ভিডিও নিউজে ১৫০ কোটি টাকার অভিযোগ অনুসন্ধানে মিলল না দালিলিক প্রমাণ-ব্রি বলছে অপপ্রচার
- আপডেট সময় : ০৭:০৮:০৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৫৬ বার পড়া হয়েছে

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও ঘিরে আলোচনার জন্ম দিয়েছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। ‘অগ্রযাত্রা প্রতিদিন এক্সক্লুসিভ ’ নামের একটি অনলাইন গণমাধ্যমের পরিচয়ে সাঈদুর রহমান নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে প্রকাশিত ওই ভিডিওতে ব্রির নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান আলীর বিরুদ্ধে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার টেন্ডার বাণিজ্য ও নানা অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে অনুসন্ধানে নামে দৈনিক জনকণ্ঠের প্রতিবেদক। অনুসন্ধানে ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, উপস্থাপক মৌখিক বক্তব্যে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করলেও কোনো দালিলিক প্রমাণ, সরকারি নথি, স্মারক নম্বর, আর্থিক লেনদেনের হিসাব, ছবি কিংবা ভিডিও ফুটেজ উপস্থাপন করেননি। পুরো ভিডিওজুড়েই ছিল একতরফা বর্ণনা ও অভিযোগ। ভিডিওতে দাবি করা হয়, সুমি ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড কনষ্ট্রাশন ও মা এন্টারপ্রাইজ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই কথিত টেন্ডার বাণিজ্য সংঘটিত হয়েছে।

এ বিষয়ে আজ বৃহস্পতিবার ব্রির নির্বাহী প্রকৌশলী মো: হাসান আলীর সঙ্গে কথা হলে তিনি অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, একটি মহল পরিকল্পিতভাবে ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে তার বিরুদ্ধে মানহানির চেষ্টা করছে এবং বাস্তবে এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। ভিডিওতে উত্থাপিত অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রকৃত তথ্য তুলে ধরে মো: হাসান আলী জানান, সুমি ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড কনষ্ট্রাশন এককভাবে কোনো কাজ পায়নি। ২০২৪–২০২৫ অর্থবছরে ১২.২২.০০০০.০০০.৭৯.০০১.২৩.৯ স্মারকে সুমি ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড কনষ্ট্রাশন ও মেসার্স প্রবাল ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে (জয়েন্ট ভেঞ্চার) একটি কাজ পেয়ে থাকে, যার কার্যাদেশের মূল্য ১১ কোটি ২৫ লাখ ১৮ হাজার ৮৭ টাকা এবং কাজটি বর্তমানে চলমান রয়েছে। এছাড়া ২০২৩–২০২৪ অর্থবছরে ১২.২২.০০০০.০০০.৭৯.০০১.২৩.৫ মা এন্টারপ্রাইজকে দুটি সীড স্টোরেজ ভবন নির্মাণের জন্য মোট ২ কোটি ৫২ লাখ ১৩ হাজার ৪৬৮ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়, যা ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে কাজটি সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই দুই প্রতিষ্ঠানের মোট কাজের পরিমাণ প্রায় ১৩ কোটি ৭৭ লক্ষ একত্রিশ হাজার পাঁচশত পঞ্চান্ন টাকার মতো, অথচ তার বিরুদ্ধে ১৫০ কোটি টাকার অভিযোগ আনা হয়েছে, যা ডাহা মিথ্যা। সংশ্লিষ্ট সব কাজের দালিলিক প্রমাণ থাকলেও তার সঙ্গে অভিযোগের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই বলেও জানান তিনি। এ সময় তিনি কিছু হলুদ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অভিযোগ তুলে প্রকৃত সাংবাদিকদের সত্য যাচাই করে সংবাদ প্রকাশের আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে ব্রির অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, এই প্রতিবেদন একটি কাল্পনিক ও সাজানো নাটক ছাড়া কিছুই নয় এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এক কর্মকর্তা জানান, মো: হাসান আলীর নেতৃত্বে ইনস্টিটিউটে একের পর এক উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় একাধিক গণ্যমান্য ব্যক্তিও বলেন, মো: হাসান আলী দীর্ঘদিন ধরে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন এবং ইনস্টিটিউটের অবকাঠামোগত উন্নয়নে তার ভূমিকা দৃশ্যমান; তাকে নিয়ে মিথ্যা অপপ্রচার অত্যন্ত দুঃখজনক। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান অভিযোগগুলোকে মানহানিকর ও ভিত্তিহীন উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানান।
তিনি বলেন, কোনো দলিল-দস্তা ছাড়া এ ধরনের অভিযোগ শুধু একজন কর্মকর্তাকে নয়, পুরো প্রতিষ্ঠানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং ব্রির মতো একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান, যা দেশের খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে, তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যারা এ ধরনের অপপ্রচারে লিপ্ত, তাদের তথ্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা জেনে সংবাদ প্রকাশের আহ্বান জানান তিনি। এদিকে ভিডিওটি প্রচারকারী উপস্থাপকের বক্তব্য নেওয়ার জন্য মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য, সরকারি কার্যাদেশের পরিমাণ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভাইরাল ভিডিওতে উত্থাপিত ১৫০ কোটি টাকার টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগের পক্ষে কোনো দৃশ্যমান বা দালিলিক প্রমাণ নেই এবং অভিযোগের অংকের সঙ্গে বাস্তব কাজের পরিমাণের মধ্যে রয়েছে সুস্পষ্ট অমিল।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যাচাই-বাছাই ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এ ধরনের ভিডিও জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করার পাশাপাশি ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে, যা উদ্বেগজনক।

























