ঢাকা ০৭:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
পর্যটকশূন্য সাজেকে সংকটে ব্যবসায়ীরা ১৩০ বছর পর ভ্যান গঘের আঁকা স্টারি নাইটের রহস্যের সমাধান আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের পদক ফের কুকুরের কামড়ে চার শিশু আহত ‘দাঁড়িপাল্লা’ নিয়ে বিতর্ক, জ্ঞানের পিরামিডে কোনো আইকন থাকছে না কৃষকের হাতে এআই, মাঠের নতুন সহায়ক সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুলসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুত ফতুল্লায় স্বামীর বাসা থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার শিশুকে ধর্ষণের দায়ে ইমামের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে কাউকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা দিইনি: মীর শাহে আলম

শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা: একটি সর্বজনীন উৎসব

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:১০:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধদের একটি আনন্দময় উৎসব। ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত পালন শেষে প্রবারণা পূর্ণিমা আসে শারদীয় আমেজ নিয়ে। প্রবারণার আনন্দে অবগাহন করেন সবাই। এটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়।

আকাশে ওড়ানো হয় নানা রকম রঙিন ফানুস। নদীতে ভাসানো হয় হরেক রকমের প্যাগোডা আকৃতির জাহাজ। সবাই আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে নানা রকমের কীর্তন ও গান গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন।

আবহমান বাংলার সংস্কৃতি, কৃষ্টিকে তুলে ধরে উৎসবের মধ্যে। এ উৎসব আশ্বিনী পূর্ণিমাকে ঘিরে হয়ে থাকে। এ পূর্ণিমায় বৌদ্ধদের তিন মাসব্যাপী আতœসংযম ও শীল-সমাধি প্রজ্ঞার সাধনার পরিসমাপ্তি ও পরিশুদ্ধতার অনুষ্ঠান বলে বৌদ্ধ ইতিহাসে এ পূর্ণিমার গুরুত্ব অপরিসীম।

ফলে এ পূর্ণিমা বৌদ্ধদের কাছে দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসবে রূপ পেয়েছে।

আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা—এই তিন মাস বৌদ্ধদের কাছে বর্ষাবাস বা ব্রত অধিষ্ঠান হিসাবে পরিচিত। বর্ষার সময় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে দেখে ভগবান বুদ্ধ ভিক্ষু সংঘকে তিন মাস বিহারে অবস্থান করে শীল-সমাধি-প্রজ্ঞার সাধনা করার জন্য বিনয় প্রজ্ঞাপন করেন।

সেই থেকে তিন মাস বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান পালন শুরু। গৃহী বৌদ্ধরাও এই তিন মাস ব্রত পালন করে থাকেন। এই তিন মাস ব্রত পালনের পরিসমাপ্তি প্রবারণা। প্রবারণার আনন্দকে সবাই ভাগাভাগি করে নেন।

.

ভগবান বুদ্ধ প্রথম পাঁচজন ভিক্ষুকে নিয়ে প্রবারণা বিধান চালু করেন। পরবর্তী সময়ে দুজন ভিক্ষুর পারস্পরিক প্রতি দেশনীয় প্রবারণার বিধান চালু করেন। একজন ভিক্ষুও প্রবারণা বিধান পালন করতে পারেন।

.বাঙালির রঙের উৎসব দোল পূর্ণিমা.

প্রবারণার অর্থ আশার তৃপ্তি, অভিলাষ পূরণ, ধ্যান সমাধির শেষ বোঝালেও বৌদ্ধ বিনয় পিটকে প্রবারণার অর্থ হচ্ছ ত্রুটি বা নৈতিক স্খলন নির্দেশ করাকে বোঝায়। অর্থাৎ কারও কোনো দোষ–ত্রুটি বা অপরাধ দেখলে তা সংশোধন করার সনিবন্ধ অনুরোধ।

সংক্ষেপে বলা যায়, অকুশল বা পাপের পথ পরিহারপূর্বক প্রকৃষ্ট রূপে বারণ করে বলে প্রবারণা বলা হয়।

প্রবারণাকে বিনয় পিটক গ্রন্থে পূর্ব কার্তিক ও পশ্চিম কার্তিক ভেদে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। আষাঢ়ী পূর্ণিমায় বর্ষাবাস শুরু হয়ে আশ্বিনী পূর্ণিমায় যে প্রবারণা হয়, তাকে পূর্ব কার্তিক দ্বিতীয় বা শ্রাবণী পূর্ণিমায় যে বর্ষাবাস শুরু হয়ে কার্তিক পূর্ণিমায় শেষ হয়, তাকে পশ্চিম কার্তিক প্রবারণা বলা হয়।

