ঢাকা ০৯:৫৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মালয়েশিয়া ভ্রমণ: কালের যাত্রাধ্বনি–২

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৪৪:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ব্যস্ত কুয়ালালামপুর ছেড়ে আমরা এখন সেলাঙ্গরের পথে। গন্তব্য বাতু কেভ। শহরের কেন্দ্র পেরিয়ে ট্যাক্সি উত্তরের দিকে এগোচ্ছিল। জানালার বাইরে উঁচু ভবনের সংখ্যা ক্রমেই কমে যাচ্ছিল। চোখে পড়ছিল রাস্তার ধারের দোকানপাট, ছোট ছোট বসতি আর দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত মানুষ।

শহরের চেনা ব্যস্ততা থেকে দূরে যাওয়ার এই পথটুকু আমার ভীষণ ভালো লাগে। গন্তব্যের দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে আগাম অনেক কিছু জানা গেলেও পথে জানালার বাইরে যে জীবন চোখে পড়ে, সে বিবরণ সচরাচর কোথাও লেখা থাকে না। অথচ অপরিচিত একটি জায়গা চিনতে সেই দৃশ্যের ভূমিকা কম নয়।

বাতু কেভে পৌঁছেই প্রথমে চোখে পড়ে সোনালি মুরুগান মূর্তি। পেছনে চুনাপাথরের পাহাড়। পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে গেছে রঙিন সিঁড়ি। ৪২ দশমিক ৭ মিটার উঁচু মূর্তিটির সামনে দাঁড়ালে মুরুগানের বিশালত্ব টের পাওয়া যায়। মূল গুহামন্দিরে পৌঁছাতে পেরোতে হয় ২৭২টি ধাপ।

.

সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে একসময় হাঁপ ধরে গেল। একটু দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকালাম। রোদে ঝলমল করছে মূর্তিটি। সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন দর্শনার্থীরা। বানর আর পায়রাগুলো মানুষের ব্যস্ততায় নির্বিকার।

কেউ মাঝপথে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। কেউ বিশ্রাম নিয়ে আবার উঠতে শুরু করেছেন। আমিও একটু জিরিয়ে নিলাম। মনে প্রশ্ন এল, চুনাপাথরের এই গুহা কীভাবে হিন্দু তীর্থস্থানে পরিণত হলো?

.

মুরুগান তামিলদের পূজিত দেবতা। হিন্দু পুরাণে তিনি শিব ও পার্বতীর পুত্র, কার্তিকেয় নামে পরিচিত। দক্ষিণ ভারতের তামিল সমাজে মুরুগান উপাসনার শিকড় বহু পুরোনো। তামিল সাহিত্য, লোকবিশ্বাস ও ধর্মীয় আচারেও তাঁর উপস্থিতি গভীর।

হাতে বর্শা, বাহন ময়ূর—মুরুগানের এই পরিচিত রূপ তামিল সংস্কৃতির সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে যে, তাঁকে ঘিরে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি ভাষা ও জাতিসত্তার অনুভবও কাজ করে। তামিলনাড়ুর পালানি, তিরুচেন্দুরসহ বিখ্যাত সব মুরুগান মন্দিরের মতো বাতু কেভও প্রবাসী তামিলদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান।

.

বাতু কেভকে মন্দির হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী থাম্বুসামি পিল্লাই (১৮৫০–১৯০২)। উনিশ শতকের শেষ দিকে তিনি গুহাটিকে মুরুগানের উপাসনার জন্য বেছে নেন। ক্রমে তীর্থযাত্রার পরিকাঠামো গড়ে ওঠে। আর বাতু কেভ হয়ে ওঠে মালয়েশিয়ার তামিল হিন্দুদের প্রধান উপাসনালয়।

এই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তামিলদের মালয়েশিয়ায় আসার কাহিনি। দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে মালয় উপদ্বীপের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বহু পুরোনো। তবে তামিলদের বড় আকারে অভিবাসনের পেছনে ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক অর্থনীতি।

উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে মালয়ার টিনের খনি, রেলপথ নির্মাণ ও রাবার বাগানে শ্রমিকের চাহিদা বাড়তে থাকে। সেই চাহিদা মেটাতে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ দক্ষিণ ভারত থেকে বহু শ্রমিক নিয়ে আসে। শ্রমিকদের অধিকাংশই ছিলেন তামিল ভাষাভাষী অঞ্চলের মানুষ।

.মালয়েশিয়া ভ্রমণ: কালের যাত্রাধ্বনি-১.

