ঢাকা ১১:০০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা, নাকি বাঙালির বিভাজন

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:১৬:৩৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ শুধু ‘রবীন্দ্রবিরোধিতা’ হিসেবে দেখলে সম্ভবত সমস্যাটির গভীরে পৌঁছানো যাবে না। শিল্পকলা একাডেমির সামনে তাঁর প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়া, তাঁকে ঘিরে অবমাননাকর বক্তব্য, তাঁর ইতিহাস ও রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে পুরোনো ও অপ্রমাণিত অভিযোগ নতুন করে প্রচার—এসবের মধ্যে একজন কবির প্রতি বিরাগের চাইতে আরও বেশি কিছু আছে বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা। রবীন্দ্রনাথ শুধু একজন ব্যক্তি নন, শুধু একজন কবি নন তিনি একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়, বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, বাঙালি জাতিসত্তা এবং শেষ বিচারে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। ফলে তাঁর প্রতিকৃতির ওপর আঘাতকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই বরং প্রশ্ন করা উচিত—এই ঘটনার মধ্য দিয়ে কি বাঙালির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে নতুন করে বিতর্কিত করার চেষ্টা হচ্ছে না?

বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন রবীন্দ্রনাথকে ‘হিন্দু’, ‘ভারতীয়’ বা ‘এই দেশের সংস্কৃতির বাইরের মানুষ’ হিসেবে উপস্থাপন করে বাংলাদেশের মুসলিম পরিচয়ের বিপরীতে দাঁড় করানোর প্রবণতা দেখা যায়।

এর মধ্যে একটি পুরোনো রাজনৈতিক বিভাজনের ছায়া স্পষ্ট—বাঙালি সংস্কৃতি বনাম ইসলামি সংস্কৃতি। যেন বাঙালি হতে হলে ইসলামি পরিচয় থেকে দূরে যেতে হবে, অথবা মুসলমানের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষা করতে হলে রবীন্দ্রনাথ, বাংলা নববর্ষ, লোকসংস্কৃতি কিংবা বাংলা ভাষার বহুত্ববাদী ঐতিহ্য থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে হবে। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাস এই দ্বৈততার সাক্ষ্য দেয় না। শত শত বছর ধরে এ ভূখণ্ডের মুসলমানেরা একই সঙ্গে বাঙালি ও মুসলমান—তাঁদের ভাষা বাংলা, তাঁদের লোকজ স্মৃতি বাংলার, আবার তাঁদের বিশ্বাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্য ইসলামের। এই দুই পরিচয়ের সহাবস্থানই বাংলাদেশের সমাজের ঐতিহাসিক বাস্তবতা।

সে কারণেই বর্তমান ঘটনাপ্রবাহকে ‘রবীন্দ্রনাথ বনাম তাঁর সমালোচক’—এই সংকীর্ণ কাঠামোয় আটকে রাখা ঠিক হবে না বরং দেখতে হবে, রবীন্দ্রনাথকে সামনে রেখে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংজ্ঞা নিয়েই নতুন করে একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক লড়াই তৈরি করা হচ্ছে কি না। একদিকে ভাষা, সাহিত্য, লোকজ ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ এবং বহুত্ববাদী বাঙালি সংস্কৃতিকে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখা হয় অন্যদিকে একটি প্রবণতা ধর্মীয় পরিচয়কে জাতীয় সংস্কৃতির প্রধান নির্ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির বিতর্ক নতুন নয়—পাকিস্তান আমলে বাংলা ভাষা, রবীন্দ্রসংগীত এবং বাঙালি সাংস্কৃতিক চর্চাকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় দ্বন্দ্বের মধ্যেও আমরা এর পূর্বসূত্র দেখতে পাই।

লক্ষণীয় যে ‘বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী অভিযান’ বেশ কিছু দিন ধরেই চালু রয়েছে। গত দশকগুলোর বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর সাথে সাম্প্রতিক রবীন্দ্রবিরোধী কার্যক্রমের ঘটনা জোড়া দিলে বুঝতে আর সময় লাগে না যে একটি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পিত ও পরিচালিত বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী অভিযান সারা বাংলাদেশে চলছে। কখনো মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন, কখনো নববর্ষ উদ্যাপন, কখনো রবীন্দ্রনাথ—একটার পর একটা ঘটনা সামনে আসছে। এসব ঘটনার ভাষা, প্রতীক নির্বাচন এবং রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে পুনরুজ্জীবিত কিছু পুরোনো অভিযোগ আমাদের সামনে একটি বড় আকারের জিজ্ঞাসা চিহ্ন নিয়ে উপস্থিত হয়েছে: বাংলাদেশের মানুষকে কি ‘বাঙালি সংস্কৃতি’ ও ‘ইসলামী সংস্কৃতি’—এই দুই কৃত্রিম শিবিরে ভাগ করার চেষ্টা হচ্ছে? এর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের মনে আর একটি প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশ তার বহুমাত্রিক ইতিহাসকে ধারণ করবে, নাকি ধর্ম ও সংস্কৃতিকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়ে নিজের জাতীয় পরিচয়কেই দুই ভাগে বিভক্ত করবে?

এই নিবন্ধে আমরা এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়াসী হব। একই সঙ্গে আমরা রবীন্দ্রনাথের নামে প্রচারিত ইতিহাস, অপ্রমাণিত অভিযোগ এবং সাংস্কৃতিক বিদ্বেষ সম্পর্কেও আলোচনা করব। আমার ধারণা, এই জায়গা থেকেই রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বর্তমান বিতর্কটির আলোচনা হওয়া দরকার। তবে মুক্তবুদ্ধির চর্চা সমুন্নত রাখতে হলে আমাদের প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি ইতিহাসকে তথ্য দিয়ে বিচার করব, নাকি ‘বিশেষ কোনো রাজনৈতিক মতবাদের প্রয়োজন’ অনুযায়ী অতীতকে নতুন করে লিখব?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ভালোবাসতেই হবে—এমন কোনো সাংবিধানিক, নৈতিক বা সাংস্কৃতিক বাধ্যবাধকতা আমাদের কারও নেই। রবীন্দ্রনাথের কবিতা কারও ভালো লাগতে পারে আবার কারও ভালো না-ও লাগতে পারে। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা, জমিদারি, বঙ্গভঙ্গবিরোধী অবস্থান, জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে তাঁর দ্বিধা, এমনকি তাঁর সাহিত্যকেও কঠোরভাবে সমালোচনা করার অধিকার সবারই আছে। কোনো একজন মহান কবি বা বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে তুলে রাখা মোটেও মুক্তবুদ্ধির পরিচয় নয়।

কিন্তু সমালোচনা আর ইতিহাস বিকৃত করা এক বিষয় নয়। সাহিত্যিক পছন্দ-অপছন্দ আর কোনো লেখকের প্রতিকৃতিতে কালি মাখানোও এক কথা নয়। রবীন্দ্রনাথের চিন্তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা আর তাঁকে ‘মুসলিমবিদ্বেষী’, ‘বাংলাদেশবিরোধী’ কিংবা ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধী’ প্রমাণ করতে অপ্রমাণিত কাহিনি প্রচার করাও কোনোভাবেই কাম্য নয়।

