একটা গুগল সার্চে কত পানি খরচ হয়
- আপডেট সময় : ০৭:৩৮:৩২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

কাজের ফাঁকে গুগলে কিছু একটা লিখে সার্চ দেওয়ার পর পর্দার আড়ালে ঠিক কী ঘটছে, তা নিয়ে আমরা খুব একটা ভাবি না। চট করে আঙুল দিয়ে কি-বোর্ডে টিপ দিই, চোখের সামনে ফলাফল চলে আসে। আমরাও চলে যাই পরের প্রশ্নে। অথচ আমাদের প্রতিটি সার্চের পেছনে কাজ করে চলেছে হাজার মাইল দূরের কোনো এক বিশাল হলঘর। সেখানে সারি সারি সার্ভার অবিরাম চলে যাচ্ছে। আর সেই শক্তিশালী সার্ভারগুলোকে ঠান্ডা রাখতে হরদম খরচ হয়ে চলেছে বিপুল পানি! কিন্তু প্রশ্ন হলো, কত পানি? এর উত্তরটা যতটা সহজ মনে হয়, মোটেও ততটা সহজ নয়।
একেকটি সার্ভার মূলত অত্যন্ত শক্তিশালী কম্পিউটার, যেগুলো চব্বিশ ঘণ্টা চালু থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষের অনুরোধ বা কুয়েরি প্রক্রিয়াজাত করে। এই নিরন্তর কাজ করতে গিয়ে প্রসেসরে প্রচণ্ড তাপ জমে, ঠিক যেমন দীর্ঘক্ষণ চলতে থাকা গাড়ির ইঞ্জিন গরম হয়ে ওঠে। সেই তাপ সময়মতো সরিয়ে না নিলে ভেতরের অতিসংবেদনশীল যন্ত্রপাতি নিমেষেই বিকল হয়ে যাবে। তাই ডেটা সেন্টারগুলোতে বসানো হয় বিশাল বিশাল কুলিং টাওয়ার। সেখানে পানি বাষ্প হয়ে ভেতরের তাপ শুষে নেয়, ঠিক যেভাবে আমাদের শরীরের ঘাম শুকিয়ে শরীর ঠান্ডা হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ইভাপোরেটিভ কুলিং।
.গুগলের সবকিছু ফ্রি, তবু এক বছরে কীভাবে ৪০০ বিলিয়ন ডলার আয় করল.
গড়ে একেকটি কেন্দ্র দিনে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার গ্যালন পানি ব্যবহার করে, যা মোটামুটি ১৬০ জোড়া জিন্স তৈরির জন্য তুলা চাষে ব্যবহৃত পানির সমান!
.
মাত্র একটি সার্চের জন্য ঠিক কতটুকু পানি খরচ হয়, সেই হিসাব বের করা বেশ কঠিন। গুগলও কখনো এ নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বিশ্লেষণের সম্ভাব্য অনুমান থেকে জানা যায়, একটি সাধারণ টেক্সট সার্চের পেছনে খরচ হয় প্রায় ০.৬ মিলিলিটার পানি, যা পানির এক ফোঁটার চেয়েও কম! শুনতে এটি একদমই নগণ্য বা সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু ভেবে দেখুন, প্রতিদিন গুগলে গড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ কোটি বার সার্চ করা হয়! এই পুঁচকে সংখ্যাটিকে যখন সেই বিপুল পরিমাণ সার্চের সঙ্গে গুণ করা হয়, তখন দাঁড়ায় লাখ লাখ লিটার পানি, যা শুধু সার্চ করার কারণেই প্রতিদিন বাষ্প হয়ে বাতাসে উড়ে যাচ্ছে!
.
গুগলের নিজেদের পরিবেশবিষয়ক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে আরও স্পষ্ট ও বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে। ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ডেটা সেন্টারগুলোতে খরচ হয়েছে ৬০০ কোটিরও বেশি গ্যালন পানি! আর এর প্রায় পুরোটাই ছিল পানযোগ্য বিশুদ্ধ পানি। এই পানির পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৪১টি গলফ কোর্সের বার্ষিক সেচের পানির সমান! কেবল আইওয়ার কাউন্সিল ব্লাফস কেন্দ্রটিই এক বছরে খরচ করেছে প্রায় ৯৮ কোটি গ্যালন পানি। গড়ে একেকটি কেন্দ্র দিনে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার গ্যালন পানি ব্যবহার করে, যা মোটামুটি ১৬০ জোড়া জিন্স তৈরির জন্য তুলা চাষে ব্যবহৃত পানির সমান!
.গুগল ক্রোমের গতি বাড়ানোর সহজ ৫ কৌশল.
২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ডেটা সেন্টারগুলোতে খরচ হয়েছে ৬০০ কোটিরও বেশি গ্যালন পানি! আর এর প্রায় পুরোটাই ছিল পানযোগ্য বিশুদ্ধ পানি।
.
