ঢাকা ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যে সেলিব্রিটিকে কখনো দেখিনি, তাঁর জীবন নিয়ে এত আগ্রহ কেন

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:২০:৩২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

তুমি হয়তো কোনো গায়ক বা অভিনেতার ভীষণ ভক্ত। তাঁর নতুন গান বের হলে সবার আগে শুনতে চাও। তিনি কী খান, কোথায় ঘুরতে যান, কার সঙ্গে ঘুরতে যাচ্ছেন—এসব জানতেও তোমার বেশ আগ্রহ। এমনকি তিনি বিয়ে করলে বা কারও সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হলে তোমার মনেও নানা প্রশ্ন জাগে। আবার কোনো তারকার সঙ্গে অন্য তারকার ঝগড়া হয়েছে শুনলে কী নিয়ে ঝগড়া, তা জানার জন্য অস্থির হয়ে পড়ো।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই মানুষদের অনেককেই তুমি কোনো দিন সামনাসামনি দেখোনি। তাঁরা তোমাকে চেনেনও না। অথচ তাঁদের জীবনের ছোটখাটো ঘটনাও তোমার কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ!

কেন এমন হয়? যাঁকে চেনোই না, তাঁর জীবনের এত খবর জানতে ইচ্ছা করে কেন? মনোবিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। তাঁদের গবেষণা বলছে, কাউকে বারবার দেখলে বা তার কথা শুনলে আমাদের মনে এমন একটা অনুভূতি তৈরি হতে পারে যেন মানুষটিকে আমরা বেশ ভালোভাবেই চিনি। অথচ বাস্তবে তার সঙ্গে আমাদের কোনো পরিচয়ই নেই!

ধরো, তুমি নিয়মিত একজন ইউটিউবারের ভিডিও দেখো। সে কীভাবে দিন শুরু করে, কী খেতে পছন্দ করে, কোথায় ঘুরতে যায়; এসব তুমি তার ভিডিও থেকে জানতে পারো। কয়েক মাস পর হয়তো তার কথা বলার ধরন, পছন্দ-অপছন্দ, এমনকি মন খারাপের কারণও তোমার চেনা চেনা লাগে। মনে হতে পারে, মানুষটাকে তুমি অনেক দিন ধরে চেনো।

কিন্তু ওই ইউটিউবার তোমার নাম জানেন না। তুমি তাঁর কোন ভিডিও দেখেছ, সেটাও হয়তো তাঁর জানা নেই। তোমাদের মধ্যে বন্ধুত্বের মতো একটা অনুভূতি তৈরি হলেও সম্পর্কটা আসলে একতরফা।

মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের সম্পর্ককে বলা হয় প্যারাসোশ্যাল সম্পর্ক। সহজ করে বললে, এমন একজন মানুষের সঙ্গে মনের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হওয়া, যিনি তোমাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না।

১৯৫০-এর দশকে গবেষক ডোনাল্ড হর্টন ও রিচার্ড ওল এ ধারণা নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁদের থেকে জানা যায়, কোনো মানুষকে বারবার দেখলে তার প্রতি আমাদের পরিচিতির অনুভূতি বাড়তে পারে। সে নিজের কথা যত বেশি জানায়, আমাদের মনে তাকে কাছের মানুষ বলে ভাবার প্রবণতাও তত বাড়তে পারে।

এ কারণেই প্রিয় কোনো তারকার সাক্ষাৎকার দেখতে তোমার ভালো লাগে। তিনি কী ভাবছেন, কী পছন্দ করেন, কোন বিষয় নিয়ে চিন্তা করেন; সবকিছু জানতে জানতে মনে হতে পারে, তুমি যেন তাঁর মনের অনেক খবরই জানো।

