ঢাকা ১১:২৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাষ্ট্রের কবিতা, কবিতার রাষ্ট্র

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:২৮:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে ভাবাদর্শিকভাবে ক্রিস্টোফার কডওয়েলের অনুসারী জর্জ টমসন তাঁর মার্ক্সবাদ ও কবিতা শীর্ষক গ্রন্থে কবিতাকে সমাজতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব ও ভাষাতত্ত্বের গভীর সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তাঁর কাছে কবিতার বিমূর্ত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সৌন্দর্যের ধারণার চেয়ে এর বাস্তব আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানের কবিতা পাঠের বেলায় টমসনের কবিতা পড়ার কৌশলের কথা নানা কারণে স্মরণে নেওয়া যাবে। কারণ, শামসুর রাহমানের কবিতার একটি বড় অংশ বিচিত্র অর্থে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গে লেখা এবং তা এই দেশের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে; আর তাঁর কবিতার আরেকটি অংশ থেকে গেছে কলাকৈবল্যবাদী ধারায়।

১.

শামসুর রাহমানের প্রথম দিকের কবিতা বিমূর্ততা ও ব্যক্তিকতার পরিসরে শেষমেশ কলাকৈবল্যবাদী; যদিও সেসব কবিতায় সব সময় ছিল দেশজতার ভাব। তাঁর প্রথম দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে (১৯৬০) এবং রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩) এর উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর প্রথম জীবনে শিল্পের বিরাজনৈতিকীকরণ ও বিমানবিকীকরণ প্রক্রিয়ায় কবিতা লেখার প্রশিক্ষণের নিদর্শন হিসেবে এই দুটি কাব্যগ্রন্থকে বিবেচনা করা যায়। কিন্তু এ–ও সত্য যে বাংলা কাব্যাঙ্গনে কলাকৈবল্যবাদী ‘ত্রিশের কাব্যান্দোলনের’ ভূমিকা ও অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু এই কাব্যান্দোলনের ‘ভূমিলগ্নতা’ নিয়ে সংশয় ও প্রশ্ন এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ত্রিশের প্রভাবেই বাংলাদেশে চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকের কবিদের একটি বড় অংশ কবিতা লিখেছিলেন; তবে কিছুকাল গড়ানোর পরেই নতুন রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পরিসর দ্রুতই বদলাতে থাকে। পঞ্চাশের দশকের পর থেকে এই নতুন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে কবিতা লেখার নন্দনতত্ত্বেরও বিরাট পরিবর্তন ঘটে।

১.১.

উপরিউক্ত বচনের প্রমাণ শামসুর রাহমান হাজির করেছেন ১৯৮৮ সালে সুবর্ণ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত শামসুর রাহমানের রাজনৈতিক কবিতার ‘পূর্বলেখ’ অংশে। তিনি লিখছেন এভাবে, ‘যখন কবিতা লিখতে শুরু করি, তখন চতুর্দিকে কড়া পাহারা বসিয়ে দিয়েছিলাম যাতে আমার কাব্যক্ষেত্রে রাজনীতির অনুপ্রবেশ না ঘটে।… কলাকৈবল্যবাদের প্ররোচনায় আমি সেই ধারণায় বশীভূত হয়েছিলাম এবং এ কথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। যাহোক, আমার কবিজীবনের গোড়ার দিকে রাজনীতি-প্রতিরোধকারী যে দুর্গটি গড়ে তুলেছিলাম তাতে প্রথম চিড় ধরে ১৯৫২ সালে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কালে। তখন থেকেই আমার পদ্যে রাজনীতি উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করলো।’ তাই প্রথম দুটো কাব্যের পর শামসুর রাহমানের আর দুটো কাব্যগ্রন্থে—বিধ্বস্ত নীলিমা (১৯৬৭) এবং নিরালোকে দিব্যরথ (১৯৬৮)—ব্যক্তি আর সমষ্টি আধাআধিভাবে গলা জড়িয়ে থাকে। তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় আর প্রচারিত কাব্যগ্রন্থ বলা যায় তিনটাকে: নিজ বাসভূমে (১৯৭০), বন্দী শিবির থেকে (১৯৭২), উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ (১৯৮২)। এগুলো ছাড়াও রাহমান রচনা করেছেন আরও প্রচুর কবিতা; সেগুলোতে তিনি পূর্বোক্ত নন্দন-রাজনীতির দোহারা রীতিই ব্যবহার করেছেন শেষাবধি।

.

জাতীয়তাবাদী রাজনীতি শামসুর রাহমানের কবিজীবন ও কবিতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আদর্শে তিনি আমৃত্যু বিশ্বাস রেখেছিলেন। তিনি কবিতায় জাতীয়তাবাদী চেতনাকে নিজস্ব ভূগোলের সীমানায় আটকে রাখেননি, বরং এর বিস্তার ঘটিয়েছেন আন্তর্জাতিক ভূগোলের সীমানায়। আর সহায় হয়েছে তাঁর মিথ-রূপক-প্রতীক ব্যবহারের আন্তর্জাতিক মানসিকতা।

.