ভগবান বুদ্ধ প্রথম পাঁচজন ভিক্ষুকে নিয়ে প্রবারণা বিধান চালু করেন। পরবর্তী সময়ে দুজন ভিক্ষুর পারস্পরিক প্রতি দেশনীয় প্রবারণার বিধান চালু করেন। একজন ভিক্ষুও প্রবারণা বিধান পালন করতে পারেন। ভিক্ষুর অভাবে একজন ভিক্ষু বৃক্ষমূলে ও আসনাদি করে প্রদীপ জ্বালিয়ে একজন ভিক্ষু প্রবারণা পালন করেন।

ভগবান বুদ্ধের জীবনে দেখা যায়, আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস তাবতিংস স্বর্গে অবস্থান করে তাঁর মাতৃদেবী প্রমুখ অসংখ্য দেব–দেবী অভিধর্ম দেশনা করে সাংকাশ্য নগরে অবতরণ করেন এবং প্রবারণার দিনে ৬০ জন ভিক্ষুকে বহুজনের হিত ও মঙ্গলের জন্য দিকে দিকে বিচরণ করে সর্দ্ধমকে প্রচার করার নির্দেশ দেন।

ভিক্ষু সংঘকে লক্ষ্য করে ভগবান বুদ্ধ বলেন, ‘হে ভিক্ষুগণ, আমার ন্যায় তোমরাও দিব্য এবং জাগতিক সকল প্রকার বন্ধন হতে মুক্ত হয়েছ। তোমাদের ন্যায় স্বল্পরজ ব্যক্তির অভাব জগতে নেই। কিন্তু প্রকৃত মার্গের সন্ধান না পেয়ে তারা শুধু অন্ধকারে হাতড়িয়ে বৃথা উদ্যম ও শক্তির অপচয় করছে। সর্দ্ধম শ্রবণের সুযোগ না পেলে এরা সকলেই বিনাশপ্রাপ্ত হবে ।’

.

তোমরা দিকে বিচরণ করো, বহুজনের হিতের জন্য, বহুজনের সুখের জন্য, জগতের প্রতি অনুকম্পা প্রর্দশনের জন্য। দেব ও মানবের আতœহিত এবং সুখের জন্য; কিন্তু দুজন এক পথে যেয়ো না।

.বুদ্ধ পূর্ণিমাকে ঘিরে চলে নানামুখী অনুষ্ঠান.

‘হে ভিক্ষুগণ, তোমরা দিকে বিচরণ করো, বহুজনের হিতের জন্য, বহুজনের সুখের জন্য, জগতের প্রতি অনুকম্পা প্রর্দশনের জন্য। দেব ও মানবের আতœহিত এবং সুখের জন্য; কিন্তু দুজন এক পথে যেয়ো না। তোমরা দেশনা করো আদিতে কল্যাণ, মধ্যে কল্যাণ, অন্তে কল্যাণ। সদ্ধর্মকে প্রকাশিত করো অর্থ ও ব্যঞ্জনযুক্ত, কৈবল্যময় পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য।’

ভগবান বুদ্ধের নব আবিষ্কৃত সর্দ্ধমকে প্রচার ও প্রকাশ করতে প্রবারণার দিন এ নির্দেশ দান করেন। প্রবারণা পূর্ণিমার পরের দিন থেকে ভিক্ষুরা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েন সর্দ্ধমকে প্রচার ও প্রকাশ করতে। ভিক্ষুরা বুদ্ধের সাম্য ও মৈত্রীর বাণী অন্তরে ধারণ করে গ্রাম–গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েন।

ভগবান বুদ্ধ যে ধর্ম প্রচার করার জন্য ভিক্ষুদের নির্দেশ দেন, তাতে সাম্য ও মৈত্রীতে ভরপুর। বুদ্ধের ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যই হলো সকল প্রাণীর সুখ ও অহিংসা প্রতিষ্ঠা করা। বুদ্ধের অহিংসার শিক্ষাগুলো হলো এই—

