ঢাকা ১০:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
৩ লাখের বেশি ভিসা বাতিল করেছে ট্রাম্প প্রশাসন, কিন্তু কেন রাষ্ট্রের জবাবদিহি ও আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত হোক প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর থেকে বাংলাদেশ কী পেতে পারে ঘাস কাটা নিয়ে বিরোধে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, ইউপি চেয়ারম্যানসহ আহত ২০ বাড়ির উঠানে ফুটবলের হাতেখড়ি মেয়েটির, এখন ডাক পড়ে দেশজুড়ে ৬ ছেলের পাকা বাড়ি, তবু কারও কাছে ঠাঁই পাচ্ছিলেন মা পুরুষের টেস্টোস্টেরন হরমোনের ঘাটতি কেন হয়, কীভাবে বাড়ানো যায় ‘মায়ের পায়ে পথ চলে’ রাজিয়ার, প্রতিবন্ধকতার বাধা ডিঙিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন বার্ধক্যের ছোট ইচ্ছে, মায়েদের নিঃসঙ্গতা ও এক বাটি পায়া চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে, ৩ বছরে ৫৪ জনের মৃত্যু

বাড়ির উঠানে ফুটবলের হাতেখড়ি মেয়েটির, এখন ডাক পড়ে দেশজুড়ে

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:১৪:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

অভাব-অনটনে বেড়ে উঠেছেন অন্তু দে (১৮)। শৈশবে শখের বশে বাড়ির উঠানে ফুটবল খেলতেন তিনি। এরপর বিদ্যালয় হয়ে সুযোগ পান উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের খেলায়। এখন জাতীয় পর্যায়ের নানা ফুটবল প্রতিযোগিতায় খেলোয়াড় হিসেবে ডাক পড়ে অন্তু দের। তাঁর স্বপ্ন, একদিন জাতীয় নারী ফুটবল দলে স্থান পাবেন।

অন্তু দের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের চক্রশালা গ্রামে। তাঁর বাবার নাম রতন দে। ছালেহ নূর ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে পড়ছেন অন্তু দে।

গ্রামের মেঠো পথ পেরিয়ে গাছপালার ভেতরে অন্তু দের বাড়ি। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, টিন ও মাটির তৈরি ছোট ঘরটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। খসে পড়ছে দেয়ালের মাটি। ঘরের কয়েকটি অংশে বেড়া ঝুলে আছে। বৃষ্টি হলেই চাল চুইয়ে ঘরের ভেতরে পানি পড়ে বলে জানালেন পরিবারের সদস্যরা।

ঘরের একটি কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ ঘরের ভেতরে ক্রেস্ট ও জার্সির স্তূপ। সযত্নে এসব রাখা হয়েছে। এর সবগুলোই ফুটবল খেলে অর্জন করেছেন বলে জানালেন অন্তু।  পরিবারের সদস্যরা জানান, অন্তুর বাবা রতন দে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। চার বছর ধরে গ্রামে একটি ছোট পানের দোকান করেন তিনি। রতন দের এক ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে সবার ছোট অন্তু। স্নাতক শেষে বিয়ে হয়েছে বড় মেয়ে তন্তু দের। ছেলে সৈকত দে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে একটি মুরগির খামার করছেন।

.

সে তো আমাদের বিদ্যালয়েরই ছাত্রী। সে আমাদের গর্ব। নিজেকেই কেবল সে খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলেনি, স্কুলের অন্য শিক্ষার্থীদেরও ফুটবলার হিসেবে গড়ে তুলছে।

নাছির উদ্দিন, প্রধান শিক্ষক, চক্রশালা কৃষি উচ্চবিদ্যালয়

.

ঘরে অন্তুর মা লক্ষ্মী দের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ঘরে অভাব-অনটন। তবু মেয়ের ফুটবল খেলায় আগ্রহ দেখে মেয়েকে কখনো বাধা দেননি তাঁরা। বরং মেয়েকে উৎসাহ দিয়েছেন। মেয়ে একদিন জাতীয় নারী ফুটবল দলে স্থান পাবে, সেই আশা তাঁর।সে তো আমাদের বিদ্যালয়েরই ছাত্রী। সে আমাদের গর্ব। নিজেকেই কেবল সে খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলেনি, স্কুলের অন্য শিক্ষার্থীদেরও ফুটবলার হিসেবে গড়ে তুলছে।—নাছির উদ্দিন, প্রধান শিক্ষক, চক্রশালা কৃষি উচ্চবিদ্যালয়।

.

