ঢাকা ০৩:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কৃষি কর্মকর্তাদের সামনে সার বিক্রিতে অনিয়ম, রেজিস্টারে গরমিল

সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০২:৫৫:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ ৩৭ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে বিসিআইসি অনুমোদিত সার ডিলার শ্রী তমাল চন্দ্র সাহার বিরুদ্ধে। সার মজুদ ও বিতরণ রেজিস্টারেও পাওয়া গেছে গরমিলের অভিযোগ।

কৃষকরা বলছেন, সার মনিটরিং ও সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার উপস্থিতিতেই এসব অনিয়ম ঘটছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী কৃষকরা।

সরেজমিনে গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার ছাপড়হাটী ইউনিয়নের শোভাগঞ্জ বাজারে ‘মেসার্স তমাল চন্দ্র সাহা’ ডিলার পয়েন্টে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ পাওয়া যায়। এ সময় সার কিনতে আসা বেশ কয়েকজন কৃষককে দোকানের আশপাশে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তাদের কেউ কেউ সকাল থেকেই সার সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

এ সময় কথা হয় অপেক্ষমাণ কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে। তারা অভিযোগ করে বলেন, সার নিতে গেলে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও ডিলারের লোকজন সার না দিয়ে নানা অজুহাত দেখান। এ কারণে প্রায়ই সার না পেয়ে বাড়ি ফিরতে হয় তাদের। তবে বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত টাকা দিলে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যায়। তখন আর স্লিপেরও প্রয়োজন হয় না বলে অভিযোগ করেন তারা। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, শোভাগঞ্জ বাজারের ওই ডিলার পয়েন্টে সার বিতরণের চিত্র এমনই।

কৃষকদের অভিযোগ, সার মনিটরিং ও সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাও ডিলার পয়েন্টে উপস্থিত থাকেন। তাদের উপস্থিতিতেই এসব অনিয়ম ঘটছে বলে দাবি স্থানীয়দের। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এমন অভিযোগ ওঠায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।

এ বিষয়ে কথা হয় সার নিতে আসা গংসার হাটের ব্যবসায়ী নয়া মিয়ার (৪৫) সাথে। তিনি বলেন, ‘দুপুর ১২ টার দিকে সার নিতে গিয়েছিলাম। আরও আট দশজন ব্যবসায়ী ছিলাম আমরা। ভ্যানে ভ্যানে সার যাচ্ছে। অথচ বিএস মিজান ওখানে নিজেই উপস্থিত। আমরা চাইলে খালি কয় শেষে নেন। পরে বিকেল ৪ টার দিকে কয় সার আর নাই। পরে হিসাব করি দেখে কাগজ কলমে সার আছে কিন্তু গোডাউনে সার নাই।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, হিসেব করার সময় আমি ওখানে ছিলাম। হিসেবে গরমিল মিলেছে। গত ২৮ তারিখে বিক্রির পর স্টকে টিএসপি ৩৩ বস্তা এবং ডিএপি ৫৬ বস্তার গরমিল মিলেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষুব্ধ এক কৃষক জানান, ‘সরকারী দামে সার কিনতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। বলা হচ্ছে সার নেই। অথচ কৃষি অফিসারের চোখের সামনেই প্রতি বস্তায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে অনেকে ঠিকই সার নিয়ে যাচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দেখেও না দেখার ভান করছেন।’

এ বিষয়ে বিষয়ে কথা হয় ডিলার মনোনীত ম্যানেজার বিধু রঞ্জনের (৪৫) সাথে। অতিরিক্ত দামে কোনো সার বিক্রি করা হয়নি বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, ‘কিছু সার মেমো করা হয়েছে আবার কিছু সার মেমো ছাড়াই ঘর থেকে বের হয়ে গেছে। বিষয়গুলো আমরা বুঝতেই পারিনি। সে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতেই কৃষি স্যার অফিসে ডেকেছেন। সেখানেই আছি৷ ডিলার পয়েন্টে চণ্ডী দা আছেন। তার কাছ থেকেই জেনে নেন বলে ফোন কেটে দেন।’