অনেকে এসেছিলেন চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক হিসেবে। মালয়ায় পৌঁছে তাঁদের বড় অংশের ঠাঁই হয় রাবার বাগানের শ্রমিক আবাসে। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সামান্য মজুরি আর কঠিন জীবনযাপনের মধ্যেও তাঁরা টিকে ছিলেন। মন্দির গড়েছেন, উৎসবের রীতি বজায় রেখেছেন, সন্তানদের শিখিয়েছেন তামিল ভাষা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মালয়েশিয়া তাঁদের ঘর হয়ে উঠলেও তামিল পরিচয় রয়ে গেছে দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে।

স্থানীয় লোকজন জানালেন, বাতু কেভের গুরুত্ব বোঝা যায় থাইপুসাম উৎসবের সময়। তামিল পঞ্জিকা ধরে থাই মাসের পূর্ণিমায় মুরুগানের উদ্দেশে এই উৎসব পালিত হয়। মানত পূরণ করতে কেউ দুধের পাত্র বহন করেন। কেউ কাঁধে কাভাড়ি তুলে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেন। কারও শরীরে বিদ্ধ থাকে ছোট ছোট বর্শা। কারও মুখে নিবিড় প্রার্থনা।

.

২৭২টি সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় ক্লান্তি আমাকে বারবার থামিয়ে দিচ্ছিল। ভক্তদের কাছে অবশ্য এই পথের অর্থ আলাদা। আর পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে থাকা সোনালি মুরুগান মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন, এই তীর্থের ইতিহাসে ধর্মের পাশাপাশি আছে অভিবাসন, শ্রম আর নতুন দেশে শিকড় গাড়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।

দক্ষিণ ভারত থেকে সমুদ্র পেরিয়ে আসা মানুষ তাঁদের দেবতাকে সঙ্গে এনেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সেই দেবতার জন্য গড়ে উঠেছে এমন এক তীর্থস্থান, যা আজ মালয়েশিয়ার সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ। মনে পড়ে গেল জীবনানন্দের ‘শ্যামলী’ কবিতার কথা।

‘দূর সাগরের শব্দ—শতাব্দীর তীরে এসে ঝরে

কাল কিছু হয়েছিল—হবে কি শাশ্বতকাল পরে।’

  • অমৃতা ইশরাত: ব্যাংকার ও লেখক

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

মালয়েশিয়া ভ্রমণ: কালের যাত্রাধ্বনি–২

আপডেট সময় : ০৮:৪৪:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

ব্যস্ত কুয়ালালামপুর ছেড়ে আমরা এখন সেলাঙ্গরের পথে। গন্তব্য বাতু কেভ। শহরের কেন্দ্র পেরিয়ে ট্যাক্সি উত্তরের দিকে এগোচ্ছিল। জানালার বাইরে উঁচু ভবনের সংখ্যা ক্রমেই কমে যাচ্ছিল। চোখে পড়ছিল রাস্তার ধারের দোকানপাট, ছোট ছোট বসতি আর দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত মানুষ।

শহরের চেনা ব্যস্ততা থেকে দূরে যাওয়ার এই পথটুকু আমার ভীষণ ভালো লাগে। গন্তব্যের দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে আগাম অনেক কিছু জানা গেলেও পথে জানালার বাইরে যে জীবন চোখে পড়ে, সে বিবরণ সচরাচর কোথাও লেখা থাকে না। অথচ অপরিচিত একটি জায়গা চিনতে সেই দৃশ্যের ভূমিকা কম নয়।

বাতু কেভে পৌঁছেই প্রথমে চোখে পড়ে সোনালি মুরুগান মূর্তি। পেছনে চুনাপাথরের পাহাড়। পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে গেছে রঙিন সিঁড়ি। ৪২ দশমিক ৭ মিটার উঁচু মূর্তিটির সামনে দাঁড়ালে মুরুগানের বিশালত্ব টের পাওয়া যায়। মূল গুহামন্দিরে পৌঁছাতে পেরোতে হয় ২৭২টি ধাপ।

.

সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে একসময় হাঁপ ধরে গেল। একটু দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকালাম। রোদে ঝলমল করছে মূর্তিটি। সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন দর্শনার্থীরা। বানর আর পায়রাগুলো মানুষের ব্যস্ততায় নির্বিকার।

কেউ মাঝপথে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। কেউ বিশ্রাম নিয়ে আবার উঠতে শুরু করেছেন। আমিও একটু জিরিয়ে নিলাম। মনে প্রশ্ন এল, চুনাপাথরের এই গুহা কীভাবে হিন্দু তীর্থস্থানে পরিণত হলো?

