ঢাকা ০২:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
রংপুরের এক কারখানা এবার বিশ্বের সেরা নতুন ভবন বিজয়া দশমীতে দেবী দুর্গাকে সিঁদুরে বরণ, অশ্রুসজল বিদায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে আলজেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের আলোচনা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত আবদুল কুদ্দুসকে দেখতে হাসপাতালে ইউপি চেয়ারম্যান রংপুরে শিল্পের বিকাশে বড় বাধা অর্থায়ন ও জ্বালানিসংকট বাবা-মেয়েকে বাড়ির আঙিনায় দাফন, মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি আহত স্ত্রী–ছেলেকে সর্বানন্দ ইউনিয়নের বিভিন্ন দুর্গামন্দিরে সাবেক চেয়ারম্যানের আর্থিক সহায়তা সরকারি দপ্তরে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির এক লাখ নিয়োগ আটকে গেল, কী বলছে অর্থ বিভাগ থ্রিডি বায়োপ্রিন্টিংয়ে যেভাবে কৃত্রিম টিস্যু হয় সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিয়ে কনস্যুলেটের চিঠিতে কী আছে

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর থেকে বাংলাদেশ কী পেতে পারে

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৬:৩৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব সুদৃঢ় করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, ২৬ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় এই সফরের অগ্রাধিকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব ও বিনিয়োগ। এসব প্রত্যাশাকে টেকসই অর্জনে রূপ দিতে প্রয়োজন সুস্পষ্ট প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। এই সম্পর্কের ভিত্তি স্বাধীনতা-পরবর্তী পুনর্গঠনের সময়েই প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জাপান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এর পর থেকে বিভিন্ন সরকারের সময়ে সম্পর্ক ও সহযোগিতার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। পাঁচ দশকের এই আস্থা বাংলাদেশের একটি মূল্যবান কূটনৈতিক সম্পদ।

যমুনা বহুমুখী সেতুতে সহযোগিতা, ঢাকার মেট্রোরেল ও যমুনা রেলসেতুতে জাপানের অর্থায়ন ও কারিগরি সম্পৃক্ততা যোগাযোগব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ২০১৪ সালের বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট বা বিগ-বি উদ্যোগ অবকাঠামো, শিল্প ও আঞ্চলিক সংযোগের সমন্বিত সম্ভাবনা উন্মোচন করে। মাতারবাড়ী ও আড়াইহাজার সেই সহযোগিতা সম্প্রসারণের ভিত্তি। এখন চালু প্রকল্পের অর্জন ও নির্মাণাধীন উদ্যোগের সম্ভাবনাকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় ব্যবসায় সুফল বাড়ানো প্রয়োজন।

.

প্রথম অগ্রাধিকার হতে পারে ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএর সুফল গ্রহণের প্রস্তুতি। চুক্তি কার্যকর করার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া, শুল্কবিধান, পণ্যের উৎসের নিয়ম, সনদ ও কাস্টমস পদ্ধতি নিয়ে যৌথ কর্মপরিকল্পনা দরকার। ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের নির্দেশিকা
এবং কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ সহায়ক হবে। পোশাকের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও হালকা প্রকৌশলে বাজার সমীক্ষা করা যায়। বাজারসুবিধাকে স্থায়ী বাণিজ্যে রূপ দিতে মান, সময়ানুবর্তিতা ও ধারাবাহিক সরবরাহ অপরিহার্য।

বিনিয়োগ আলোচনায় প্রস্তুত জমি, বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন সংযোগ, অনুমোদনব্যবস্থাসহ সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন ফলপ্রসূ হতে পারে। আড়াইহাজার অর্থনৈতিক অঞ্চলকে ভিত্তি করে যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক উপকরণ, প্যাকেজিং ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে সম্ভাব্যতা যাচাই করা যায়। স্থানীয় সরবরাহকারী, দক্ষ কর্মী ও বাজারের চাহিদা বিবেচনায় বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি জাপানি মাঝারি প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগ উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

.

