ঢাকা ০২:১২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নদ পেরিয়ে বাঁচার লড়াই

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০১:০৮:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

চারদিকে হালকা কুয়াশা। পূর্ব আকাশে সূর্যের আভা ফুটতে শুরু করেছে মাত্র। এরই মধ্যে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পাশ দিয়ে বয়ে চলা ব্রহ্মপুত্র নদের উদীচী ঘাট। জীবিকার তাগিদে ওপার থেকে এপারে ছুটে আসছেন অনেকে। কারও মাথায় বাঁশের ডালায় সাজানো মিষ্টিকুমড়া, কারও হাতে বেগুন কিংবা টাটকা শাকসবজি। কেউ আবার সাইকেল নিয়ে অপেক্ষা করছেন নৌকার জন্য। নৌকা ঘাটে ভিড়তেই শুরু হয় ওঠানামার ব্যস্ততা। সবার লক্ষ্য একটাই। সময়মতো পৌঁছাতে হবে গন্তব্যে।

ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারের চর থেকে এপারে আসা এসব মানুষের কাছে এটি নিছক নদ পারাপার নয়। বরং জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিনের এক অনিবার্য যাত্রা। তাদের উৎপাদিত ফসলের বাজার, কাজের ক্ষেত্র কিংবা প্রয়োজনীয় গন্তব্য নদীর এপারে। তাই ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই শুরু হয় দিনভর পরিশ্রমের প্রথম ধাপ। নদ পারাপার।

.

ঘাটে দেখা যায় কৃষকেরা নিজেদের উৎপাদিত শাকসবজি বাঁশের ডালা, ঝুড়ি কিংবা বস্তায় করে নৌকায় তুলছেন। কারও সঙ্গে রয়েছে সাইকেল। নদ পার হয়ে কেউ যাবেন স্থানীয় বাজারে, কেউ পণ্য পৌঁছে দেবেন পরিচিত ক্রেতার কাছে। সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো তাঁদের লক্ষ্য।

.

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: ns@prothomalo.com

.

নদকে ঘিরে উদীচী ঘাটে গড়ে উঠেছে দুই পারের মানুষের নিবিড় যোগাযোগ। এক পাশে বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যস্ত জীবন। অন্য পাশে চরাঞ্চলের কৃষি, শ্রম ও জীবিকার নানা আয়োজন। মাঝখানে বয়ে চলা নদটি দুই পারের মানুষের যাতায়াত ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হয়ে উঠেছে।

এই যাতায়াতের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরও কয়েকটি পরিবারের উপার্জন। নৌকা পারাপারের ভাড়া, পণ্য ওঠানো-নামানোর শ্রম এবং নদ পার হয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছানোর পরিবহন। সব মিলিয়ে ঘাটকে কেন্দ্র করে সচল রয়েছে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চক্র।

.

উদীচী ঘাটের ব্যস্ততা কেবল কৃষিপণ্য পরিবহনে সীমাবদ্ধ নয়। এই ঘাটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাকৃবিতে অবস্থানরত শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ আশপাশ এলাকার মানুষের দৈনন্দিন জীবন। নদীর ওপার থেকে অনেকে কাজের প্রয়োজনে এপারে আসেন। তাঁদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোয় কাজ করেন। কেউবা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বিভিন্ন হোটেল ও খাবারের দোকানে শ্রম দেন। ফলে ঘাটটি হয়ে উঠেছে যাতায়াত, জীবিকা ও কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছেও ব্রহ্মপুত্রের এই পাড় পরিচিত একটি জায়গা। ক্লাস ও হলের ব্যস্ততার বাইরে বিকেলে অনেকেই নদীর পাড়ে আসেন। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন, কেউ উপভোগ করেন নদীর শান্ত পরিবেশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের মানুষও অবসর কাটাতে এখানে আসেন।

ঘাটের আশপাশে সারি সারি ছোট দোকানে বিক্রি হয় ফুচকা, চটপটিসহ নানা মুখরোচক খাবার। বিকেল গড়ালে এসব দোকানে ভিড় বাড়তে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ আসেন নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে। নদীর বাতাস, খোলামেলা পরিবেশ আর বিভিন্ন খাবার সব মিলিয়ে বিকেলের দিকে ঘাটটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।

.