.

মুরুগান তামিলদের পূজিত দেবতা। হিন্দু পুরাণে তিনি শিব ও পার্বতীর পুত্র, কার্তিকেয় নামে পরিচিত। দক্ষিণ ভারতের তামিল সমাজে মুরুগান উপাসনার শিকড় বহু পুরোনো। তামিল সাহিত্য, লোকবিশ্বাস ও ধর্মীয় আচারেও তাঁর উপস্থিতি গভীর।

হাতে বর্শা, বাহন ময়ূর—মুরুগানের এই পরিচিত রূপ তামিল সংস্কৃতির সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে যে, তাঁকে ঘিরে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি ভাষা ও জাতিসত্তার অনুভবও কাজ করে। তামিলনাড়ুর পালানি, তিরুচেন্দুরসহ বিখ্যাত সব মুরুগান মন্দিরের মতো বাতু কেভও প্রবাসী তামিলদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান।

.

বাতু কেভকে মন্দির হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী থাম্বুসামি পিল্লাই (১৮৫০–১৯০২)। উনিশ শতকের শেষ দিকে তিনি গুহাটিকে মুরুগানের উপাসনার জন্য বেছে নেন। ক্রমে তীর্থযাত্রার পরিকাঠামো গড়ে ওঠে। আর বাতু কেভ হয়ে ওঠে মালয়েশিয়ার তামিল হিন্দুদের প্রধান উপাসনালয়।

এই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তামিলদের মালয়েশিয়ায় আসার কাহিনি। দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে মালয় উপদ্বীপের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বহু পুরোনো। তবে তামিলদের বড় আকারে অভিবাসনের পেছনে ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক অর্থনীতি।

উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে মালয়ার টিনের খনি, রেলপথ নির্মাণ ও রাবার বাগানে শ্রমিকের চাহিদা বাড়তে থাকে। সেই চাহিদা মেটাতে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ দক্ষিণ ভারত থেকে বহু শ্রমিক নিয়ে আসে। শ্রমিকদের অধিকাংশই ছিলেন তামিল ভাষাভাষী অঞ্চলের মানুষ।

.মালয়েশিয়া ভ্রমণ: কালের যাত্রাধ্বনি-১.

অনেকে এসেছিলেন চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক হিসেবে। মালয়ায় পৌঁছে তাঁদের বড় অংশের ঠাঁই হয় রাবার বাগানের শ্রমিক আবাসে। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সামান্য মজুরি আর কঠিন জীবনযাপনের মধ্যেও তাঁরা টিকে ছিলেন। মন্দির গড়েছেন, উৎসবের রীতি বজায় রেখেছেন, সন্তানদের শিখিয়েছেন তামিল ভাষা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মালয়েশিয়া তাঁদের ঘর হয়ে উঠলেও তামিল পরিচয় রয়ে গেছে দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে।

স্থানীয় লোকজন জানালেন, বাতু কেভের গুরুত্ব বোঝা যায় থাইপুসাম উৎসবের সময়। তামিল পঞ্জিকা ধরে থাই মাসের পূর্ণিমায় মুরুগানের উদ্দেশে এই উৎসব পালিত হয়। মানত পূরণ করতে কেউ দুধের পাত্র বহন করেন। কেউ কাঁধে কাভাড়ি তুলে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেন। কারও শরীরে বিদ্ধ থাকে ছোট ছোট বর্শা। কারও মুখে নিবিড় প্রার্থনা।

.

২৭২টি সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় ক্লান্তি আমাকে বারবার থামিয়ে দিচ্ছিল। ভক্তদের কাছে অবশ্য এই পথের অর্থ আলাদা। আর পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে থাকা সোনালি মুরুগান মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন, এই তীর্থের ইতিহাসে ধর্মের পাশাপাশি আছে অভিবাসন, শ্রম আর নতুন দেশে শিকড় গাড়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।

দক্ষিণ ভারত থেকে সমুদ্র পেরিয়ে আসা মানুষ তাঁদের দেবতাকে সঙ্গে এনেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সেই দেবতার জন্য গড়ে উঠেছে এমন এক তীর্থস্থান, যা আজ মালয়েশিয়ার সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ। মনে পড়ে গেল জীবনানন্দের ‘শ্যামলী’ কবিতার কথা।

‘দূর সাগরের শব্দ—শতাব্দীর তীরে এসে ঝরে

কাল কিছু হয়েছিল—হবে কি শাশ্বতকাল পরে।’

  • অমৃতা ইশরাত: ব্যাংকার ও লেখক