জমি দান বা হেবায় দানকর, আয়কর ও সম্পত্তি হস্তান্তরের হিসাব কীভাবে করবেন
- আপডেট সময় : ০৮:৪৪:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে জমি বা অন্যান্য সম্পত্তি হস্তান্তরের প্রচলিত পদ্ধতি হলো দান বা হেবা। তবে এ ধরনের হস্তান্তরে কর প্রযোজ্য কি না, তা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। কেউ মনে করেন, হেবা করলেই কর দিতে হবে। আবার কারও ধারণা, পারিবারিক দান সম্পূর্ণ করমুক্ত। বাস্তবে করদায় নির্ভর করে লেনদেনের প্রকৃতি ও প্রযোজ্য আইনের ওপর। এ ক্ষেত্রে দানকর, আয়কর ও সম্পত্তি হস্তান্তরের সময় সংগৃহীত কর পৃথকভাবে বিবেচ্য।
অর্থ আইন, ২০২৬–এর মাধ্যমে আয়কর আইন, ২০২৩–এর ধারা ১২৫–এ উপধারা (২ক) সংযোজন এবং এনবিআরের গত ৭ জুলাইয়ের স্পষ্টীকরণে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়েছে। দানকর আইন, ১৯৯০ প্রযোজ্য হলে ওই আইন অনুযায়ী কর নির্ধারিত হবে। তবে চূড়ান্ত করদায় নির্ভর করবে দাতা–গ্রহীতার সম্পর্ক, সম্পত্তির মূল্য ও আইনগত অব্যাহতির ওপর।
দানকর আইন, ১৯৯০–এর ধারা ২ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ও বিনা প্রতিদানে অন্য ব্যক্তিকে নগদ অর্থ, জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাটসহ স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করলে তা ‘দান’ হিসেবে গণ্য হতে পারে। এ ক্ষেত্রে দলিলে ‘দান’, ‘উপহার’, ‘হেবা’ বা অন্য কোনো নাম ব্যবহারের চেয়ে লেনদেনের প্রকৃত বৈশিষ্ট্যই গুরুত্বপূর্ণ। একই আইনের ধারা ৩ অনুযায়ী, ১ জুলাই ১৯৯০ থেকে প্রদত্ত দানের ওপর নির্ধারিত হারে দানকর প্রযোজ্য, যদি আইনগত অব্যাহতি না থাকে। দানকর মূলত দানকারীর দায়। তাই দানকারীর দানকর ও দানগ্রহীতার আয়কর দায় সম্পূর্ণ পৃথক বিষয়।
কোথায়, কাকে দান করলে দানকর অব্যাহতি
দানকর আইন, ১৯৯০–এর ধারা ৪ অনুযায়ী, বাংলাদেশের বাইরে অবস্থিত সম্পত্তি, সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে প্রদত্ত দান এবং নির্ধারিত শর্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, দুর্যোগ তহবিল ও ধর্মীয় বা দাতব্য প্রতিষ্ঠানে করা দান দানকরমুক্ত। এ ছাড়া নির্ভরশীল আত্মীয়ের বিবাহে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকার দান, নির্দিষ্ট বিমা বা বার্ষিক বৃত্তির পলিসি, উইল বা অসিয়ত এবং মৃত্যুশয্যাজনিত দানও অব্যাহতিপ্রাপ্ত। পুত্র, কন্যা, পিতা, মাতা, স্বামী, স্ত্রী ও আপন ভাই–বোনকে করা দানও দানকরমুক্ত।
এসব অব্যাহতির বাইরে কোনো ব্যক্তি একটি অর্থবছরে সর্বমোট ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দান করলে তা দানকরমুক্ত থাকবে। তবে এই করমুক্ত সীমা প্রতিটি পৃথক দান বা দলিলের জন্য নয়; বরং সংশ্লিষ্ট অর্থবছরে দাতার করা সব প্রযোজ্য দানের সম্মিলিত মূল্যের ওপর প্রযোজ্য হবে। সরকার গেজেটের মাধ্যমেও শর্তসাপেক্ষে অব্যাহতি দিতে পারে। তবে দাদা–নাতি, নানা–নাতনি, চাচা–ভাতিজা, মামা–ভাগনে বা বন্ধুদের মধ্যে দান শুধু সম্পর্কের কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে করমুক্ত নয়। সে ক্ষেত্রে অন্য কোনো আইনগত অব্যাহতি প্রযোজ্য কি না, তা যাচাই করতে হবে।