আগে কোনো তারকার খবর জানতে হলে পত্রিকা বা ম্যাগাজিন পড়তে হতো। টেলিভিশনে তাঁর সাক্ষাৎকার দেখার সুযোগও সব সময় পাওয়া যেত না। কিন্তু এখন? তোমার হাতে থাকা ফোনেই তারকার জীবনের নানা খবর চলে আসে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রিয় অভিনেতা কী খেলেন, দুপুরে কোথায় গেলেন, ছুটিতে কার সঙ্গে ঘুরতে গেলেন, জন্মদিনে কী উপহার পেলেন—সবই হয়তো তুমি তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় দেখতে পাও। কেউ নতুন প্রেমের কথা জানান, কেউ বিয়ের খবর দেন, কেউ আবার মনখারাপের কথা লেখেন। পোষা কুকুরের ছবি থেকে শুরু করে বিদেশভ্রমণের ভিডিও–ছবিও যেন বাদ থাকে না!

এত ব্যক্তিগত কথা তারকারা কেন শেয়ার করেন? এর একটা কারণ হতে পারে, নিজের জীবনের কথা অন্যকে জানালে মানুষের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। আমরা যখন কারও আনন্দ, দুঃখ বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা শুনি, তখন তাকে আগের চেয়ে কাছের মানুষ বলে মনে হতে পারে।

গবেষক জিহিউন কিম ও হাইয়ন সং টুইটারে তারকাদের অনুসরণ করেন, এমন ৪২৯ জনের ওপর গবেষণা করেছিলেন। তাঁরা দেখেন, তারকারা নিজেদের কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের কথাও শেয়ার করলে অনুসারীদের মনে তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি বাড়ে। মনে হয়, তারকাটি যেন তাদের কাছেই আছেন। আর এই অনুভূতি তারকার সঙ্গে সম্পর্ক থাকার ভাবনাকেও আরও জোরালো করে।

বাস্তব জীবনেও এমনটা ঘটে। ধরো, তোমার নতুন এক বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় হলো। প্রথমে শুধু নাম জানলে। পরে জানলে, সে কোন খেলাটা পছন্দ করে, কোন খাবার খেতে ভালোবাসে, কোন বিষয়ে তার ভয় লাগে। ধীরে ধীরে তোমাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হতে পারে। সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি উপায় হলো নিজের কথা জানানো।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারকারাও তাঁদের জীবনের নানা কথা লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। তুমি যখন বিছানায় শুয়ে ফোনে সেই পোস্ট দেখো, তখন সেটি তোমার কাছে আলাদা একটা অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। কারণ, পোস্টটি দেখার সময় তোমার মনে হতে পারে, সেই তারকা যেন সরাসরি তোমার সঙ্গেই কথা বলছেন।

এতক্ষণে হয়তো তোমার মনে হচ্ছে, কাউকে যত বেশি দেখব, তাকে তত বেশি পছন্দ করব। কিন্তু ব্যাপারটা সব সময় এমন নয়।

কাউকে বেশি দেখলে তার এমন অনেক আচরণও চোখে পড়তে পারে, যা তোমার ভালো লাগে না। ধরো, তোমার প্রিয় কোনো গায়ক নিয়মিত নিজের জীবনের নানা কথা শেয়ার করেন। প্রথমে তাঁর খোলামেলা স্বভাব তোমার ভালো লাগল। কিন্তু পরে যদি মনে হয়, তিনি শুধু পণ্য বিক্রি করার জন্যই কথাগুলো বলেন, তাহলে তাঁর প্রতি তোমার আগ্রহ কমে যেতে পারে।

কখনো কখনো ভক্তরা প্রিয় তারকার ওপর এত বিরক্ত হন যে তাঁর সমালোচনা করতে শুরু করেন। মজার ব্যাপার হলো, তাঁরা কিন্তু সব সময় তারকাটিকে অনুসরণ করা বন্ধ করেন না। বরং তাঁর নতুন পোস্ট দেখেন, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেন, এমনকি সমালোচনাও করেন।

