মাছের শিদল কীভাবে বানায়
- আপডেট সময় : ০৭:৫৬:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

তুমি কি কখনো শিদলের নাম শুনেছ? না শুনে থাকলে আজ জেনে নাও। শুনে থাকলেও হয়তো জানো না, জিনিসটা আসলে কীভাবে তৈরি হয়। কোনো বাড়িতে শিদল রান্না হলে পাশের বাড়ির লোকও টের পেয়ে যায়। কেউ সেই গন্ধে নাক কুঁচকায়, কেউ আবার ঘ্রাণ পেয়েই খেতে বসে যায়। মাছ আর কচু দিয়ে তৈরি এই বিশেষ খাবারের গন্ধ যেমন তীব্র, তেমনি এর পেছনের গল্পও মজার। চলো, জেনে নিই কীভাবে তৈরি হয় শিদল আর হাঁড়ির ভেতর মাসের পর মাস ধরে কী ঘটে।
শিদল হলো মাছ ও কচু দিয়ে তৈরি একধরনের গাঁজানো খাবার। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে এর প্রচলন বেশি। পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যেও মাছ গাঁজিয়ে খাবার তৈরির রীতি রয়েছে। রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধায় শিদল জনপ্রিয়। অঞ্চলভেদে এসব খাবারের নাম, উপকরণ ও তৈরির পদ্ধতিতে পার্থক্য দেখা যায়। শিদল তৈরির প্রচলিত পদ্ধতিতে সাধারণত ছোট মাছ শুকিয়ে, কচুর সঙ্গে মিশিয়ে মাটির হাঁড়িতে ভরে রাখা হয়। এরপর শুরু হয় অপেক্ষা। কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস ধরে গাঁজনের মাধ্যমে মিশ্রণের স্বাদ, গন্ধ ও গঠন বদলে যায়।
কিন্তু মানুষ এত ঝামেলা করে মাছ সংরক্ষণ করতে গেল কেন? এর উত্তর পেতে তাকাতে হবে অতীতের দিকে। বর্ষায় হাওর-বিল পানিতে ভরে উঠত। জালে ধরা পড়ত ঝুড়ি ঝুড়ি ছোট মাছ। তখন তো আর ঘরে ঘরে ফ্রিজ ছিল না। একসঙ্গে এত মাছ খেয়েও শেষ করা যেত না। আবার ফেলে দিলে নষ্ট হতো মূল্যবান খাবার। তাই মানুষ মাছ দীর্ঘদিন ভালো রাখার নানা উপায় বের করেছিল। রোদে শুকিয়ে শুঁটকি বানানো ছিল তার একটি। মাছ গাঁজিয়ে সংরক্ষণের পদ্ধতিও গড়ে ওঠে বিভিন্ন অঞ্চলে। শিদল সেই দীর্ঘদিনের খাদ্য সংরক্ষণের ঐতিহ্যেরই অংশ।
.ইলিশের নামে চলা চন্দনা ও সুরমা মাছ কীভাবে চিনব.
শিদল তৈরিতে সাধারণত ছোট মাছ ব্যবহার করা হয়। পুঁটি মাছ এর পরিচিত উপকরণগুলোর একটি। এর সঙ্গে লাগে কচু। কেউ কচুর কন্দ ব্যবহার করেন, কেউ নেন লতি বা ডাঁটা। অঞ্চল ও পারিবারিক রীতি অনুযায়ী উপকরণে পার্থক্য থাকতে পারে। লবণের পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ; কারণ, লবণ খাবারের স্বাদ বদলানোর পাশাপাশি জীবাণুর বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে। সব উপকরণ মেশানোর পর মিশ্রণটি রাখা হয় মাটির হাঁড়িতে। এই হাঁড়িতেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় শিদলের পরিচিত স্বাদ ও গন্ধ।
শুরুটা হয় মাছ প্রস্তুত করা দিয়ে। মাছ পরিষ্কার করে নিতে হয়, যাতে গায়ে কাদা, ময়লা বা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বস্তু লেগে না থাকে। এরপর মাছ রোদে শুকানো হয়। সাধারণত বাঁশের চাটাই বা মাচায় মাছ ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যেন বাতাস চলাচল করতে পারে এবং মাছ সমানভাবে শুকায়। প্রয়োজন অনুযায়ী মাছ উল্টে দিতে হয়, যাতে দুই পাশেই রোদ লাগে। আবহাওয়া ও মাছের আকারের ওপর নির্ভর করে শুকানোর সময় কমবেশি হতে পারে। বৃষ্টি বা অতিরিক্ত আর্দ্রতা থাকলে মাছ ঠিকমতো শুকায় না, ফলে পচন ও ছত্রাকের ঝুঁকি বাড়ে। তাই মাছ শুকানোর সময় পরিচ্ছন্নতা ও আবহাওয়ার দিকে বিশেষ নজর রাখা জরুরি।