পানির এই চমকে দেওয়ার মতো হিসাব কিন্তু এখানেই থেমে থাকে না। সার্ভারগুলো ২৪ ঘণ্টা চালু রাখতে প্রচুর বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। আর সেই বিদ্যুৎ যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে তৈরি হয়, সেখানেও টারবাইন ঠান্ডা রাখতে বিপুল পরিমাণ পানি খরচ করা লাগে। যুক্তরাষ্ট্রের লরেন্স বার্কলি ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে দেশের গড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাড়ে চার লিটারেরও বেশি পানি খরচ হয়। এই পরোক্ষ পানির হিসাবটুকু যোগ করলে ডেটা সেন্টারের মোট পানির ফুটপ্রিন্ট বা ব্যবহারের চিত্রটি আরও কয়েক গুণ বড় হয়ে সামনে দাঁড়ায়।
সাধারণ সার্চের বদলে আমরা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেলের মুখোমুখি হই, তখন এই তুলনাটা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। গুগল অবশ্য দাবি করে, তাদের জেমিনাই মডেলে একটি টেক্সট প্রম্পটের জন্য সরাসরি খরচ হয় মাত্র ০.২৬ মিলিলিটার পানি। তবে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রিভারসাইডের গবেষক শাওলেই রেনের আলাদা গবেষণা কিন্তু ভিন্ন কথা বলছে।
.
বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরোক্ষ খরচ যুক্ত করলে প্রতিটি প্রম্পটেই পানি লাগতে পারে ১৬ মিলিলিটারেরও বেশি, যা গুগলের দেখানো প্রত্যক্ষ হিসাবের প্রায় ষাট গুণ! সাধারণ কোনো কথোপকথনভিত্তিক এআই চ্যাটে ২০ থেকে ৫০টি প্রশ্ন-উত্তর চালালে তা প্রায় আধা লিটারের এক বোতল পানি শুষে নিতে পারে। আর এআই দিয়ে ছবি তৈরির খরচ তো আরও বেশি। প্রতিটি ছবির পেছনে বের হয়ে যায় প্রায় ২৩ মিলিলিটার পানি! কারণটা খুব সাধারণ, সার্চ ইঞ্জিন তার আগে থেকে তৈরি করা ইনডেক্স থেকে মিলিসেকেন্ডের মধ্যে উত্তর খুঁজে এনে দেয়; কিন্তু এআই মডেল প্রতিবার নতুন করে চিন্তা করে, শব্দের পর শব্দ গণনা করে একদম নতুন উত্তর তৈরি করে।
.ঘুরতে যাওয়ার আগে গুগল ম্যাপসের ৩টি টিপস জেনে নিন.
সাধারণ কোনো কথোপকথনভিত্তিক এআই চ্যাটে ২০ থেকে ৫০টি প্রশ্ন-উত্তর চালালে তা প্রায় আধা লিটারের এক বোতল পানি শুষে নিতে পারে। আর এআই দিয়ে ছবি তৈরির খরচ তো আরও বেশি।
.
সব ডেটা সেন্টার কিন্তু একইভাবে শীতল রাখা হয় না। কিছু কেন্দ্রে বাতাস বা এয়ার-কুলিং ব্যবহার করে তাপ কমানো হয়, এতে পানির খরচ কম হলেও বিদ্যুতের খরচ আবার অনেক বেড়ে যায়। তবে গরম ও আর্দ্র জলবায়ুর অঞ্চলে পানিভিত্তিক ঠান্ডা করার পদ্ধতিই বেশি কার্যকর। ফলে এখানে সৃষ্টি হয় এক অদ্ভুত জটিল সমীকরণ—কম পানি খরচ করতে গেলে বিদ্যুৎ বেশি লাগে, আর বিদ্যুৎ বাঁচাতে গেলে পানি বেশি লাগে! তদুপরি, এআই চালানোর জন্য ব্যবহৃত শক্তিশালী জিপিইউ চিপগুলো সাধারণ সার্ভারের তুলনায় বহু গুণ বেশি তাপ সৃষ্টি করে। তাই সেগুলোতে প্রায়ই তরল পদার্থ দিয়ে সরাসরি চিপ ঠান্ডা করতে হয়, যা পানির সামগ্রিক ব্যয়কে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
পরিসংখ্যানের গণ্ডি পেরিয়ে পানির এই বিপুল খরচের আসল প্রভাব পড়ে স্থানীয় পরিবেশের ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যারোলাইনার বার্কলি কাউন্টির একটি মাত্র গুগল কেন্দ্র ২০২২ সালেই প্রায় ৬৬২ মিলিয়ন গ্যালন ভূগর্ভস্থ পানি তুলে খরচ করেছিল! কোম্পানিটি অবশ্য ঠিক কতটা ভূগর্ভস্থ পানি তুলছে তা প্রকাশ্যে জানাতে রাজি হয়নি, একে দেওয়া হয়েছে ব্যবসায়িক গোপনীয়তার তকমা। তবে স্থানীয় পরিবেশবিদদের যুক্তি খুব পরিষ্কার—বিশুদ্ধ পানীয় জল কোনো কোম্পানির একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়, তা সর্বজনীন মানবসম্পদ।
.গুগল স্টোরেজ ফুল হলে টাকা খরচ না করে যেভাবে জায়গা খালি করবেন.