বিপণন নিয়ে গবেষণা করেন রেবেকা মার্ডন ও তাঁর সহকর্মীরা। তাঁরা দেখেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু তারকার সাবেক ভক্ত পরে তাঁদের কড়া সমালোচক হয়ে উঠেছেন। আগে যে ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি ছিল, তা কমে গেলে বা তারকার আচরণকে ব্যবসার কৌশল বলে মনে হলে এমনটা ঘটতে পারে।

অর্থাৎ কাউকে কাছের মানুষ বলে মনে হওয়া আর তাঁকে পছন্দ করা এক কথা নয়। তুমি কাউকে খুব পছন্দ করেও তাঁর খবর রাখতে পারো। আবার কাউকে অপছন্দ করেও তাঁর নতুন পোস্ট দেখার জন্য অপেক্ষা করতে পারো!

এবার ভাবো, কোনো তারকার পোস্টে তুমি নিয়মিত লাইক দাও, মন্তব্য করো, ভিডিও দেখো। তাঁর নতুন কোনো পণ্য বা পছন্দের জিনিসের কথা শুনে তোমারও সেটি কিনতে ইচ্ছা হলো। হয়তো আগে জিনিসটি কেনার কথা তোমার মনেই আসেনি। কিন্তু তারকার কথা শুনে মনে হলো, তোমারও এটি দরকার।

বিজ্ঞাপনদাতা ও বিপণনকর্মীরা জানেন, মানুষ যাঁদের বিশ্বাস করে বা কাছের মানুষ বলে ভাবে, তাঁদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারকাদের সঙ্গে মানুষের এ সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হয়, তা নিয়ে তাঁদের আগ্রহ অনেক।

বিপণন গবেষক লরেন ল্যাব্রেকের গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইনে কোনো ব্র্যান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ যদি ব্যক্তিগত, খোলামেলা ও আন্তরিক বলে মনে হয়, তাহলে মানুষের সঙ্গে সেই ব্র্যান্ডের সম্পর্কের অনুভূতি তৈরি হতে পারে। এতে মানুষ ব্র্যান্ডটির প্রতি আরও অনুগত হতে পারে এবং তার সঙ্গে বেশি যোগাযোগ রাখতে চাইতে পারে।

তুমি হয়তো সকালে নাশতা করতে করতে একজন তারকার পরিবারের ছবি দেখলে। অন্য দিন দেখলে, তিনি কোথায় বেড়াতে গেছেন। আরেক দিন দেখলে, তাঁর মন খারাপ। প্রতিটি পোস্ট আলাদা ঘটনা হলেও সব মিলিয়ে তোমার মনে মানুষটিকে চেনার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এ অনুভূতির মূল্য বোঝে। কারণ, কাউকে কাছের মানুষ মনে হলে তাঁর কথা বিশ্বাস করার বা তার পরামর্শে কোনো কিছু কেনার সম্ভাবনা বাড়ে। ফলে তোমার মনোযোগও ব্যবসার অংশ হয়ে ওঠে। তুমি যত বেশি সময় পোস্ট দেখো, ভিডিও চালাও, পছন্দের তারকার কথা শোনো; তত বেশি সুযোগ তৈরি হয় তোমার কাছে কোনো পণ্য তুলে ধরার।

এর মানে অবশ্য এই নয় যে সব তারকাই শুধু পণ্য বিক্রি করার জন্য নিজেদের জীবনের কথা বলেন। কেউ নিজের কাজের খবর দিতে চান, কেউ ভক্তদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে চান। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত জীবনের গল্প অনেক সময় ব্যবসার কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

একেবারেই না! প্রিয় গায়ক বা অভিনেতার খবর জানতে ভালো লাগতেই পারে। কোনো খেলোয়াড়ের সাফল্যে আনন্দ পাওয়া কিংবা কোনো লেখকের নতুন বইয়ের অপেক্ষা করাও স্বাভাবিক। মানুষের গল্প জানতে আমাদের ভালো লাগে। আর যাঁদের বারবার দেখি, তাঁদের গল্পের প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়।

