ছোটবেলা থেকেই ইংরেজি শেখা: ভীতি বনাম ভিত্তি
- আপডেট সময় : ১০:২৮:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে

আমাদের দেশে ইংরেজি শুধুই একটি পরীক্ষার বিষয়। সমাজ, বিজ্ঞান কিংবা আর আট দশটা বিষয়ের মতোই ইংরেজি শেখানোর প্রচলিত পদ্ধতির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে গ্রামারের নিয়ম মুখস্থ করা, শব্দার্থ ও নানা রকম স্ট্রাকচার মনে রাখা। শুধু কোনোভাবে পরীক্ষায় উতরে যাওয়ার জন্যও শেখানো হয় নানা রকম টিপস ও টেকনিক। এমন একটি চর্চাও আমি দেখেছি, যেখানে শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট কিছু প্যারাগ্রাফ লেখার টেমপ্লেট মুখস্থ করানো হয়। এমনকি আইইএলটিএসের মতো পরীক্ষার শিক্ষার্থীদেরও অনেক সময় বোঝানো হয়, কয়েকটি নির্দিষ্ট বাক্য ও লেখার কাঠামো শিখে রাখলেই যেকোনো বিষয়ে ইংরেজি প্যারাগ্রাফ লেখা সম্ভব। ফলে শিক্ষার্থীরা বিষয়টি বুঝে নিজের মতো করে সৃজনশীলভাবে প্রকাশ করার পরিবর্তে মুখস্থ করা ‘টেমপ্লেট’–এর মধ্যেই টপিকের নাম বসিয়ে লিখে দেন।
বিদেশি ভাষা শিক্ষা বিবেচনায় টিপস–টেকনিক, সূত্র বা স্ট্রাকচার—এসবের প্রয়োজনীয়তা আছে, কিন্তু শুধু এগুলোর ওপর নির্ভর করে একটি ভাষায় সাবলীল হওয়া কঠিন। কারণ, কোনো বাক্যের নিয়ম জানা আর বাস্তব পরিস্থিতিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই বাক্য ব্যবহার করতে পারা এক বিষয় নয়। যার ফলে প্রায় সময়েই দেখা যায়, অনেক শিক্ষার্থী এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষায় ইংরেজিতে অসাধারণ ফলাফল অর্জন করেও বাস্তব জীবনে ইংরেজিতে কথা বলতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ে, নিজের চিন্তা সাবলীলভাবে প্রকাশ করতে পারে না কিংবা নির্ভুলভাবে লিখতেও হিমশিম খায়।
একটি শিশু যে ভাষার পরিবেশে বড় হয়, সেই ভাষা সে খুব স্বাভাবিকভাবেই শিখে নেয়। তাকে প্রতিটি বাক্যের ব্যাকরণ বুঝিয়ে দিতে হয় না, শব্দের অর্থ মুখস্থ করাতে হয় না কিংবা প্রতিদিন পরীক্ষার মাধ্যমে তার শেখার অগ্রগতি যাচাই করতে হয় না। পরিবারের মানুষের কথা শুনতে শুনতে, তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে এবং চারপাশের পরিবেশ থেকে অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্য দিয়েই শিশুটি ভাষা আয়ত্ত করে ফেলে।
শৈশবে মানুষের মস্তিষ্ক ভাষা ও নানা ধরনের অভিজ্ঞতা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে নমনীয় থাকে। এ সময় নিয়মিত কোনো ভাষা শোনা, সেই ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করা এবং অর্থপূর্ণ পরিস্থিতিতে ভাষাটি ব্যবহার করার সুযোগ পেলে শেখা অনেক বেশি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন ভাষা শেখা অবশ্যই সম্ভব, তবে উচ্চারণ, কথার স্বাভাবিক ছন্দ এবং অনর্গল কথা বলার দক্ষতা অর্জনে বেশি সময় ও অনুশীলন প্রয়োজন হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, একটি বাঙালি শিশু ছোটবেলা থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে বড় হচ্ছে। তার পরিবারের সদস্যরা যদি তার সঙ্গে বাংলায় কথা বলেন, আর চারপাশের মানুষ যদি ইংরেজিতে কথা বলেন, তাহলে সে একই সঙ্গে দুটি ভাষা শিখে নিতে পারে। বাংলার জন্য তাকে আলাদা করে প্রতিটি বাক্যের গঠন মুখস্থ করতে হয় না।