২.

শামসুর রাহমানের প্রথম রাষ্ট্র ও রাজনীতিসম্পৃক্ত কবিতা ‘মেষতন্ত্র’। কবিতাটি আছে রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থে। আইয়ুব খানের শাসনামলের রাজনৈতিক-সামাজিক-রাষ্ট্রিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলে এই কবিতার সক্রিয় সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক সংযুক্তির বিষয় স্পষ্ট হয়। কেমন স্বৈরতান্ত্রিক পরিস্থিতি সেই সময় সক্রিয় ছিল, তা এই কবিতায় বিধৃত রাজনৈতিক কাব্যতত্ত্বে প্রকাশিত হয়েছে। ক্ষমতা আর ভাষার সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রযন্ত্র কিংবা সামাজিক-রাষ্ট্রিক নিপীড়নের মতাদর্শিক ধারণা অনেকটাই মূর্ততা আর প্রতাপের সঙ্গে এই কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে। এতে কবিতার নন্দন কিংবা সাধারণ আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের বিষয়টিও আর নিরীহ বিষয় না থেকে একটি রাষ্ট্রসম্পর্কিত রাজনৈতিক ভাষ্যে পরিণত হয়েছে। কবি সমাজ ও জনপরিসরে বিদ্যমান আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক ভাষ্যকে শ্লেষের ভেতর দিয়েই সক্রিয় ‘পাল্টা বয়ান’ আকারে হাজির করেছেন এভাবে: ‘দিনদুপুরে ডাকাত পড়ে/ পাড়ায় রাহাজানি,/ দশের দশায় ধেড়ে কুমির/ ফেলছে চোখের পানি।’ (মেষতন্ত্র) এই অংশে প্রকাশিত হয়েছে সহজাত কাব্যিক শ্লেষ, কিন্তু লুক্কায়িত আছে এক সামগ্রিক পরিস্থিতি আর প্রতিরোধের বয়ান। কবিতায় এই প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয় ক্ষমতা, মতাদর্শ ও তার ভাষ্য নির্মাণের সক্রিয় সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক রাজনীতি। শ্লেষ-ব্যঙ্গের আরেকটি উদাহরণ, ‘ঢ্যাম কুড় কুড় বাজনা বাজে,/ পথে ঘাটে সান্ত্রী সাজে।/ শোনো সবাই হুকুমনামা,/ ধরতে হবে রাজার ধামা।’ (রাজকাহিনী)

৩.

জাতীয়তাবাদী রাজনীতি শামসুর রাহমানের কবিজীবন ও কবিতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আদর্শে তিনি আমৃত্যু বিশ্বাস রেখেছিলেন। তিনি কবিতায় জাতীয়তাবাদী চেতনাকে নিজস্ব ভূগোলের সীমানায় আটকে রাখেননি, বরং এর বিস্তার ঘটিয়েছেন আন্তর্জাতিক ভূগোলের সীমানায়। আর সহায় হয়েছে তাঁর মিথ-রূপক-প্রতীক ব্যবহারের আন্তর্জাতিক মানসিকতা। এর ভালো একটা উদাহরণ ‘টেলেমেকাস’ কবিতা। এই কবিতায় তিনি নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য এক ত্রাণকর্তা-সন্ধানী। এই কবিতায় পুরাণ কেবল বিশ্বসাহিত্যের বিষয় নয়, বরং এর ভেতর দিয়েই তিনি তাঁর কাব্যের রাজনৈতিক ভাষা নির্মাণ করতে চান, যে ভাষা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে তাঁর নিজের রাষ্ট্রিক পরিসরে। যদিও এই আকাঙ্ক্ষা ছড়িয়ে পড়ছে দৈশিক আকাঙ্ক্ষার সমান্তরালে, কিন্তু এই প্রকল্পে ব্যবহৃত মিথ বৈদেশিক। কবিতায় বর্ণনা এমন, ‘ইথাকায় রাখলে পা দেখতে পাবে রয়েছি দাঁড়িয়ে/ দরজা আগলে, পিতা, অধীর তোমারই প্রতীক্ষায়।’ (টেলেমেকাস)

.

শামসুর রাহমান কবিতায় সামাজিক অবস্থান ও শ্রেণিচেতনা, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের নান্দনিকতা নির্মাণেও ভীষণ পারদর্শী। তাঁর কবিতার এক পিঠকে মনে হয় স্লোগান, কিন্তু অপর পিঠ কাব্য-ব্যঞ্জনার সব বৈশিষ্ট্য নিয়েই হাজির থাকে, সেখানে আরও থাকে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম। আর এসবের মধ্য দিয়েই ফুটে ওঠে জাতীয় আন্দোলনের এক স্ফটিক রূপ।

.

৪.