সমস্যা হয় যখন আমরা ভুলে যাই যে পর্দায় দেখা মানুষটির সঙ্গে আমাদের বাস্তব সম্পর্ক নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা তাঁর জীবনের কিছু অংশ দেখিমাত্র। তাঁর প্রতিদিনের সব কথা বা অনুভূতি আমাদের জানা নেই। তাই তাঁর সম্পর্কে যা দেখি, তার সবকিছুকেই পুরো সত্যি বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

আর কোনো তারকার কথা শুনে কিছু কিনতে ইচ্ছা হলে নিজেকে একটা প্রশ্ন করতে পারো, জিনিসটা কি সত্যিই আমার দরকার, নাকি প্রিয় মানুষটি ব্যবহার করছেন বলেই আমার কিনতে ইচ্ছা করছে?

তোমার সময় ও মনোযোগেরও মূল্য আছে। তুমি কাকে অনুসরণ করবে, কার কথা শুনবে, কোন পোস্টে সময় দেবে, তা তোমার সিদ্ধান্ত। শুধু এটুকু মাথায় রাখলেই চলবে যে তোমার মনে ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি তৈরি হয় কীভাবে, তা বোঝার জন্য অনেক মানুষ গবেষণা করছেন। আর সেই অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে তোমার কাছে পণ্য বিক্রি করার চেষ্টা করছে নানা প্রতিষ্ঠান।

তাই তারকাদের বিয়ে, নতুন সন্তান, প্রেম, বিচ্ছেদ কিংবা ঝগড়ার খবর দেখতে কোনো দোষ নেই। দেখতে দেখতে কখন যে এক ঘণ্টা কেটে গেল, সেটা শুধু খেয়াল রেখো! আর একটা জিনিস মনে রাখা দরকার, যাঁর জীবনের খবর তুমি এত আগ্রহ নিয়ে পড়ছ, তিনি হয়তো তোমার অস্তিত্ব সম্পর্কেই জানেন না।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

যে সেলিব্রিটিকে কখনো দেখিনি, তাঁর জীবন নিয়ে এত আগ্রহ কেন

আপডেট সময় : ০৭:২০:৩২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

তুমি হয়তো কোনো গায়ক বা অভিনেতার ভীষণ ভক্ত। তাঁর নতুন গান বের হলে সবার আগে শুনতে চাও। তিনি কী খান, কোথায় ঘুরতে যান, কার সঙ্গে ঘুরতে যাচ্ছেন—এসব জানতেও তোমার বেশ আগ্রহ। এমনকি তিনি বিয়ে করলে বা কারও সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হলে তোমার মনেও নানা প্রশ্ন জাগে। আবার কোনো তারকার সঙ্গে অন্য তারকার ঝগড়া হয়েছে শুনলে কী নিয়ে ঝগড়া, তা জানার জন্য অস্থির হয়ে পড়ো।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই মানুষদের অনেককেই তুমি কোনো দিন সামনাসামনি দেখোনি। তাঁরা তোমাকে চেনেনও না। অথচ তাঁদের জীবনের ছোটখাটো ঘটনাও তোমার কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ!

কেন এমন হয়? যাঁকে চেনোই না, তাঁর জীবনের এত খবর জানতে ইচ্ছা করে কেন? মনোবিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। তাঁদের গবেষণা বলছে, কাউকে বারবার দেখলে বা তার কথা শুনলে আমাদের মনে এমন একটা অনুভূতি তৈরি হতে পারে যেন মানুষটিকে আমরা বেশ ভালোভাবেই চিনি। অথচ বাস্তবে তার সঙ্গে আমাদের কোনো পরিচয়ই নেই!