ডিলার পয়েন্ট বন্ধ করে তার পার্শ্বেই অবস্থান করছিলেন ম্যানেজারের সহযোগী চন্ডী দাস। পরে কথা হয় তার সাথে। অতিরিক্ত মূল্যে কোনো সার বিক্রি করা হয়নি বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, ‘এ তারিখে সার বিক্রির দিন হরিলুট হয়েছে। কে কয়টা বস্তা নিয়ে গেছে কিছুই বুঝতে পারিনি আমরা। এখনো তাদের অনেকেই টাকা পয়সাও দেয়নি আমাদের। লোকসানে আছি আমরা। হরিলুট হওয়ার কারণে সারের হিসাবটা মেলাতে পারেননি বলেও জানান তিনি।’

এ বিষয়ে বিসিআইসি অনুমোদিত সার ডিলার শ্রী তমাল চন্দ্র সাহা মোবাইল ফোনে অভিযোগের বিষয়গুলো শোনা পরে বলেন, ‘আমার ডিলার পয়েন্টে এ ধরনের কোনো ঘটনায় ঘটেনি।’

সংশ্লিষ্ট ডিলার পয়েন্টের সার মনিটরিং ও সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান মন্ডল বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নে ছিলাম কৃষি কার্ডের কাজে। ঠিক সেই মুহুর্তে স্যার আমাকে ফোন দিয়ে ঘটনাস্থলে যেতে বলেন। গিয়ে দেখি একটি ভ্যানে ১০ টি সারের বস্তা। তথন ডিলারকে জিজ্জাসা করি। তখন উনি বলেন ওখানে দুজন কৃষকের সার। এরপর আমি ওখান থেকে চলে আসি।’

মজুদ ও বিতরণ রেজিস্ট্রারে কোনো গরমিল আছে কি না বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গরমিলের বিষয়টি শুনেছি তবে দেখিনি।’

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়গুলো আমি শুনেছি। সংশ্লিষ্ট ডিলারের নিকট থেকে মজুদ স্টক ও বিক্রির স্টক রেজিস্ট্রার বই চেয়েছি। বিতরণে কোনো গরমিল আছে কি না বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য। সত্যতা পেলে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই। আর সারের মজুদ, বিক্রি ও স্টক রেজিস্ট্রারে গরমিল বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত। বিষয়গুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :
   

কৃষি কর্মকর্তাদের সামনে সার বিক্রিতে অনিয়ম, রেজিস্টারে গরমিল

আপডেট সময় : ০২:৫৫:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে বিসিআইসি অনুমোদিত সার ডিলার শ্রী তমাল চন্দ্র সাহার বিরুদ্ধে। সার মজুদ ও বিতরণ রেজিস্টারেও পাওয়া গেছে গরমিলের অভিযোগ।

কৃষকরা বলছেন, সার মনিটরিং ও সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার উপস্থিতিতেই এসব অনিয়ম ঘটছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী কৃষকরা।

সরেজমিনে গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার ছাপড়হাটী ইউনিয়নের শোভাগঞ্জ বাজারে ‘মেসার্স তমাল চন্দ্র সাহা’ ডিলার পয়েন্টে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ পাওয়া যায়। এ সময় সার কিনতে আসা বেশ কয়েকজন কৃষককে দোকানের আশপাশে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তাদের কেউ কেউ সকাল থেকেই সার সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

এ সময় কথা হয় অপেক্ষমাণ কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে। তারা অভিযোগ করে বলেন, সার নিতে গেলে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও ডিলারের লোকজন সার না দিয়ে নানা অজুহাত দেখান। এ কারণে প্রায়ই সার না পেয়ে বাড়ি ফিরতে হয় তাদের। তবে বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত টাকা দিলে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যায়। তখন আর স্লিপেরও প্রয়োজন হয় না বলে অভিযোগ করেন তারা। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, শোভাগঞ্জ বাজারের ওই ডিলার পয়েন্টে সার বিতরণের চিত্র এমনই।

কৃষকদের অভিযোগ, সার মনিটরিং ও সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাও ডিলার পয়েন্টে উপস্থিত থাকেন। তাদের উপস্থিতিতেই এসব অনিয়ম ঘটছে বলে দাবি স্থানীয়দের। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এমন অভিযোগ ওঠায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।

