ঢাকা ১২:৪৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
গাইবান্ধায় ৩ লাখ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন বলেশ্বর নদীতে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ, স্থান পরিদর্শনে জেলা পরিষদ প্রশাসক পুনরায় অতিথি পাখির দেখা মিলেছে ইবিতে, নিরাপদ আবাস নিশ্চিতের দাবি অভয়ারণ্য’র শিশুদের নিয়ে চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশনের জলবায়ু সচেতনতা কর্মসূচি রংপুরে তিস্তা সংহতি সভায় বক্তাদের প্রশ্ন, নিজস্ব টাকায় পদ্মা হলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেন নয়? রংপুরের পীরগঞ্জে ৩০০ হাত পতাকা নিয়ে আর্জেন্টিনা ভক্তদের আনন্দ শোভাযাত্রা বিশ্ব পরিবেশ দিবসে সুন্দরগঞ্জে বছরব্যাপী বৃক্ষরোপণ ও চারা বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন মাদরাসা ছাত্রকে বলাৎকারের চেষ্টার অভিযোগে শিক্ষককে গণধোলাই, পুলিশে সোপর্দ কাগজে নিষেধাজ্ঞা, মাঠে ইউক্যালিপটাস-আকাশমনির দাপট হাতিয়ায় জমি দখলচেষ্টার অভিযোগে হামলা-ভাঙচুর, নিরাপত্তা চেয়ে সংবাদ সম্মেলন

কাগজে নিষেধাজ্ঞা, মাঠে ইউক্যালিপটাস-আকাশমনির দাপট

গাইবান্ধা প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৫:২৮:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছের চারা রোপণ, উৎপাদন ও বিক্রি সরকারি প্রজ্ঞাপনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও দেশের উত্তরের জেলা গাইবান্ধায় এখনো এসব আগ্রাসী প্রজাতির গাছের বিস্তার থামেনি। জেলার সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি, সদর, পলাশবাড়ী, সাদুল্লাপুর ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলাজুড়ে গ্রামীণ জনপদের বিস্তীর্ণ এলাকায় এই গাছের অবাধ বিস্তার দেখা যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারি ও নিয়মিত তদারকির অভাবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অনেক ক্ষেত্রেই কাগজে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ১৫ মে’র প্রজ্ঞাপনে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছকে আগ্রাসী প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করে এর চারা উৎপাদন, বিক্রি, বিতরণ ও রোপণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। দেশের মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে গাইবান্ধার চিত্র ভিন্ন।

সরেজমিনে জেলার সাত উপজেলাতেই দেখা যায়, গ্রামীণ সড়কের দুই পাশ, ফসলি জমির আইল, পুকুরপাড়, বসতবাড়ির আঙিনা এবং চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় সারি সারি ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছ দাঁড়িয়ে আছে। একই সঙ্গে প্রতি বছরই নতুন করে এসব গাছের চারা রোপণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। অনেক এলাকায় ছোট আকারের নার্সারি বা ব্যক্তিগত উদ্যোগেও এসব চারা সংগ্রহ করে লাগানো হচ্ছে, যা ধীরে ধীরে গ্রামীণ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

স্থানীয়দের মতে, দ্রুত বর্ধনশীল হওয়ায় এবং কাঠ বিক্রির নিশ্চয়তা থাকায় এসব গাছকে অনেকেই লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন। ফলে কৃষিজমি, বসতবাড়ির আশপাশ এমনকি পতিত জমিতেও এসব গাছ রোপণের প্রবণতা বাড়ছে। এতে একদিকে ব্যক্তিগত লাভ হলেও অন্যদিকে পরিবেশগত ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, এসব গাছ মাটির স্বাভাবিক আর্দ্রতা নষ্ট করে দিচ্ছে এবং আশপাশের ফসলি জমির উৎপাদন ক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, নিষেধাজ্ঞার কথা অনেকেই জানেন না, আবার যারা জানেন তাদের একাংশ পরোয়া করেন না কারণ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না বলে তারা মনে করেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি দ্রুত বর্ধনশীল হওয়ায় একসময় কৃষক ও সাধারণ মানুষের কাছে এই গাছ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। স্বল্প সময়ে বিক্রিযোগ্য কাঠ পাওয়া যায় বলে অনেকে লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে এসব গাছ রোপণ করতেন। কিন্তু এই লাভের আড়ালে যে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ বিপর্যয় লুকিয়ে আছে, তা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই গাছ প্রতিদিন শত শত লিটার ভূগর্ভস্থ পানি শোষণ করে, আশপাশের মাটি শুষ্ক করে দেয় এবং এর ছায়ায় অন্য কোনো দেশীয় উদ্ভিদ জন্মাতে পারে না। ফলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয় এবং পাখি ও কীটপতঙ্গের আবাস বিপন্ন হয়ে পড়ে।

