এইচএসসিতে ২২ বছরের মধ্যে পাসের হার কম, কিন্তু কেন এই বিপর্যয়
- আপডেট সময় : ০৫:১৪:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

এ বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে গত বছরের নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। গত ২২ বছরের ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি পরীক্ষায় এবারই পাসের হার সবচেয়ে কম। পাস করেছেন ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ পরীক্ষার্থী। গত বছর এই হার ছিল ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার আরও প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে।
শুধু পাসের হার নয়, কমেছে ফলাফলের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও। এবার নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩৫ হাজার ৯৪৮ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬৩ হাজার ২১৯। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৭ হাজারের বেশি।
.
এবারের ফলাফলে বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড বাদে প্রায় সব শিক্ষা বোর্ডেই এ বিষয়ে পাসের হার কম। বাধ্যতামূলক এ বিষয়ে দুর্বল ফল সামগ্রিক পাসের হার কমার অন্যতম কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আজ প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত তিন বছরে পাসের হারে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। ২০২৪ সালে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশে। এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছিল প্রায় ১৮ শতাংশীয় পয়েন্ট। এবার তা আরও কমে ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশে নেমেছে।
.
এবারের ফলাফল খারাপ হওয়ার পেছনে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান, প্রশ্নপত্রের ধরন এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নপদ্ধতি—সব বিষয়ই পর্যালোচনার দাবি রাখে। তবে ইংরেজির মতো বাধ্যতামূলক বিষয়ে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। যদিও শুধু ফলাফলের পরিসংখ্যান দিয়েই এর কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বিষয়ভিত্তিক ফলাফল, প্রশ্ন কঠিন হওয়া, পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের ধরন পর্যালোচনা করেই প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা দরকার বলে মনে করেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
.এইচএসসি পরীক্ষা ২০২৬: কোন বোর্ডে পাসের হার কত.
পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, ২৯ অক্টোবর এ বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের কথা ছিল। পরে তারিখ পরিবর্তন করে ৩১ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়। এ বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছিল গত ২ জুলাই। এবার নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ জন। এর মধ্যে পাস করেছেন ৫ লাখ ৪১ হাজার ২৪৯ জন।
ফলাফলে ছাত্রীদের পাসের হার ছাত্রদের তুলনায় বেশি। ছাত্রীদের পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ, ছাত্রদের ৪৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। তবে জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে ছাত্ররা সামান্য এগিয়ে। জিপিএ-৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র ১৮ হাজার ১৫৫ জন এবং ছাত্রী ১৭ হাজার ৭৯৩ জন। অর্থাৎ পাসের হারে ছাত্রীরা এগিয়ে থাকলেও ফলের সর্বোচ্চ সূচক অর্জনে ছাত্রদের সংখ্যা কিছুটা বেশি।
.
এবারের ফলাফলে বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা। বাধ্যতামূলক এ বিষয়ে দুর্বল ফল সামগ্রিক পাসের হার কমার অন্যতম কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
.
২০০৫ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ছিল। এবারও বিএনপি ক্ষমতায়। ২০০৫ সাল থেকে এ বছর পর্যন্ত ২২ বছরের ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে পাসের হারে সবচেয়ে বড় পতন ঘটে গত বছর। ২০২৪ সালে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশে। ২০০৫ সালের পর গত বছরের পাসের হার ছিল সর্বনিম্ন। এবার সেই হার আরও কমে ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশে নেমেছে।
এর আগে ২০০৫ সালে পাসের হার ছিল ৫৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। এরপর ২০০৬ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোনো বছরই পাসের হার ৬০ শতাংশের নিচে নামেনি। এ বছরগুলোতে পাসের হার কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে। তবে বেশির ভাগ বছরেই তা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের ওপরে ছিল। করোনা শুরুর বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে পরীক্ষা ছাড়াই ফলাফল প্রকাশে সবাই পাস করেছিলেন। ফলে গত দুই বছরের ধারাবাহিক পতন এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের সাম্প্রতিক প্রবণতায় বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
.
এবারের ফলাফলে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ছাড়া অন্য কোনো বোর্ডেই এ বিষয়ে পাসের হার ৭০ শতাংশে পৌঁছায়নি। ঢাকা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। এবার সাধারণ শিক্ষাবোর্ডগুলোর মধ্যে পাসের হারে ঢাকা বোর্ড শীর্ষে। অন্য বোর্ডগুলোতে ইংরেজি বিষয়ে পাসের হার ৫৪ থেকে প্রায় ৬৬ শতাংশের মধ্যে।
ইংরেজি বাধ্যতামূলক বিষয় হওয়ায় এ বিষয়ে বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার প্রভাব সামগ্রিক ফলাফলেও পড়েছে। তবে ইংরেজিতে ফল খারাপ হওয়ার কারণ শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত প্রস্তুতির ঘাটতি কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের প্রাপ্যতা, শ্রেণিকক্ষে ইংরেজি শেখানোর পরিবেশ এবং পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন—সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া প্রশ্নপত্র কঠিন হওয়া এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় কঠোরতা এসেছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। কারণ এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র নিয়ে নানা ধরনের ভুল ও অসংগতির অভিযোগ উঠেছিল। পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের দুটি প্রশ্নে ভুলের বিষয়টি সরকার স্বীকারও করেছিল। ওই দুটি প্রশ্নের জন্য সব পরীক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এ ছাড়া রসায়ন ও জীববিজ্ঞান বিষয়েও প্রশ্নপত্রে কিছু অসংগতির অভিযোগ করেছিলেন পরীক্ষার্থীরা।
.এক বছরে জিপিএ ৫ কমে গেল ৩২ হাজার.
শুধু প্রশ্ন প্রণয়ন বা পরিশোধনেই (মডারেশন) ভুল নয়, এ বছর প্রশ্নপত্র বিতরণেও ঘটে বেশ কিছু গরমিল। কোথাও নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের হাতে দেওয়া হয়েছে অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের জন্য তৈরি প্রশ্নপত্র, কোথাও আবার প্রথম পত্রের পরীক্ষার জায়গায় নেওয়া হয় দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ, দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি ও তদন্তের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া এবার এবার বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নেওয়ায় পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ক্ষোভেরও সৃষ্টি হয়েছিল।
এ ছাড়া এবার মূল্যায়নপদ্ধতির পরিবর্তনও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে এসব কারণের কোনটির প্রভাব কতটা, তা নির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়।
ফলাফলের এই ধারাবাহিক অবনতি শুধু পরীক্ষায় পাস-ফেলের বিষয় নয়; এটি শিক্ষার্থীদের শিখন-অর্জন এবং শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে। পরীক্ষায় ভালো ফল করানোই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। শিক্ষার্থীরা কতটা শিখছে, বিশেষ করে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে তাদের দক্ষতা কতটা তৈরি হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এবারের ফলাফলকে কেবল পাসের হার কমে যাওয়ার ঘটনা হিসেবে না দেখে শিক্ষার গুণগত মান মূল্যায়নের একটি সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

