কোনো ভাষাভিত্তিক ভূখণ্ডের রাজনীতি-অর্থনীতি-সংস্কৃতির ভিত নির্মাণের বেলায় ভাষা জরুরি ভূমিকা রাখে। তাই ভাষার রাজনীতি ঠাহর করতে হলে রাজনৈতিক কাব্যতত্ত্বের ভাষার নিছক আলংকারিক গুণের বাইরে এর লড়াই কিংবা প্রতিরোধের ক্ষমতা বিশ্লেষণ জরুরি। শাসকগোষ্ঠী যখন বিশেষ কোনো প্রচারের কৌশল কোনো পরাধীন রাষ্ট্রের অন্দরে বিরাজিত শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির জগৎসহ রাজনৈতিক জগতেও ছুড়ে দেয়, ভাষা তখন তার মোকাবিলার প্রায় সব ক্ষমতা নিয়েই হাজির হওয়ার সক্ষমতা রাখে। আবার ভাষার ভেতর দিয়েও নিপীড়নের ষোলোকলা পূর্ণ করা যায়।

এই পরিস্থিতিতে কবি তাঁর ভাষায় সমাজ-রাষ্ট্রের মানুষের যাপিত জীবনের নানা অভিজ্ঞতা হাজির করেন। শামসুর রাহমান তাঁর কবিতায় রূপক, প্রতীক, চিত্রকল্পের মাধ্যমে হাজির করেছেন। তাঁর ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’ কবিতায় এই প্রস্তাবনাই হাজির রয়েছে। ভাষা ধারণার ভেতর দিয়ে অধিকারের রূপকল্পগুলো আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ–ও স্পষ্ট হয়েছে যে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারণা নির্মাণের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রের পত্তনের বেলায় ভাষা-প্রশ্ন কীভাবে ভীষণ জরুরি হয়ে ওঠে। এই জাতীয়তাবাদী ধারণাটি ছিল নিঃসন্দেহে এক ইতিবাচক ঐতিহাসিক জাগরণ। শোষক-শোষিতের বিবেচনায় তা শোষিতের পক্ষেই হেলে থাকে। এবং দখল আর পুনর্দখলের প্রক্রিয়াটিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উচ্চারিত হয় এমন ধ্বনি, ‘এখন তোমাকে ঘিরে খিস্তি-খেউড়ের পৌষমাস!/ তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো,/ বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা।’ এই পুরো কবিতায় সংস্থাপিত হয়েছে পঞ্চাশের দশকের ভাষা-পরিস্থিতি, ভাষার ক্ষমতায়ন ও ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের আগাগোড়া মঞ্চায়নের এক পক্ষ। অপর পক্ষ অবশ্যই ভিন্ন, তার বয়ানও আলাদা।

৫.

শামসুর রাহমান কবিতায় সামাজিক অবস্থান ও শ্রেণিচেতনা, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের নান্দনিকতা নির্মাণেও ভীষণ পারদর্শী। তাঁর কবিতার এক পিঠকে মনে হয় স্লোগান, কিন্তু অপর পিঠ কাব্য-ব্যঞ্জনার সব বৈশিষ্ট্য নিয়েই হাজির থাকে, সেখানে আরও থাকে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম। আর এসবের মধ্য দিয়েই ফুটে ওঠে জাতীয় আন্দোলনের এক স্ফটিক রূপ। এভাবে তাঁর ‘ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯’ কবিতার মূর্ত জগতে হাজির থাকে ‘পলাশতলীর হাড্ডিসার ক্লান্ত এক ফতুর কৃষক’, ‘চটকলের শ্রমিক’, ‘উদাস কুমোর’, ‘রাজস্ব দফতরের করুণ কেরানী’, ‘ছাত্র’, ‘লেখক’, ‘উজ্জ্বল তরুণ’। আদতে থাকে না কে, সেটাই প্রশ্ন হয়ে ওঠে। তাঁর কবিতায় এরা সবাই হাজির হয়ে নির্মাণ করে এক সর্বাত্মক আন্দোলনের পটভূমি। এভাবেই রাষ্ট্র প্রশ্নে সামষ্টিকের প্রতিরোধ প্রবণতার সারাৎসার ধরা পড়ে তাঁর কবিতায়। সেখানে নারী-পুরুষ প্রশ্নে নারী, প্রান্তিক নারীও এসে যোগ দেয়। যদিও এই নারীদের অবদান যেন ঘটেছে নীরবে, তথাপি নীরব প্রতিবাদের ধারণাই হয়ে ওঠে লিঙ্গীয় সমতার অভাবিত প্রচারপত্র। আর এভাবেই সৃষ্টি হয় পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রধারণার বিরুদ্ধে এক নতুনতর রাজনৈতিক কাব্যতত্ত্ব।

.

পঞ্চাশ ও ষাটের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও সংগ্রামের পটভূমি গঠনে তাঁর কবিতা পালন করেছিল জোরালো ভূমিকা। বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাংস্কৃতিক ভিত্তি খুঁজতে গিয়ে মুদ্রণব্যবস্থা এবং বইয়ের অপরিহার্য ভূমিকার কথা বলেছেন। শামসুর রাহমান ও তাঁর কবিতার একটি বড় অংশ এই ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

.