বাড়ির উঠান থেকে প্রতিযোগিতার মাঠে

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই ফুটবলের প্রতি অন্তুর আগ্রহ তৈরি হয়। শুরুতে বাড়ির উঠানে প্রতিবেশী ছেলেদের সঙ্গে খেলতেন। এলাকার মাঠেও খেলেছেন। এক চাচাতো ভাই তাঁকে মাঠে নিয়ে যেতেন ফুটবল খেলতে।

চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় বিদ্যালয়ভিত্তিক বিভিন্ন খেলায় অংশ নিতে শুরু করেন অন্তু। তাঁর খেলা দেখে তখন বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকা সাগর দে তাঁকে বেশ উৎসাহ দিতেন। বিদ্যালয়ের দলের অধিনায়ক করা হয় অন্তুকে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে উপজেলা পর্যায়ের ফুটবল প্রতিযোগিতায় দুবার সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পান অন্তু।

.

প্রাথমিক শেষে চক্রশালা কৃষি উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন অন্তু। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় অনূর্ধ্ব-১৭ নারী ফুটবল প্রতিযোগিতায় খেলার সুযোগ হয় তাঁর। ২০১৮ সালের দিকে তৎকালীন প্রধান শিক্ষক সমর কান্তি দে ও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিনের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় স্থানীয় নারী ফুটবলের সংগঠক সৈয়দ সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। এরপর তাঁর মাধ্যমেই পটিয়া মহিলা ফুটবল একাডেমির সঙ্গে যুক্ত হন অন্তু। একাডেমির প্রায় ৪০ জন খেলোয়াড়ের সঙ্গে পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে নিয়মিত অনুশীলন শুরু করেন। মাত্র দুই দিন অনুশীলনের পর ২০১৮ সালের ১৮ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর স্টেডিয়ামে লোহাগাড়া উপজেলার দলের বিপক্ষে খেলেন। ওই ম্যাচে পটিয়া জিতলেও পরবর্তী সময়ে আনোয়ারা উপজেলার দলের কাছে হেরে যায় অন্তুদের দল।

.

২০১৮ সালের শেষ দিকে চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে উপজেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় পটিয়া উপজেলা চ্যাম্পিয়ন হয়। পরের বছর জেলা পর্যায়ে খেলার সুযোগ পায় দলটি। সেখানে পটিয়ার হয়ে খেলে অন্তু সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। প্রথম ম্যাচে ফেনীর কাছে চট্টগ্রাম ২-০ গোলে হেরে যায়।

জেলা পর্যায়ের বাছাইয়ে ৪০ জন খেলোয়াড়ের মধ্য থেকে ১৮ জনকে নির্বাচন করা হয়। তাঁদের মধ্যে পটিয়ার অন্তু দে ছিলেন। অন্তু শেষ পর্যন্ত ১১ জনের দলে জায়গা করে নেন। ২০২০ সালে ঢাকায় বিভাগীয় পর্যায়েও খেলেন তিনি। একই বছর আনোয়ারার একটি দলের হয়ে সিলেটে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।

.

ঘরে অন্তুর মা লক্ষ্মী দের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ঘরে অভাব-অনটন। তবু মেয়ের ফুটবল খেলায় আগ্রহ দেখে মেয়েকে কখনো বাধা দেননি তাঁরা। বরং মেয়েকে উৎসাহ দিয়েছেন। মেয়ে একদিন জাতীয় নারী ফুটবল দলে স্থান পাবে, সেই আশা তাঁর।

.

এরপর রংপুর, কক্সবাজার, কুমিল্লা, বগুড়া, নীলফামারী, চুয়াডাঙ্গা ও জয়পুরহাটসহ বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন দলের হয়ে খেলেছেন অন্তু। ২০২১ সালে যুব গেমসে চট্টগ্রাম জেলা দল চ্যাম্পিয়ন হয়, যেখানে অন্তু ছিলেন। পরে ফেনীতে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় পর্যায়ের খেলায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় দল রানারআপ হয়।

২০২৫ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ উইমেনস লিগে ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে খেলেন অন্তু। ওই প্রতিযোগিতায় ১০টি দলের সঙ্গে খেলে ক্লাবটি রানারআপ হয়। বাংলাদেশ ফুটসাল লিগেও চাঁদপুর ফুটবল ক্লাবের হয়ে খেলেছেন তিনি। এ ছাড়া বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে চট্টগ্রাম বিভাগের হয়ে মৌলভীবাজার জেলার বিপক্ষে খেলেছেন।

.