এই প্রচেষ্টার সহায়ক হবে প্রশাসনিক নির্ভরযোগ্যতা। অনুমোদন, শুল্কের প্রয়োগ ও অর্থ লেনদেনে পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়াতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিনিয়োগকারীর সমস্যা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সংস্কারের সুফল দেশীয় ব্যবসার কাছেও পৌঁছালে সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হবে।

অবকাঠামো সহযোগিতায় মাতারবাড়ী বন্দর ও মহেশখালী–মাতারবাড়ী এলাকার উন্নয়নকে সড়ক, রেল, গুদাম, কাস্টমস ও শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল কাস্টমস, ঝুঁকিভিত্তিক পরীক্ষা, পরিচালন প্রশিক্ষণ ও তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমানোর যৌথ কর্মসূচি নেওয়া যায়। নতুন প্রকল্পে ঋণের শর্ত, বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধের দায়, ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বিবেচনা করলে সহযোগিতার অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব বাড়বে।

মানবসম্পদ সহযোগিতায় ২০১৯ সালের দক্ষ কর্মী–সংক্রান্ত কাঠামোকে নিয়োগদাতার বাস্তব চাহিদার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন। যৌথ পাঠক্রমে ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ, বোধগম্য নিয়োগ চুক্তি, ব্যয়ের স্বচ্ছতা, অসাধু মধ্যস্থতা প্রতিরোধ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি গুরুত্ব পেতে পারে। কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে দক্ষতা, আয় ও সুরক্ষার উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

.

দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হওয়া উচিত বিদেশে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দেশের উৎপাদন ও জ্ঞানভিত্তি সমৃদ্ধ করা। জাপানি প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ, বাংলাদেশে যৌথ কারখানা এবং প্রত্যাবর্তনকারী কর্মীদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগকে একই পরিকল্পনায় আনা যায়। যোগ্যতার স্বীকৃতি, গবেষণার পরিবেশ ও বিনিয়োগসুবিধা স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবর্তন এবং দেশে দক্ষতা ছড়িয়ে দেওয়াকে উৎসাহিত করবে। এতে অভিবাসনের সুফল রেমিট্যান্সের বাইরেও প্রসারিত হবে।

বাংলাদেশের শিল্পের ইতিহাসে এর তাৎপর্যপূর্ণ নজির রয়েছে। সত্তরের দশকের শেষভাগে দেশ গার্মেন্টস ও দক্ষিণ কোরিয়ার দাইয়ুর সহযোগিতায় প্রশিক্ষিত কর্মীদের উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার জ্ঞান পোশাকশিল্পে ছড়িয়ে পড়ে। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার স্থায়ী অর্জন মানুষের ও প্রতিষ্ঠানের শেখার সক্ষমতায় নিহিত। বর্তমান অংশীদারত্বেও প্রকল্প শেষে দেশে কী দক্ষতা থেকে যাচ্ছে, তা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

.

বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জাপানি অংশীদারদের যৌথ গবেষণা ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এ ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ, পানি ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগসহনশীল নির্মাণে সহযোগিতা বাড়ানো যায়। প্রযুক্তি সংগ্রহের সঙ্গে পরিচালনা, মেরামত ও স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযোজনের সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে।

পরিবেশ ও জ্বালানিতে ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর সহযোগিতা সমঝোতাকে কাজে লাগিয়ে শিল্পে জ্বালানি সাশ্রয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও দুর্যোগ প্রস্তুতির সম্ভাবনা যাচাই করা যেতে পারে। স্থানীয় সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় উদ্যোগ বেছে নিলে উৎপাদন ব্যয় এবং পরিবেশগত ঝুঁকি কমবে।

জাপানকে ঘিরে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের সুসংহত পূর্ব এশিয়া কৌশলের অংশ হওয়া প্রয়োজন। চীনের উৎপাদন ও সরবরাহ নেটওয়ার্ক, জাপানের শিল্পপ্রযুক্তি ও মান ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার উৎপাদন ও প্রযুক্তি অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের সমন্বয় করা যায়।

.

