ডায়েট করেও ওজন কমছে না? যে ৯টি ভুল হতে পারে কারণ
- আপডেট সময় : ০৭:২৪:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

অনেকেই ডায়েট পরিকল্পনা অনুসরণ করেও প্রত্যাশিত ফল পান না। কারও ওজন কমে না, আবার কারও ক্ষেত্রে ডায়েট শেষ করার পর দ্রুত আগের ওজন ফিরে আসে। কিন্তু কেন ডায়েট কাজ করছে না? ভুল ডায়েট নির্বাচন, খাদ্যাভ্যাসে অসংগতি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব—এর পেছনে থাকতে পারে নানা কারণ। ডায়েট করেও কেন কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না, আর ওজন কমানোর সুফলই-বা কেন দীর্ঘস্থায়ী হয় না, তা জানতে জেনে নেওয়া যাক নয়টি সাধারণ ভুল সম্পর্কে।
অনেকে মনে করেন, যত কম খাবেন, তত দ্রুত ওজন কমবে। তাই কেউ সকালের নাশতা, কেউ দুপুরের খাবার, আবার কেউ রাতের খাবার বাদ দেন। কারও কারও অভ্যাস দিনে মাত্র একবার খাওয়া। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকাই ওজন কমানোর কার্যকর উপায় নয়। বরং অতিরিক্ত ক্ষুধার কারণে পরবর্তী সময়ে বেশি খাওয়া, দুর্বলতা কিংবা প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ, যে পদ্ধতিতে দ্রুত ওজন কমানোর আশা করছেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দিতে পারে।
ওজন কমাতে ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ক্যালরি কমানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অনেকেই খাবার নির্বাচন ও পরিমাণের হিসাব ঠিকভাবে করেন না। যেমন, কার্বোহাইড্রেট কমানোর জন্য ভাত বাদ দিয়ে তার পরিবর্তে মুড়ি, ওটস বা নুডলস খেতে শুরু করেন। অথচ এসব খাবারের ক্যালরি নির্ভর করে পরিমাণ, উপকরণ ও প্রস্তুতপ্রণালির ওপর। বেশি পরিমাণে খেলে বিকল্প খাবার থেকেও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্যালরি গ্রহণ করা হতে পারে। তাই শুধু ভাত বাদ দেওয়া নয়, বরং সুষম খাবার বেছে নেওয়া এবং পরিমাণের দিকে নজর দেওয়াও জরুরি।
ডায়েট মানে সপ্তাহের পাঁচ দিন কঠোর নিয়ম মেনে চলা আর বাকি দুই দিন ইচ্ছেমতো খাওয়া নয়। অনেকেই ডায়েটের মধ্যেও ফাস্ট ফুড, দোকানের প্যাকেটজাত স্ন্যাকস কিংবা দাওয়াতের ভারী খাবার নিয়মিত খান। এসব খাবারে অতিরিক্ত ক্যালরি, লবণ, চিনি বা অস্বাস্থ্যকর চর্বি থাকতে পারে। ফলে অন্যান্য সময়ে খাবার নিয়ন্ত্রণ করলেও মোট ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। মাঝেমধ্যে পছন্দের খাবার খাওয়া সমস্যা নয়; তবে পরিমাণ ও খাওয়ার অভ্যাসে ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন।
অনেকের ধারণা, ডায়েট করতে হলে বিশেষ কিছু খাবার খেতেই হবে। যেমন—অ্যাপল সাইডার ভিনেগার, ডিটক্স পানি, চিয়া সিড কিংবা অলিভ অয়েল দিয়ে তৈরি বিদেশি সালাদ। অথচ ওজন কমানোর জন্য এসব খাবার অপরিহার্য নয়। আমাদের দেশেই রয়েছে সহজলভ্য ও পুষ্টিকর নানা খাবার—শাকসবজি, মৌসুমি ফল, ডাল, ডিম, মাছ ও অন্যান্য প্রোটিনের উৎস। সঠিক পরিমাণে এসব খাবার খেয়েও সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। দামি বা বিদেশি খাবারের চেয়ে খাবারের পুষ্টিমান, পরিমাণ ও সামগ্রিক খাদ্যতালিকায় ভারসাম্য রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো খাবার পুষ্টিকর হলেই তা ইচ্ছেমতো খাওয়া যায়—এমন ধারণা ঠিক নয়। যেমন ফল স্বাস্থ্যকর হলেও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খেলে মোট ক্যালরি গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু ফল বেশি খেলে পেট ফাঁপা বা অস্বস্তিও হতে পারে। একইভাবে বাদাম, মাছ ও মুরগির মাংস পুষ্টিকর খাবার হলেও এগুলোর পরিমাণ এবং রান্নায় ব্যবহৃত তেল ও অন্যান্য উপকরণের দিকে নজর রাখা জরুরি।
বিশেষ করে বাদামে ক্যালরি বেশি থাকে। তাই অতিরিক্ত খেলে ওজন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য ব্যাহত হতে পারে। আবার কিডনির ওপর প্রভাব নির্ভর করে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা, খাদ্যগ্রহণ ও আগে থেকে কোনো রোগ আছে কি না, তার ওপর। তাই সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়ার পাশাপাশি পরিমিত খাওয়ার অভ্যাসও গড়ে তুলতে হবে।
কিছু মানুষ কয়েক দিন কঠোরভাবে ডায়েট করেন, তারপর হঠাৎ তা ছেড়ে দেন। আবার কিছুদিন পর নতুন করে শুরু করেন। ডায়েটের এই অনিয়মিত বা ‘অন-অফ’ পদ্ধতিতে দীর্ঘমেয়াদি ফল ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত বিধিনিষেধের কারণে একসময় ক্লান্তি বা একঘেয়েমি তৈরি হতে পারে, যা নিয়মিত খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য এমন একটি খাদ্যাভ্যাস প্রয়োজন, যা দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে মানানসই এবং দীর্ঘদিন অনুসরণ করা সম্ভব। সাময়িকভাবে কঠোর নিয়ম মেনে চলার চেয়ে ধারাবাহিকতা এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বন্ধু, পরিচিত ব্যক্তি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারের ডায়েট পরিকল্পনা দেখে অনেকেই তা অনুসরণ করতে শুরু করেন। কিন্তু সবার শরীর ও পুষ্টির চাহিদা এক নয়। বয়স, উচ্চতা, শারীরিক গঠন, দৈনন্দিন কাজকর্ম, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং বিপাকীয় চাহিদার ওপর নির্ভর করে খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করা উচিত। বেসাল মেটাবলিক রেট (বিএমআর), অর্থাৎ বিশ্রামকালীন অবস্থায় শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তির পরিমাণও ব্যক্তিভেদে আলাদা।