৫ অক্টোবর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিসংলগ্ন ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর পাশের দেয়ালে বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত ১০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রতিকৃতি আঁকা হয়। তাঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পাশাপাশি ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, জয়নুল আবেদিন, এস এম সুলতান, জহির রায়হান, শাহ আবদুল করিম, হুমায়ূন ফরীদি, সত্যজিৎ রায় প্রমুখ।

১০ অক্টোবর সেই দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি কালো কালি দিয়ে মুছে ফেলার চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে রাষ্ট্রসংলাপ ফোরামের এক নেতাসহ কয়েকজনকে আটক করে। পরে চারজনকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত মামলার তথ্য অনুযায়ী, দণ্ডবিধির ১২০বি, ১৫৩এ ও ২৯৫এ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে—অর্থাৎ অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা উসকে দেওয়া এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসংক্রান্ত অভিযোগ। ১১ অক্টোবর আদালত দুই আসামিকে তিন দিন এবং অন্য দুজনকে দুই দিনের রিমান্ডে দেন।

পরদিন রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতির সামনে উদীচীর একটি অংশ ‘যে কবি জনতার’ শিরোনামে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের আয়োজন করে।

এর মধ্যেই বিতর্ক পৌঁছায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মার রবীন্দ্রসংগীতের সুর নিয়ে ‘রঠা সংগীত’ নামে একটি বিকৃত ভিডিও প্রকাশ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের অনেকে এ ঘটনার প্রতিবাদ করেন। পরে একজন ছাত্রদল নেতা রাকসু ভবনে রবীন্দ্রনাথের পক্ষে কবি শামসুর রাহমানের বাণী সংবলিত একটি পোস্টার লাগান।

গত ১৩ অক্টোবর ৩৭ জন বিশিষ্ট নাগরিক এক বিবৃতিতে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি দেওয়ার ঘটনাসহ সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির চেষ্টার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

গতকাল ১৪ অক্টোবর, এ ঘটনার জের হিসেবে আদালতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রিমান্ড শেষে দুজন আসামির জামিন শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যেকার উত্তেজনা শারীরিক সংঘর্ষে গড়ায়। বিব্রত বিচারক কিছু সময়ের জন্য এজলাস ছেড়ে যান। একই দিনে জাতীয় কবিতা পরিষদ ঢাকায় ‘অসাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রনাথকে মুছে ফেলা যাবে না’ শিরোনামে কবিতাপাঠ ও আলোচনা আয়োজন করে। সেখানে বক্তারা রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে বিভাজন তৈরির প্রচেষ্টার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। মোদ্দাকথা, ১০ অক্টোবরের দেয়ালচিত্রের ঘটনাটি এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে সীমাবদ্ধ নেই এটি সংগঠিত সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়াও তৈরি করছে।

সব কটি ঘটনা বিবেচনা করলে এটিও অস্বীকার করার উপায় থাকে না যে—রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে পুরোনো কিছু অভিযোগ নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রকাশ্য রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণাও দেখিয়েছে, বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ ও জাতীয় সংগীত দীর্ঘদিন ধরে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মভিত্তিক পরিচয়-রাজনীতির টানাপোড়েনের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। একটা বিশেষ গোষ্ঠী সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সামনে রেখে নানা ধরনের মিথ্যা ও অপতথ্য প্রচারের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথবিরোধী অদ্ভুত এক বয়ান সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথবিরোধী আলোচনায় সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পুনরাবৃত্ত দাবি হলো—তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। কখনো আরও এক ধাপ এগিয়ে তাঁর নামে এমন কথাও প্রচার করা হয় যে পূর্ববঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন নেই কিংবা ‘মূর্খের দেশে আবার কিসের বিশ্ববিদ্যালয়’। সমস্যা হচ্ছে, এসব বক্তব্যের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায় না।

১১ অক্টোবর ২০২৬ বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ফ্যাক্টওয়াচের গবেষণালব্ধ তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন—এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বহুল প্রচারিত কাহিনিতে বলা হয়েছিল, ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধী সভায় রবীন্দ্রনাথ সভাপতিত্ব করেছিলেন। অবশ্য তাঁর দিনপঞ্জির সঙ্গেও সেই দাবির অসংগতি রয়েছে।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ইতিহাসে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। ১৯২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল পরিদর্শন করেন এবং হলের সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বাসন্তিকা’র জন্য কবিতা লিখে দেন। সুতরাং, বারবার একই মিথ্যা নানাভাবে বললেই তা সত্য হয়ে যায় না।

রবীন্দ্রনাথ ‘বিদেশি’, তাই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ নন: রবীন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন কলকাতায়, ১৮৬১ সালে। বর্তমান রাষ্ট্রসীমার হিসাবে কলকাতা ভারতে কিন্তু এখান থেকে যদি সিদ্ধান্ত হয় যে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের ইতিহাসের ‘বিদেশি ব্যক্তি’, তাহলে উনিশ শতকের ইতিহাসকে ১৯৪৭ ও ১৯৭১-পরবর্তী রাষ্ট্রসীমা দিয়ে বিচার করা হয়।

রবীন্দ্রনাথের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে। পারিবারিক জমিদারি দেখাশোনার সূত্রে তিনি শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসর ও পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। পদ্মা, বাংলার গ্রাম, কৃষক, প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবন তাঁর গল্প, কবিতা ও চিঠিতে গভীর ছাপ ফেলেছে। বাংলাপিডিয়ার জীবনীতেও এই পূর্ববঙ্গ-অভিজ্ঞতাকে তাঁর সাহিত্যিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আরও মৌলিক একটি সত্য আছে। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় প্রতীক–সম্পর্কিত অধ্যাদেশে (The Bangladesh National Anthem, Flag and Emblem Order, 1972) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরচিত এই গানকেই জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৪(১) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’র প্রথম ১০ চরণ।

অতএব রবীন্দ্রনাথ পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য—এটি যেমন সত্য, তেমনি তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংস্কৃতি পাসপোর্ট নিয়ে জন্মায় না। লালনকে শুধু কুষ্টিয়ার, নজরুলকে শুধু বর্ধমানের কিংবা জীবনানন্দকে শুধু বরিশালের সম্পত্তি বানালে যেমন তাঁদের ছোট করা হয়, রবীন্দ্রনাথকেও বর্তমান রাষ্ট্রসীমার খোপে আটকে দিলে একই ভুল হয়।

রবীন্দ্রসাহিত্যে বাংলার মুসলমান জনসংখ্যার আনুপাতিক উপস্থিতি কম বলেই কি তাঁকে মুসলিমবিদ্বেষী বলা যেতে পারে? ঔপনিবেশিক বাংলার উচ্চবর্ণীয় ভদ্রলোক সমাজের সন্তান হিসেবে তাঁর সামাজিক অবস্থান এবং তাঁর সাহিত্যে কোন জনগোষ্ঠী কতটা প্রতিনিধিত্ব পেয়েছে, সেটি অবশ্যই গবেষণার বিষয় হতে পারে কিন্তু ‘মুসলমান চরিত্র তুলনামূলক কম’ থেকে ‘রবীন্দ্রনাথ মুসলিমবিদ্বেষী’—এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে গেলে অনেক ঐতিহাসিক তথ্য অস্বীকার করতে হয়।