বাংলাদেশের উপযোগী অবস্থান হতে পারে উন্নয়নকেন্দ্রিক কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন। প্রতিটি সম্পর্কের নিজস্ব মূল্য স্বীকার করে পারস্পরিক আস্থা, জাতীয় স্বার্থ ও সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা বজায় রাখা প্রয়োজন। জাপানের সঙ্গে গভীরতর সহযোগিতা এবং চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পরস্পরের পরিপূরক উন্নয়ন সুযোগ তৈরি করতে পারে। ঋণের স্থায়িত্ব, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, তথ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর কার্যকর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে অভিন্ন মানদণ্ড এই অবস্থানকে বিশ্বাসযোগ্য করবে।

বঙ্গোপসাগরের অবস্থান কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার বাজার ও পূর্ব এশিয়ার উৎপাদনব্যবস্থার মধ্যে কার্যকর সংযোগস্থল হতে পারে। এ জন্য সমন্বিত পরিবহন ও কাস্টমসের পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সঙ্গে পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য বাণিজ্যব্যবস্থা প্রয়োজন। স্থানীয় উৎপাদন, মেরামতসেবা, গবেষণা ও সরবরাহকারী গড়ে তুললে সংযোগের সুফল দেশে ধরে রাখা যাবে। অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য অর্থনৈতিক সহনশীলতাও বাড়াবে।

.

পাঁচ থেকে দশ বছরের পূর্ব এশিয়া সহযোগিতা পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার শিল্প খাত, সরবরাহকারীর সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ, যৌথ গবেষণা ও উৎপাদনের পর্যায় নির্ধারণ করা যেতে পারে। পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য শর্তে স্থানীয় ক্রয় ও শেখার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। মূল্যায়নের সূচক হবে বাস্তব বিনিয়োগ, দেশীয় মূল্য সংযোজন, কর্মীর আয়, স্থানীয় ক্রয়াদেশ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা।

সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, দুর্যোগে সহায়তা, আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তিতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে জাপানের ধারাবাহিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা প্রত্যাশা করা যেতে পারে।

সফর শেষে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, সময়সীমা ও পর্যালোচনা পদ্ধতিসহ বাস্তবায়ন তালিকা প্রকাশ সহায়ক হবে। ছয় মাস ও এক বছরের অগ্রগতি মূল্যায়নে ঘোষিত বিনিয়োগ, প্রকৃত অর্থপ্রবাহ ও উৎপাদন এবং প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাঁচ দশকের আস্থা পরবর্তী দশকের শিল্পায়নের ভিত্তি হতে পারে, যদি অবকাঠামোর সঙ্গে উৎপাদন এবং অভিবাসনের সঙ্গে জ্ঞান যুক্ত হয়।

  • ড. এ কে এম আহসান উল্লাহ অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই

  • akmahsanullah@gmail.com

  • মতামত লেখকের নিজস্ব

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর থেকে বাংলাদেশ কী পেতে পারে

আপডেট সময় : ০৯:৪৬:৩৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব সুদৃঢ় করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, ২৬ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় এই সফরের অগ্রাধিকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব ও বিনিয়োগ। এসব প্রত্যাশাকে টেকসই অর্জনে রূপ দিতে প্রয়োজন সুস্পষ্ট প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। এই সম্পর্কের ভিত্তি স্বাধীনতা-পরবর্তী পুনর্গঠনের সময়েই প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জাপান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এর পর থেকে বিভিন্ন সরকারের সময়ে সম্পর্ক ও সহযোগিতার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। পাঁচ দশকের এই আস্থা বাংলাদেশের একটি মূল্যবান কূটনৈতিক সম্পদ।

যমুনা বহুমুখী সেতুতে সহযোগিতা, ঢাকার মেট্রোরেল ও যমুনা রেলসেতুতে জাপানের অর্থায়ন ও কারিগরি সম্পৃক্ততা যোগাযোগব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ২০১৪ সালের বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট বা বিগ-বি উদ্যোগ অবকাঠামো, শিল্প ও আঞ্চলিক সংযোগের সমন্বিত সম্ভাবনা উন্মোচন করে। মাতারবাড়ী ও আড়াইহাজার সেই সহযোগিতা সম্প্রসারণের ভিত্তি। এখন চালু প্রকল্পের অর্জন ও নির্মাণাধীন উদ্যোগের সম্ভাবনাকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় ব্যবসায় সুফল বাড়ানো প্রয়োজন।

.