তবে এই পরিচিত দৃশ্যের আড়ালে রয়েছে বহু মানুষের উপার্জনের হিসাব। নৌকার মাঝি থেকে শুরু করে খাবারের দোকানি, প্রত্যেকের জীবিকার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত এই ঘাট। কারও উপার্জন নির্ভর করে নদ পারাপারের ওপর, কারও আয় আসে যাত্রী ও দর্শনার্থীদের ঘিরে গড়ে ওঠা ছোট ব্যবসা থেকে।

ব্রহ্মপুত্রের ওপারের মানুষের কাছে এপার মানে শুধু নদীর অন্য তীর নয়। জীবিকার নতুন সুযোগ। অন্যদিকে বাকৃবি ও আশপাশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও নদটির রয়েছে আলাদা উপস্থিতি। কৃষিপণ্য পরিবহন, শ্রম, যাতায়াত ও মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে দুই পাড়ের মধ্যে তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক।

নদীর স্রোত বদলায়। ঘাটে মানুষের ভিড় কখনো বাড়ে, কখনো কমে। কিন্তু জীবিকার প্রয়োজনে নৌকায় ওঠা মানুষগুলোর যাত্রা থেমে থাকে না।

বাকৃবির পাশ দিয়ে বয়ে চলা ব্রহ্মপুত্র তাই শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উৎস নয়। নদের এ ঘাটকে ঘিরে প্রতিদিন চলতে থাকে মানুষের যাতায়াত ও বেঁচে থাকার নিরন্তর চেষ্টা।

  • সাইয়্যেদা গালিবা রুহী, শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

নদ পেরিয়ে বাঁচার লড়াই

আপডেট সময় : ০১:০৮:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

চারদিকে হালকা কুয়াশা। পূর্ব আকাশে সূর্যের আভা ফুটতে শুরু করেছে মাত্র। এরই মধ্যে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পাশ দিয়ে বয়ে চলা ব্রহ্মপুত্র নদের উদীচী ঘাট। জীবিকার তাগিদে ওপার থেকে এপারে ছুটে আসছেন অনেকে। কারও মাথায় বাঁশের ডালায় সাজানো মিষ্টিকুমড়া, কারও হাতে বেগুন কিংবা টাটকা শাকসবজি। কেউ আবার সাইকেল নিয়ে অপেক্ষা করছেন নৌকার জন্য। নৌকা ঘাটে ভিড়তেই শুরু হয় ওঠানামার ব্যস্ততা। সবার লক্ষ্য একটাই। সময়মতো পৌঁছাতে হবে গন্তব্যে।

ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারের চর থেকে এপারে আসা এসব মানুষের কাছে এটি নিছক নদ পারাপার নয়। বরং জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিনের এক অনিবার্য যাত্রা। তাদের উৎপাদিত ফসলের বাজার, কাজের ক্ষেত্র কিংবা প্রয়োজনীয় গন্তব্য নদীর এপারে। তাই ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই শুরু হয় দিনভর পরিশ্রমের প্রথম ধাপ। নদ পারাপার।

.

ঘাটে দেখা যায় কৃষকেরা নিজেদের উৎপাদিত শাকসবজি বাঁশের ডালা, ঝুড়ি কিংবা বস্তায় করে নৌকায় তুলছেন। কারও সঙ্গে রয়েছে সাইকেল। নদ পার হয়ে কেউ যাবেন স্থানীয় বাজারে, কেউ পণ্য পৌঁছে দেবেন পরিচিত ক্রেতার কাছে। সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো তাঁদের লক্ষ্য।

.