সাম্প্রতিক গবেষণায় তাঁর ইসলাম ও মুসলিম সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে যে পূর্ববঙ্গে জমিদারি পরিচালনার সময় তাঁর অধিকাংশ প্রজাই ছিলেন মুসলমান সেই অভিজ্ঞতা হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক সম্পর্কে তাঁর চিন্তাকে প্রভাবিত করে। তিনি পারস্যের সুফি কবি হাফিজ ও সাদির প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন তাঁর রচনায় মুসলমান চরিত্র এবারেই অনুপস্থিত নয়—‘কাবুলিওয়ালা’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘মুসলমানীর গল্প’সহ বিভিন্ন রচনায় তা পাওয়া যায়। বিশ্বভারতীতে ১৯২৭ সালে ইসলামিক স্টাডিজের বিভাগ খোলা হয়, এবং পরে সেখানে পারস্য বিদ্যাচর্চার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।

রবীন্দ্র–সাহিত্যে মুসলিম জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্বের সীমাবদ্ধতা নিয়ে সমালোচনা হয়তো করা যেতে পারে কিন্তু তাঁকে মুসলিমবিদ্বেষী ঘোষণা করার দাবির পক্ষে ইতিহাসের সামগ্রিক সাক্ষ্য অত্যন্ত দুর্বল।

কৃষক-শোষক জমিদার রবীন্দ্রনাথ: এখানেও ইতিহাসকে সাদা-কালো করলে ভুল হবে। রবীন্দ্রনাথ জমিদার পরিবারের সদস্য ছিলেন এবং জমিদারি পরিচালনা করেছেন—এটি কেউ অস্বীকার করে না। ঔপনিবেশিক বাংলার জমিদারিব্যবস্থা নিজেই ছিল বৈষম্যমূলক ভূসম্পর্কের অংশ। সুতরাং রবীন্দ্রনাথের শ্রেণিগত অবস্থান আড়াল করাও সঠিক ইতিহাসচর্চা হয় না।

তাই বলে বিপরীতক্রমে, তাঁকে কেবল ‘অত্যাচারী জমিদার’ বানালেও ঐতিহাসিক তথ্য অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ দারিদ্র্যের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তায় পরিবর্তন আনে। পতিসরে কৃষকদের মহাজনি ঋণ থেকে বের করার লক্ষ্যে তিনি কৃষি ও সমবায়ভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণের উদ্যোগ, গ্রামসংগঠন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি উন্নয়নের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর, রবীন্দ্রনাথ সেই অর্থের প্রায় পুরোটাই (এক লাখ আট হাজার টাকা) নওগাঁর পতিসরে কৃষকদের কল্যাণে বিনিয়োগ করেন। তিনি পতিসরে ‘কৃষি সমবায় ব্যাংক’ স্থাপন করেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় মহাজনদের চড়া সুদ থেকে কৃষকদের রক্ষা করা। ১৯৩০-এর দশকের বিশ্বমন্দা ও ১৯৩৬ সালে ‘বঙ্গীয় ঋণসালিসি আইন’ পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথের বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত আসেনি ফলে ব্যাংকটিও এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের পল্লি পুনর্গঠন-ভাবনায় গ্রামবাসীর সম্মিলিত সক্ষমতা ও আত্মশক্তির উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল।

অতএব ন্যায়সংগত মূল্যায়ন হবে: রবীন্দ্রনাথ জমিদারি কাঠামোর বাইরে ছিলেন না আবার সেই কাঠামোর সুবিধাভোগী হয়েও তিনি মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে গ্রামীণ দারিদ্র্য, ঋণ ও উন্নয়নের সমস্যা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন।

রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমালোচনাগুলোর একটি তাঁর ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী অবস্থান। পূর্ববঙ্গের বহু মুসলমান বঙ্গভঙ্গকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ঢাকাকেন্দ্রিক নতুন প্রদেশ তাঁদের শিক্ষা, প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্ব ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাড়াবে—এমন প্রত্যাশা ছিল। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের তিনটি জমিদারিই ছিল পূর্ববঙ্গে। তাঁর বঙ্গভঙ্গবিরোধী অবস্থানের প্রধান কারণ ছিল তার শ্রেণিস্বার্থ, যা সেই সময়ের পূর্ববঙ্গের মুসলমান জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ স্বদেশি আন্দোলনের উগ্রতা, বর্জনের জবরদস্তি এবং হিন্দু-মুসলমান বিভেদের বিপদ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। গবেষণায় দেখা যায়, পূর্ববঙ্গের দরিদ্র মুসলমান ও নমশূদ্র কৃষকেরা দামি স্বদেশি পণ্যের স্বার্থে সস্তা আমদানি করা কাপড় ও লবণ বর্জনে সব সময় রাজি ছিলেন না এ সংঘাত রবীন্দ্রনাথকে জাতীয়তাবাদের নৈতিক বিপদ সম্পর্কে আরও সতর্ক করে। তাঁর প্রবন্ধ এবং পরে ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে উগ্র জাতীয়তাবাদের এই বিপজ্জনক রূপ সঠিকভাবে আঁকতে পেরেছিলেন। অর্থাৎ তিনি বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলেন—সত্য। তাই তিনি মুসলমানের শত্রু ছিলেন—এটি ইতিহাস থেকে স্বতসিদ্ধভাবে প্রমাণিত হয় না।

আরেকটি সুবিধাজনক প্রচার হলো রবীন্দ্রনাথ নাকি ব্রিটিশপন্থী অভিজাত বা ব্রিটিশদের কবি ছিলেন। তাঁর পরিবার ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার সুবিধাভোগী ছিল—এ কথা অসত্য নয়। ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইট উপাধিও দিয়েছিল কিন্তু ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পর রবীন্দ্রনাথ সেই সম্মানসূচক নাইটহুড উপাধি ত্যাগ করেন। মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে তাঁর জন্য নাইটহুড উপাধি ত্যাগ করা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আনুগত্য ত্যাগ করার সমার্থকই ছিল। তিনি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরোধী ছিলেন কিন্তু একই সঙ্গে বিশ্বাস করতেন—জাতীয়তাবাদ যদি মানুষকে অন্ধ সমষ্টিগত অহংকার, ঘৃণা ও সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়, তবে স্বাধীনতার আন্দোলনও মানবিকতা হারাতে পারে। তাঁর অবস্থানকে তাই সাম্রাজ্যবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদ উভয়ের সমালোচনা হিসেবে দেখা উচিত হবে বলে আধুনিককালের বেশির ভাগ গবেষণাতেই বেরিয়ে এসেছে।

প্রকৃতপক্ষে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজ সময়ের সন্তান। তাঁর শ্রেণি ছিল, সামাজিক অবস্থান ছিল, সীমাবদ্ধতা ছিল। তাঁর নারীবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি, গ্রামভাবনা, জাতীয়তাবাদ, জমিদারি, ধর্ম, রাজনৈতিক কর্মপন্থা—সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন করা যায়। তাঁর কোনো সাহিত্যকর্মকে অতিমূল্যায়িত মনে হলে তা–ও অবলীলায় বলা যায় কিন্তু প্রশ্ন করা আর তাঁর সম্পর্কে অপপ্রচার করা এক নয়।