এভাবে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে শামসুর রাহমানের কবিতা হয়ে ওঠে বুলেট-নিরোধী প্রতিবাদ। রাষ্ট্রীয় আধিপত্য ও বুর্জোয়া সংস্কৃতির বিপরীতে গণ-আন্দোলন ও গণসংস্কৃতি নির্মাণের আকাঙ্ক্ষাও থাকে। এমন এক কবিতা-নন্দনে ব্যক্তির স্মৃতির বিপরীতে সমষ্টির স্মৃতিও প্রগাঢ়ভাবে সঞ্চিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় নির্মিত হয় সাহিত্যিক স্মৃতি বা ইতিহাস, যে ইতিহাসে কেবল তথ্য হিসেবে নয়, রাজনৈতিক ও আবেগীময় চেতনার রূপান্তর হিসেবে পাঠের মর্যাদা লাভ করে। এসব কবিতায় উচ্চারিত হয় এমন সুষম শব্দগুচ্ছ, ‘গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিম্বা সূর্যাস্তের/ জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট/ উড়ছে হাওয়ায়, নীলিমায়।’ (আসাদের শার্ট)

৬.

শামসুর রাহমান তাঁর রাষ্ট্রিক ও রাজনৈতিক কাব্যতত্ত্ব নির্মাণের বেলায় সহায় হিসেবে গ্রহণ করেছেন তাঁর পরিপার্শ্বকে; নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ স্থানিক বাস্তবতাকে, তাঁর দেখা ভূগোলকে, সেই ভূগোলের প্রধান শহরকে, সেই শহরের মানুষজনকে। শহরের রাজপথ, বস্তি ইত্যাদি কীভাবে রাজনৈতিক ঘটনাবলির কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তা প্রচারিত হয়েছে তাঁর কবিতায় এভাবে: ‘বস্তির দুরন্ত ছেলেটার/ হাতের মুঠোয়/ সর্বদাই দেখি জ্বলে—স্বাধীনতা নামক শব্দটি।’ (বন্দী শিবির থেকে) ভৌগোলিক পটভূমিতে বিচিত্র বিষয় যুক্ত হয় এভাবে, ‘স্বাধীনতা তুমি ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি’ কিংবা ‘স্বাধীনতা তুমি/ কালবোশেখীর দিগন্ত জোড়া মত্ত ঝাপটা।’ (স্বাধীনতা তুমি) স্থানিক রাজনৈতিক ধারণা আর নাগরিক পরিচয়ের ভেতর দিয়েই তৈরি হয়েছে এসব। আর আছে শ্রমজীবী শ্রেণির বিচিত্র কর্মকাণ্ডের উল্লেখ, ‘কেষ্ট দাস, জেলেপাড়ার সবচেয়ে সাহসী লোকটা’, ‘মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি’, ‘রুস্তম শেখ, ঢাকার রিক্শাওয়ালা’ ইত্যাদি (তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা)

৭.

শামসুর রাহমান সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন রাষ্ট্র ও রাজনীতি নিয়ে লেখা তাঁর কবিতাগুলোর জন্য। তাঁর যে কবিতাগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে, মিছিলে কিংবা আবৃত্তিতে প্রতিনিয়ত উচ্চারিত হয়, তার প্রায় সবই তিনি লিখেছিলেন অবরুদ্ধ ও সংকটে ঘেরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মলগ্নে। সেকালে জরুরি হয়ে পড়েছিল শক্তিশালী জাতীয় সাহিত্যের, যেখানে শিল্পের জন্য শিল্প এবং সমাজের জন্য শিল্প—এই দুই ধারণার মধ্যে মানুষের প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছিল দ্বিতীয়টা, অর্থাৎ সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। এই দুই ধারার সুসমন্বয়ে তিনি নির্মাণ করেছিলেন এক নতুন রাজনৈতিক কাব্যতত্ত্ব। কবির ব্যক্তিগত ও শৈল্পিক স্বাধীনতা বজায় রেখেই যে রাজনৈতিক সংকটে জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো যায় এবং দায়িত্ববোধ থেকে কবিতা লেখা যায়, শামসুর রাহমান তার উজ্জ্বলতম উদাহরণ।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় সাহিত্য নিছক রাষ্ট্র বা সময়ের উপজাত হয়ে থাকেনি; বরং তা হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্রগঠনের এক সক্রিয় সাংস্কৃতিক হাতিয়ার। পঞ্চাশ ও ষাটের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও সংগ্রামের পটভূমি গঠনে তাঁর কবিতা পালন করেছিল জোরালো ভূমিকা। বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাংস্কৃতিক ভিত্তি খুঁজতে গিয়ে মুদ্রণব্যবস্থা এবং বইয়ের অপরিহার্য ভূমিকার কথা বলেছেন। শামসুর রাহমান ও তাঁর কবিতার একটি বড় অংশ এই ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

  • সোহানুজ্জামান:  প্রাবন্ধিক, গবেষক ও শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