জমি বা ফ্ল্যাটের মূল্য কীভাবে নির্ধারণ
জমি, ফ্ল্যাট, ভবন বা অন্য কোনো অ–নগদ সম্পত্তি দান করা হলে দানকর আইন, ১৯৯০–এর ধারা ৫ গুরুত্বপূর্ণ। ধারা ৫ অনুযায়ী, দান হিসেবে হস্তান্তরিত অ–নগদ সম্পত্তির মূল্য হবে দানের তারিখে সম্পত্তিটি খোলাবাজারে যে মূল্যে বিক্রি হতে পারত, সেই মূল্য। তাই দানপত্রে কম মূল্য লেখা থাকলেই করের হিসাবেও সেই মূল্য গ্রহণ করতে হবে—এমন নয়। কোনো সম্পত্তির খোলাবাজারের মূল্য নির্ধারণ সম্ভব না হলে ধারা ৫ অনুযায়ী বিধিতে নির্ধারিত পদ্ধতিতে মূল্য নিরূপণের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে দলিলে উল্লেখিত মূল্য এবং কর আইনের উদ্দেশ্যে নির্ধারিত মূল্য একই না–ও হতে পারে।
দানকর আইন, ১৯৯০–এর তফসিলে করযোগ্য দানের মূল্যের ওপর ধাপভিত্তিক করহার নির্ধারিত রয়েছে। দানের ক্ষেত্রে সম্পত্তি কিংবা নগদ অর্থের প্রথম ৫ লাখ টাকার ওপর ৫ শতাংশ, পরবর্তী ১০ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী ২০ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট অংশের ওপর ২০ শতাংশ হারে দানকর প্রযোজ্য। এই হারগুলো ধাপভিত্তিক। অর্থাৎ কোনো দানের পুরো মূল্যের ওপর সরাসরি ২০ শতাংশ কর আরোপ করা যাবে না; বরং প্রতিটি ধাপের অংশের ওপর সংশ্লিষ্ট হার প্রয়োগ করতে হবে।
দানকর আইন, ১৯৯০–এর ধারা ৭ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি আর্থিক বছরে করযোগ্য দান করলে পরবর্তী কর বছরের ১৫ সেপ্টেম্বরের আগে নির্ধারিত ফরমে সংশ্লিষ্ট উপ–কর কমিশনারের কাছে দানের রিটার্ন দাখিল করতে হবে। উপ–কর কমিশনার কোনো দান করযোগ্য মনে করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নোটিশ দিয়ে রিটার্ন দাখিলের নির্দেশ দিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩০ দিন সময় দিতে হবে। তবে প্রয়োজন বা যুক্তিসংগত কারণ থাকলে উপ–কর কমিশনার রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বৃদ্ধি করতে পারবেন।
দানকর ও দানগ্রহীতার আয়কর এক বিষয় নয়
দানকর ও আয়কর দুটি পৃথক বিষয়। আয়কর আইন, ২০২৩–এর ধারা ৬৬ অনুযায়ী, দান, অনুদান বা উপহার ‘অন্যান্য উৎস হতে আয়’ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে কোনো দান দানকরমুক্ত হলেই তা গ্রহীতার হাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আয়করমুক্ত হবে—এমন নয়। তবে ষষ্ঠ তফসিলের অংশ–১–এর দফা ৩৫ অনুযায়ী, স্বামী–স্ত্রী, আপন ভাই–বোন, মাতা–পিতা ও সন্তানের কাছ থেকে প্রাপ্ত দান আয়করমুক্ত, যদি উভয়ের রিটার্নে তা প্রদর্শিত হয়। তবে বিদেশে অবস্থানরত দাতা ব্যাংকিং চ্যানেলে দান পাঠালে তাঁর রিটার্নে প্রদর্শনের শর্ত প্রযোজ্য নয়।