ধরো, তুমি নিয়মিত একজন ইউটিউবারের ভিডিও দেখো। সে কীভাবে দিন শুরু করে, কী খেতে পছন্দ করে, কোথায় ঘুরতে যায়; এসব তুমি তার ভিডিও থেকে জানতে পারো। কয়েক মাস পর হয়তো তার কথা বলার ধরন, পছন্দ-অপছন্দ, এমনকি মন খারাপের কারণও তোমার চেনা চেনা লাগে। মনে হতে পারে, মানুষটাকে তুমি অনেক দিন ধরে চেনো।

কিন্তু ওই ইউটিউবার তোমার নাম জানেন না। তুমি তাঁর কোন ভিডিও দেখেছ, সেটাও হয়তো তাঁর জানা নেই। তোমাদের মধ্যে বন্ধুত্বের মতো একটা অনুভূতি তৈরি হলেও সম্পর্কটা আসলে একতরফা।

মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের সম্পর্ককে বলা হয় প্যারাসোশ্যাল সম্পর্ক। সহজ করে বললে, এমন একজন মানুষের সঙ্গে মনের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হওয়া, যিনি তোমাকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না।

১৯৫০-এর দশকে গবেষক ডোনাল্ড হর্টন ও রিচার্ড ওল এ ধারণা নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁদের থেকে জানা যায়, কোনো মানুষকে বারবার দেখলে তার প্রতি আমাদের পরিচিতির অনুভূতি বাড়তে পারে। সে নিজের কথা যত বেশি জানায়, আমাদের মনে তাকে কাছের মানুষ বলে ভাবার প্রবণতাও তত বাড়তে পারে।

এ কারণেই প্রিয় কোনো তারকার সাক্ষাৎকার দেখতে তোমার ভালো লাগে। তিনি কী ভাবছেন, কী পছন্দ করেন, কোন বিষয় নিয়ে চিন্তা করেন; সবকিছু জানতে জানতে মনে হতে পারে, তুমি যেন তাঁর মনের অনেক খবরই জানো।

আগে কোনো তারকার খবর জানতে হলে পত্রিকা বা ম্যাগাজিন পড়তে হতো। টেলিভিশনে তাঁর সাক্ষাৎকার দেখার সুযোগও সব সময় পাওয়া যেত না। কিন্তু এখন? তোমার হাতে থাকা ফোনেই তারকার জীবনের নানা খবর চলে আসে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রিয় অভিনেতা কী খেলেন, দুপুরে কোথায় গেলেন, ছুটিতে কার সঙ্গে ঘুরতে গেলেন, জন্মদিনে কী উপহার পেলেন—সবই হয়তো তুমি তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় দেখতে পাও। কেউ নতুন প্রেমের কথা জানান, কেউ বিয়ের খবর দেন, কেউ আবার মনখারাপের কথা লেখেন। পোষা কুকুরের ছবি থেকে শুরু করে বিদেশভ্রমণের ভিডিও–ছবিও যেন বাদ থাকে না!

এত ব্যক্তিগত কথা তারকারা কেন শেয়ার করেন? এর একটা কারণ হতে পারে, নিজের জীবনের কথা অন্যকে জানালে মানুষের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। আমরা যখন কারও আনন্দ, দুঃখ বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা শুনি, তখন তাকে আগের চেয়ে কাছের মানুষ বলে মনে হতে পারে।

গবেষক জিহিউন কিম ও হাইয়ন সং টুইটারে তারকাদের অনুসরণ করেন, এমন ৪২৯ জনের ওপর গবেষণা করেছিলেন। তাঁরা দেখেন, তারকারা নিজেদের কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের কথাও শেয়ার করলে অনুসারীদের মনে তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি বাড়ে। মনে হয়, তারকাটি যেন তাদের কাছেই আছেন। আর এই অনুভূতি তারকার সঙ্গে সম্পর্ক থাকার ভাবনাকেও আরও জোরালো করে।