রাষ্ট্রের কবিতা, কবিতার রাষ্ট্র

আপডেট সময় : ০৮:২৮:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে ভাবাদর্শিকভাবে ক্রিস্টোফার কডওয়েলের অনুসারী জর্জ টমসন তাঁর মার্ক্সবাদ ও কবিতা শীর্ষক গ্রন্থে কবিতাকে সমাজতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব ও ভাষাতত্ত্বের গভীর সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তাঁর কাছে কবিতার বিমূর্ত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সৌন্দর্যের ধারণার চেয়ে এর বাস্তব আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানের কবিতা পাঠের বেলায় টমসনের কবিতা পড়ার কৌশলের কথা নানা কারণে স্মরণে নেওয়া যাবে। কারণ, শামসুর রাহমানের কবিতার একটি বড় অংশ বিচিত্র অর্থে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গে লেখা এবং তা এই দেশের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে; আর তাঁর কবিতার আরেকটি অংশ থেকে গেছে কলাকৈবল্যবাদী ধারায়।

১.

শামসুর রাহমানের প্রথম দিকের কবিতা বিমূর্ততা ও ব্যক্তিকতার পরিসরে শেষমেশ কলাকৈবল্যবাদী; যদিও সেসব কবিতায় সব সময় ছিল দেশজতার ভাব। তাঁর প্রথম দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে (১৯৬০) এবং রৌদ্র করোটিতে (১৯৬৩) এর উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর প্রথম জীবনে শিল্পের বিরাজনৈতিকীকরণ ও বিমানবিকীকরণ প্রক্রিয়ায় কবিতা লেখার প্রশিক্ষণের নিদর্শন হিসেবে এই দুটি কাব্যগ্রন্থকে বিবেচনা করা যায়। কিন্তু এ–ও সত্য যে বাংলা কাব্যাঙ্গনে কলাকৈবল্যবাদী ‘ত্রিশের কাব্যান্দোলনের’ ভূমিকা ও অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু এই কাব্যান্দোলনের ‘ভূমিলগ্নতা’ নিয়ে সংশয় ও প্রশ্ন এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ত্রিশের প্রভাবেই বাংলাদেশে চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকের কবিদের একটি বড় অংশ কবিতা লিখেছিলেন; তবে কিছুকাল গড়ানোর পরেই নতুন রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পরিসর দ্রুতই বদলাতে থাকে। পঞ্চাশের দশকের পর থেকে এই নতুন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে কবিতা লেখার নন্দনতত্ত্বেরও বিরাট পরিবর্তন ঘটে।

১.১.

উপরিউক্ত বচনের প্রমাণ শামসুর রাহমান হাজির করেছেন ১৯৮৮ সালে সুবর্ণ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত শামসুর রাহমানের রাজনৈতিক কবিতার ‘পূর্বলেখ’ অংশে। তিনি লিখছেন এভাবে, ‘যখন কবিতা লিখতে শুরু করি, তখন চতুর্দিকে কড়া পাহারা বসিয়ে দিয়েছিলাম যাতে আমার কাব্যক্ষেত্রে রাজনীতির অনুপ্রবেশ না ঘটে।… কলাকৈবল্যবাদের প্ররোচনায় আমি সেই ধারণায় বশীভূত হয়েছিলাম এবং এ কথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। যাহোক, আমার কবিজীবনের গোড়ার দিকে রাজনীতি-প্রতিরোধকারী যে দুর্গটি গড়ে তুলেছিলাম তাতে প্রথম চিড় ধরে ১৯৫২ সালে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কালে। তখন থেকেই আমার পদ্যে রাজনীতি উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করলো।’ তাই প্রথম দুটো কাব্যের পর শামসুর রাহমানের আর দুটো কাব্যগ্রন্থে—বিধ্বস্ত নীলিমা (১৯৬৭) এবং নিরালোকে দিব্যরথ (১৯৬৮)—ব্যক্তি আর সমষ্টি আধাআধিভাবে গলা জড়িয়ে থাকে। তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় আর প্রচারিত কাব্যগ্রন্থ বলা যায় তিনটাকে: নিজ বাসভূমে (১৯৭০), বন্দী শিবির থেকে (১৯৭২), উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ (১৯৮২)। এগুলো ছাড়াও রাহমান রচনা করেছেন আরও প্রচুর কবিতা; সেগুলোতে তিনি পূর্বোক্ত নন্দন-রাজনীতির দোহারা রীতিই ব্যবহার করেছেন শেষাবধি।

.

জাতীয়তাবাদী রাজনীতি শামসুর রাহমানের কবিজীবন ও কবিতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আদর্শে তিনি আমৃত্যু বিশ্বাস রেখেছিলেন। তিনি কবিতায় জাতীয়তাবাদী চেতনাকে নিজস্ব ভূগোলের সীমানায় আটকে রাখেননি, বরং এর বিস্তার ঘটিয়েছেন আন্তর্জাতিক ভূগোলের সীমানায়। আর সহায় হয়েছে তাঁর মিথ-রূপক-প্রতীক ব্যবহারের আন্তর্জাতিক মানসিকতা।

.

