দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি হচ্ছে আজ
- আপডেট সময় : ০৩:০০:৩০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুরু হওয়া চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারার প্রক্রিয়া গতি পেয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। সেই ধারাবাহিকতায় এখন নির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি হচ্ছে।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা তিনটায় ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ মিলনায়তনে এই চুক্তি সই হওয়ার কথা। চুক্তি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড ১৫ বছর টার্মিনালটি পরিচালনা করবে। ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে মাশুলও আদায় করবে প্রতিষ্ঠানটি। বিনিময়ে বন্দর কর্তৃপক্ষকে এককালীন অর্থ ও কনটেইনারপ্রতি মাশুল দেবে। তবে চুক্তির কোনো তথ্য এখনো প্রকাশ করেনি সরকার।
চুক্তি হলে এনসিটি হবে বিদেশি অপারেটরের কাছে দেওয়া চট্টগ্রাম বন্দরের তৃতীয় কনটেইনার টার্মিনাল। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্মিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পায় সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান আরএসজিটি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে লালদিয়ায় কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য নিয়োগ পায় ডেনমার্কের মায়ের্সকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস। একই সময়ে কেরানীগঞ্জের পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল সুইজারল্যান্ডের মেডলগের কাছে ইজারা দেওয়া হয়। বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দেওয়া টার্মিনালের বাইরে বন্দরে দুটি টার্মিনাল আছে, যেগুলো এখনো দেশীয় অপারেটররা পরিচালনা করছে।
২০০৭ সালে নির্মাণকাজ শেষ হওয়া প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ নিউমুরিং টার্মিনালে একসঙ্গে চারটি সমুদ্রগামী ও একটি ছোট কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানো যায়। নির্মাণের পর প্রথমে আংশিক ও পরে পুরোদমে টার্মিনালটি চালু হয়। দেশীয় অপারেটরদের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। টার্মিনালটিতে মূলত জাহাজে রপ্তানি কনটেইনার তোলা এবং জাহাজ থেকে আমদানি কনটেইনার নামানো হয়।
২০০৮ সালে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে টার্মিনালটিতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয় বিশ্বের চারটি শীর্ষ বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে। তালিকায় ছিল যুক্তরাজ্যের পিঅ্যান্ডও, যেটি ডিপি ওয়ার্ল্ড অধিগ্রহণ করেছিল। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ওই নিয়োগপ্রক্রিয়া বাতিল হয়।
এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই টার্মিনালটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু হয়। ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি আবুধাবিতে সই হয় একটি সমঝোতা স্মারক। দুবাই সরকার ও বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষের (পিপিপি কর্তৃপক্ষ) মধ্যে এ সমঝোতা হয়। ২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের মাধ্যমে এনসিটি ইজারা দেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়।
২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এই সরকারের সময় ইজারার প্রক্রিয়া গতি পায়। সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হয়। এরপর শুরু হয় দর-কষাকষি। এ বছরের ২৭ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দর-কষাকষি চলে।
অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তির প্রস্তুতি এগিয়ে নিলেও এ সময় বন্দরে শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়। পরে ৮ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক চৌধুরী জানান, ডিপি ওয়ার্ল্ড খসড়া চুক্তি পর্যালোচনার জন্য সময় চেয়েছে। সরকারের মেয়াদও আর মাত্র দুই কার্যদিবস বাকি। ফলে ওই সময়ের মধ্যে চুক্তি হচ্ছে না।
গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থগিত হওয়া ইজারার প্রক্রিয়া আবার এগোতে থাকে। গত ৮ এপ্রিল দুই পক্ষের যৌথ প্ল্যাটফর্মের সভার পর ডিপি ওয়ার্ল্ড নতুন করে প্রস্তাব দেয়। সেই প্রস্তাবের কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন শেষে দর-কষাকষি চূড়ান্ত হয়। ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি টার্মিনালটি ১৫ বছরের জন্য বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালনার রেয়াতি চুক্তির খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এনসিটি ইজারার বিরুদ্ধে বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ব্যানারে আন্দোলন শুরু হলে বন্দরে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। সে সময় নির্বাচিত সরকারের অধীনে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি ওঠে। এখন নির্বাচিত সরকারের আমলেও ইজারার বিরুদ্ধে বন্দর রক্ষা আন্দোলনের ব্যানারে সরব শ্রমিক-কর্মচারীরা। গত সোমবার এক অবস্থান কর্মসূচিতে বন্দর রক্ষা আন্দোলনের নেতারা হুঁশিয়ারি দেন, এনসিটি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বাতিল না হলে বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল বুধবার বন্দর এলাকায় মশাল মিছিল হয়েছে।
গত অর্থবছরে নিউমুরিং টার্মিনালে প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়েছে। এটি বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ। ডিপি ওয়ার্ল্ড দায়িত্ব নিলে কনটেইনার পরিবহন কতটা বাড়বে, তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে।
ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের শীর্ষ ১০ বন্দর অপারেটরের একটি হলেও এনসিটির সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিষ্ঠানটিকে অবকাঠামো খাতে নতুন বিনিয়োগ করতে হবে বলে মনে করেন বন্দর পর্ষদের সাবেক সদস্য জাফর আলম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড অনেক আগেই অবকাঠামো খাতে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল।
এনসিটির সুফল পেতে টার্মিনালের পাশাপাশি বন্দর থেকে কনটেইনার আনা-নেওয়ার পথে এখন ডিপি ওয়ার্ল্ডকে অবকাঠামো উন্নয়নেও বিনিয়োগ করতে হবে। এ জন্য উৎপাদন অঞ্চলের কাছে প্রস্তাবিত ধীরাশ্রম অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) ও তার সঙ্গে রেল যোগাযোগে বিনিয়োগ করা দরকার। এতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনদক্ষতা বাড়বে এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যেও সুফল আসবে।

