পরিবেশ সচেতন মহল মনে করেন, শুধু প্রজ্ঞাপন জারি বা মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেই এই সমস্যার সমাধান হবে না। নিয়মিত ও কঠোর মনিটরিং, ব্যাপক জনসচেতনতা কার্যক্রম এবং দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণে কার্যকর উদ্যোগ একসঙ্গে নিতে হবে। তারা বলছেন, স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া এই আগ্রাসী প্রজাতির বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয়।

পরিবেশকর্মীদের দাবি, মেহগনি, কড়ই, শিমুল, অর্জুন, জাম, কাঁঠাল ও আমসহ দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ এখনই জোরদার করতে হবে। এই গাছগুলো পরিবেশবান্ধব হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যথায় নিষেধাজ্ঞা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, আর মাটি, পানি ও প্রকৃতির ওপর ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনির নেতিবাচক প্রভাব প্রতিদিন আরও গভীর হতে থাকবে।

শিক্ষক ও সমাজকর্মী মো. হাবিবুল্লাহ সরকার বলেন, ‘ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছ পরিবেশের জন্য এখন নীরব হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার এগুলো নিষিদ্ধ করলেও মাঠপর্যায়ে সেই সিদ্ধান্তের কার্যকর বাস্তবায়ন নেই। কাগজে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ দুর্বল। এই গাছগুলো মাটি থেকে অতিরিক্ত পানি শোষণ করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নীচে নামিয়ে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে কৃষির জন্য বড় সংকট তৈরি করতে পারে। এখনই কঠোর নজরদারি ও দেশীয় গাছ রোপণে গুরুত্ব না দিলে এর ক্ষতি ভয়াবহ হবে।’

গাইবান্ধা সামাজিক বনায়ন জোনের ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি রেঞ্জার এএইচএম শরিফুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনার পর আমাদের জোন থেকে প্রায় ৪৩ হাজার ৫০০ ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছের চারা ধ্বংস করা হয়েছে। নিষিদ্ধ প্রজাতির বিস্তার রোধে আমরা সক্রিয়ভাবে কাজ করছি।’

মাঠপর্যায়ে এখনো নতুন চারা রোপণের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে আমরা দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব এবং তদারকি আরও জোরদার করা হবে।’

পরিবেশকর্মী, কবি ও সংগঠক কঙ্কন সরকার বলেন, ‘আকাশমনি, ইউক্যালিপটাস আগ্রাসী ধরনের গাছ। যা আমাদের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর। এজন্য সরকার একটা আইন করেছে এ গাছের চারা উৎপাদন, রোপণ নিষিদ্ধ বিষয়ে। কিন্তু তবুও উৎপাদন, বিক্রয়, রোপণ চলছেই প্রায়। এ চারা নাকি উৎপাদন সহজ ও বাড়ে তাড়াতাড়ি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, আইনের প্রয়োগ যথাযথ হোক। পাশাপাশি এসব গাছ যে ক্ষতিকর তা মানুষের হৃদয়াঙ্গম করতে সচেতনতা তৈরিতেও ব্যাপক ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। কেননা, মানুষ সহজলভ্যতার দিকে এগোয় বেশি। আর এ গাছের বিকল্প কাঠ বা জ্বালানীর জন্য পরিবেশবান্ধব গাছ যেমন- ঘোড়ানিম, পাউয়া, কদম, জিগনি, শিমুলসহ এমন গাছ রোপণেও উৎসাহিত করতে হবে। কেননা, এসব গাছও কাঠ দেয়, তাড়াতাড়ি বাড়ে, প্রাণী-পাখির আহার জোগায়।’