২.

শামসুর রাহমানের প্রথম রাষ্ট্র ও রাজনীতিসম্পৃক্ত কবিতা ‘মেষতন্ত্র’। কবিতাটি আছে রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থে। আইয়ুব খানের শাসনামলের রাজনৈতিক-সামাজিক-রাষ্ট্রিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলে এই কবিতার সক্রিয় সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক সংযুক্তির বিষয় স্পষ্ট হয়। কেমন স্বৈরতান্ত্রিক পরিস্থিতি সেই সময় সক্রিয় ছিল, তা এই কবিতায় বিধৃত রাজনৈতিক কাব্যতত্ত্বে প্রকাশিত হয়েছে। ক্ষমতা আর ভাষার সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রযন্ত্র কিংবা সামাজিক-রাষ্ট্রিক নিপীড়নের মতাদর্শিক ধারণা অনেকটাই মূর্ততা আর প্রতাপের সঙ্গে এই কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে। এতে কবিতার নন্দন কিংবা সাধারণ আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের বিষয়টিও আর নিরীহ বিষয় না থেকে একটি রাষ্ট্রসম্পর্কিত রাজনৈতিক ভাষ্যে পরিণত হয়েছে। কবি সমাজ ও জনপরিসরে বিদ্যমান আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক ভাষ্যকে শ্লেষের ভেতর দিয়েই সক্রিয় ‘পাল্টা বয়ান’ আকারে হাজির করেছেন এভাবে: ‘দিনদুপুরে ডাকাত পড়ে/ পাড়ায় রাহাজানি,/ দশের দশায় ধেড়ে কুমির/ ফেলছে চোখের পানি।’ (মেষতন্ত্র) এই অংশে প্রকাশিত হয়েছে সহজাত কাব্যিক শ্লেষ, কিন্তু লুক্কায়িত আছে এক সামগ্রিক পরিস্থিতি আর প্রতিরোধের বয়ান। কবিতায় এই প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয় ক্ষমতা, মতাদর্শ ও তার ভাষ্য নির্মাণের সক্রিয় সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক রাজনীতি। শ্লেষ-ব্যঙ্গের আরেকটি উদাহরণ, ‘ঢ্যাম কুড় কুড় বাজনা বাজে,/ পথে ঘাটে সান্ত্রী সাজে।/ শোনো সবাই হুকুমনামা,/ ধরতে হবে রাজার ধামা।’ (রাজকাহিনী)

৩.

জাতীয়তাবাদী রাজনীতি শামসুর রাহমানের কবিজীবন ও কবিতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আদর্শে তিনি আমৃত্যু বিশ্বাস রেখেছিলেন। তিনি কবিতায় জাতীয়তাবাদী চেতনাকে নিজস্ব ভূগোলের সীমানায় আটকে রাখেননি, বরং এর বিস্তার ঘটিয়েছেন আন্তর্জাতিক ভূগোলের সীমানায়। আর সহায় হয়েছে তাঁর মিথ-রূপক-প্রতীক ব্যবহারের আন্তর্জাতিক মানসিকতা। এর ভালো একটা উদাহরণ ‘টেলেমেকাস’ কবিতা। এই কবিতায় তিনি নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য এক ত্রাণকর্তা-সন্ধানী। এই কবিতায় পুরাণ কেবল বিশ্বসাহিত্যের বিষয় নয়, বরং এর ভেতর দিয়েই তিনি তাঁর কাব্যের রাজনৈতিক ভাষা নির্মাণ করতে চান, যে ভাষা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে তাঁর নিজের রাষ্ট্রিক পরিসরে। যদিও এই আকাঙ্ক্ষা ছড়িয়ে পড়ছে দৈশিক আকাঙ্ক্ষার সমান্তরালে, কিন্তু এই প্রকল্পে ব্যবহৃত মিথ বৈদেশিক। কবিতায় বর্ণনা এমন, ‘ইথাকায় রাখলে পা দেখতে পাবে রয়েছি দাঁড়িয়ে/ দরজা আগলে, পিতা, অধীর তোমারই প্রতীক্ষায়।’ (টেলেমেকাস)

.

শামসুর রাহমান কবিতায় সামাজিক অবস্থান ও শ্রেণিচেতনা, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের নান্দনিকতা নির্মাণেও ভীষণ পারদর্শী। তাঁর কবিতার এক পিঠকে মনে হয় স্লোগান, কিন্তু অপর পিঠ কাব্য-ব্যঞ্জনার সব বৈশিষ্ট্য নিয়েই হাজির থাকে, সেখানে আরও থাকে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম। আর এসবের মধ্য দিয়েই ফুটে ওঠে জাতীয় আন্দোলনের এক স্ফটিক রূপ।

.

৪.