রবীন্দ্রনাথ কেন বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলেন? তা নিশ্চয় ইতিহাসের গবেষক খুঁজে বের করবেন। তাঁর জমিদারি ও পল্লি উন্নয়ন চিন্তার মধ্যে কি দ্বন্দ্ব ছিল? এটি সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার প্রশ্ন। তাঁর সাহিত্যে মুসলমান সমাজ যথেষ্ট প্রতিনিধিত্ব পেয়েছে কি? সেটি সাহিত্যিক-সমাজতাত্ত্বিক বিষয়। তবে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন—এটি একটি মীমাংসিত তথ্য-যাচাইয়ের বিষয়। এ বিষয়ে বাসস গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে।

তবে রবীন্দ্রনাথের দেয়ালচিত্রে কালিমা লেপন কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনা নয় এটি একটি কুৎসিত ঘরানার হীন রাজনৈতিক প্রচেষ্টা মাত্র।

এই লেখার শুরুতেই পাঠকের জন্য যে প্রশ্ন রেখেছিলাম, সেই প্রশ্ন সঠিক ছিল বলেই মনে হচ্ছে। বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে এই পুনরাবৃত্ত বিরোধের পেছনে সম্ভবত আরও গভীর একটি পরিচয়সংকট কাজ করছে। আমরা কি বাঙালি, নাকি মুসলমান? বাংলাদেশের নাগরিক হতে হলে কি শাশ্বত বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকার পরিত্যাগ করতে হবে? এমন সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিচার কি ন্যায়সংগত?

একজন মানুষের একাধিক পরিচয় পরস্পরকে বাতিল করে না। বাংলাদেশের একজন নাগরিক একই সঙ্গে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান হতে পারেন বাঙালি বা অন্য জাতিসত্তার সদস্য হতে পারেন দক্ষিণ এশীয় ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহন করতে পারেন আবার আধুনিক বিশ্বের নাগরিকও হতে পারেন।

নাগরিকের জাতীয় পরিচয় শূন্য স্থানে বসানোর এমন কোনো একমাত্রিক বস্তু নয় যে সেখানে আর অন্য কোনো পরিচয় রাখার জায়গা হয় না। বাংলাদেশের নাগরিক একই সঙ্গে তার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ইত্যাদি পরিচয় ধারণ করতে পারেন। রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি আলাওল, লালন, হাসন রাজা, নজরুল, শাহ আবদুল করিম, আবদুল হাকিম, বেগম রোকেয়া, মাইকেল মধুসূদন, জসীমউদ্দীন, জীবনানন্দ দাশ, সুফিয়া কামাল প্রমুখও আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের পূর্বপুরুষ—তাঁদের কাউকেই অস্বীকার করার সুযোগ আমাদের নেই। আমরা অসংখ্য লোকজ, বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলিম, বৈষ্ণব, সুফি এবং আধুনিক পাশ্চাত্য চিন্তার উত্তরাধিকার। অসংখ্য সাংস্কৃতিক-সামাজিক স্রোতের মিলনমেলা আমাদের এই বাংলাদেশ।

রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে তাই বাংলাদেশকে আরও বেশি ‘বাংলাদেশি’ করা যায় না। একইভাবে রবীন্দ্রনাথকে সামনে রেখে অন্য ধারার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ছোট করেও বাংলাদেশকে বোঝা যায় না। ইতিহাস বিয়োগের বা নতুন কিছু যোগের অঙ্ক নয়।

১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া রবীন্দ্রনাথ প্রথম এশীয় নোবেল সাহিত্য বিজয়ী হিসেবে বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে স্থান করে নেন। নোবেল কমিটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তাঁর কবিতার সংবেদনশীলতা ও নিজস্ব ইংরেজি রূপান্তরের মাধ্যমে তাঁর চিন্তা পাশ্চাত্য সাহিত্যের অংশ হয়ে ওঠার স্বীকৃতিতেই তাঁকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল।

কিন্তু বাংলাদেশের কাছে তাঁর গুরুত্ব নোবেল পুরস্কারের চেয়েও অন্য উচ্চতায়। এই দেশের নদী, বর্ষা, ধানখেত, গ্রাম, পদ্মার চর, কৃষকের দারিদ্র্য ও মানুষের সম্পর্ক তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বিশ্বসাহিত্যে প্রবেশ করেছে। আর তাঁর লেখা একটি গান স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে গেছে। তাই দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথকে কালো কালি দিয়ে ঢেকে দেওয়া সম্ভব হলেও রবীন্দ্রনাথকে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া সম্ভব নয়। আজ তাই কোনো ব্যক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, মুক্তবুদ্ধিচর্চার পক্ষে দাঁড়ানো।

যেখানে রবীন্দ্রনাথ ভুল করেছেন, সেখানে ইতিহাস তাঁকে প্রশ্ন করুক। যেখানে তাঁর শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতা ছিল, গবেষণা তা দেখাক। বঙ্গভঙ্গের প্রশ্নে পূর্ববঙ্গের মুসলমানের ভিন্ন অভিজ্ঞতা সামনে আসুক। তাঁর জমিদারি নিয়ে বিতর্ক হোক। তাঁর সাহিত্য নতুন প্রজন্ম ভিন্ন চোখে পড়ুক। কেউ তাঁকে ভালোবাসুক, কেউ সমালোচনা করুক।

কিন্তু যে কথা তিনি বলেননি, সেটি তাঁর নামে চালানো যাবে না। যে সভায় তাঁর উপস্থিতির প্রমাণ নেই, সেখানে তাঁকে সভাপতি বানানো যাবে না। বর্তমান রাষ্ট্রসীমা অতীতে বসিয়ে তাঁকে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করা যাবে না। আর রাজনৈতিক অপছন্দের কারণে কোনো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের মুখে কালি মাখিয়ে ইতিহাস পুনর্লিখন করা যায় না।

একটি আত্মবিশ্বাসী জাতি তার ইতিহাসের বড় মানুষদের ভয় পায় না। তাঁদের দেবতা বানায় না, আবার প্রতিকৃতিও মুছে দেয় না। তাদের পড়ে তাদের প্রশ্ন করে তাদের ভুল শনাক্ত করে এবং তাদের অবদানকে ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার নৈতিক সাহস রাখে।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাংলাদেশের আজকের পরীক্ষাটি সম্ভবত এখানেই নিহিত। এটি শেষ পর্যন্ত একজন কবির মর্যাদা রক্ষার পরীক্ষা নয়। এটি আমাদের নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক সততা, সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস এবং ভিন্নমত সহ্য করার ক্ষমতার পরীক্ষা। দেয়ালের ছবিতে কালি লাগলে সেটি আবার আঁকা যায়। তবে একটি সমাজ যখন তথ্যের জায়গায় কল্পকাহিনি, সমালোচনার জায়গায় ঘৃণা এবং ইতিহাসের জায়গায় পরিচয়-রাজনীতিকে বসিয়ে দেয়, তখন যে কালিটা লাগে, সেটি দেয়ালে নয়; লাগে সমাজের সম্মিলিত স্মৃতিতে, বোধে। সেই দাগ মুছতে অনেক বেশি সময় লাগে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা, নাকি বাঙালির বিভাজন