একইভাবে ইংরেজি শেখার জন্যও তাকে প্রথমে গ্রামারের নিয়ম শিখে তারপর কথা বলা শুরু করতে হয় না। ভাষার সঙ্গে নিয়মিত পরিচয়, শোনা, বলা, পড়া ও লেখার অভ্যাসই তাকে ধীরে ধীরে দক্ষ করে তোলে। যেকোনো ভাষা শেখার ক্ষেত্রেই এই বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ছোটবেলা থেকেই যদি শিশুরা ইংরেজি ভাষার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে পরিচিত হওয়ার, ভাষাটি বোঝার এবং দৈনন্দিন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করার সুযোগ পায়, তাহলে তাদের জন্য ইংরেজি শেখার প্রক্রিয়াটি অনেক বেশি সহজ ও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। শৈশব থেকেই এই অভ্যাস গড়ে তোলা ভবিষ্যতে তাদের যোগাযোগ, জ্ঞানচর্চা ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। পরিবারের মধ্যে বেড়ে ওঠার সময় একটি শিশু যদি নিয়মিত ইংরেজি গল্প শোনা, কার্টুন দেখা, সহজ ইংরেজি বই পড়া এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলার সুযোগ পায়, তাহলে সে ধীরে ধীরে শব্দের অর্থ, বাক্যের গঠন ও ব্যবহারের ধরন বুঝতে শিখবে। প্রথম দিকে ভুল হতে পারে, বাক্য অসম্পূর্ণ হতে পারে, উচ্চারণেও সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু নিয়মিত অনুশীলন ও উৎসাহ পেলে তার দক্ষতা বাড়তে থাকবে। পরবর্তী সময়ে স্কুলের পাঠ্যক্রমে গ্রামারের নিয়ম শেখাও তার জন্য অনেক সহজ হয়ে যায় এবং ইংরেজির ওপর তার ভাষাগত দক্ষতা অনেক বেড়ে যায়।
অনেকেই বলে থাকেন, ‘ইংরেজিতে ভালো হওয়ার জন্য গ্রামারের প্রয়োজন নেই’। গ্রামার না জেনে আপনি অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রগুলোয় হয়তো পার পেয়ে যাবেন, কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বিবেচনায় এই ধারণা ভুল। গ্রামার জানা থাকা একজন শিক্ষার্থীর ইংরেজির দক্ষতাকে আরও নিখুঁত করে তোলে।
আইইএলটিএস, টোয়েফল ও পিটিই ইত্যাদি প্রতিটি পরীক্ষায় গ্রামার মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে কাজ করে। তাই গ্রামার শেখাকে কোনোভাবেই অপ্রয়োজনীয় বলা যাবে না; বরং গ্রামার শেখার সময়, পদ্ধতি ও উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের সবারই চিন্তাভাবনা করা উচিত। স্কুল–কলেজজীবনে কঠিন বিষয় হিসেবে ইংরেজির প্রতি শিক্ষার্থীর যে ভীতি, সেই ভীতি কাটিয়ে কীভাবে এটিকে শুধু একটি ভাষা, বাংলার মতোই মনের ভাব প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, সে ব্যাপারে প্রত্যেক স্তরেই কাজ করা উচিত। প্রথমে ভাষার সঙ্গে পরিচয়, তারপর ব্যবহারিক অনুশীলন এবং পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাকরণ শেখা—এই পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর হতে পারে।
অভিভাবকেরা চাইলে ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে ইংরেজির একটি আনন্দদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারেন। প্রতিদিন কিছু সময় ইংরেজি গল্প শোনা, বয়স উপযোগী বই পড়া, পরিচিত বিষয় নিয়ে সহজ বাক্যে কথা বলা এবং ইংরেজিতে প্রশ্ন করতে উৎসাহ দিতে পারেন। বাসায় অভিধান, ছবিযুক্ত এনসাইক্লোপিডিয়া, বয়স উপযোগী ম্যাগাজিন, ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা ইত্যাদি রাখা যেতে পারে। শিশুকে ভুলের জন্য লজ্জা দেওয়া বা প্রতিটি বাক্যে থামিয়ে সংশোধন করার বদলে তার কথা বলার আগ্রহ বাড়ানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চাও বজায় রাখা উচিত। একাধিক ভাষা শেখা মানে মাতৃভাষাকে বাদ দেওয়া নয়; বরং নতুন ভাষার মাধ্যমে জ্ঞান ও যোগাযোগের পরিসর বাড়ানো।
আমাদের সবাইকেই বুঝতে হবে, ইংরেজি শেখার জন্য কোনো শর্টকাট পদ্ধতি নেই। ছোটবেলায় ভাষার পরিবেশ তৈরি করা বিশেষ সুবিধা দিতে পারে, তবে শুধু নিয়মিত অনুশীলন ও বাস্তব ব্যবহারের মাধ্যমেই ইংরেজির দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। তাই ইংরেজি শেখাকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলা প্রয়োজন। ছোটবেলা থেকেই যদি শিশুরা ইংরেজি চর্চা করার একটি সহজ ও সাবলীল পরিবেশ পায়, তাহলে ভাষাটি তাদের কাছে ভয়ের বিষয় না হয়ে পরিচিত ও ব্যবহারযোগ্য একটি দক্ষতায় পরিণত হবে।
*লেখক: ফাহিম শাহরিয়ার, আইইএলটিএস ট্রেইনার






