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যারোলাইনার বার্কলি কাউন্টির একটি মাত্র গুগল কেন্দ্র ২০২২ সালেই প্রায় ৬৬২ মিলিয়ন গ্যালন ভূগর্ভস্থ পানি তুলে খরচ করেছিল!
.
ক্যালিফোর্নিয়া, জর্জিয়া কিংবা অ্যারিজোনার কৃষকেরা ইতোমধ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, ডেটা সেন্টারগুলোর পানি টানাটানির প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছে তাদের কৃষিজমি ও ফসল। এমনিতেই শুষ্ক অঞ্চলগুলোতে নদী আর ভূগর্ভস্থ জলাধারের পানি আশঙ্কাজনকভাবে কমছে, তার ওপর নতুন প্রতিটি ডেটা সেন্টার সৃষ্টি করছে বাড়তি সংকট। দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় যখন গুগলকে প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ গ্যালন ভূগর্ভস্থ পানি তোলার অনুমোদন দেওয়া হয়, তখন স্থানীয় পরিবেশ সংরক্ষণবাদীরা তীব্র প্রতিবাদ জানান। তাঁদের বক্তব্য ছিল একদম পরিষ্কার, সার্ভার ঠান্ডা রাখা কোনোভাবেই মানুষের মৌলিক পানীয় জলের চাহিদার চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পেতে পারে না।
গুগল অবশ্য পরিবেশের এই বৈশ্বিক সংকট নিয়ে হাত গুটিয়ে বসে নেই। ২০২১ সালে তারা একটি ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঘোষণা করেছিল যে, ২০৩০ সালের মধ্যে তারা যে পরিমাণ পানি ব্যবহার করবে, তার ১২০ শতাংশ পানি আবার প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেবে। এর অংশ হিসেবে অনেক কেন্দ্রে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ব্যবহৃত বর্জ্য পানি শোধন করে পুনরায় ব্যবহারের প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। কিন্তু মূল প্রশ্নটি থেকেই যায়, এই চমৎকার প্রতিশ্রুতি কাগজে-কলমে যতটা সুন্দর দেখায়, বাস্তবে কিংবা মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন কতটা ঘটছে, সেই হিসাব এখনো স্পষ্ট নয়।
.বিশ্বব্যাপী ২৫০ কোটি মানুষকে ভূমিকম্প সতর্কবার্তা দেবে গুগল.
২০২১ সালে গুগল একটি ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঘোষণা করেছিল যে, ২০৩০ সালের মধ্যে তারা যে পরিমাণ পানি ব্যবহার করবে, তার ১২০ শতাংশ পানি আবার প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেবে।
.
বাংলাদেশে এখনো এই পরিবেশগত প্রশ্নটি খুব বেশি আলোচনায় উঠে আসেনি। কারণ এখানে আন্তর্জাতিক মানের বড় ডেটা সেন্টারের সংখ্যা তুলনামূলক কম এবং সুনির্দিষ্ট কোনো পরিবেশগত প্রতিবেদনও নেই। তবে এআই আর ইন্টারনেটের ওপর আমাদের নির্ভরতা যেভাবে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, তাতে আমাদের প্রতিটি চ্যাটবট প্রশ্ন, প্রতিটি গুগল সার্চ কিংবা প্রতিটি এআই ছবি তৈরির অনুরোধ দূর-দূরান্তের কোনো হলঘরে গিয়ে পানির ফোঁটা হয়ে ঝরছে। আমাদের করা একটিমাত্র সার্চ হয়তো পানির এক ফোঁটার চেয়েও কম; কিন্তু যখন বিশ্বজুড়ে বিলিয়ন বিলিয়ন বার সেটি গুণ হয়, তখন সেই পুঁচকে ফোঁটাগুলোই তৈরি করে খরস্রোতা নদী!
লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র: গুগল এনভায়রনমেন্ট রিপোর্ট ২০২৪, লরেন্স বার্কলি ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি, দ্য পোস্ট অ্যান্ড কুরিয়ার, ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট, লিংকন ইনস্টিটিউট অব ল্যান্ড পলিসি
.গুগল ওয়ালেট ও গুগল পে কী, কীভাবে কাজ করে, যা জানা দরকার
