এ বিষয়ে কথা হয় সার নিতে আসা গংসার হাটের ব্যবসায়ী নয়া মিয়ার (৪৫) সাথে। তিনি বলেন, ‘দুপুর ১২ টার দিকে সার নিতে গিয়েছিলাম। আরও আট দশজন ব্যবসায়ী ছিলাম আমরা। ভ্যানে ভ্যানে সার যাচ্ছে। অথচ বিএস মিজান ওখানে নিজেই উপস্থিত। আমরা চাইলে খালি কয় শেষে নেন। পরে বিকেল ৪ টার দিকে কয় সার আর নাই। পরে হিসাব করি দেখে কাগজ কলমে সার আছে কিন্তু গোডাউনে সার নাই।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, হিসেব করার সময় আমি ওখানে ছিলাম। হিসেবে গরমিল মিলেছে। গত ২৮ তারিখে বিক্রির পর স্টকে টিএসপি ৩৩ বস্তা এবং ডিএপি ৫৬ বস্তার গরমিল মিলেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষুব্ধ এক কৃষক জানান, ‘সরকারী দামে সার কিনতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। বলা হচ্ছে সার নেই। অথচ কৃষি অফিসারের চোখের সামনেই প্রতি বস্তায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে অনেকে ঠিকই সার নিয়ে যাচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দেখেও না দেখার ভান করছেন।’

এ বিষয়ে বিষয়ে কথা হয় ডিলার মনোনীত ম্যানেজার বিধু রঞ্জনের (৪৫) সাথে। অতিরিক্ত দামে কোনো সার বিক্রি করা হয়নি বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, ‘কিছু সার মেমো করা হয়েছে আবার কিছু সার মেমো ছাড়াই ঘর থেকে বের হয়ে গেছে। বিষয়গুলো আমরা বুঝতেই পারিনি। সে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতেই কৃষি স্যার অফিসে ডেকেছেন। সেখানেই আছি৷ ডিলার পয়েন্টে চণ্ডী দা আছেন। তার কাছ থেকেই জেনে নেন বলে ফোন কেটে দেন।’

ডিলার পয়েন্ট বন্ধ করে তার পার্শ্বেই অবস্থান করছিলেন ম্যানেজারের সহযোগী চন্ডী দাস। পরে কথা হয় তার সাথে। অতিরিক্ত মূল্যে কোনো সার বিক্রি করা হয়নি বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, ‘এ তারিখে সার বিক্রির দিন হরিলুট হয়েছে। কে কয়টা বস্তা নিয়ে গেছে কিছুই বুঝতে পারিনি আমরা। এখনো তাদের অনেকেই টাকা পয়সাও দেয়নি আমাদের। লোকসানে আছি আমরা। হরিলুট হওয়ার কারণে সারের হিসাবটা মেলাতে পারেননি বলেও জানান তিনি।’

এ বিষয়ে বিসিআইসি অনুমোদিত সার ডিলার শ্রী তমাল চন্দ্র সাহা মোবাইল ফোনে অভিযোগের বিষয়গুলো শোনা পরে বলেন, ‘আমার ডিলার পয়েন্টে এ ধরনের কোনো ঘটনায় ঘটেনি।’

সংশ্লিষ্ট ডিলার পয়েন্টের সার মনিটরিং ও সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান মন্ডল বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নে ছিলাম কৃষি কার্ডের কাজে। ঠিক সেই মুহুর্তে স্যার আমাকে ফোন দিয়ে ঘটনাস্থলে যেতে বলেন। গিয়ে দেখি একটি ভ্যানে ১০ টি সারের বস্তা। তথন ডিলারকে জিজ্জাসা করি। তখন উনি বলেন ওখানে দুজন কৃষকের সার। এরপর আমি ওখান থেকে চলে আসি।’

মজুদ ও বিতরণ রেজিস্ট্রারে কোনো গরমিল আছে কি না বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গরমিলের বিষয়টি শুনেছি তবে দেখিনি।’

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়গুলো আমি শুনেছি। সংশ্লিষ্ট ডিলারের নিকট থেকে মজুদ স্টক ও বিক্রির স্টক রেজিস্ট্রার বই চেয়েছি। বিতরণে কোনো গরমিল আছে কি না বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য। সত্যতা পেলে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই। আর সারের মজুদ, বিক্রি ও স্টক রেজিস্ট্রারে গরমিল বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত। বিষয়গুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’