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: ns@prothomalo.com

.

নদকে ঘিরে উদীচী ঘাটে গড়ে উঠেছে দুই পারের মানুষের নিবিড় যোগাযোগ। এক পাশে বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যস্ত জীবন। অন্য পাশে চরাঞ্চলের কৃষি, শ্রম ও জীবিকার নানা আয়োজন। মাঝখানে বয়ে চলা নদটি দুই পারের মানুষের যাতায়াত ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হয়ে উঠেছে।

এই যাতায়াতের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরও কয়েকটি পরিবারের উপার্জন। নৌকা পারাপারের ভাড়া, পণ্য ওঠানো-নামানোর শ্রম এবং নদ পার হয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছানোর পরিবহন। সব মিলিয়ে ঘাটকে কেন্দ্র করে সচল রয়েছে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চক্র।

.

উদীচী ঘাটের ব্যস্ততা কেবল কৃষিপণ্য পরিবহনে সীমাবদ্ধ নয়। এই ঘাটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাকৃবিতে অবস্থানরত শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ আশপাশ এলাকার মানুষের দৈনন্দিন জীবন। নদীর ওপার থেকে অনেকে কাজের প্রয়োজনে এপারে আসেন। তাঁদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোয় কাজ করেন। কেউবা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বিভিন্ন হোটেল ও খাবারের দোকানে শ্রম দেন। ফলে ঘাটটি হয়ে উঠেছে যাতায়াত, জীবিকা ও কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছেও ব্রহ্মপুত্রের এই পাড় পরিচিত একটি জায়গা। ক্লাস ও হলের ব্যস্ততার বাইরে বিকেলে অনেকেই নদীর পাড়ে আসেন। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন, কেউ উপভোগ করেন নদীর শান্ত পরিবেশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের মানুষও অবসর কাটাতে এখানে আসেন।

ঘাটের আশপাশে সারি সারি ছোট দোকানে বিক্রি হয় ফুচকা, চটপটিসহ নানা মুখরোচক খাবার। বিকেল গড়ালে এসব দোকানে ভিড় বাড়তে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ আসেন নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে। নদীর বাতাস, খোলামেলা পরিবেশ আর বিভিন্ন খাবার সব মিলিয়ে বিকেলের দিকে ঘাটটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।

.

তবে এই পরিচিত দৃশ্যের আড়ালে রয়েছে বহু মানুষের উপার্জনের হিসাব। নৌকার মাঝি থেকে শুরু করে খাবারের দোকানি, প্রত্যেকের জীবিকার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত এই ঘাট। কারও উপার্জন নির্ভর করে নদ পারাপারের ওপর, কারও আয় আসে যাত্রী ও দর্শনার্থীদের ঘিরে গড়ে ওঠা ছোট ব্যবসা থেকে।

ব্রহ্মপুত্রের ওপারের মানুষের কাছে এপার মানে শুধু নদীর অন্য তীর নয়। জীবিকার নতুন সুযোগ। অন্যদিকে বাকৃবি ও আশপাশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও নদটির রয়েছে আলাদা উপস্থিতি। কৃষিপণ্য পরিবহন, শ্রম, যাতায়াত ও মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে দুই পাড়ের মধ্যে তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক।

নদীর স্রোত বদলায়। ঘাটে মানুষের ভিড় কখনো বাড়ে, কখনো কমে। কিন্তু জীবিকার প্রয়োজনে নৌকায় ওঠা মানুষগুলোর যাত্রা থেমে থাকে না।

বাকৃবির পাশ দিয়ে বয়ে চলা ব্রহ্মপুত্র তাই শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উৎস নয়। নদের এ ঘাটকে ঘিরে প্রতিদিন চলতে থাকে মানুষের যাতায়াত ও বেঁচে থাকার নিরন্তর চেষ্টা।

  • সাইয়্যেদা গালিবা রুহী, শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়