আপডেট সময় : ০৮:১৬:৩৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ শুধু ‘রবীন্দ্রবিরোধিতা’ হিসেবে দেখলে সম্ভবত সমস্যাটির গভীরে পৌঁছানো যাবে না। শিল্পকলা একাডেমির সামনে তাঁর প্রতিকৃতিতে কালি দেওয়া, তাঁকে ঘিরে অবমাননাকর বক্তব্য, তাঁর ইতিহাস ও রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে পুরোনো ও অপ্রমাণিত অভিযোগ নতুন করে প্রচার—এসবের মধ্যে একজন কবির প্রতি বিরাগের চাইতে আরও বেশি কিছু আছে বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা। রবীন্দ্রনাথ শুধু একজন ব্যক্তি নন, শুধু একজন কবি নন তিনি একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়, বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, বাঙালি জাতিসত্তা এবং শেষ বিচারে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। ফলে তাঁর প্রতিকৃতির ওপর আঘাতকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই বরং প্রশ্ন করা উচিত—এই ঘটনার মধ্য দিয়ে কি বাঙালির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে নতুন করে বিতর্কিত করার চেষ্টা হচ্ছে না?

বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন রবীন্দ্রনাথকে ‘হিন্দু’, ‘ভারতীয়’ বা ‘এই দেশের সংস্কৃতির বাইরের মানুষ’ হিসেবে উপস্থাপন করে বাংলাদেশের মুসলিম পরিচয়ের বিপরীতে দাঁড় করানোর প্রবণতা দেখা যায়।

এর মধ্যে একটি পুরোনো রাজনৈতিক বিভাজনের ছায়া স্পষ্ট—বাঙালি সংস্কৃতি বনাম ইসলামি সংস্কৃতি। যেন বাঙালি হতে হলে ইসলামি পরিচয় থেকে দূরে যেতে হবে, অথবা মুসলমানের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষা করতে হলে রবীন্দ্রনাথ, বাংলা নববর্ষ, লোকসংস্কৃতি কিংবা বাংলা ভাষার বহুত্ববাদী ঐতিহ্য থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে হবে। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাস এই দ্বৈততার সাক্ষ্য দেয় না। শত শত বছর ধরে এ ভূখণ্ডের মুসলমানেরা একই সঙ্গে বাঙালি ও মুসলমান—তাঁদের ভাষা বাংলা, তাঁদের লোকজ স্মৃতি বাংলার, আবার তাঁদের বিশ্বাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্য ইসলামের। এই দুই পরিচয়ের সহাবস্থানই বাংলাদেশের সমাজের ঐতিহাসিক বাস্তবতা।

সে কারণেই বর্তমান ঘটনাপ্রবাহকে ‘রবীন্দ্রনাথ বনাম তাঁর সমালোচক’—এই সংকীর্ণ কাঠামোয় আটকে রাখা ঠিক হবে না বরং দেখতে হবে, রবীন্দ্রনাথকে সামনে রেখে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংজ্ঞা নিয়েই নতুন করে একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক লড়াই তৈরি করা হচ্ছে কি না। একদিকে ভাষা, সাহিত্য, লোকজ ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ এবং বহুত্ববাদী বাঙালি সংস্কৃতিকে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখা হয় অন্যদিকে একটি প্রবণতা ধর্মীয় পরিচয়কে জাতীয় সংস্কৃতির প্রধান নির্ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির বিতর্ক নতুন নয়—পাকিস্তান আমলে বাংলা ভাষা, রবীন্দ্রসংগীত এবং বাঙালি সাংস্কৃতিক চর্চাকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় দ্বন্দ্বের মধ্যেও আমরা এর পূর্বসূত্র দেখতে পাই।

লক্ষণীয় যে ‘বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী অভিযান’ বেশ কিছু দিন ধরেই চালু রয়েছে। গত দশকগুলোর বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর সাথে সাম্প্রতিক রবীন্দ্রবিরোধী কার্যক্রমের ঘটনা জোড়া দিলে বুঝতে আর সময় লাগে না যে একটি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পিত ও পরিচালিত বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী অভিযান সারা বাংলাদেশে চলছে। কখনো মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন, কখনো নববর্ষ উদ্যাপন, কখনো রবীন্দ্রনাথ—একটার পর একটা ঘটনা সামনে আসছে। এসব ঘটনার ভাষা, প্রতীক নির্বাচন এবং রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে পুনরুজ্জীবিত কিছু পুরোনো অভিযোগ আমাদের সামনে একটি বড় আকারের জিজ্ঞাসা চিহ্ন নিয়ে উপস্থিত হয়েছে: বাংলাদেশের মানুষকে কি ‘বাঙালি সংস্কৃতি’ ও ‘ইসলামী সংস্কৃতি’—এই দুই কৃত্রিম শিবিরে ভাগ করার চেষ্টা হচ্ছে? এর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের মনে আর একটি প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশ তার বহুমাত্রিক ইতিহাসকে ধারণ করবে, নাকি ধর্ম ও সংস্কৃতিকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়ে নিজের জাতীয় পরিচয়কেই দুই ভাগে বিভক্ত করবে?

এই নিবন্ধে আমরা এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়াসী হব। একই সঙ্গে আমরা রবীন্দ্রনাথের নামে প্রচারিত ইতিহাস, অপ্রমাণিত অভিযোগ এবং সাংস্কৃতিক বিদ্বেষ সম্পর্কেও আলোচনা করব। আমার ধারণা, এই জায়গা থেকেই রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বর্তমান বিতর্কটির আলোচনা হওয়া দরকার। তবে মুক্তবুদ্ধির চর্চা সমুন্নত রাখতে হলে আমাদের প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি ইতিহাসকে তথ্য দিয়ে বিচার করব, নাকি ‘বিশেষ কোনো রাজনৈতিক মতবাদের প্রয়োজন’ অনুযায়ী অতীতকে নতুন করে লিখব?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ভালোবাসতেই হবে—এমন কোনো সাংবিধানিক, নৈতিক বা সাংস্কৃতিক বাধ্যবাধকতা আমাদের কারও নেই। রবীন্দ্রনাথের কবিতা কারও ভালো লাগতে পারে আবার কারও ভালো না-ও লাগতে পারে। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা, জমিদারি, বঙ্গভঙ্গবিরোধী অবস্থান, জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে তাঁর দ্বিধা, এমনকি তাঁর সাহিত্যকেও কঠোরভাবে সমালোচনা করার অধিকার সবারই আছে। কোনো একজন মহান কবি বা বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে তুলে রাখা মোটেও মুক্তবুদ্ধির পরিচয় নয়।

কিন্তু সমালোচনা আর ইতিহাস বিকৃত করা এক বিষয় নয়। সাহিত্যিক পছন্দ-অপছন্দ আর কোনো লেখকের প্রতিকৃতিতে কালি মাখানোও এক কথা নয়। রবীন্দ্রনাথের চিন্তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা আর তাঁকে ‘মুসলিমবিদ্বেষী’, ‘বাংলাদেশবিরোধী’ কিংবা ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধী’ প্রমাণ করতে অপ্রমাণিত কাহিনি প্রচার করাও কোনোভাবেই কাম্য নয়।