প্রথম অগ্রাধিকার হতে পারে ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএর সুফল গ্রহণের প্রস্তুতি। চুক্তি কার্যকর করার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া, শুল্কবিধান, পণ্যের উৎসের নিয়ম, সনদ ও কাস্টমস পদ্ধতি নিয়ে যৌথ কর্মপরিকল্পনা দরকার। ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের নির্দেশিকা
এবং কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ সহায়ক হবে। পোশাকের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও হালকা প্রকৌশলে বাজার সমীক্ষা করা যায়। বাজারসুবিধাকে স্থায়ী বাণিজ্যে রূপ দিতে মান, সময়ানুবর্তিতা ও ধারাবাহিক সরবরাহ অপরিহার্য।

বিনিয়োগ আলোচনায় প্রস্তুত জমি, বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন সংযোগ, অনুমোদনব্যবস্থাসহ সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন ফলপ্রসূ হতে পারে। আড়াইহাজার অর্থনৈতিক অঞ্চলকে ভিত্তি করে যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক উপকরণ, প্যাকেজিং ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে সম্ভাব্যতা যাচাই করা যায়। স্থানীয় সরবরাহকারী, দক্ষ কর্মী ও বাজারের চাহিদা বিবেচনায় বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি জাপানি মাঝারি প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগ উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

.

এই প্রচেষ্টার সহায়ক হবে প্রশাসনিক নির্ভরযোগ্যতা। অনুমোদন, শুল্কের প্রয়োগ ও অর্থ লেনদেনে পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়াতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিনিয়োগকারীর সমস্যা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সংস্কারের সুফল দেশীয় ব্যবসার কাছেও পৌঁছালে সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হবে।

অবকাঠামো সহযোগিতায় মাতারবাড়ী বন্দর ও মহেশখালী–মাতারবাড়ী এলাকার উন্নয়নকে সড়ক, রেল, গুদাম, কাস্টমস ও শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল কাস্টমস, ঝুঁকিভিত্তিক পরীক্ষা, পরিচালন প্রশিক্ষণ ও তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমানোর যৌথ কর্মসূচি নেওয়া যায়। নতুন প্রকল্পে ঋণের শর্ত, বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধের দায়, ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বিবেচনা করলে সহযোগিতার অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব বাড়বে।

মানবসম্পদ সহযোগিতায় ২০১৯ সালের দক্ষ কর্মী–সংক্রান্ত কাঠামোকে নিয়োগদাতার বাস্তব চাহিদার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন। যৌথ পাঠক্রমে ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ, বোধগম্য নিয়োগ চুক্তি, ব্যয়ের স্বচ্ছতা, অসাধু মধ্যস্থতা প্রতিরোধ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি গুরুত্ব পেতে পারে। কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে দক্ষতা, আয় ও সুরক্ষার উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

.

দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হওয়া উচিত বিদেশে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দেশের উৎপাদন ও জ্ঞানভিত্তি সমৃদ্ধ করা। জাপানি প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ, বাংলাদেশে যৌথ কারখানা এবং প্রত্যাবর্তনকারী কর্মীদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগকে একই পরিকল্পনায় আনা যায়। যোগ্যতার স্বীকৃতি, গবেষণার পরিবেশ ও বিনিয়োগসুবিধা স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবর্তন এবং দেশে দক্ষতা ছড়িয়ে দেওয়াকে উৎসাহিত করবে। এতে অভিবাসনের সুফল রেমিট্যান্সের বাইরেও প্রসারিত হবে।

বাংলাদেশের শিল্পের ইতিহাসে এর তাৎপর্যপূর্ণ নজির রয়েছে। সত্তরের দশকের শেষভাগে দেশ গার্মেন্টস ও দক্ষিণ কোরিয়ার দাইয়ুর সহযোগিতায় প্রশিক্ষিত কর্মীদের উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার জ্ঞান পোশাকশিল্পে ছড়িয়ে পড়ে। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার স্থায়ী অর্জন মানুষের ও প্রতিষ্ঠানের শেখার সক্ষমতায় নিহিত। বর্তমান অংশীদারত্বেও প্রকল্প শেষে দেশে কী দক্ষতা থেকে যাচ্ছে, তা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

.

বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জাপানি অংশীদারদের যৌথ গবেষণা ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এ ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ, পানি ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগসহনশীল নির্মাণে সহযোগিতা বাড়ানো যায়। প্রযুক্তি সংগ্রহের সঙ্গে পরিচালনা, মেরামত ও স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযোজনের সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে।

পরিবেশ ও জ্বালানিতে ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর সহযোগিতা সমঝোতাকে কাজে লাগিয়ে শিল্পে জ্বালানি সাশ্রয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও দুর্যোগ প্রস্তুতির সম্ভাবনা যাচাই করা যেতে পারে। স্থানীয় সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় উদ্যোগ বেছে নিলে উৎপাদন ব্যয় এবং পরিবেশগত ঝুঁকি কমবে।

জাপানকে ঘিরে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের সুসংহত পূর্ব এশিয়া কৌশলের অংশ হওয়া প্রয়োজন। চীনের উৎপাদন ও সরবরাহ নেটওয়ার্ক, জাপানের শিল্পপ্রযুক্তি ও মান ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার উৎপাদন ও প্রযুক্তি অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের সমন্বয় করা যায়।

.

বাংলাদেশের উপযোগী অবস্থান হতে পারে উন্নয়নকেন্দ্রিক কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন। প্রতিটি সম্পর্কের নিজস্ব মূল্য স্বীকার করে পারস্পরিক আস্থা, জাতীয় স্বার্থ ও সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা বজায় রাখা প্রয়োজন। জাপানের সঙ্গে গভীরতর সহযোগিতা এবং চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পরস্পরের পরিপূরক উন্নয়ন সুযোগ তৈরি করতে পারে। ঋণের স্থায়িত্ব, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, তথ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর কার্যকর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে অভিন্ন মানদণ্ড এই অবস্থানকে বিশ্বাসযোগ্য করবে।

বঙ্গোপসাগরের অবস্থান কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার বাজার ও পূর্ব এশিয়ার উৎপাদনব্যবস্থার মধ্যে কার্যকর সংযোগস্থল হতে পারে। এ জন্য সমন্বিত পরিবহন ও কাস্টমসের পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সঙ্গে পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য বাণিজ্যব্যবস্থা প্রয়োজন। স্থানীয় উৎপাদন, মেরামতসেবা, গবেষণা ও সরবরাহকারী গড়ে তুললে সংযোগের সুফল দেশে ধরে রাখা যাবে। অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য অর্থনৈতিক সহনশীলতাও বাড়াবে।

.

পাঁচ থেকে দশ বছরের পূর্ব এশিয়া সহযোগিতা পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার শিল্প খাত, সরবরাহকারীর সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ, যৌথ গবেষণা ও উৎপাদনের পর্যায় নির্ধারণ করা যেতে পারে। পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য শর্তে স্থানীয় ক্রয় ও শেখার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। মূল্যায়নের সূচক হবে বাস্তব বিনিয়োগ, দেশীয় মূল্য সংযোজন, কর্মীর আয়, স্থানীয় ক্রয়াদেশ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা।

সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, দুর্যোগে সহায়তা, আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তিতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে জাপানের ধারাবাহিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা প্রত্যাশা করা যেতে পারে।

সফর শেষে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, সময়সীমা ও পর্যালোচনা পদ্ধতিসহ বাস্তবায়ন তালিকা প্রকাশ সহায়ক হবে। ছয় মাস ও এক বছরের অগ্রগতি মূল্যায়নে ঘোষিত বিনিয়োগ, প্রকৃত অর্থপ্রবাহ ও উৎপাদন এবং প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাঁচ দশকের আস্থা পরবর্তী দশকের শিল্পায়নের ভিত্তি হতে পারে, যদি অবকাঠামোর সঙ্গে উৎপাদন এবং অভিবাসনের সঙ্গে জ্ঞান যুক্ত হয়।

  • ড. এ কে এম আহসান উল্লাহ অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই

  • akmahsanullah@gmail.com

  • মতামত লেখকের নিজস্ব