বাস্তব জীবনেও এমনটা ঘটে। ধরো, তোমার নতুন এক বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় হলো। প্রথমে শুধু নাম জানলে। পরে জানলে, সে কোন খেলাটা পছন্দ করে, কোন খাবার খেতে ভালোবাসে, কোন বিষয়ে তার ভয় লাগে। ধীরে ধীরে তোমাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হতে পারে। সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি উপায় হলো নিজের কথা জানানো।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারকারাও তাঁদের জীবনের নানা কথা লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। তুমি যখন বিছানায় শুয়ে ফোনে সেই পোস্ট দেখো, তখন সেটি তোমার কাছে আলাদা একটা অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। কারণ, পোস্টটি দেখার সময় তোমার মনে হতে পারে, সেই তারকা যেন সরাসরি তোমার সঙ্গেই কথা বলছেন।

এতক্ষণে হয়তো তোমার মনে হচ্ছে, কাউকে যত বেশি দেখব, তাকে তত বেশি পছন্দ করব। কিন্তু ব্যাপারটা সব সময় এমন নয়।

কাউকে বেশি দেখলে তার এমন অনেক আচরণও চোখে পড়তে পারে, যা তোমার ভালো লাগে না। ধরো, তোমার প্রিয় কোনো গায়ক নিয়মিত নিজের জীবনের নানা কথা শেয়ার করেন। প্রথমে তাঁর খোলামেলা স্বভাব তোমার ভালো লাগল। কিন্তু পরে যদি মনে হয়, তিনি শুধু পণ্য বিক্রি করার জন্যই কথাগুলো বলেন, তাহলে তাঁর প্রতি তোমার আগ্রহ কমে যেতে পারে।

কখনো কখনো ভক্তরা প্রিয় তারকার ওপর এত বিরক্ত হন যে তাঁর সমালোচনা করতে শুরু করেন। মজার ব্যাপার হলো, তাঁরা কিন্তু সব সময় তারকাটিকে অনুসরণ করা বন্ধ করেন না। বরং তাঁর নতুন পোস্ট দেখেন, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেন, এমনকি সমালোচনাও করেন।

বিপণন নিয়ে গবেষণা করেন রেবেকা মার্ডন ও তাঁর সহকর্মীরা। তাঁরা দেখেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু তারকার সাবেক ভক্ত পরে তাঁদের কড়া সমালোচক হয়ে উঠেছেন। আগে যে ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি ছিল, তা কমে গেলে বা তারকার আচরণকে ব্যবসার কৌশল বলে মনে হলে এমনটা ঘটতে পারে।

অর্থাৎ কাউকে কাছের মানুষ বলে মনে হওয়া আর তাঁকে পছন্দ করা এক কথা নয়। তুমি কাউকে খুব পছন্দ করেও তাঁর খবর রাখতে পারো। আবার কাউকে অপছন্দ করেও তাঁর নতুন পোস্ট দেখার জন্য অপেক্ষা করতে পারো!

এবার ভাবো, কোনো তারকার পোস্টে তুমি নিয়মিত লাইক দাও, মন্তব্য করো, ভিডিও দেখো। তাঁর নতুন কোনো পণ্য বা পছন্দের জিনিসের কথা শুনে তোমারও সেটি কিনতে ইচ্ছা হলো। হয়তো আগে জিনিসটি কেনার কথা তোমার মনেই আসেনি। কিন্তু তারকার কথা শুনে মনে হলো, তোমারও এটি দরকার।

বিজ্ঞাপনদাতা ও বিপণনকর্মীরা জানেন, মানুষ যাঁদের বিশ্বাস করে বা কাছের মানুষ বলে ভাবে, তাঁদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারকাদের সঙ্গে মানুষের এ সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হয়, তা নিয়ে তাঁদের আগ্রহ অনেক।

বিপণন গবেষক লরেন ল্যাব্রেকের গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইনে কোনো ব্র্যান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ যদি ব্যক্তিগত, খোলামেলা ও আন্তরিক বলে মনে হয়, তাহলে মানুষের সঙ্গে সেই ব্র্যান্ডের সম্পর্কের অনুভূতি তৈরি হতে পারে। এতে মানুষ ব্র্যান্ডটির প্রতি আরও অনুগত হতে পারে এবং তার সঙ্গে বেশি যোগাযোগ রাখতে চাইতে পারে।