৫ অক্টোবর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিসংলগ্ন ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর পাশের দেয়ালে বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত ১০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রতিকৃতি আঁকা হয়। তাঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পাশাপাশি ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, জয়নুল আবেদিন, এস এম সুলতান, জহির রায়হান, শাহ আবদুল করিম, হুমায়ূন ফরীদি, সত্যজিৎ রায় প্রমুখ।

১০ অক্টোবর সেই দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি কালো কালি দিয়ে মুছে ফেলার চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে রাষ্ট্রসংলাপ ফোরামের এক নেতাসহ কয়েকজনকে আটক করে। পরে চারজনকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত মামলার তথ্য অনুযায়ী, দণ্ডবিধির ১২০বি, ১৫৩এ ও ২৯৫এ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে—অর্থাৎ অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা উসকে দেওয়া এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসংক্রান্ত অভিযোগ। ১১ অক্টোবর আদালত দুই আসামিকে তিন দিন এবং অন্য দুজনকে দুই দিনের রিমান্ডে দেন।

পরদিন রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতির সামনে উদীচীর একটি অংশ ‘যে কবি জনতার’ শিরোনামে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের আয়োজন করে।

এর মধ্যেই বিতর্ক পৌঁছায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মার রবীন্দ্রসংগীতের সুর নিয়ে ‘রঠা সংগীত’ নামে একটি বিকৃত ভিডিও প্রকাশ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের অনেকে এ ঘটনার প্রতিবাদ করেন। পরে একজন ছাত্রদল নেতা রাকসু ভবনে রবীন্দ্রনাথের পক্ষে কবি শামসুর রাহমানের বাণী সংবলিত একটি পোস্টার লাগান।

গত ১৩ অক্টোবর ৩৭ জন বিশিষ্ট নাগরিক এক বিবৃতিতে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি দেওয়ার ঘটনাসহ সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির চেষ্টার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

গতকাল ১৪ অক্টোবর, এ ঘটনার জের হিসেবে আদালতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রিমান্ড শেষে দুজন আসামির জামিন শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যেকার উত্তেজনা শারীরিক সংঘর্ষে গড়ায়। বিব্রত বিচারক কিছু সময়ের জন্য এজলাস ছেড়ে যান। একই দিনে জাতীয় কবিতা পরিষদ ঢাকায় ‘অসাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রনাথকে মুছে ফেলা যাবে না’ শিরোনামে কবিতাপাঠ ও আলোচনা আয়োজন করে। সেখানে বক্তারা রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে বিভাজন তৈরির প্রচেষ্টার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। মোদ্দাকথা, ১০ অক্টোবরের দেয়ালচিত্রের ঘটনাটি এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে সীমাবদ্ধ নেই এটি সংগঠিত সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়াও তৈরি করছে।

সব কটি ঘটনা বিবেচনা করলে এটিও অস্বীকার করার উপায় থাকে না যে—রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে পুরোনো কিছু অভিযোগ নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রকাশ্য রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণাও দেখিয়েছে, বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ ও জাতীয় সংগীত দীর্ঘদিন ধরে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মভিত্তিক পরিচয়-রাজনীতির টানাপোড়েনের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। একটা বিশেষ গোষ্ঠী সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সামনে রেখে নানা ধরনের মিথ্যা ও অপতথ্য প্রচারের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথবিরোধী অদ্ভুত এক বয়ান সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথবিরোধী আলোচনায় সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পুনরাবৃত্ত দাবি হলো—তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। কখনো আরও এক ধাপ এগিয়ে তাঁর নামে এমন কথাও প্রচার করা হয় যে পূর্ববঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন নেই কিংবা ‘মূর্খের দেশে আবার কিসের বিশ্ববিদ্যালয়’। সমস্যা হচ্ছে, এসব বক্তব্যের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায় না।

১১ অক্টোবর ২০২৬ বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ফ্যাক্টওয়াচের গবেষণালব্ধ তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন—এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বহুল প্রচারিত কাহিনিতে বলা হয়েছিল, ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধী সভায় রবীন্দ্রনাথ সভাপতিত্ব করেছিলেন। অবশ্য তাঁর দিনপঞ্জির সঙ্গেও সেই দাবির অসংগতি রয়েছে।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ইতিহাসে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। ১৯২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল পরিদর্শন করেন এবং হলের সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বাসন্তিকা’র জন্য কবিতা লিখে দেন। সুতরাং, বারবার একই মিথ্যা নানাভাবে বললেই তা সত্য হয়ে যায় না।

রবীন্দ্রনাথ ‘বিদেশি’, তাই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ নন: রবীন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন কলকাতায়, ১৮৬১ সালে। বর্তমান রাষ্ট্রসীমার হিসাবে কলকাতা ভারতে কিন্তু এখান থেকে যদি সিদ্ধান্ত হয় যে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের ইতিহাসের ‘বিদেশি ব্যক্তি’, তাহলে উনিশ শতকের ইতিহাসকে ১৯৪৭ ও ১৯৭১-পরবর্তী রাষ্ট্রসীমা দিয়ে বিচার করা হয়।

রবীন্দ্রনাথের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে। পারিবারিক জমিদারি দেখাশোনার সূত্রে তিনি শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসর ও পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। পদ্মা, বাংলার গ্রাম, কৃষক, প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবন তাঁর গল্প, কবিতা ও চিঠিতে গভীর ছাপ ফেলেছে। বাংলাপিডিয়ার জীবনীতেও এই পূর্ববঙ্গ-অভিজ্ঞতাকে তাঁর সাহিত্যিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আরও মৌলিক একটি সত্য আছে। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় প্রতীক–সম্পর্কিত অধ্যাদেশে (The Bangladesh National Anthem, Flag and Emblem Order, 1972) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরচিত এই গানকেই জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৪(১) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’র প্রথম ১০ চরণ।

অতএব রবীন্দ্রনাথ পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য—এটি যেমন সত্য, তেমনি তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংস্কৃতি পাসপোর্ট নিয়ে জন্মায় না। লালনকে শুধু কুষ্টিয়ার, নজরুলকে শুধু বর্ধমানের কিংবা জীবনানন্দকে শুধু বরিশালের সম্পত্তি বানালে যেমন তাঁদের ছোট করা হয়, রবীন্দ্রনাথকেও বর্তমান রাষ্ট্রসীমার খোপে আটকে দিলে একই ভুল হয়।

রবীন্দ্রসাহিত্যে বাংলার মুসলমান জনসংখ্যার আনুপাতিক উপস্থিতি কম বলেই কি তাঁকে মুসলিমবিদ্বেষী বলা যেতে পারে? ঔপনিবেশিক বাংলার উচ্চবর্ণীয় ভদ্রলোক সমাজের সন্তান হিসেবে তাঁর সামাজিক অবস্থান এবং তাঁর সাহিত্যে কোন জনগোষ্ঠী কতটা প্রতিনিধিত্ব পেয়েছে, সেটি অবশ্যই গবেষণার বিষয় হতে পারে কিন্তু ‘মুসলমান চরিত্র তুলনামূলক কম’ থেকে ‘রবীন্দ্রনাথ মুসলিমবিদ্বেষী’—এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে গেলে অনেক ঐতিহাসিক তথ্য অস্বীকার করতে হয়।

