ঈদের দ্বিতীয় দিনে মওলানা ভাসানী তিস্তা সেতুতে মানুষের ঢল, মুখর তিস্তাপাড়
- আপডেট সময় : ০৭:৫৮:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬ ২৭ বার পড়া হয়েছে

ঈদুল আজহার দ্বিতীয় দিনে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর-চিলমারী মওলানা ভাসানী তিস্তা সেতু এলাকায় ছিল মানুষের উপচেপড়া ভিড়। সকাল গড়াতেই সেতুর দুই প্রান্তজুড়ে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি। দুপুরের পর সেই ভিড় রূপ নেয় জনসমুদ্রে। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও স্বজনদের নিয়ে মানুষ ছুটে আসেন তিস্তার পাড়ে। নদীর বাতাস, খোলা আকাশ আর দীর্ঘ সেতুর সৌন্দর্যে ঈদের আনন্দ যেন নতুন মাত্রা পায়।
সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে অনেকে ছবি তুলেছেন, ভিডিও করেছেন, আবার কেউ নদীর দিকে তাকিয়ে গল্পে মেতে উঠেছেন। বিকেলের দিকে পুরো এলাকা যেন এক অস্থায়ী উৎসবকেন্দ্রে পরিণত হয়। শিশুদের কোলাহল, ভুট্টা ভাজা ও চায়ের দোকানের ভিড়, মোটরসাইকেলের সারি আর মানুষের হাঁটাচলায় মুখর হয়ে ওঠে তিস্তাপাড়।
ঈদের ছুটিতে একটু নির্মল পরিবেশে সময় কাটাতে রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও অনেকে এখানে ঘুরতে আসেন। কেউ মোটরসাইকেলে, কেউ অটোরিকশায়, কেউ মাইক্রোবাস কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে পরিবার নিয়ে আসেন সেতু এলাকায়।
রংপুর থেকে ঘুরতে আসা কলেজ শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, ‘বন্ধুদের নিয়ে ঈদের ছুটিতে ঘুরতে আসছি। তিস্তার ওপর দাঁড়াইলে মনটা অন্যরকম ভালো হয়ে যায়। শহরের ভিড়ের বাইরে এমন খোলা পরিবেশ খুব কম জায়গাতেই পাওয়া যায়। পাশাপাশি চিলমারীর রমনা ঘাট থেকেও ঘুরে আসলাম। নদীর পরিবেশ আর এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সত্যিই উপভোগ করার মতো।’
কুড়িগ্রাম শহর থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসা কলেজ শিক্ষক সাদিয়া সুলতানা বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ‘ঈদের ব্যস্ততার মাঝেও পরিবারের সবাইকে নিয়ে একটু খোলামেলা পরিবেশে সময় কাটানোর জন্য এখানে আসছি। তিস্তার ওপর দাঁড়িয়ে নদীর বাতাস নিতে সত্যিই অনেক ভালো লাগছে। চারপাশের পরিবেশটা খুব শান্ত ও মনোমুগ্ধকর। বাচ্চারাও আনন্দ করছে, ছবি তুলছে, নদী দেখছে। শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে এমন জায়গায় সময় কাটালে মনটা অনেকটা সতেজ হয়ে যায়।’
গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে আসা যুবক মিফতাহুল জান্নাত বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে সবাই মিলে একটু ঘুরতে বের হয়েছি। মওলানা ভাসানী তিস্তা সেতুতে এসে অনেক ভালো লাগছে। সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে নদী দেখা, ছবি তোলা আর বিকেলের ঠাণ্ডা বাতাস উপভোগ করার অনুভূতিটা সত্যিই দারুণ। এখানে আসলে মনটা অনেক ফ্রেশ হয়ে যায়। বিশেষ করে বিকেলের সময়টা খুব সুন্দর লাগে, তাই প্রতি ঈদেই বন্ধুদের নিয়ে একদিন এখানে আসার চেষ্টা করি।’
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের বাসিন্দা সুমাইয়া বেগম বলেন, ‘প্রতি ঈদেই আমরা পরিবার নিয়ে এখানে ঘুরতে আসি। বাচ্চারা নদী দেখলে খুব খুশি হয়। বিকেলের দিকে এত মানুষ হয়েছে যে ঠিকমতো হাঁটাও কষ্ট হচ্ছিল। তারপরও সবাই খুব আনন্দ করছে। খোলা বাতাস, নদীর দৃশ্য আর মানুষের ভিড় মিলিয়ে পুরো এলাকাটা একেবারে উৎসবমুখর লাগছে। সন্ধ্যার আগে সেতুর ওপর দাঁড়ালে তিস্তার দৃশ্যটা আরও সুন্দর লাগে।’