এ পর্যন্ত সেরা খেলোয়াড় হিসেবে চারটি এবং ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ হিসেবে পাঁচটি পুরস্কার পেয়েছেন অন্তু। খেলা থেকে পাওয়া আর্থিক সহায়তা দিয়ে পরিবারের খরচেও কিছুটা সহযোগিতা করেছেন।

বর্তমানে খেলার পাশাপাশি চক্রশালা কৃষি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফুটবল প্রশিক্ষণ দেন অন্তু।  জানতে চাইলে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক নাছির উদ্দিন বলেন, ‘সে তো আমাদের বিদ্যালয়েরই ছাত্রী। সে আমাদের গর্ব। নিজেকেই কেবল সে খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলেনি, স্কুলের অন্য শিক্ষার্থীদেরও ফুটবলার হিসেবে গড়ে তুলছে।’

জানতে চাইলে অন্তু বলেন, ‘শৈশব থেকেই খেলায় উৎসাহ দিয়েছেন আমার মা-বাবা। তাঁদের সহায়তা না পেলে এত দূর আশা কঠিন হতো। প্রাথমিকে পড়ার সময় যখন গ্রামের মাঠে খেলতাম, তখন আমিই ছিলাম একমাত্র মেয়ে। শৈশবে আমার চাচাতো ভাই প্রকাশ দে আমাকে খেলাধুলায় বেশ উৎসাহ দিয়েছেন।’

.

কোচের সহযোগিতায় এগিয়ে চলা

অন্তু জানান, তাঁর ফুটবলজীবনে বড় ভূমিকা রেখেছেন পটিয়া মহিলা ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা চিকিৎসক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম। তিনি চট্টগ্রামের বাংলাদেশ বয়েজ ফুটবল একাডেমিরও কর্ণধার। অন্তুর পরিবারের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে আর্থিক সহায়তাও দিয়েছেন সাইফুল।

অন্তু বলেন, তাঁর কোচ সৈয়দ সাইফুল ইসলাম সব সময় পাশে থেকেছেন। মাঠে অনুশীলন কিংবা বিভিন্ন জায়গায় খেলতে যাওয়ার সময় তিনি এখনো সহযোগিতা করেন।

ফুটবল খেলতে গিয়ে অনেক কটূক্তির স্বীকার হয়েছেন বলেও জানান অন্তু। তিনি বলেন, ‘মেয়ে হয়ে ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলা, ছেলেদের মতো পোশাক পরে বাইরে যাওয়া নিয়ে অনেকেই কটূক্তি করতেন। তবে এখন এলাকার মানুষ উৎসাহ দেন।’

পটিয়া মহিলা ফুটবল একাডেমির নারী কোচ হিসেবে রয়েছেন নাছরিন আক্তার। তিনি বলেন, অন্তু নিয়মিত অনুশীলন করেন। এর মধ্য দিয়ে নিজেকে খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তুলেছেন অন্তু। নাছরিন আক্তার জানান, ২০১৭ সালে এলাকার নারী খেলোয়াড়দের নিয়ে কাজ শুরু করেন সৈয়দ সাইফুল ইসলাম। পটিয়া মহিলা ফুটবল একাডেমি গড়ে তোলা হয়। অন্তু এই একাডেমির ভালো ফুটবলারদের মধ্যে অন্যতম।

.

জানতে চাইলে সৈয়দ সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রত্যন্ত গ্রামের অনেক প্রতিভাবান মেয়ে ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলায় আগ্রহী। কিন্তু গ্রাম পর্যায়ে তাঁদের উৎসাহ দিতে না পারলে তাঁদের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া কঠিন। তিনি বলেন, ‘মেয়েরা যাতে অনুশীলনের সুযোগ পেয়ে জাতীয় পর্যায়ে খেলতে পারে—এই লক্ষ্যেই আমি পটিয়া মহিলা ফুটবল একাডেমি গড়ে তুলেছি। অন্তু দের মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়েরা এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন।’

স্বপ্ন জাতীয় নারী ফুটবল দল

অন্তুর স্বপ্ন জাতীয় নারী ফুটবল দলে খেলার। তিনি বলেন, জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশের নারী ফুটবলার শামসুন্নাহারসহ বেশ কয়েকজনকে অনুসরণ করেন তিনি। তাঁদের মতো খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। জাতীয় নারী ফুটবল দলে একদিন ঠাঁই পাবেন, এই স্বপ্ন দেখেন তিনি।