সাম্প্রতিক গবেষণায় তাঁর ইসলাম ও মুসলিম সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে যে পূর্ববঙ্গে জমিদারি পরিচালনার সময় তাঁর অধিকাংশ প্রজাই ছিলেন মুসলমান সেই অভিজ্ঞতা হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক সম্পর্কে তাঁর চিন্তাকে প্রভাবিত করে। তিনি পারস্যের সুফি কবি হাফিজ ও সাদির প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন তাঁর রচনায় মুসলমান চরিত্র এবারেই অনুপস্থিত নয়—‘কাবুলিওয়ালা’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘মুসলমানীর গল্প’সহ বিভিন্ন রচনায় তা পাওয়া যায়। বিশ্বভারতীতে ১৯২৭ সালে ইসলামিক স্টাডিজের বিভাগ খোলা হয়, এবং পরে সেখানে পারস্য বিদ্যাচর্চার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।

রবীন্দ্র–সাহিত্যে মুসলিম জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্বের সীমাবদ্ধতা নিয়ে সমালোচনা হয়তো করা যেতে পারে কিন্তু তাঁকে মুসলিমবিদ্বেষী ঘোষণা করার দাবির পক্ষে ইতিহাসের সামগ্রিক সাক্ষ্য অত্যন্ত দুর্বল।

কৃষক-শোষক জমিদার রবীন্দ্রনাথ: এখানেও ইতিহাসকে সাদা-কালো করলে ভুল হবে। রবীন্দ্রনাথ জমিদার পরিবারের সদস্য ছিলেন এবং জমিদারি পরিচালনা করেছেন—এটি কেউ অস্বীকার করে না। ঔপনিবেশিক বাংলার জমিদারিব্যবস্থা নিজেই ছিল বৈষম্যমূলক ভূসম্পর্কের অংশ। সুতরাং রবীন্দ্রনাথের শ্রেণিগত অবস্থান আড়াল করাও সঠিক ইতিহাসচর্চা হয় না।

তাই বলে বিপরীতক্রমে, তাঁকে কেবল ‘অত্যাচারী জমিদার’ বানালেও ঐতিহাসিক তথ্য অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ দারিদ্র্যের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তায় পরিবর্তন আনে। পতিসরে কৃষকদের মহাজনি ঋণ থেকে বের করার লক্ষ্যে তিনি কৃষি ও সমবায়ভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণের উদ্যোগ, গ্রামসংগঠন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি উন্নয়নের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর, রবীন্দ্রনাথ সেই অর্থের প্রায় পুরোটাই (এক লাখ আট হাজার টাকা) নওগাঁর পতিসরে কৃষকদের কল্যাণে বিনিয়োগ করেন। তিনি পতিসরে ‘কৃষি সমবায় ব্যাংক’ স্থাপন করেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় মহাজনদের চড়া সুদ থেকে কৃষকদের রক্ষা করা। ১৯৩০-এর দশকের বিশ্বমন্দা ও ১৯৩৬ সালে ‘বঙ্গীয় ঋণসালিসি আইন’ পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথের বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত আসেনি ফলে ব্যাংকটিও এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের পল্লি পুনর্গঠন-ভাবনায় গ্রামবাসীর সম্মিলিত সক্ষমতা ও আত্মশক্তির উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল।

অতএব ন্যায়সংগত মূল্যায়ন হবে: রবীন্দ্রনাথ জমিদারি কাঠামোর বাইরে ছিলেন না আবার সেই কাঠামোর সুবিধাভোগী হয়েও তিনি মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে গ্রামীণ দারিদ্র্য, ঋণ ও উন্নয়নের সমস্যা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন।

রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমালোচনাগুলোর একটি তাঁর ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী অবস্থান। পূর্ববঙ্গের বহু মুসলমান বঙ্গভঙ্গকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ঢাকাকেন্দ্রিক নতুন প্রদেশ তাঁদের শিক্ষা, প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্ব ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাড়াবে—এমন প্রত্যাশা ছিল। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের তিনটি জমিদারিই ছিল পূর্ববঙ্গে। তাঁর বঙ্গভঙ্গবিরোধী অবস্থানের প্রধান কারণ ছিল তার শ্রেণিস্বার্থ, যা সেই সময়ের পূর্ববঙ্গের মুসলমান জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ স্বদেশি আন্দোলনের উগ্রতা, বর্জনের জবরদস্তি এবং হিন্দু-মুসলমান বিভেদের বিপদ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। গবেষণায় দেখা যায়, পূর্ববঙ্গের দরিদ্র মুসলমান ও নমশূদ্র কৃষকেরা দামি স্বদেশি পণ্যের স্বার্থে সস্তা আমদানি করা কাপড় ও লবণ বর্জনে সব সময় রাজি ছিলেন না এ সংঘাত রবীন্দ্রনাথকে জাতীয়তাবাদের নৈতিক বিপদ সম্পর্কে আরও সতর্ক করে। তাঁর প্রবন্ধ এবং পরে ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে উগ্র জাতীয়তাবাদের এই বিপজ্জনক রূপ সঠিকভাবে আঁকতে পেরেছিলেন। অর্থাৎ তিনি বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলেন—সত্য। তাই তিনি মুসলমানের শত্রু ছিলেন—এটি ইতিহাস থেকে স্বতসিদ্ধভাবে প্রমাণিত হয় না।

আরেকটি সুবিধাজনক প্রচার হলো রবীন্দ্রনাথ নাকি ব্রিটিশপন্থী অভিজাত বা ব্রিটিশদের কবি ছিলেন। তাঁর পরিবার ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার সুবিধাভোগী ছিল—এ কথা অসত্য নয়। ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইট উপাধিও দিয়েছিল কিন্তু ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পর রবীন্দ্রনাথ সেই সম্মানসূচক নাইটহুড উপাধি ত্যাগ করেন। মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে তাঁর জন্য নাইটহুড উপাধি ত্যাগ করা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আনুগত্য ত্যাগ করার সমার্থকই ছিল। তিনি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরোধী ছিলেন কিন্তু একই সঙ্গে বিশ্বাস করতেন—জাতীয়তাবাদ যদি মানুষকে অন্ধ সমষ্টিগত অহংকার, ঘৃণা ও সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়, তবে স্বাধীনতার আন্দোলনও মানবিকতা হারাতে পারে। তাঁর অবস্থানকে তাই সাম্রাজ্যবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদ উভয়ের সমালোচনা হিসেবে দেখা উচিত হবে বলে আধুনিককালের বেশির ভাগ গবেষণাতেই বেরিয়ে এসেছে।

প্রকৃতপক্ষে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজ সময়ের সন্তান। তাঁর শ্রেণি ছিল, সামাজিক অবস্থান ছিল, সীমাবদ্ধতা ছিল। তাঁর নারীবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি, গ্রামভাবনা, জাতীয়তাবাদ, জমিদারি, ধর্ম, রাজনৈতিক কর্মপন্থা—সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন করা যায়। তাঁর কোনো সাহিত্যকর্মকে অতিমূল্যায়িত মনে হলে তা–ও অবলীলায় বলা যায় কিন্তু প্রশ্ন করা আর তাঁর সম্পর্কে অপপ্রচার করা এক নয়।