সম্পত্তি হস্তান্তর ও হেবার ক্ষেত্রে করণীয়
সম্পত্তি হেবা বা দানের মাধ্যমে হস্তান্তরের করব্যবস্থা সাধারণ ক্রয়–বিক্রয় থেকে আলাদা। ক্রয়–বিক্রয়ের ক্ষেত্রে আয়কর আইন, ২০২৩–এর ধারা ১২৫ অনুযায়ী উৎসে কর প্রযোজ্য হলেও হেবা বা দানের ক্ষেত্রে দানকর আইন প্রযোজ্য হতে পারে। তবে সব হেবা বা দানপত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দানকর আরোপিত হয় না। কর নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট লেনদেন দানকর আইনের আওতাভুক্ত কি না, ধারা ৪ অনুযায়ী কোনো অব্যাহতি রয়েছে কি না এবং ২০ হাজার টাকার সাধারণ অব্যাহতি প্রযোজ্য কি না, তা যাচাই করতে হবে। এরপর সম্পত্তির করযোগ্য মূল্য ও আইনের তফসিল অনুযায়ী প্রকৃত দানকর নির্ধারিত হবে। তাই হেবা ও ক্রয়–বিক্রয়ের ক্ষেত্রে পৃথক করের বিধান বিবেচনা করা জরুরি।
২০২৬ সালের অর্থ আইনের মাধ্যমে আয়কর আইন, ২০২৩–এর ধারা ১২৫–এ নতুন উপধারা (২ক) সংযোজন করা হয়েছে, যা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর। এ বিধান অনুযায়ী, কোনো সম্পত্তি হেবা বা দানের মাধ্যমে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দানকর আইন, ১৯৯০ প্রযোজ্য হলে নিবন্ধনকারী কর্মকর্তা এ–চালানের মাধ্যমে প্রযোজ্য দানকর সংগ্রহ করবেন এবং আলাদা করে উৎসে কর সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা নেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ৭ জুলাইয়ের স্পষ্টীকরণেও বলা হয়েছে, উপধারা (২ক) হেবা বা দানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; সাধারণ ক্রয়–বিক্রয়ের ক্ষেত্রে নয়।
দলিলে ‘হেবা’ শব্দ ব্যবহৃত হলেই তা কর আইনের দৃষ্টিতে দানের বাইরে চলে যায় না। মুসলিম আইনে হেবার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২–এ এর বিশেষ স্বীকৃতিও রয়েছে। তবে কর নির্ধারণে দলিলের নাম নয়, লেনদেনের প্রকৃত আইনগত ও আর্থিক চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ। হেবা হলেই দানকর, আয়কর বা সম্পত্তি হস্তান্তর–সংক্রান্ত অন্যান্য কর থেকে স্বয়ংক্রিয় অব্যাহতি পাওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে হস্তান্তরটি স্বেচ্ছায় ও বিনা প্রতিদানে হয়েছে কি না, দাতা–গ্রহীতার সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট কর আইনের অব্যাহতি যাচাই করতে হবে। অর্থাৎ হেবা একটি বিশেষ আইনগত পদ্ধতি হলেও করদায় নির্ধারিত হবে লেনদেনের প্রকৃতি ও প্রযোজ্য আয়কর আইনের বিধানের ভিত্তিতে।
ফয়সাল ইসলাম, ফেলো চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও আর্থিক খাত বিশ্লেষক



