অন্তু জানান, পটিয়ায় মেয়েদের ফুটবল অনুশীলনের জন্য আলাদা মাঠ নেই। বর্তমানে পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও অনুশীলন করেন। মেয়েদের অনুশীলনের জন্য আলাদা মাঠের ব্যবস্থা করা গেলে তাঁরা আরও এগিয়ে যেতেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

বাড়ির উঠানে ফুটবলের হাতেখড়ি মেয়েটির, এখন ডাক পড়ে দেশজুড়ে

আপডেট সময় : ০৯:১৪:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

অভাব-অনটনে বেড়ে উঠেছেন অন্তু দে (১৮)। শৈশবে শখের বশে বাড়ির উঠানে ফুটবল খেলতেন তিনি। এরপর বিদ্যালয় হয়ে সুযোগ পান উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের খেলায়। এখন জাতীয় পর্যায়ের নানা ফুটবল প্রতিযোগিতায় খেলোয়াড় হিসেবে ডাক পড়ে অন্তু দের। তাঁর স্বপ্ন, একদিন জাতীয় নারী ফুটবল দলে স্থান পাবেন।

অন্তু দের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের চক্রশালা গ্রামে। তাঁর বাবার নাম রতন দে। ছালেহ নূর ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে পড়ছেন অন্তু দে।

গ্রামের মেঠো পথ পেরিয়ে গাছপালার ভেতরে অন্তু দের বাড়ি। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, টিন ও মাটির তৈরি ছোট ঘরটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। খসে পড়ছে দেয়ালের মাটি। ঘরের কয়েকটি অংশে বেড়া ঝুলে আছে। বৃষ্টি হলেই চাল চুইয়ে ঘরের ভেতরে পানি পড়ে বলে জানালেন পরিবারের সদস্যরা।

ঘরের একটি কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ ঘরের ভেতরে ক্রেস্ট ও জার্সির স্তূপ। সযত্নে এসব রাখা হয়েছে। এর সবগুলোই ফুটবল খেলে অর্জন করেছেন বলে জানালেন অন্তু।  পরিবারের সদস্যরা জানান, অন্তুর বাবা রতন দে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। চার বছর ধরে গ্রামে একটি ছোট পানের দোকান করেন তিনি। রতন দের এক ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে সবার ছোট অন্তু। স্নাতক শেষে বিয়ে হয়েছে বড় মেয়ে তন্তু দের। ছেলে সৈকত দে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে একটি মুরগির খামার করছেন।

.

সে তো আমাদের বিদ্যালয়েরই ছাত্রী। সে আমাদের গর্ব। নিজেকেই কেবল সে খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলেনি, স্কুলের অন্য শিক্ষার্থীদেরও ফুটবলার হিসেবে গড়ে তুলছে।

নাছির উদ্দিন, প্রধান শিক্ষক, চক্রশালা কৃষি উচ্চবিদ্যালয়

.

ঘরে অন্তুর মা লক্ষ্মী দের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ঘরে অভাব-অনটন। তবু মেয়ের ফুটবল খেলায় আগ্রহ দেখে মেয়েকে কখনো বাধা দেননি তাঁরা। বরং মেয়েকে উৎসাহ দিয়েছেন। মেয়ে একদিন জাতীয় নারী ফুটবল দলে স্থান পাবে, সেই আশা তাঁর।সে তো আমাদের বিদ্যালয়েরই ছাত্রী। সে আমাদের গর্ব। নিজেকেই কেবল সে খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলেনি, স্কুলের অন্য শিক্ষার্থীদেরও ফুটবলার হিসেবে গড়ে তুলছে।—নাছির উদ্দিন, প্রধান শিক্ষক, চক্রশালা কৃষি উচ্চবিদ্যালয়।

.

বাড়ির উঠান থেকে প্রতিযোগিতার মাঠে

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই ফুটবলের প্রতি অন্তুর আগ্রহ তৈরি হয়। শুরুতে বাড়ির উঠানে প্রতিবেশী ছেলেদের সঙ্গে খেলতেন। এলাকার মাঠেও খেলেছেন। এক চাচাতো ভাই তাঁকে মাঠে নিয়ে যেতেন ফুটবল খেলতে।

চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় বিদ্যালয়ভিত্তিক বিভিন্ন খেলায় অংশ নিতে শুরু করেন অন্তু। তাঁর খেলা দেখে তখন বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকা সাগর দে তাঁকে বেশ উৎসাহ দিতেন। বিদ্যালয়ের দলের অধিনায়ক করা হয় অন্তুকে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে উপজেলা পর্যায়ের ফুটবল প্রতিযোগিতায় দুবার সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পান অন্তু।

.