সামাজিক উন্নয়ন পদক্ষেপ (এসইউপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক এম সাদ্দাম হোসেন পবন বলেন, বাংলাদেশে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছের চারা রোপণ, বিতরণ ও বিপণন আইন দ্বারা নিষিদ্ধ থাকলেও, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং তদারকির অভাবে এসব গাছের বিস্তার থামানো যাচ্ছে না। এতে দেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব গাছ অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি শোষণ করে এবং পাতা থেকে নির্গত রাসায়নিক উপাদান মাটির উর্বরতা নষ্ট করে দেয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে মাটি অনুর্বর হয়ে কৃষি উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তিনি আরও বলেন, আশির দশক থেকে বাংলাদেশে ইউক্যালিপটাস গাছের বিস্তার শুরু হয়, যার উৎপত্তি মূলত কুইন্সল্যান্ড, কেপ ইয়র্ক উপদ্বীপ ও পাপুয়া নিউগিনি অঞ্চল থেকে। অন্যদিকে আকাশমনি গাছের প্রসার সিলেট অঞ্চলে শুরু হয়, যার উৎপত্তিস্থল হিসেবে তাসমানিয়া ও পাপুয়া নিউগিনি চিহ্নিত। এসব গাছের পাতা ও বাকলে থাকা ট্যানিন ও ফেনোলিক অ্যাসিড মাটির অম্লতা (pH) বাড়িয়ে উর্বরতা কমিয়ে দেয়, যা পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক।

আকাশমনি গাছের বিষয়ে তিনি বলেন, এর ফুলের পরাগরেণু বাতাসে ছড়িয়ে অ্যালার্জি, হাঁপানি ও শ্বাসতন্ত্রজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এসব আগ্রাসী বিদেশি প্রজাতির পরিবর্তে দেশীয় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ এখন সময়ের দাবি। শুধু আইন নয়, এর কঠোর বাস্তবায়ন এবং ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ, বৃক্ষরোপণ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করছে ‘বৃক্ষসখা’ নামের সংগঠনটি। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার সরকার (পিএইচডি) বলেন, ‘আমাদের দেশে দ্রুত বৃদ্ধি ও কাঠের বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে একসময় ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছিল। আসবাবপত্র তৈরি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে চটজলদি লাভের দিক থেকে গাছ দুটির উপযোগিতা থাকলেও, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর এদের সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব এখন মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউক্যালিপটাস বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি শোষণ করে মাটিকে অনুর্বর ও শুষ্ক করে তোলে, আর আকাশমনির পরাগরেণু মানবদেহে অ্যালার্জি ও শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়ায়; পাশাপাশি এদের পাতা সহজে না পচায় মাটির অম্লতা বাড়ে এবং দেশীয় উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সংকট হলো, এই বিদেশী প্রজাতির গাছগুলো আমাদের স্থানীয় পাখি ও বন্যপ্রাণীকে কোনো খাদ্য বা নিরাপদ আশ্রয় দিতে পারে না, যা সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সাময়িক অর্থনৈতিক লাভ কখনোই দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত বিপর্যয়ের চেয়ে বড় হতে পারে না। তাই পরিবেশের বৃহত্তর স্বার্থে এই ক্ষতিকর গাছগুলোর চারা রোপণ, উৎপাদন ও বিক্রি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। তবে এই নিষেধাজ্ঞা সফল করতে হলে শুধু আইন করলেই হবে না, নার্সারি মালিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং এর বিকল্প হিসেবে দেশি পরিবেশবান্ধব, দ্রুত বর্ধনশীল ও ঐতিহ্যবাহী প্রজাতির গাছ রোপণে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতে হবে।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :
   

কাগজে নিষেধাজ্ঞা, মাঠে ইউক্যালিপটাস-আকাশমনির দাপট

আপডেট সময় : ০৫:২৮:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছের চারা রোপণ, উৎপাদন ও বিক্রি সরকারি প্রজ্ঞাপনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও দেশের উত্তরের জেলা গাইবান্ধায় এখনো এসব আগ্রাসী প্রজাতির গাছের বিস্তার থামেনি। জেলার সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি, সদর, পলাশবাড়ী, সাদুল্লাপুর ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলাজুড়ে গ্রামীণ জনপদের বিস্তীর্ণ এলাকায় এই গাছের অবাধ বিস্তার দেখা যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারি ও নিয়মিত তদারকির অভাবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অনেক ক্ষেত্রেই কাগজে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ১৫ মে’র প্রজ্ঞাপনে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছকে আগ্রাসী প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করে এর চারা উৎপাদন, বিক্রি, বিতরণ ও রোপণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। দেশের মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে গাইবান্ধার চিত্র ভিন্ন।

সরেজমিনে জেলার সাত উপজেলাতেই দেখা যায়, গ্রামীণ সড়কের দুই পাশ, ফসলি জমির আইল, পুকুরপাড়, বসতবাড়ির আঙিনা এবং চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় সারি সারি ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছ দাঁড়িয়ে আছে। একই সঙ্গে প্রতি বছরই নতুন করে এসব গাছের চারা রোপণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। অনেক এলাকায় ছোট আকারের নার্সারি বা ব্যক্তিগত উদ্যোগেও এসব চারা সংগ্রহ করে লাগানো হচ্ছে, যা ধীরে ধীরে গ্রামীণ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