তাই অন্য কারও জন্য কার্যকর একটি ডায়েট পরিকল্পনা আপনার জন্য সমানভাবে কার্যকর না-ও হতে পারে। নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যতালিকা তৈরি করতে পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
অনেকে মনে করেন, খাবার নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই ওজন কমানোর কাজ শেষ। কিন্তু স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম ও পানির প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম শরীরকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে। পর্যাপ্ত ঘুম ক্ষুধা ও তৃপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়ক। অন্যদিকে, শরীরে পানির ঘাটতি হলে ক্লান্তি ও শারীরিক অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।
তাই শুধু খাবারের পরিমাণ কমিয়ে নয়, বরং জীবনযাপনের সামগ্রিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা উচিত।
এটি ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত একটি ভুল। কয়েক কেজি ওজন কমে গেলে অনেকেই মনে করেন, লক্ষ্য পূরণ হয়েছে; এবার আগের মতো খাওয়া যাবে। ফলে পুরোনো খাদ্যাভ্যাসে ফিরে যাওয়ার পর কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে হারানো ওজন আবার ফিরে আসতে পারে। কখনো কখনো ওজন আরও বেড়ে যায়।
আসলে ওজন কমানোই একমাত্র লক্ষ্য নয়; কমানো ওজন ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই লক্ষ্য পূরণের পরও সুষম খাদ্যাভ্যাস, পরিমিত খাবার ও নিয়মিত শরীরচর্চা চালিয়ে যেতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে অনুসরণ করা সম্ভব, এমন অভ্যাসই ওজন নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বেশি সহায়ক।
শুধু ডায়েট করলেই হবে না। দৈনন্দিন জীবনযাপনে কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস যুক্ত করলে ওজন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সামগ্রিক সুস্থতাও বজায় রাখা সহজ হয়। • পর্যাপ্ত ঘুম: প্রতিদিন নিয়মিত সময়ে ঘুমানোর চেষ্টা করুন। অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য সাধারণত ৭–৯ ঘণ্টা ঘুম উপকারী। • চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি নিয়ন্ত্রণ: মিষ্টি, চিনিযুক্ত পানীয়, অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার, ট্রান্স ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাটের অতিরিক্ত গ্রহণ কমিয়ে আনুন। • নিয়মিত হাঁটা ও শরীরচর্চা: প্রতিদিন অন্তত ৩০–৪০ মিনিট হাঁটা বা শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস গড়ে তুলুন। নিজের সক্ষমতা ও শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী ব্যায়ামের ধরন ও সময় নির্ধারণ করুন। • পর্যাপ্ত পানি পান: সারা দিনে ৮–১৪ গ্লাস পানি পান করার পরামর্শ অনেকের ক্ষেত্রে প্রচলিত। তবে পানির প্রয়োজন ব্যক্তির বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, আবহাওয়া ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর নির্ভর করে। তাই সবার জন্য একই পরিমাণ পানি প্রয়োজন হয় না।
মনে রাখতে হবে, ওজন বাড়তে যেমন সময় লাগে, তেমনি স্বাস্থ্যকর উপায়ে ওজন কমাতেও সময় ও ধৈর্যের প্রয়োজন। অল্প সময়ে প্রত্যাশিত ফল না পেয়ে হতাশ হয়ে ডায়েট ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়। মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও নেতিবাচক মনোভাবও খাদ্যাভ্যাস ও ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলতে পারে।
তাই বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করুন, নিজের শরীরকে সময় দিন এবং এমন খাদ্যাভ্যাস বেছে নিন, যা দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখা সম্ভব। দ্রুত ওজন কমানোর প্রতিশ্রুতির চেয়ে নিয়মিত ও সুষম জীবনযাপন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন। সুস্থ থাকুন, সবল থাকুন, বাস্তবসম্মতভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণ করুন। লেখক: আয়শা আনিকা নাজনীন, পুষ্টিবিদ, প্রত্যয় মেডিক্যাল ক্লিনিক, বারিধারা।
