প্রাথমিক শেষে চক্রশালা কৃষি উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন অন্তু। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় অনূর্ধ্ব-১৭ নারী ফুটবল প্রতিযোগিতায় খেলার সুযোগ হয় তাঁর। ২০১৮ সালের দিকে তৎকালীন প্রধান শিক্ষক সমর কান্তি দে ও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিনের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় স্থানীয় নারী ফুটবলের সংগঠক সৈয়দ সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। এরপর তাঁর মাধ্যমেই পটিয়া মহিলা ফুটবল একাডেমির সঙ্গে যুক্ত হন অন্তু। একাডেমির প্রায় ৪০ জন খেলোয়াড়ের সঙ্গে পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে নিয়মিত অনুশীলন শুরু করেন। মাত্র দুই দিন অনুশীলনের পর ২০১৮ সালের ১৮ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর স্টেডিয়ামে লোহাগাড়া উপজেলার দলের বিপক্ষে খেলেন। ওই ম্যাচে পটিয়া জিতলেও পরবর্তী সময়ে আনোয়ারা উপজেলার দলের কাছে হেরে যায় অন্তুদের দল।

.

২০১৮ সালের শেষ দিকে চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে উপজেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় পটিয়া উপজেলা চ্যাম্পিয়ন হয়। পরের বছর জেলা পর্যায়ে খেলার সুযোগ পায় দলটি। সেখানে পটিয়ার হয়ে খেলে অন্তু সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। প্রথম ম্যাচে ফেনীর কাছে চট্টগ্রাম ২-০ গোলে হেরে যায়।

জেলা পর্যায়ের বাছাইয়ে ৪০ জন খেলোয়াড়ের মধ্য থেকে ১৮ জনকে নির্বাচন করা হয়। তাঁদের মধ্যে পটিয়ার অন্তু দে ছিলেন। অন্তু শেষ পর্যন্ত ১১ জনের দলে জায়গা করে নেন। ২০২০ সালে ঢাকায় বিভাগীয় পর্যায়েও খেলেন তিনি। একই বছর আনোয়ারার একটি দলের হয়ে সিলেটে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।

.

ঘরে অন্তুর মা লক্ষ্মী দের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ঘরে অভাব-অনটন। তবু মেয়ের ফুটবল খেলায় আগ্রহ দেখে মেয়েকে কখনো বাধা দেননি তাঁরা। বরং মেয়েকে উৎসাহ দিয়েছেন। মেয়ে একদিন জাতীয় নারী ফুটবল দলে স্থান পাবে, সেই আশা তাঁর।

.

এরপর রংপুর, কক্সবাজার, কুমিল্লা, বগুড়া, নীলফামারী, চুয়াডাঙ্গা ও জয়পুরহাটসহ বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন দলের হয়ে খেলেছেন অন্তু। ২০২১ সালে যুব গেমসে চট্টগ্রাম জেলা দল চ্যাম্পিয়ন হয়, যেখানে অন্তু ছিলেন। পরে ফেনীতে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় পর্যায়ের খেলায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় দল রানারআপ হয়।

২০২৫ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ উইমেনস লিগে ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে খেলেন অন্তু। ওই প্রতিযোগিতায় ১০টি দলের সঙ্গে খেলে ক্লাবটি রানারআপ হয়। বাংলাদেশ ফুটসাল লিগেও চাঁদপুর ফুটবল ক্লাবের হয়ে খেলেছেন তিনি। এ ছাড়া বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে চট্টগ্রাম বিভাগের হয়ে মৌলভীবাজার জেলার বিপক্ষে খেলেছেন।

.

