শহরে কিছুটা দাম থাকলেও চরাঞ্চলে পানির দরে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির পশুর চামড়া
- আপডেট সময় : ০২:২৯:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬ ৩১ বার পড়া হয়েছে

পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে জমে ওঠে বেচাকেনা। তবে এবার গাইবান্ধার চামড়ার বাজারে দেখা দিয়েছে চরম মন্দা। শহরাঞ্চলে কিছুটা দাম মিললেও চরাঞ্চলে পানির দরে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির চামড়া। কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ কোরবানিদাতারা।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ঈদের দিন সকাল থেকে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার, মাদরাসা ও অস্থায়ী সংগ্রহকেন্দ্রে চামড়া কেনাবেচা শুরু হয়। তবে বাজারে ক্রেতা কম থাকায় এবং দাম আশানুরূপ না হওয়ায় হতাশা দেখা যায় বিক্রেতাদের মাঝে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এবার কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে চরম মন্দা বিরাজ করছে। শহরাঞ্চলে কিছুটা বেশি দামে চামড়া বিক্রি হলেও চরাঞ্চলে দাম একেবারেই কম। গরুর চামড়া আকার ও মানভেদে শহরে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হলেও চরাঞ্চলের অনেক এলাকায় একই চামড়া ১০০ থেকে ২০০ টাকার বেশি দাম পাচ্ছে না। আবার ছাগল ও ভেড়ার চামড়া বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকায়। কোথাও কোথাও ক্রেতা না থাকায় অনেককে বিনামূল্যেও চামড়া দিয়ে দিতে হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চরাঞ্চল থেকে চামড়া শহরে নিতে অতিরিক্ত পরিবহন খরচ গুনতে হয়। পাশাপাশি সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামে চামড়া বিক্রি করছেন। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন চরাঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ কোরবানিদাতারা।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার মৌজা মালিবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা মো. আব্দুল কাদের বলেন, গত বছর যে চামড়া চারশ থেকে পাঁচশ টাকায় বিক্রি হইছে, এবার সেই চামড়ার দাম একশ-দুইশ টাকার বেশি নিচ্ছেনা ক্রেতারা। নিরুপায় হয়ে কম দামেই বিক্রি করলাম।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. ছোটন সরকার বলেন, কোরবানির পরে চামড়া বিক্রি করতে গিয়া দেখি কেউ দামই দিতে চায় না। শেষ পর্যন্ত ১০০ টাকায় গরুর একটি চামড়া বিক্রি করলাম। এত বড় গরুর চামড়ার এই অবস্থা দেইখা খারাপ লাগছে।
স্থানীয়রা জানান, সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় চামড়া নিয়ে বিক্রেতারা ঘুরলেও আশানুরূপ ক্রেতা পাওয়া যায়নি। অনেকে কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। আবার কেউ কেউ মাদরাসা ও এতিমখানায় বিনামূল্যে চামড়া দিয়ে দিয়েছেন।
চরাঞ্চলের চামড়া ব্যবসায়ী মো. আজম মিয়া বলেন, চামড়ার দাম একেবারে কম। দেড়শ টাকার বেশি দিয়ে চামড়া কিনিনি। সারাদিন চামড়া কিনে সর্বোচ্চ দুইশ থেকে আড়াইশ টাকা দরে বিক্রি করা যাবে। আবার চর থেকে শহরে চামড়া নিতে গেলেই পরিবহন খরচ বাড়ে। সব মিলিয়ে লাভ তো দূরের কথা, মূলধন তুলতেই কষ্ট হইবে।
ব্যবসায়ী দুলাল রবিদাস বলেন, কোরবানির গরুর চামড়া প্রকারভেদে দুইশ থেকে তিনশ টাকায় কিনতে হচ্ছে। কিন্তু বাজারে বিক্রি করে তেমন লাভ থাকতেছে না। পরিবহন, লবণ আর শ্রমিক খরচ দিয়া ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ছে।
আরেক ব্যবসায়ী সন্তোষ রবি দাস বলেন, অনেক বছর ধরে চামড়ার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আছি। কিন্তু কখনো এত কম দাম দেখিনি। এবার চামড়া কিনে লাভের আশা তো নাই, বরং লোকসানের ভয় নিয়েই ব্যবসা করতে হচ্ছে।
চরাঞ্চলের কয়েকজন মৌসুমি ব্যবসায়ী জানান, ট্যানারিগুলো থেকে আগের মতো চাহিদা না থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে চামড়ার দাম কমে গেছে। এছাড়া সংরক্ষণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় ছোট ব্যবসায়ীরা বেশি ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।
গাইবান্ধা শহরের এক মৌসুমি ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চামড়া কিনে রাখলেও পরে ভালো দামে বিক্রি করা যাবে কিনা সেই নিশ্চয়তা নাই। তাই অনেকে কম দামে কিনতেছে, আবার অনেকে কিনতেই চাচ্ছে না।
এদিকে বিভিন্ন এতিমখানা ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষও বলছেন, চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তাদের প্রত্যাশিত আয় কমে গেছে। এতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, প্রতি বছর সরকারিভাবে দাম নির্ধারণ করা হলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় না। সিন্ডিকেট, সংরক্ষণ সংকট ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্র জানায়, এবার জেলায় বিপুল সংখ্যক পশু কোরবানি হয়েছে। তবে চামড়ার বাজার স্বাভাবিক না থাকায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, কোরবানির পশুর চামড়া যেন নষ্ট না হয়, সেজন্য সংরক্ষণে লবণ ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, ব্যবসায়ীরা সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন।


























