‘ওদের নিয়েই বাঁচতাম, ওরা কোথায় হারিয়ে গেল’
- আপডেট সময় : ১০:৪৪:১০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

‘ওরা খুব সুখী ছিল। একদম ফুলের মতো। ওদের দিকে তাকালে তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছা করবে শুধু,’ কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন স্কুলশিক্ষক ফারজানা মতিন। ছোট বোন, বোনজামাই আর দুই ভাগনির কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিল তাঁর কণ্ঠ।
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতে কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নিখোঁজ তাঁরা চারজন। তাঁদের কী হয়েছে, এখনো জানেন না স্বজনেরা।
সাতক্ষীরার বাসিন্দা ফারজানা মতিনের ছোট বোন আফসানা মতিন তানজি (৩৬), বোনজামাই নাহিদুর রহমান (৪১) এবং তাঁদের দুই মেয়ে রুজাইনা ইনায়া (৬) ও সুনাইনা ইহানা (৩) টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নিখোঁজ। স্বজনেরা তাঁদের মৃত্যুর আশঙ্কা করছেন। তবে গতকাল শনিবার রাত পর্যন্ত নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।
গতকাল সকাল সাড়ে সাতটার দিকে রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। এতে ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিকভাবে আটজনের পরিচয় অনুমান করা গেছে। তাঁদের মধ্যে ছয়জন একই পরিবারের সদস্য। তবে ওই আটজনের মধ্যে আফসানা, নাহিদ ও তাঁদের দুই মেয়ের নাম নেই।
কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) ফিরোজ কবির আজ রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ‘কারোর পরিচয়ই আসলে নিশ্চিত হয়নি। ডিএনএ টেস্টের আগে সেটা সম্ভবও নয়। যাদের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো পরিবারের দাবি। সবার পরিচয় নিশ্চিত হতে কিছুটা সময় লাগবে।’
গতকাল রাতে মুঠোফোনে ফারজানা মতিন প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল দুপুরের দিকে ফেসবুকে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের খবর দেখেন তিনি। খবরের সঙ্গে ছোট বোনের পরিবারের বেড়াতে যাওয়ার বিবরণ মিলে যাওয়ায় তাঁর মনে সন্দেহ জাগে। এর আগেই সকাল সাতটার দিক থেকে নাহিদ ও আফসানার মুঠোফোন বন্ধ পাচ্ছিলেন পরিবারের সদস্যরা।
ফারজানা আরও বলেন, ‘আমার বোনজামাই তো মোবাইল বন্ধ রাখে না। ও অফিসের কাজে গেলেও ফোন বন্ধ রাখার ছেলে নয়। সকাল সাতটা থেকে দুজনের ফোন বন্ধ। তখন থেকেই আমার মনে হচ্ছিল, ওরা কোনো বিপদে পড়েছে।’
প্রথমে পরিবারের সদস্যরা ভেবেছিলেন, হয়তো বেড়াতে গিয়ে কোথাও ব্যস্ত আছেন নাহিদ ও আফসানা। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের খবর জানার পর উদ্বেগ বাড়তে থাকে। আত্মীয়স্বজনকে ফোন করেন ফারজানা। কক্সবাজারে পরিচিতজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ফায়ার সার্ভিস ও হাসপাতালে খোঁজ নেওয়া হয়। আহত ও নিহত ব্যক্তিদের তালিকায় খোঁজা হয় চারজনের নাম। কিন্তু কোথাও তাঁদের বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না।
পরে ইন্টারনেটে রিসোর্টের নথি থেকে নাহিদুর রহমানের নাম ও মুঠোফোন নম্বরের তথ্য পান তাঁদের বন্ধুরা। সেই তথ্য ফারজানার কাছেও পাঠানো হয়। রিসোর্টে তাঁদের অবস্থানের তথ্য মিললেও চারজনের পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ফারজানা বলেন, খবর পাওয়ার পর তাঁর পরিবারের সদস্যরা কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। নাহিদের ভাই ও বন্ধুরাও সেখানে যাচ্ছেন।
নাহিদুর রহমান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপণন বিভাগে চাকরি করতেন। স্ত্রী আফসানা মতিন ও দুই মেয়েকে নিয়ে ঢাকার মোহাম্মদপুরে থাকতেন তিনি। গত শুক্রবার সকালে কক্সবাজারে পৌঁছে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। আফসানা তাঁর মায়ের কাছে রিসোর্টটির বর্ণনাও দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, দোতলা কাঠের তৈরি রিসোর্টটির এক বারান্দা থেকে সমুদ্র দেখা যায়, অন্যটি থেকে পাহাড়। সকালের নাশতায় বুফের ব্যবস্থাও আছে।
বেড়াতে গিয়ে রিসোর্টের এমন বিবরণ পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন আফসানা। অথচ সেই ভ্রমণের পর এখন আর তাঁর বা পরিবারের অন্য তিন সদস্যের কোনো খোঁজ নেই।
কথা বলতে বলতে বারবার দুই ভাগনির প্রসঙ্গে ফিরে যাচ্ছিলেন ফারজানা। রুজাইনা ইনায়ার বয়স ছয় বছর আর সুনাইনা ইহানার তিন। দুই শিশুকে ঘিরেই দুই পরিবারের আনন্দ।
ফারজানা বলেন, ‘ওরা সকাল-সন্ধ্যা ভিডিও কলে কথা বলত। ওই দুই মেয়েকে নিয়ে আমাদের কত আনন্দ! আমরা তো ওদের নিয়েই বাঁচতাম।’
কথা বলতে বলতে আবারও কেঁদে ফেলেন ফারজানা। দুই শিশুর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা, তাদের হাসিমুখ—সবকিছুই এখন স্মৃতি আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফারজানা বলেন, ‘ওরা কোথায় হারিয়ে গেল। ওদের কি আর ফিরে পাব না?’




