স্থানীয়দের মতে, দ্রুত বর্ধনশীল হওয়ায় এবং কাঠ বিক্রির নিশ্চয়তা থাকায় এসব গাছকে অনেকেই লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন। ফলে কৃষিজমি, বসতবাড়ির আশপাশ এমনকি পতিত জমিতেও এসব গাছ রোপণের প্রবণতা বাড়ছে। এতে একদিকে ব্যক্তিগত লাভ হলেও অন্যদিকে পরিবেশগত ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, এসব গাছ মাটির স্বাভাবিক আর্দ্রতা নষ্ট করে দিচ্ছে এবং আশপাশের ফসলি জমির উৎপাদন ক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, নিষেধাজ্ঞার কথা অনেকেই জানেন না, আবার যারা জানেন তাদের একাংশ পরোয়া করেন না কারণ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না বলে তারা মনে করেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি দ্রুত বর্ধনশীল হওয়ায় একসময় কৃষক ও সাধারণ মানুষের কাছে এই গাছ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। স্বল্প সময়ে বিক্রিযোগ্য কাঠ পাওয়া যায় বলে অনেকে লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে এসব গাছ রোপণ করতেন। কিন্তু এই লাভের আড়ালে যে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ বিপর্যয় লুকিয়ে আছে, তা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই গাছ প্রতিদিন শত শত লিটার ভূগর্ভস্থ পানি শোষণ করে, আশপাশের মাটি শুষ্ক করে দেয় এবং এর ছায়ায় অন্য কোনো দেশীয় উদ্ভিদ জন্মাতে পারে না। ফলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয় এবং পাখি ও কীটপতঙ্গের আবাস বিপন্ন হয়ে পড়ে।

পরিবেশ সচেতন মহল মনে করেন, শুধু প্রজ্ঞাপন জারি বা মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেই এই সমস্যার সমাধান হবে না। নিয়মিত ও কঠোর মনিটরিং, ব্যাপক জনসচেতনতা কার্যক্রম এবং দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণে কার্যকর উদ্যোগ একসঙ্গে নিতে হবে। তারা বলছেন, স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া এই আগ্রাসী প্রজাতির বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয়।

পরিবেশকর্মীদের দাবি, মেহগনি, কড়ই, শিমুল, অর্জুন, জাম, কাঁঠাল ও আমসহ দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ এখনই জোরদার করতে হবে। এই গাছগুলো পরিবেশবান্ধব হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যথায় নিষেধাজ্ঞা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, আর মাটি, পানি ও প্রকৃতির ওপর ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনির নেতিবাচক প্রভাব প্রতিদিন আরও গভীর হতে থাকবে।

শিক্ষক ও সমাজকর্মী মো. হাবিবুল্লাহ সরকার বলেন, ‘ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছ পরিবেশের জন্য এখন নীরব হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার এগুলো নিষিদ্ধ করলেও মাঠপর্যায়ে সেই সিদ্ধান্তের কার্যকর বাস্তবায়ন নেই। কাগজে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ দুর্বল। এই গাছগুলো মাটি থেকে অতিরিক্ত পানি শোষণ করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নীচে নামিয়ে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে কৃষির জন্য বড় সংকট তৈরি করতে পারে। এখনই কঠোর নজরদারি ও দেশীয় গাছ রোপণে গুরুত্ব না দিলে এর ক্ষতি ভয়াবহ হবে।’

গাইবান্ধা সামাজিক বনায়ন জোনের ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি রেঞ্জার এএইচএম শরিফুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনার পর আমাদের জোন থেকে প্রায় ৪৩ হাজার ৫০০ ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছের চারা ধ্বংস করা হয়েছে। নিষিদ্ধ প্রজাতির বিস্তার রোধে আমরা সক্রিয়ভাবে কাজ করছি।’

মাঠপর্যায়ে এখনো নতুন চারা রোপণের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে আমরা দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব এবং তদারকি আরও জোরদার করা হবে।’