মৈত্রী: বিশ্বের সকল প্রাণীর প্রতি প্রীতিবোধ প্রণোদিত আচরণ হলো মৈত্রীর চর্চা। কীভাবে অহিংসিত হয়ে অবস্থান করবেন তা আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গে সুস্পষ্ট নিদের্শনা দেন। সম্যক সংকল্পে হিংসা–বিদ্বেষ পরিহারের নির্দেশ আছে।

সম্যক বাক্যে পরনিন্দা ও অপ্রিয় ভাষণ, সম্যক কর্মে অহিংস আচরণ, সম্যক আজীবে পঞ্চশীল নীতির যাতে বত্যয় না ঘটে। আজ মৈত্রী চর্চার অভাবে মানুষ মানুষকে নিবিচার হত্যা করছে, প্রাণী হত্যা তো এখন মামুলি।

করুণা: মমত্ববোধ থেকে করুণার সৃষ্টি। প্রাণীর প্রতি করুণার উদ্রেক সৃষ্টি হলেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। হিংসা হানাহানি লোপ পাবে।

মুদিতা: মানুষ নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে পরের দুঃখে দুঃখী ও সুখে সুখী হয়—এভাবে মুদিতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

উপেক্ষা: এ তিন অবস্থা অনুশীলনে উপেক্ষায় উপনীত হয়। তখন মানুষ সকলের কল্যাণে নিজের জীবনকে উৎসর্গিত করে। এগুলোই হলো ব্রহ্মবিহার।

বুদ্ধের মৈত্রী অনুশীলনের নির্দেশ এই, ‘মা যেমন তার একমাত্র সন্তানকে নিজের জীবন দিয়ে রক্ষা করেন, তেমনি জগতের সকল প্রাণীর প্রতি অপ্রমেয় মৈত্রী পোষণ করবে।’ এ মৈত্রী অনুশীলন তো বর্তমান সূদূরপরাহত। এখন দেখি ধর্মে নামে কতো নিরীহ প্রাণী বধ, কত মানুষ নিষ্ঠুরতার শিকার।

বুদ্ধের অহিংসা হলো শুধু প্রাণী হিংসা থেকে বিরত থাকা নয়, সকলের প্রতি প্রীতি বহন করা, কল্যাণ চিন্তা করা, পরার্থে আত্মনিবেদিত থাকা। বুদ্ধের মতো এমন আত্মত্যাগীর পক্ষে সম্ভব প্রাণীর প্রতি করুণাঘন হৃদয় বিতরণ করা। পৃথিবীকে আমরা মৈত্রী হৃদয়ে ভরিয়ে দিই।

  • ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয় : সম্পাদক, সৌগত

.গৌতম বুদ্ধ: রাজকুমার থেকে বোধিপ্রাপ্তির মহাযাত্রা

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা: একটি সর্বজনীন উৎসব

আপডেট সময় : ০৫:১০:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধদের একটি আনন্দময় উৎসব। ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত পালন শেষে প্রবারণা পূর্ণিমা আসে শারদীয় আমেজ নিয়ে। প্রবারণার আনন্দে অবগাহন করেন সবাই। এটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়।

আকাশে ওড়ানো হয় নানা রকম রঙিন ফানুস। নদীতে ভাসানো হয় হরেক রকমের প্যাগোডা আকৃতির জাহাজ। সবাই আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে নানা রকমের কীর্তন ও গান গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন।

আবহমান বাংলার সংস্কৃতি, কৃষ্টিকে তুলে ধরে উৎসবের মধ্যে। এ উৎসব আশ্বিনী পূর্ণিমাকে ঘিরে হয়ে থাকে। এ পূর্ণিমায় বৌদ্ধদের তিন মাসব্যাপী আতœসংযম ও শীল-সমাধি প্রজ্ঞার সাধনার পরিসমাপ্তি ও পরিশুদ্ধতার অনুষ্ঠান বলে বৌদ্ধ ইতিহাসে এ পূর্ণিমার গুরুত্ব অপরিসীম।

ফলে এ পূর্ণিমা বৌদ্ধদের কাছে দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসবে রূপ পেয়েছে।

আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা—এই তিন মাস বৌদ্ধদের কাছে বর্ষাবাস বা ব্রত অধিষ্ঠান হিসাবে পরিচিত। বর্ষার সময় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে দেখে ভগবান বুদ্ধ ভিক্ষু সংঘকে তিন মাস বিহারে অবস্থান করে শীল-সমাধি-প্রজ্ঞার সাধনা করার জন্য বিনয় প্রজ্ঞাপন করেন।

সেই থেকে তিন মাস বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান পালন শুরু। গৃহী বৌদ্ধরাও এই তিন মাস ব্রত পালন করে থাকেন। এই তিন মাস ব্রত পালনের পরিসমাপ্তি প্রবারণা। প্রবারণার আনন্দকে সবাই ভাগাভাগি করে নেন।

.