স্থানীয় যুবক রমজান আলী বলেন, ‘এবার অন্যবারের চেয়ে মানুষ অনেক বেশি আসছে। সকাল থেকেই মোটরসাইকেল, অটোরিকশা আর মানুষের চাপ ছিল চোখে পড়ার মতো। বিকেলের দিকে সেতুর দুই পাশে এত ভিড় হয়েছে যে অনেক জায়গায় দাঁড়ানোরও জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। এবার পুরো এলাকাটা যেন ছোটখাটো মেলায় পরিণত হয়েছে।’
সেতুর দুই পাশে অস্থায়ীভাবে বসেছে ছোট ছোট দোকান। কেউ চা, ঝালমুড়ি, চটপটি, আইসক্রিম, ফুচকা, ভাজাপোড়া কিংবা আখের রস বিক্রি করছেন। পাশাপাশি নারীদের জন্য চুরি-ফিতা, কসমেটিক ও শিশুদের খেলনার দোকানও বসেছে। দর্শনার্থীদের ভিড়ে এসব দোকানের বেচাকেনাও ভালো হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘সাধারণ দিনে এখানে এত মানুষ আসে না, তাই বেচাকেনাও কম হয়। কিন্তু ঈদের সময় মানুষের ভিড় বাড়লে আমাদেরও ভালো আয় হয়। সকাল থেকে একটানা চা বানাচ্ছি, বসার সময়ও পাইনি। ঈদের এই কয়েকটা দিনই আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো সময়।’
ঝালমুড়ি বিক্রেতা রুবেল মিয়া বলেন, ‘ঈদের এই দুই-তিন দিনই আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো সময়। দুপুরের পর এত ভিড় হয়েছে যে একটানা কাজ করতে হচ্ছে। ছোট-বড় সবাই ঝালমুড়ি কিনছে। বিকেলের দিকে চাপ আরও বেড়ে যায়।’
আইসক্রিম বিক্রেতা মফিদুল ইসলাম বলেন, ‘বাচ্চাদের নিয়ে পরিবার বেশি আসছে। তাই আইসক্রিমের চাহিদাও অনেক বেশি। বিকেলের দিকে দোকানের সামনে দাঁড়ানোর জায়গাও থাকে না। ঈদের ছুটিতে এমন ভিড় হলে আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীদেরও কিছু বাড়তি আয় হয়।’
চা বিক্রেতা রহিম উদ্দিন বলেন, ‘নদীর পাড়ে মানুষ বসে গল্প করে, চা খায়, ছবি তোলে। ঈদের সময় এই সেতুই যেন আলাদা একটা আনন্দের জায়গা হয়ে যায়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষ আসছে আর যাচ্ছে। বিশেষ করে বিকেলের পর পরিবার ও তরুণদের ভিড় সবচেয়ে বেশি থাকে। মানুষ বেশি আসলে আমাদের বেচাকেনাও ভালো হয়।’
তবে অতিরিক্ত মানুষের ভিড়ে সেতুর দুই প্রান্তে কিছুটা যানজটও তৈরি হয়। বিকেলের দিকে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার চাপ বেড়ে গেলে ধীরগতিতে চলাচল করতে দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।
স্থানীয়দের মতে, মওলানা ভাসানী তিস্তা সেতুতে পর্যটন সুবিধা বাড়ানো গেলে এটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থানে পরিণত হতে পারে। বসার ব্যবস্থা, পার্কিং ও বিনোদনের সুযোগ বাড়ালে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বাড়বে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. আজাদুল ইসলাম বলেন, ‘এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনেক সুন্দর। সরকারিভাবে উন্নয়ন করা গেলে এটি সারা বছর পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।’
স্থানীয় শিক্ষক মো. আবু রায়হান সেলিম বলেন, ‘তিস্তা সেতু এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম না, মানুষের বিনোদনের জায়গাও হয়ে উঠছে। ঈদের সময় এখানে মানুষের আগ্রহ দেখে সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়।’
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে সেতুর লাইট জ্বলে উঠলে পুরো এলাকা আলোকিত হয়ে ওঠে। নদীর পানিতে আলো প্রতিফলিত হয়ে তৈরি হয় মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। তখনও অনেকেই পরিবার নিয়ে সময় কাটাতে ব্যস্ত ছিলেন। পুরো বিকেল ও সন্ধ্যাজুড়ে তাই মওলানা ভাসানী তিস্তা সেতু এলাকা ছিল উৎসবমুখর পরিবেশে ভরপুর। মানুষের কোলাহল, নদীর বাতাস আর আনন্দঘন মুহূর্তে প্রাণ ফিরে পেয়েছিল পুরো তিস্তাপাড়।




