রবীন্দ্রনাথ কেন বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলেন? তা নিশ্চয় ইতিহাসের গবেষক খুঁজে বের করবেন। তাঁর জমিদারি ও পল্লি উন্নয়ন চিন্তার মধ্যে কি দ্বন্দ্ব ছিল? এটি সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার প্রশ্ন। তাঁর সাহিত্যে মুসলমান সমাজ যথেষ্ট প্রতিনিধিত্ব পেয়েছে কি? সেটি সাহিত্যিক-সমাজতাত্ত্বিক বিষয়। তবে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন—এটি একটি মীমাংসিত তথ্য-যাচাইয়ের বিষয়। এ বিষয়ে বাসস গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে।

তবে রবীন্দ্রনাথের দেয়ালচিত্রে কালিমা লেপন কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনা নয় এটি একটি কুৎসিত ঘরানার হীন রাজনৈতিক প্রচেষ্টা মাত্র।

এই লেখার শুরুতেই পাঠকের জন্য যে প্রশ্ন রেখেছিলাম, সেই প্রশ্ন সঠিক ছিল বলেই মনে হচ্ছে। বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে এই পুনরাবৃত্ত বিরোধের পেছনে সম্ভবত আরও গভীর একটি পরিচয়সংকট কাজ করছে। আমরা কি বাঙালি, নাকি মুসলমান? বাংলাদেশের নাগরিক হতে হলে কি শাশ্বত বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকার পরিত্যাগ করতে হবে? এমন সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিচার কি ন্যায়সংগত?

একজন মানুষের একাধিক পরিচয় পরস্পরকে বাতিল করে না। বাংলাদেশের একজন নাগরিক একই সঙ্গে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান হতে পারেন বাঙালি বা অন্য জাতিসত্তার সদস্য হতে পারেন দক্ষিণ এশীয় ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহন করতে পারেন আবার আধুনিক বিশ্বের নাগরিকও হতে পারেন।

নাগরিকের জাতীয় পরিচয় শূন্য স্থানে বসানোর এমন কোনো একমাত্রিক বস্তু নয় যে সেখানে আর অন্য কোনো পরিচয় রাখার জায়গা হয় না। বাংলাদেশের নাগরিক একই সঙ্গে তার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ইত্যাদি পরিচয় ধারণ করতে পারেন। রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি আলাওল, লালন, হাসন রাজা, নজরুল, শাহ আবদুল করিম, আবদুল হাকিম, বেগম রোকেয়া, মাইকেল মধুসূদন, জসীমউদ্দীন, জীবনানন্দ দাশ, সুফিয়া কামাল প্রমুখও আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের পূর্বপুরুষ—তাঁদের কাউকেই অস্বীকার করার সুযোগ আমাদের নেই। আমরা অসংখ্য লোকজ, বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলিম, বৈষ্ণব, সুফি এবং আধুনিক পাশ্চাত্য চিন্তার উত্তরাধিকার। অসংখ্য সাংস্কৃতিক-সামাজিক স্রোতের মিলনমেলা আমাদের এই বাংলাদেশ।

রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে তাই বাংলাদেশকে আরও বেশি ‘বাংলাদেশি’ করা যায় না। একইভাবে রবীন্দ্রনাথকে সামনে রেখে অন্য ধারার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ছোট করেও বাংলাদেশকে বোঝা যায় না। ইতিহাস বিয়োগের বা নতুন কিছু যোগের অঙ্ক নয়।

১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া রবীন্দ্রনাথ প্রথম এশীয় নোবেল সাহিত্য বিজয়ী হিসেবে বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে স্থান করে নেন। নোবেল কমিটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তাঁর কবিতার সংবেদনশীলতা ও নিজস্ব ইংরেজি রূপান্তরের মাধ্যমে তাঁর চিন্তা পাশ্চাত্য সাহিত্যের অংশ হয়ে ওঠার স্বীকৃতিতেই তাঁকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল।

কিন্তু বাংলাদেশের কাছে তাঁর গুরুত্ব নোবেল পুরস্কারের চেয়েও অন্য উচ্চতায়। এই দেশের নদী, বর্ষা, ধানখেত, গ্রাম, পদ্মার চর, কৃষকের দারিদ্র্য ও মানুষের সম্পর্ক তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বিশ্বসাহিত্যে প্রবেশ করেছে। আর তাঁর লেখা একটি গান স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে গেছে। তাই দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথকে কালো কালি দিয়ে ঢেকে দেওয়া সম্ভব হলেও রবীন্দ্রনাথকে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া সম্ভব নয়। আজ তাই কোনো ব্যক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, মুক্তবুদ্ধিচর্চার পক্ষে দাঁড়ানো।

যেখানে রবীন্দ্রনাথ ভুল করেছেন, সেখানে ইতিহাস তাঁকে প্রশ্ন করুক। যেখানে তাঁর শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতা ছিল, গবেষণা তা দেখাক। বঙ্গভঙ্গের প্রশ্নে পূর্ববঙ্গের মুসলমানের ভিন্ন অভিজ্ঞতা সামনে আসুক। তাঁর জমিদারি নিয়ে বিতর্ক হোক। তাঁর সাহিত্য নতুন প্রজন্ম ভিন্ন চোখে পড়ুক। কেউ তাঁকে ভালোবাসুক, কেউ সমালোচনা করুক।

কিন্তু যে কথা তিনি বলেননি, সেটি তাঁর নামে চালানো যাবে না। যে সভায় তাঁর উপস্থিতির প্রমাণ নেই, সেখানে তাঁকে সভাপতি বানানো যাবে না। বর্তমান রাষ্ট্রসীমা অতীতে বসিয়ে তাঁকে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করা যাবে না। আর রাজনৈতিক অপছন্দের কারণে কোনো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের মুখে কালি মাখিয়ে ইতিহাস পুনর্লিখন করা যায় না।

একটি আত্মবিশ্বাসী জাতি তার ইতিহাসের বড় মানুষদের ভয় পায় না। তাঁদের দেবতা বানায় না, আবার প্রতিকৃতিও মুছে দেয় না। তাদের পড়ে তাদের প্রশ্ন করে তাদের ভুল শনাক্ত করে এবং তাদের অবদানকে ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার নৈতিক সাহস রাখে।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাংলাদেশের আজকের পরীক্ষাটি সম্ভবত এখানেই নিহিত। এটি শেষ পর্যন্ত একজন কবির মর্যাদা রক্ষার পরীক্ষা নয়। এটি আমাদের নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক সততা, সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস এবং ভিন্নমত সহ্য করার ক্ষমতার পরীক্ষা। দেয়ালের ছবিতে কালি লাগলে সেটি আবার আঁকা যায়। তবে একটি সমাজ যখন তথ্যের জায়গায় কল্পকাহিনি, সমালোচনার জায়গায় ঘৃণা এবং ইতিহাসের জায়গায় পরিচয়-রাজনীতিকে বসিয়ে দেয়, তখন যে কালিটা লাগে, সেটি দেয়ালে নয়; লাগে সমাজের সম্মিলিত স্মৃতিতে, বোধে। সেই দাগ মুছতে অনেক বেশি সময় লাগে।