ভগবান বুদ্ধ প্রথম পাঁচজন ভিক্ষুকে নিয়ে প্রবারণা বিধান চালু করেন। পরবর্তী সময়ে দুজন ভিক্ষুর পারস্পরিক প্রতি দেশনীয় প্রবারণার বিধান চালু করেন। একজন ভিক্ষুও প্রবারণা বিধান পালন করতে পারেন।

.বাঙালির রঙের উৎসব দোল পূর্ণিমা.

প্রবারণার অর্থ আশার তৃপ্তি, অভিলাষ পূরণ, ধ্যান সমাধির শেষ বোঝালেও বৌদ্ধ বিনয় পিটকে প্রবারণার অর্থ হচ্ছ ত্রুটি বা নৈতিক স্খলন নির্দেশ করাকে বোঝায়। অর্থাৎ কারও কোনো দোষ–ত্রুটি বা অপরাধ দেখলে তা সংশোধন করার সনিবন্ধ অনুরোধ।

সংক্ষেপে বলা যায়, অকুশল বা পাপের পথ পরিহারপূর্বক প্রকৃষ্ট রূপে বারণ করে বলে প্রবারণা বলা হয়।

প্রবারণাকে বিনয় পিটক গ্রন্থে পূর্ব কার্তিক ও পশ্চিম কার্তিক ভেদে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। আষাঢ়ী পূর্ণিমায় বর্ষাবাস শুরু হয়ে আশ্বিনী পূর্ণিমায় যে প্রবারণা হয়, তাকে পূর্ব কার্তিক দ্বিতীয় বা শ্রাবণী পূর্ণিমায় যে বর্ষাবাস শুরু হয়ে কার্তিক পূর্ণিমায় শেষ হয়, তাকে পশ্চিম কার্তিক প্রবারণা বলা হয়।

ভগবান বুদ্ধ প্রথম পাঁচজন ভিক্ষুকে নিয়ে প্রবারণা বিধান চালু করেন। পরবর্তী সময়ে দুজন ভিক্ষুর পারস্পরিক প্রতি দেশনীয় প্রবারণার বিধান চালু করেন। একজন ভিক্ষুও প্রবারণা বিধান পালন করতে পারেন। ভিক্ষুর অভাবে একজন ভিক্ষু বৃক্ষমূলে ও আসনাদি করে প্রদীপ জ্বালিয়ে একজন ভিক্ষু প্রবারণা পালন করেন।

ভগবান বুদ্ধের জীবনে দেখা যায়, আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস তাবতিংস স্বর্গে অবস্থান করে তাঁর মাতৃদেবী প্রমুখ অসংখ্য দেব–দেবী অভিধর্ম দেশনা করে সাংকাশ্য নগরে অবতরণ করেন এবং প্রবারণার দিনে ৬০ জন ভিক্ষুকে বহুজনের হিত ও মঙ্গলের জন্য দিকে দিকে বিচরণ করে সর্দ্ধমকে প্রচার করার নির্দেশ দেন।

ভিক্ষু সংঘকে লক্ষ্য করে ভগবান বুদ্ধ বলেন, ‘হে ভিক্ষুগণ, আমার ন্যায় তোমরাও দিব্য এবং জাগতিক সকল প্রকার বন্ধন হতে মুক্ত হয়েছ। তোমাদের ন্যায় স্বল্পরজ ব্যক্তির অভাব জগতে নেই। কিন্তু প্রকৃত মার্গের সন্ধান না পেয়ে তারা শুধু অন্ধকারে হাতড়িয়ে বৃথা উদ্যম ও শক্তির অপচয় করছে। সর্দ্ধম শ্রবণের সুযোগ না পেলে এরা সকলেই বিনাশপ্রাপ্ত হবে ।’

.

তোমরা দিকে বিচরণ করো, বহুজনের হিতের জন্য, বহুজনের সুখের জন্য, জগতের প্রতি অনুকম্পা প্রর্দশনের জন্য। দেব ও মানবের আতœহিত এবং সুখের জন্য; কিন্তু দুজন এক পথে যেয়ো না।

.বুদ্ধ পূর্ণিমাকে ঘিরে চলে নানামুখী অনুষ্ঠান.