কোনো ভাষাভিত্তিক ভূখণ্ডের রাজনীতি-অর্থনীতি-সংস্কৃতির ভিত নির্মাণের বেলায় ভাষা জরুরি ভূমিকা রাখে। তাই ভাষার রাজনীতি ঠাহর করতে হলে রাজনৈতিক কাব্যতত্ত্বের ভাষার নিছক আলংকারিক গুণের বাইরে এর লড়াই কিংবা প্রতিরোধের ক্ষমতা বিশ্লেষণ জরুরি। শাসকগোষ্ঠী যখন বিশেষ কোনো প্রচারের কৌশল কোনো পরাধীন রাষ্ট্রের অন্দরে বিরাজিত শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির জগৎসহ রাজনৈতিক জগতেও ছুড়ে দেয়, ভাষা তখন তার মোকাবিলার প্রায় সব ক্ষমতা নিয়েই হাজির হওয়ার সক্ষমতা রাখে। আবার ভাষার ভেতর দিয়েও নিপীড়নের ষোলোকলা পূর্ণ করা যায়।

এই পরিস্থিতিতে কবি তাঁর ভাষায় সমাজ-রাষ্ট্রের মানুষের যাপিত জীবনের নানা অভিজ্ঞতা হাজির করেন। শামসুর রাহমান তাঁর কবিতায় রূপক, প্রতীক, চিত্রকল্পের মাধ্যমে হাজির করেছেন। তাঁর ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’ কবিতায় এই প্রস্তাবনাই হাজির রয়েছে। ভাষা ধারণার ভেতর দিয়ে অধিকারের রূপকল্পগুলো আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ–ও স্পষ্ট হয়েছে যে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারণা নির্মাণের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রের পত্তনের বেলায় ভাষা-প্রশ্ন কীভাবে ভীষণ জরুরি হয়ে ওঠে। এই জাতীয়তাবাদী ধারণাটি ছিল নিঃসন্দেহে এক ইতিবাচক ঐতিহাসিক জাগরণ। শোষক-শোষিতের বিবেচনায় তা শোষিতের পক্ষেই হেলে থাকে। এবং দখল আর পুনর্দখলের প্রক্রিয়াটিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উচ্চারিত হয় এমন ধ্বনি, ‘এখন তোমাকে ঘিরে খিস্তি-খেউড়ের পৌষমাস!/ তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো,/ বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা।’ এই পুরো কবিতায় সংস্থাপিত হয়েছে পঞ্চাশের দশকের ভাষা-পরিস্থিতি, ভাষার ক্ষমতায়ন ও ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের আগাগোড়া মঞ্চায়নের এক পক্ষ। অপর পক্ষ অবশ্যই ভিন্ন, তার বয়ানও আলাদা।

৫.

শামসুর রাহমান কবিতায় সামাজিক অবস্থান ও শ্রেণিচেতনা, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের নান্দনিকতা নির্মাণেও ভীষণ পারদর্শী। তাঁর কবিতার এক পিঠকে মনে হয় স্লোগান, কিন্তু অপর পিঠ কাব্য-ব্যঞ্জনার সব বৈশিষ্ট্য নিয়েই হাজির থাকে, সেখানে আরও থাকে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম। আর এসবের মধ্য দিয়েই ফুটে ওঠে জাতীয় আন্দোলনের এক স্ফটিক রূপ। এভাবে তাঁর ‘ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯’ কবিতার মূর্ত জগতে হাজির থাকে ‘পলাশতলীর হাড্ডিসার ক্লান্ত এক ফতুর কৃষক’, ‘চটকলের শ্রমিক’, ‘উদাস কুমোর’, ‘রাজস্ব দফতরের করুণ কেরানী’, ‘ছাত্র’, ‘লেখক’, ‘উজ্জ্বল তরুণ’। আদতে থাকে না কে, সেটাই প্রশ্ন হয়ে ওঠে। তাঁর কবিতায় এরা সবাই হাজির হয়ে নির্মাণ করে এক সর্বাত্মক আন্দোলনের পটভূমি। এভাবেই রাষ্ট্র প্রশ্নে সামষ্টিকের প্রতিরোধ প্রবণতার সারাৎসার ধরা পড়ে তাঁর কবিতায়। সেখানে নারী-পুরুষ প্রশ্নে নারী, প্রান্তিক নারীও এসে যোগ দেয়। যদিও এই নারীদের অবদান যেন ঘটেছে নীরবে, তথাপি নীরব প্রতিবাদের ধারণাই হয়ে ওঠে লিঙ্গীয় সমতার অভাবিত প্রচারপত্র। আর এভাবেই সৃষ্টি হয় পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রধারণার বিরুদ্ধে এক নতুনতর রাজনৈতিক কাব্যতত্ত্ব।

.

পঞ্চাশ ও ষাটের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও সংগ্রামের পটভূমি গঠনে তাঁর কবিতা পালন করেছিল জোরালো ভূমিকা। বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাংস্কৃতিক ভিত্তি খুঁজতে গিয়ে মুদ্রণব্যবস্থা এবং বইয়ের অপরিহার্য ভূমিকার কথা বলেছেন। শামসুর রাহমান ও তাঁর কবিতার একটি বড় অংশ এই ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

.

