চামড়ার বাজারে ধস, অপেক্ষার পর সড়কেই ফেলে গেলেন ব্যবসায়ীরা
- আপডেট সময় : ০৩:৩৪:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬ ৩৪ বার পড়া হয়েছে

ঈদুল আজহার কোরবানির পর সাধারণত চামড়ার হাটে জমে ওঠে বেচাকেনা। মৌসুমী ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা-এতিমখানা ও ক্ষুদ্র সংগ্রাহকদের পদচারণায় মুখর থাকে হাট-বাজার। কিন্তু এবার গাইবান্ধায় দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ক্রেতা সংকট, কম দাম এবং পাইকারদের অনীহার কারণে মহাসড়কের পাশেই শত শত কোরবানির পশুর চামড়া ফেলে রেখে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার ঈদুল আজহায় গাইবান্ধায় প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল। ঈদের দিন দুপুরের পর থেকেই জেলার ঐতিহ্যবাহী পলাশবাড়ী কালিবাজার চামড়ার হাটে চামড়া নিয়ে আসতে শুরু করেন মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি বিভিন্ন মাদ্রাসা ও এতিমখানাও দান হিসেবে পাওয়া চামড়া সংগ্রহ করে বিক্রির আশায় অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু দুইদিন পার হলেও মিলেনি আশানুরূপ ক্রেতা।
ফলে অনেকে মহাসড়কের পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চামড়া নিয়ে অপেক্ষা করেও বিক্রি করতে না পেরে সেগুলো ফেলে রেখে বাড়ি ফিরে গেছেন। কোথাও কোথাও রাস্তার ধারে পড়ে থাকতে দেখা গেছে গরু ও ছাগলের চামড়ার স্তূপ। বাতাসে ছড়িয়েছে দুর্গন্ধ। আর সেই দৃশ্য যেন কোরবানির পরের বাস্তবতার এক নির্মম চিত্র হয়ে উঠেছে।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার চাপাদহ গ্রামের ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী মানিক চন্দ্র রবিদাস (৫৫) প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদের দিন সাইকেল নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে চামড়া সংগ্রহ করেন। পরে সেগুলো বিক্রির জন্য নিয়ে যান পলাশবাড়ী হাটে। কিন্তু এবার চরম হতাশার মুখে পড়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘ঈদের দিন ধারদেনা করে প্রায় ৪০ হাজার টাকার গরুর চামড়া কিনছি। ভাবছিলাম আগের মতো পাইকারদের কাছে বিক্রি করমু। কিন্তু দুইদিন ধইরা হাটে বসে আছি, কেউ ঠিকমতো দামই কয় নাই। এখন চামড়া বাড়িতে নিয়ে লবণ দিয়া রাখছি। পরে বিক্রি করলেও লাভ হইবো কিনা জানি না।’
পলাশবাড়ী উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হরিপদ দাসও একই ধরনের হতাশার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘ঈদের দিন প্রায় ৫০ হাজার টাকার চামড়া কিনছি। গাইবান্ধা শহরের আড়তে নিয়া গেছিলাম, কেউ দাম করে নাই। পরে পলাশবাড়ীর হাটে নিয়া গেলাম, সেখানেও একই অবস্থা। পাইকাররা কয়, চামড়া কিনে কী করব? আমরা বিক্রি করব কোথায়?’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন বাড়িতে লবণ দিয়ে চামড়া রাখছি। কিন্তু এত খরচ করে পরে লাভ হবে কিনা, সেই চিন্তায় ঘুমাইতে পারতেছি না।’
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, দীর্ঘদিনের নিয়ম অনুযায়ী ঈদের পর যে বুধবার পড়ে, সেদিনই পলাশবাড়ীর বড় চামড়ার হাট বসে। সে হিসেবে আগামী বুধবার হাট বসার কথা রয়েছে। সাধারণত ওইদিন ঢাকা ও অন্যান্য এলাকা থেকে ট্যানারি মালিক ও বড় পাইকাররা এসে চামড়া কিনে নিয়ে যান। কিন্তু এবার ঈদের পরদিন থেকেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চামড়া নিয়ে হাটে আসতে শুরু করলেও পাইকারদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম।
পলাশবাড়ী চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির নেতা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘প্রতিবছর ট্যানারির বড় ক্রেতারা হাটের দিনে আসেন। তাদের চাহিদার ওপরই বাজার অনেকটা নির্ভর করে। এবারও আমরা আশা করছি বুধবার থেকে বেচাকেনা বাড়বে।’
চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ৫৫ টাকা এবং ছাগলের চামড়া ১২ থেকে ১৫ টাকা নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বেশি দামে চামড়া কিনেছেন। ফলে সেই দামে বিক্রি করতে না পারায় বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, ‘দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা এনে চামড়া কিনছি। এখন মহাজনরা ছাগলের চামড়ার দামও করতে চায় না। কীভাবে টাকা শোধ করব বুঝতেছি না।’
গাইবান্ধা শহরের চামড়া ব্যবসায়ী আরশাদ আলী বলেন, ‘ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে চামড়া কিনছেন। এছাড়া এবার লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত অনেক পশুর চামড়াও এসেছে। এসব কারণে স্থানীয় পাইকাররা চামড়া কিনতে ভয় পাচ্ছেন।’
তবে মাঠপর্যায়ের অনেক ব্যবসায়ী ও মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ট্যানারি মালিকদের একটি সিন্ডিকেটের কারণেই প্রতি বছর কোরবানির সময় চামড়ার বাজার ধসে পড়ে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি মাদ্রাসার শিক্ষক বলেন, ‘প্রতিবছরের মতো এবারও অনেকে মাদ্রাসায় চামড়া দান করছে। আবার ফোন দিলে ছাত্র পাঠাইয়া সংগ্রহ করছি। কিন্তু দুইদিনেও কোনো ক্রেতা আসে নাই। তাই ভ্যানে করে মহাসড়কে নিয়া আসছিলাম, যদি কোনো পাইকার কিনে নেয়। সারাদিন বসে থেকেও কেউ আসে নাই। শেষে বাধ্য হইয়া কিছু চামড়া ফেলে রেখে চলে গেছি।’
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এই চামড়াগুলা বিক্রি হইলে মাদ্রাসার ছাত্রদের কিছু উপকার হইতো। কিন্তু এখন উল্টো খরচ বাড়ছে। কোরবানির সময় চামড়ার দাম কমে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় গরিব মানুষ আর দানে চলা প্রতিষ্ঠানগুলো।’
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে প্রতিবছরই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো এমন সংকটে পড়বে। তাদের মতে, কোরবানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান চামড়া যদি ন্যায্যমূল্য না পায়, তাহলে এর সঙ্গে জড়িত হাজারো মানুষের জীবিকাও হুমকির মুখে পড়বে।




















