শ্রবণপ্রতিবন্ধী তিন শিল্পীর ব্যান্ডটি নিয়ে উন্মাদনা
- আপডেট সময় : ০৭:৫৭:৩২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

গান বাজছে। মঞ্চে নাচছেন তিন তরুণ। গানের তালে তালে হাতের ইশারায় প্রকাশ করছেন কথাও। সামনে উচ্ছ্বসিত দর্শক। তাঁদের উল্লাসের মধ্যেই চলছে পরিবেশনা।
এটি দক্ষিণ কোরিয়ার কে-পপ দল বিগ ওশানের কনসার্টের দৃশ্য। দলটির তিন সদস্যই শ্রবণপ্রতিবন্ধী। তারপরও গান, নাচ ও ইশারা ভাষার সমন্বয়ে তাঁরা তৈরি করেছেন নিজস্ব পরিবেশনাশৈলী।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের কনসার্ট দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সফর শুরু করে বিগ ওশান। আট শহরের এই সফরের প্রথম কনসার্টের সব টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। ২০২৪ সালে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই দলটি আন্তর্জাতিক সংগীতাঙ্গনে আলোচনায় এসেছে।
তবে শুধু শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিল্পীদের দল হিসেবে পরিচিত থাকতে চান না সদস্যরা। নিজেদের গান ও পরিবেশনা দিয়েই দর্শকদের মন জয় করতে চান তাঁরা।
বিগ ওশানের তিন সদস্য পি জে, কিম জিসক ও লি চানইয়ন। তাঁদের প্রত্যেকের জীবনেই রয়েছে আলাদা অভিজ্ঞতা। পি জে আগে ইউটিউবে ভিডিও তৈরি করতেন।
শ্রবণপ্রতিবন্ধকতা নিয়ে সচেতনতা তৈরিতেও কাজ করেছেন তিনি। কিম জিসক ছিলেন প্রতিযোগিতামূলক আলপাইন স্কিয়ার। অন্যদিকে লি চানইয়ন কাজ করেছেন শ্রবণবিশেষজ্ঞ হিসেবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্যারাস্টার এন্টারটেইনমেন্টের উদ্যোগে একত্র হন তাঁরা। এরপর শুরু হয় সংগীত ও নাচের প্রশিক্ষণ। ২০২৪ সালের ২০ এপ্রিল ‘গ্লো’ গান দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে বিগ ওশান।
দল গঠনের পর থেকেই তাঁদের সামনে ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। গান গাওয়ার পাশাপাশি নাচের তাল মেলানো, গানের কথা প্রকাশ করা এবং মঞ্চে একসঙ্গে পরিবেশনা চালিয়ে যেতে হতো। এ জন্য প্রয়োজন হয়েছে নিয়মিত অনুশীলন ও প্রযুক্তির সহায়তা।
সংগীতের তাল বোঝার জন্য বিগ ওশানের সদস্যরা বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। অনুশীলনের সময় কম্পন তৈরি করা স্মার্টওয়াচ তাঁদের সাহায্য করে। বিশেষ মেট্রোনোম ও আলোর সংকেত থেকেও তাল বুঝতে পারেন তাঁরা। তবে প্রযুক্তিই সব নয়।
বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে গানের ছন্দ ও নাচের ধাপ আয়ত্ত করেন সদস্যরা। মঞ্চে একে অন্যের সংকেত অনুসরণ করেন। এতে একজনের ভুল বা দেরি হলে অন্যরা সমন্বয় করে পরিবেশনা চালিয়ে যেতে পারেন।
গান রেকর্ড করার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। কণ্ঠের স্বর, সুর ও তাল ঠিক রাখতে প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল অডিও প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়। তবে প্রযুক্তি তাঁদের নিজস্ব কণ্ঠের বিকল্প নয়। বরং সংগীত পরিবেশনকে আরও পরিশীলিত করতে সহায়তা করে।
বিগ ওশানের পরিবেশনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ইশারা ভাষার ব্যবহার। সদস্যরা শুধু গানের তালে হাত নাড়েন না। গানের কথা ও আবেগও প্রকাশ করেন ইশারায়। এ জন্য নাচ ও ইশারা ভাষা—দুটিই আলাদাভাবে অনুশীলন করতে হয়। পরে সেগুলো মিলিয়ে তৈরি করা হয় মঞ্চের পরিবেশনা।
এতে শ্রবণপ্রতিবন্ধী দর্শকেরা গানের কথা ও আবেগ বুঝতে পারেন। অন্য দর্শকেরাও গানের অর্থকে দৃশ্যের মাধ্যমে উপলব্ধি করার সুযোগ পান।
লাইভ পরিবেশনায় অবশ্য চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ২০২৪ সালে প্যারিসের এক অনুষ্ঠানে দর্শকদের উল্লাসের কারণে গানের শব্দ শোনা কঠিন হয়ে পড়েছিল। তখন সদস্যদের পরস্পরের সংকেতের ওপর নির্ভর করতে হয়।
বিগ ওশানকে ঘিরে আলোচনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে সদস্যদের শ্রবণপ্রতিবন্ধকতা। কিন্তু নিজেদের শিল্পীসত্তার পরিচয়ও প্রতিষ্ঠা করতে চান তাঁরা।
২০২৫ সালে প্রকাশিত দ্বিতীয় মিনি অ্যালবাম ‘আন্ডারওয়াটার’-এর মাধ্যমে নিজেদের সংগীতের পরিসর আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করেছে দলটি। তাদের গানে উঠে আসে আত্মবিশ্বাস, ঐক্য ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা।
শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সংগীতের জগতে অংশ নেওয়ার পথ যে একটিমাত্র নয়, বিগ ওশানের পরিবেশনা তা সামনে এনেছে। শব্দের পাশাপাশি কম্পন, আলো, দৃশ্য ও ইশারা ভাষাও হতে পারে সংগীতের অভিজ্ঞতা।
এপি, দ্য গার্ডিয়ান ও গ্র্যামি ডটকম অবলম্বনে

