এভাবে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে শামসুর রাহমানের কবিতা হয়ে ওঠে বুলেট-নিরোধী প্রতিবাদ। রাষ্ট্রীয় আধিপত্য ও বুর্জোয়া সংস্কৃতির বিপরীতে গণ-আন্দোলন ও গণসংস্কৃতি নির্মাণের আকাঙ্ক্ষাও থাকে। এমন এক কবিতা-নন্দনে ব্যক্তির স্মৃতির বিপরীতে সমষ্টির স্মৃতিও প্রগাঢ়ভাবে সঞ্চিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় নির্মিত হয় সাহিত্যিক স্মৃতি বা ইতিহাস, যে ইতিহাসে কেবল তথ্য হিসেবে নয়, রাজনৈতিক ও আবেগীময় চেতনার রূপান্তর হিসেবে পাঠের মর্যাদা লাভ করে। এসব কবিতায় উচ্চারিত হয় এমন সুষম শব্দগুচ্ছ, ‘গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিম্বা সূর্যাস্তের/ জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট/ উড়ছে হাওয়ায়, নীলিমায়।’ (আসাদের শার্ট)

৬.

শামসুর রাহমান তাঁর রাষ্ট্রিক ও রাজনৈতিক কাব্যতত্ত্ব নির্মাণের বেলায় সহায় হিসেবে গ্রহণ করেছেন তাঁর পরিপার্শ্বকে; নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ স্থানিক বাস্তবতাকে, তাঁর দেখা ভূগোলকে, সেই ভূগোলের প্রধান শহরকে, সেই শহরের মানুষজনকে। শহরের রাজপথ, বস্তি ইত্যাদি কীভাবে রাজনৈতিক ঘটনাবলির কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তা প্রচারিত হয়েছে তাঁর কবিতায় এভাবে: ‘বস্তির দুরন্ত ছেলেটার/ হাতের মুঠোয়/ সর্বদাই দেখি জ্বলে—স্বাধীনতা নামক শব্দটি।’ (বন্দী শিবির থেকে) ভৌগোলিক পটভূমিতে বিচিত্র বিষয় যুক্ত হয় এভাবে, ‘স্বাধীনতা তুমি ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি’ কিংবা ‘স্বাধীনতা তুমি/ কালবোশেখীর দিগন্ত জোড়া মত্ত ঝাপটা।’ (স্বাধীনতা তুমি) স্থানিক রাজনৈতিক ধারণা আর নাগরিক পরিচয়ের ভেতর দিয়েই তৈরি হয়েছে এসব। আর আছে শ্রমজীবী শ্রেণির বিচিত্র কর্মকাণ্ডের উল্লেখ, ‘কেষ্ট দাস, জেলেপাড়ার সবচেয়ে সাহসী লোকটা’, ‘মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি’, ‘রুস্তম শেখ, ঢাকার রিক্শাওয়ালা’ ইত্যাদি (তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা)

৭.

শামসুর রাহমান সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন রাষ্ট্র ও রাজনীতি নিয়ে লেখা তাঁর কবিতাগুলোর জন্য। তাঁর যে কবিতাগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে, মিছিলে কিংবা আবৃত্তিতে প্রতিনিয়ত উচ্চারিত হয়, তার প্রায় সবই তিনি লিখেছিলেন অবরুদ্ধ ও সংকটে ঘেরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মলগ্নে। সেকালে জরুরি হয়ে পড়েছিল শক্তিশালী জাতীয় সাহিত্যের, যেখানে শিল্পের জন্য শিল্প এবং সমাজের জন্য শিল্প—এই দুই ধারণার মধ্যে মানুষের প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছিল দ্বিতীয়টা, অর্থাৎ সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। এই দুই ধারার সুসমন্বয়ে তিনি নির্মাণ করেছিলেন এক নতুন রাজনৈতিক কাব্যতত্ত্ব। কবির ব্যক্তিগত ও শৈল্পিক স্বাধীনতা বজায় রেখেই যে রাজনৈতিক সংকটে জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো যায় এবং দায়িত্ববোধ থেকে কবিতা লেখা যায়, শামসুর রাহমান তার উজ্জ্বলতম উদাহরণ।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় সাহিত্য নিছক রাষ্ট্র বা সময়ের উপজাত হয়ে থাকেনি; বরং তা হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্রগঠনের এক সক্রিয় সাংস্কৃতিক হাতিয়ার। পঞ্চাশ ও ষাটের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও সংগ্রামের পটভূমি গঠনে তাঁর কবিতা পালন করেছিল জোরালো ভূমিকা। বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাংস্কৃতিক ভিত্তি খুঁজতে গিয়ে মুদ্রণব্যবস্থা এবং বইয়ের অপরিহার্য ভূমিকার কথা বলেছেন। শামসুর রাহমান ও তাঁর কবিতার একটি বড় অংশ এই ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

  • সোহানুজ্জামান:  প্রাবন্ধিক, গবেষক ও শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়