তুমি হয়তো সকালে নাশতা করতে করতে একজন তারকার পরিবারের ছবি দেখলে। অন্য দিন দেখলে, তিনি কোথায় বেড়াতে গেছেন। আরেক দিন দেখলে, তাঁর মন খারাপ। প্রতিটি পোস্ট আলাদা ঘটনা হলেও সব মিলিয়ে তোমার মনে মানুষটিকে চেনার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এ অনুভূতির মূল্য বোঝে। কারণ, কাউকে কাছের মানুষ মনে হলে তাঁর কথা বিশ্বাস করার বা তার পরামর্শে কোনো কিছু কেনার সম্ভাবনা বাড়ে। ফলে তোমার মনোযোগও ব্যবসার অংশ হয়ে ওঠে। তুমি যত বেশি সময় পোস্ট দেখো, ভিডিও চালাও, পছন্দের তারকার কথা শোনো; তত বেশি সুযোগ তৈরি হয় তোমার কাছে কোনো পণ্য তুলে ধরার।

এর মানে অবশ্য এই নয় যে সব তারকাই শুধু পণ্য বিক্রি করার জন্য নিজেদের জীবনের কথা বলেন। কেউ নিজের কাজের খবর দিতে চান, কেউ ভক্তদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে চান। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত জীবনের গল্প অনেক সময় ব্যবসার কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

একেবারেই না! প্রিয় গায়ক বা অভিনেতার খবর জানতে ভালো লাগতেই পারে। কোনো খেলোয়াড়ের সাফল্যে আনন্দ পাওয়া কিংবা কোনো লেখকের নতুন বইয়ের অপেক্ষা করাও স্বাভাবিক। মানুষের গল্প জানতে আমাদের ভালো লাগে। আর যাঁদের বারবার দেখি, তাঁদের গল্পের প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়।

সমস্যা হয় যখন আমরা ভুলে যাই যে পর্দায় দেখা মানুষটির সঙ্গে আমাদের বাস্তব সম্পর্ক নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা তাঁর জীবনের কিছু অংশ দেখিমাত্র। তাঁর প্রতিদিনের সব কথা বা অনুভূতি আমাদের জানা নেই। তাই তাঁর সম্পর্কে যা দেখি, তার সবকিছুকেই পুরো সত্যি বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

আর কোনো তারকার কথা শুনে কিছু কিনতে ইচ্ছা হলে নিজেকে একটা প্রশ্ন করতে পারো, জিনিসটা কি সত্যিই আমার দরকার, নাকি প্রিয় মানুষটি ব্যবহার করছেন বলেই আমার কিনতে ইচ্ছা করছে?

তোমার সময় ও মনোযোগেরও মূল্য আছে। তুমি কাকে অনুসরণ করবে, কার কথা শুনবে, কোন পোস্টে সময় দেবে, তা তোমার সিদ্ধান্ত। শুধু এটুকু মাথায় রাখলেই চলবে যে তোমার মনে ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি তৈরি হয় কীভাবে, তা বোঝার জন্য অনেক মানুষ গবেষণা করছেন। আর সেই অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে তোমার কাছে পণ্য বিক্রি করার চেষ্টা করছে নানা প্রতিষ্ঠান।

তাই তারকাদের বিয়ে, নতুন সন্তান, প্রেম, বিচ্ছেদ কিংবা ঝগড়ার খবর দেখতে কোনো দোষ নেই। দেখতে দেখতে কখন যে এক ঘণ্টা কেটে গেল, সেটা শুধু খেয়াল রেখো! আর একটা জিনিস মনে রাখা দরকার, যাঁর জীবনের খবর তুমি এত আগ্রহ নিয়ে পড়ছ, তিনি হয়তো তোমার অস্তিত্ব সম্পর্কেই জানেন না।