‘হে ভিক্ষুগণ, তোমরা দিকে বিচরণ করো, বহুজনের হিতের জন্য, বহুজনের সুখের জন্য, জগতের প্রতি অনুকম্পা প্রর্দশনের জন্য। দেব ও মানবের আতœহিত এবং সুখের জন্য; কিন্তু দুজন এক পথে যেয়ো না। তোমরা দেশনা করো আদিতে কল্যাণ, মধ্যে কল্যাণ, অন্তে কল্যাণ। সদ্ধর্মকে প্রকাশিত করো অর্থ ও ব্যঞ্জনযুক্ত, কৈবল্যময় পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য।’

ভগবান বুদ্ধের নব আবিষ্কৃত সর্দ্ধমকে প্রচার ও প্রকাশ করতে প্রবারণার দিন এ নির্দেশ দান করেন। প্রবারণা পূর্ণিমার পরের দিন থেকে ভিক্ষুরা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েন সর্দ্ধমকে প্রচার ও প্রকাশ করতে। ভিক্ষুরা বুদ্ধের সাম্য ও মৈত্রীর বাণী অন্তরে ধারণ করে গ্রাম–গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েন।

ভগবান বুদ্ধ যে ধর্ম প্রচার করার জন্য ভিক্ষুদের নির্দেশ দেন, তাতে সাম্য ও মৈত্রীতে ভরপুর। বুদ্ধের ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যই হলো সকল প্রাণীর সুখ ও অহিংসা প্রতিষ্ঠা করা। বুদ্ধের অহিংসার শিক্ষাগুলো হলো এই—

মৈত্রী: বিশ্বের সকল প্রাণীর প্রতি প্রীতিবোধ প্রণোদিত আচরণ হলো মৈত্রীর চর্চা। কীভাবে অহিংসিত হয়ে অবস্থান করবেন তা আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গে সুস্পষ্ট নিদের্শনা দেন। সম্যক সংকল্পে হিংসা–বিদ্বেষ পরিহারের নির্দেশ আছে।

সম্যক বাক্যে পরনিন্দা ও অপ্রিয় ভাষণ, সম্যক কর্মে অহিংস আচরণ, সম্যক আজীবে পঞ্চশীল নীতির যাতে বত্যয় না ঘটে। আজ মৈত্রী চর্চার অভাবে মানুষ মানুষকে নিবিচার হত্যা করছে, প্রাণী হত্যা তো এখন মামুলি।

করুণা: মমত্ববোধ থেকে করুণার সৃষ্টি। প্রাণীর প্রতি করুণার উদ্রেক সৃষ্টি হলেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। হিংসা হানাহানি লোপ পাবে।

মুদিতা: মানুষ নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে পরের দুঃখে দুঃখী ও সুখে সুখী হয়—এভাবে মুদিতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

উপেক্ষা: এ তিন অবস্থা অনুশীলনে উপেক্ষায় উপনীত হয়। তখন মানুষ সকলের কল্যাণে নিজের জীবনকে উৎসর্গিত করে। এগুলোই হলো ব্রহ্মবিহার।

বুদ্ধের মৈত্রী অনুশীলনের নির্দেশ এই, ‘মা যেমন তার একমাত্র সন্তানকে নিজের জীবন দিয়ে রক্ষা করেন, তেমনি জগতের সকল প্রাণীর প্রতি অপ্রমেয় মৈত্রী পোষণ করবে।’ এ মৈত্রী অনুশীলন তো বর্তমান সূদূরপরাহত। এখন দেখি ধর্মে নামে কতো নিরীহ প্রাণী বধ, কত মানুষ নিষ্ঠুরতার শিকার।

বুদ্ধের অহিংসা হলো শুধু প্রাণী হিংসা থেকে বিরত থাকা নয়, সকলের প্রতি প্রীতি বহন করা, কল্যাণ চিন্তা করা, পরার্থে আত্মনিবেদিত থাকা। বুদ্ধের মতো এমন আত্মত্যাগীর পক্ষে সম্ভব প্রাণীর প্রতি করুণাঘন হৃদয় বিতরণ করা। পৃথিবীকে আমরা মৈত্রী হৃদয়ে ভরিয়ে দিই।

  • ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয় : সম্পাদক, সৌগত

.গৌতম বুদ্ধ: রাজকুমার থেকে বোধিপ্রাপ্তির মহাযাত্রা