এক কলস পানির জন্য মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি
- আপডেট সময় : ০৮:২৩:০০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬ ৫০ বার পড়া হয়েছে

তপ্ত দুপুরে এক কলস সুপেয় পানির জন্য মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দেওয়া এখন খুলনার কয়রাবাসীর নিত্যদিনের বাস্তবতা। উপকূলীয় এই জনপদে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষের জন্য নিরাপদ পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দীর্ঘস্থায়ী খরায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অধিকাংশ নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে লবণাক্ততার কারণে চারপাশের পুকুর ও জলাধারের পানি পানের অনুপযোগী হয়ে উঠেছে। ফলে সাতটি ইউনিয়নের মানুষের জীবনযাত্রা চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিটি গ্রামেই যেন পানির জন্য হাহাকার। কোথাও সুন্দরবনের ফরেস্ট ক্যাম্প থেকে ট্রলারে করে পানি কিনে আনছেন মানুষ, আবার কোথাও নিরুপায় হয়ে পুকুরের ময়লাযুক্ত পানি পান করছেন। আধুনিকতার দোহাই দিয়ে প্রাচীন পুকুর-জলাশয়গুলো সংরক্ষণ না করা এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় সংকট দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি উদ্যোগের ঘাটতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবেই প্রতি বছর খরা মৌসুমে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কিছু পানির ট্যাঙ্ক বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। গভীর নলকূপ স্থাপন করলেও অনেক জায়গায় সেগুলো থেকেও পানি উঠছে না।
বাগালী ইউনিয়নের দিপা রানী বলেন, ‘বাড়ি থেকে আড়াই কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনতে হয়। পুকুরের পানি খাওয়ার উপযোগী না। খরার সময় প্রায় ৪-৫ মাস এভাবে কষ্ট করতে হয়। দুই-তিন বাড়ি মিলে একটি ট্যাঙ্কি পেয়েছি, কিন্তু তাতে প্রয়োজন মেটে না।’
কয়রা সদর ইউনিয়নের ময়না বেগম বলেন, ‘বাড়ির পুরুষরা বাইরে কাজে থাকে, পানি আনতে হয় আমাদের। অনেক দূর থেকে হাঁটতে হাঁটতে পানি আনতে হয়। কখনো ভ্যানে করে আনতে হয়। খুব কষ্ট হয়।’
কয়রা সদর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. লুৎফর রহমান সরদার জানান, তার ইউনিয়নের প্রায় ৬২ হাজার মানুষ পানির সংকটে ভুগছেন। অনেকেই সুন্দরবনের ফরেস্ট ক্যাম্প থেকে ট্রলারে করে পানি কিনে আনছেন। তিনি বলেন, ‘পানির ট্যাঙ্কি বিতরণ করা হলেও তা অর্ধেক মানুষের কাছেও পৌঁছায়নি। আগে পুকুর ছিল, সেখান থেকে পানি পাওয়া যেত। এখন সেই পুকুরগুলো নেই বললেই চলে। দ্রুত পুকুর খনন ও দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।’
আমাদী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান বলেন, ‘বৃষ্টির পানি সংরক্ষণই এখানে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হতে পারে। কিন্তু পর্যাপ্ত ট্যাঙ্কি না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। সব পরিবারের জন্য ট্যাঙ্কি নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।’
বাগালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুস সামাদ গাজী জানান, খরা মৌসুমে অনেকেই পুকুরের পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। পানি একদিন রেখে দিলে তলানিতে ময়লা জমে, তখন উপরের পানি পান করতে হয়। তবে এটি নিরাপদ নয়।
এ বিষয়ে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, ‘বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বর্তমানে চলমান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং পানির ট্যাঙ্কি বিতরণসহ বিভিন্ন এনজিওর উদ্যোগ চলছে।’
খুলনা জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী ইব্রাহিম মো. তৈমুর জানান, ‘বর্তমানে চলমান প্রকল্পের কাজ জুন মাসের মধ্যে শেষ করার চেষ্টা চলছে। যেসব এলাকায় টিউবওয়েল কার্যকর হয়নি, সেখানে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’
স্থানীয়দের আশা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে এই সংকট আরও গভীর মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

























