রাষ্ট্রের জবাবদিহি ও আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত হোক
- আপডেট সময় : ১০:০২:৩৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে দেশের মানবাধিকার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সময়ে দেশে অন্তত ১ হাজার ১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৭৩ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির ৩৯৮টি ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৮৭ জন। নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রটিও আশঙ্কাজনক—গত ৯ মাসে ২ হাজার ৪০৪ জন কন্যাশিশু ও নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
এইচআরএসএসের এই প্রতিবেদনে আগের বছরের তথ্য না থাকলেও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অন্যান্য সময়ের পরিসংখ্যানের সঙ্গে মেলালে পরিস্থিতির ধারাবাহিক অবনতিই স্পষ্ট হয়। উদাহরণস্বরূপ, গত আগস্টে সরকারের ছয় মাস উপলক্ষে প্রকাশিত প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পূর্ববর্তী ছয় মাসের তুলনায় পরবর্তী সময়ে খুন, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
.
তবে রাজনৈতিক সহিংসতা ও গণপিটুনির এই পরিসংখ্যানকে নিছক ‘আইনশৃঙ্খলার অবনতি’ বলে চিহ্নিত করলে সমস্যার গভীরতা আড়াল হয়ে যাবে। কারণ, এর একটি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রতীক, অন্যটি সামাজিক অসহিষ্ণুতার প্রকাশ। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৯১ শতাংশ রাজনৈতিক সহিংসতাই ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং অন্য দলের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের কারণে। কেবল অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রাণ হারিয়েছেন ৪০ জন। এ ছাড়া মোট নিহত ৭৩ জনের মধ্যে ৪৬ জনই দলটির সদস্য।
মূলধারার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা এতে স্পষ্ট। বাংলাদেশে ক্ষমতা পাওয়ার অর্থই যেন পদ-পদবি, ঠিকাদারি, টেন্ডার, দখল ও নিয়ন্ত্রণের একচ্ছত্র সুযোগ। আর এই ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারা ঘিরে নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের প্রবণতা ক্রমে বাড়ছে।
দীর্ঘ দেড় দশক পর নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করা গিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বিভিন্ন দখলের ঘটনা ও পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, সে আশা পূরণ হওয়া এখনো বেশ কঠিন।
.
যদিও বিভিন্ন সময় অপরাধীদের বিরুদ্ধে সরকারপ্রধানের কঠোর বার্তা ও পদক্ষেপ লক্ষ করা গেছে, তবে তৃণমূল পর্যায়ে সে বার্তা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। পাশাপাশি রাজনৈতিক সহিংসতার ক্ষেত্রে বিচারহীনতা ও দায়হীনতার যে দীর্ঘ অপসংস্কৃতি আমাদের দেশে শিকড় গেড়েছে, তা-ই এসব সহিংসতা জারি রাখার পেছনে মূল ইন্ধন হিসেবে কাজ করছে।
অন্যদিকে সমাজে মব–সহিংসতার বিস্তার দিন দিন আরও ভীতিপ্রদ হয়ে উঠছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ বা চুরি-ছিনতাইয়ের সন্দেহে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিচারে দীর্ঘসূত্রতা কিংবা বিচারহীনতার সংস্কৃতিই মূলত মানুষকে এভাবে আইন হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করছে। তদুপরি মব–সহিংসতার সময় পুলিশ ও প্রশাসনের নীরব বা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা অপরাধীদের সুযোগ করে দিচ্ছে।
.
এই সময়ে কারাগারে মৃত্যু, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে প্রাণহানি এবং গুমের ঘটনা রাষ্ট্রের জবাবদিহির মারাত্মক অভাবকে সামনে এনেছে। একই সঙ্গে সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনাগুলো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য চরম হুমকি।
আমরা মনে করি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত ও টেকসই উন্নতি নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সক্রিয় হতে হবে। দলীয় কোন্দল ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনি—উভয় পদক্ষেপই নিতে হবে; কোনোভাবেই দলীয় পরিচয় যেন অপরাধের সুরক্ষাকবচ না হয়। প্রতিটি মব–সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত মামলা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক সহিংসতার রাশ টেনে ধরা জরুরি।
