পরিবেশকর্মী, কবি ও সংগঠক কঙ্কন সরকার বলেন, ‘আকাশমনি, ইউক্যালিপটাস আগ্রাসী ধরনের গাছ। যা আমাদের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর। এজন্য সরকার একটা আইন করেছে এ গাছের চারা উৎপাদন, রোপণ নিষিদ্ধ বিষয়ে। কিন্তু তবুও উৎপাদন, বিক্রয়, রোপণ চলছেই প্রায়। এ চারা নাকি উৎপাদন সহজ ও বাড়ে তাড়াতাড়ি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, আইনের প্রয়োগ যথাযথ হোক। পাশাপাশি এসব গাছ যে ক্ষতিকর তা মানুষের হৃদয়াঙ্গম করতে সচেতনতা তৈরিতেও ব্যাপক ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। কেননা, মানুষ সহজলভ্যতার দিকে এগোয় বেশি। আর এ গাছের বিকল্প কাঠ বা জ্বালানীর জন্য পরিবেশবান্ধব গাছ যেমন- ঘোড়ানিম, পাউয়া, কদম, জিগনি, শিমুলসহ এমন গাছ রোপণেও উৎসাহিত করতে হবে। কেননা, এসব গাছও কাঠ দেয়, তাড়াতাড়ি বাড়ে, প্রাণী-পাখির আহার জোগায়।’

সামাজিক উন্নয়ন পদক্ষেপ (এসইউপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক এম সাদ্দাম হোসেন পবন বলেন, বাংলাদেশে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছের চারা রোপণ, বিতরণ ও বিপণন আইন দ্বারা নিষিদ্ধ থাকলেও, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং তদারকির অভাবে এসব গাছের বিস্তার থামানো যাচ্ছে না। এতে দেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব গাছ অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি শোষণ করে এবং পাতা থেকে নির্গত রাসায়নিক উপাদান মাটির উর্বরতা নষ্ট করে দেয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে মাটি অনুর্বর হয়ে কৃষি উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তিনি আরও বলেন, আশির দশক থেকে বাংলাদেশে ইউক্যালিপটাস গাছের বিস্তার শুরু হয়, যার উৎপত্তি মূলত কুইন্সল্যান্ড, কেপ ইয়র্ক উপদ্বীপ ও পাপুয়া নিউগিনি অঞ্চল থেকে। অন্যদিকে আকাশমনি গাছের প্রসার সিলেট অঞ্চলে শুরু হয়, যার উৎপত্তিস্থল হিসেবে তাসমানিয়া ও পাপুয়া নিউগিনি চিহ্নিত। এসব গাছের পাতা ও বাকলে থাকা ট্যানিন ও ফেনোলিক অ্যাসিড মাটির অম্লতা (pH) বাড়িয়ে উর্বরতা কমিয়ে দেয়, যা পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক।

আকাশমনি গাছের বিষয়ে তিনি বলেন, এর ফুলের পরাগরেণু বাতাসে ছড়িয়ে অ্যালার্জি, হাঁপানি ও শ্বাসতন্ত্রজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এসব আগ্রাসী বিদেশি প্রজাতির পরিবর্তে দেশীয় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ এখন সময়ের দাবি। শুধু আইন নয়, এর কঠোর বাস্তবায়ন এবং ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ, বৃক্ষরোপণ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করছে ‘বৃক্ষসখা’ নামের সংগঠনটি। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার সরকার (পিএইচডি) বলেন, ‘আমাদের দেশে দ্রুত বৃদ্ধি ও কাঠের বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে একসময় ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছিল। আসবাবপত্র তৈরি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে চটজলদি লাভের দিক থেকে গাছ দুটির উপযোগিতা থাকলেও, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর এদের সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব এখন মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউক্যালিপটাস বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি শোষণ করে মাটিকে অনুর্বর ও শুষ্ক করে তোলে, আর আকাশমনির পরাগরেণু মানবদেহে অ্যালার্জি ও শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়ায়; পাশাপাশি এদের পাতা সহজে না পচায় মাটির অম্লতা বাড়ে এবং দেশীয় উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সংকট হলো, এই বিদেশী প্রজাতির গাছগুলো আমাদের স্থানীয় পাখি ও বন্যপ্রাণীকে কোনো খাদ্য বা নিরাপদ আশ্রয় দিতে পারে না, যা সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সাময়িক অর্থনৈতিক লাভ কখনোই দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত বিপর্যয়ের চেয়ে বড় হতে পারে না। তাই পরিবেশের বৃহত্তর স্বার্থে এই ক্ষতিকর গাছগুলোর চারা রোপণ, উৎপাদন ও বিক্রি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। তবে এই নিষেধাজ্ঞা সফল করতে হলে শুধু আইন করলেই হবে না, নার্সারি মালিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং এর বিকল্প হিসেবে দেশি পরিবেশবান্ধব, দ্রুত বর্ধনশীল ও ঐতিহ্যবাহী প্রজাতির গাছ রোপণে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতে হবে।’