এ পর্যন্ত সেরা খেলোয়াড় হিসেবে চারটি এবং ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ হিসেবে পাঁচটি পুরস্কার পেয়েছেন অন্তু। খেলা থেকে পাওয়া আর্থিক সহায়তা দিয়ে পরিবারের খরচেও কিছুটা সহযোগিতা করেছেন।

বর্তমানে খেলার পাশাপাশি চক্রশালা কৃষি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফুটবল প্রশিক্ষণ দেন অন্তু।  জানতে চাইলে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক নাছির উদ্দিন বলেন, ‘সে তো আমাদের বিদ্যালয়েরই ছাত্রী। সে আমাদের গর্ব। নিজেকেই কেবল সে খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলেনি, স্কুলের অন্য শিক্ষার্থীদেরও ফুটবলার হিসেবে গড়ে তুলছে।’

জানতে চাইলে অন্তু বলেন, ‘শৈশব থেকেই খেলায় উৎসাহ দিয়েছেন আমার মা-বাবা। তাঁদের সহায়তা না পেলে এত দূর আশা কঠিন হতো। প্রাথমিকে পড়ার সময় যখন গ্রামের মাঠে খেলতাম, তখন আমিই ছিলাম একমাত্র মেয়ে। শৈশবে আমার চাচাতো ভাই প্রকাশ দে আমাকে খেলাধুলায় বেশ উৎসাহ দিয়েছেন।’

.

কোচের সহযোগিতায় এগিয়ে চলা

অন্তু জানান, তাঁর ফুটবলজীবনে বড় ভূমিকা রেখেছেন পটিয়া মহিলা ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা চিকিৎসক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম। তিনি চট্টগ্রামের বাংলাদেশ বয়েজ ফুটবল একাডেমিরও কর্ণধার। অন্তুর পরিবারের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে আর্থিক সহায়তাও দিয়েছেন সাইফুল।

অন্তু বলেন, তাঁর কোচ সৈয়দ সাইফুল ইসলাম সব সময় পাশে থেকেছেন। মাঠে অনুশীলন কিংবা বিভিন্ন জায়গায় খেলতে যাওয়ার সময় তিনি এখনো সহযোগিতা করেন।

ফুটবল খেলতে গিয়ে অনেক কটূক্তির স্বীকার হয়েছেন বলেও জানান অন্তু। তিনি বলেন, ‘মেয়ে হয়ে ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলা, ছেলেদের মতো পোশাক পরে বাইরে যাওয়া নিয়ে অনেকেই কটূক্তি করতেন। তবে এখন এলাকার মানুষ উৎসাহ দেন।’

পটিয়া মহিলা ফুটবল একাডেমির নারী কোচ হিসেবে রয়েছেন নাছরিন আক্তার। তিনি বলেন, অন্তু নিয়মিত অনুশীলন করেন। এর মধ্য দিয়ে নিজেকে খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তুলেছেন অন্তু। নাছরিন আক্তার জানান, ২০১৭ সালে এলাকার নারী খেলোয়াড়দের নিয়ে কাজ শুরু করেন সৈয়দ সাইফুল ইসলাম। পটিয়া মহিলা ফুটবল একাডেমি গড়ে তোলা হয়। অন্তু এই একাডেমির ভালো ফুটবলারদের মধ্যে অন্যতম।

.

জানতে চাইলে সৈয়দ সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রত্যন্ত গ্রামের অনেক প্রতিভাবান মেয়ে ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলায় আগ্রহী। কিন্তু গ্রাম পর্যায়ে তাঁদের উৎসাহ দিতে না পারলে তাঁদের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া কঠিন। তিনি বলেন, ‘মেয়েরা যাতে অনুশীলনের সুযোগ পেয়ে জাতীয় পর্যায়ে খেলতে পারে—এই লক্ষ্যেই আমি পটিয়া মহিলা ফুটবল একাডেমি গড়ে তুলেছি। অন্তু দের মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়েরা এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন।’

স্বপ্ন জাতীয় নারী ফুটবল দল

অন্তুর স্বপ্ন জাতীয় নারী ফুটবল দলে খেলার। তিনি বলেন, জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশের নারী ফুটবলার শামসুন্নাহারসহ বেশ কয়েকজনকে অনুসরণ করেন তিনি। তাঁদের মতো খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। জাতীয় নারী ফুটবল দলে একদিন ঠাঁই পাবেন, এই স্বপ্ন দেখেন তিনি।

অন্তু জানান, পটিয়ায় মেয়েদের ফুটবল অনুশীলনের জন্য আলাদা মাঠ নেই। বর্তমানে পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও অনুশীলন করেন। মেয়েদের অনুশীলনের জন্য আলাদা মাঠের ব্যবস্থা করা গেলে তাঁরা আরও এগিয়ে যেতেন।