এরপর আসে কচুর পালা। কচু পরিষ্কার করে কেউ সেদ্ধ করেন, আবার কোনো কোনো পদ্ধতিতে অন্যভাবে প্রস্তুত করা হয়। তারপর কচু মেখে নরম মিশ্রণ তৈরি করা হয়। এই মিশ্রণ শুকনা মাছের গুঁড়ার সঙ্গে মিশে উপকরণগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি কচুর নিজস্ব উপাদানও গাঁজনের সময় তৈরি হওয়া স্বাদ ও গন্ধে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ঠিক কোন ধরনের কচু ব্যবহার করা হবে এবং কীভাবে প্রস্তুত করা হবে, তা নির্ভর করে স্থানীয় রীতি ও পরিবারের প্রচলিত পদ্ধতির ওপর।
শুকনা মাছ এবার গুঁড়া করার পালা। আগের দিনে এ কাজ করা হতো হামানদিস্তা বা ঢেঁকিতে। পরিবারের বড়রা মাছ থেঁতো করতেন, আর ছোটরা পাশে বসে দেখত কীভাবে তৈরি হচ্ছে পরিচিত খাবারটি। মাছ গুঁড়া হয়ে এলে তার সঙ্গে মেশানো হয় কচু ও লবণ। এরপর হাত দিয়ে ভালোভাবে মেখে নিতে হয়, যাতে সব উপকরণ সমানভাবে মিশে যায়। মিশ্রণটি খুব শুকনা হলে সহজে ভেঙে যেতে পারে, আবার অতিরিক্ত আর্দ্রতা থাকলে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই উপকরণের অনুপাত ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে শিদল তৈরির অভিজ্ঞতা যাঁদের আছে, তাঁরা নিজেদের প্রচলিত পদ্ধতি অনুযায়ী এই কাজ করেন। তবে অভিজ্ঞতা থাকলেও পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপদ সংরক্ষণের নিয়ম মেনে চলা জরুরি।
.কোন মাছ ডাঙায় বেঁচে থাকে.
এবার মিশ্রণ ভরার পালা মাটির হাঁড়িতে। হাঁড়ি ভালোভাবে পরিষ্কার করে শুকিয়ে নিতে হয়। এরপর মিশ্রণ অল্প অল্প করে ভরা হয় এবং চেপে বসানো হয়, যাতে ভেতরে অপ্রয়োজনীয় ফাঁকা জায়গা না থাকে। হাঁড়ির মুখ বন্ধ করার পদ্ধতি এলাকাভেদে আলাদা হতে পারে। কোথাও কলাপাতা বা পরিষ্কার কাপড় ব্যবহার করা হয়, কোথাও মুখে মাটির প্রলেপ দেওয়ার চল রয়েছে। উদ্দেশ্য হলো বাইরের ময়লা, পোকামাকড় ও অনাকাঙ্ক্ষিত দূষণ থেকে খাবারকে রক্ষা করা। তবে শুধু হাঁড়ির মুখ বন্ধ করলেই খাবার নিরাপদ হয় না; সঠিক উপকরণ, লবণের পরিমাণ, আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ও পরিচ্ছন্নতার ওপরও নির্ভর করে গাঁজনের ফল।
হাঁড়ি ভরে মুখ বন্ধ করার পর শুরু হয় অপেক্ষার পালা। প্রচলিত পদ্ধতিতে হাঁড়ি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সংরক্ষণ করা হয়, যাতে মিশ্রণটি গাঁজতে পারে। গাঁজনের সময় অণুজীব মাছ ও কচুর বিভিন্ন উপাদানের ওপর কাজ করে। এতে তৈরি হয় নতুন কিছু রাসায়নিক যৌগ, যা খাবারের স্বাদ ও গন্ধ বদলে দেয়। শিদলের তীব্র গন্ধের পেছনেও রয়েছে এই রাসায়নিক পরিবর্তন। দই, পনির ও বিভিন্ন ধরনের আচার তৈরির ক্ষেত্রেও গাঁজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে সব খাবারের গাঁজন এক রকম নয়। শিদলের মতো মাছ দিয়ে তৈরি খাবারের ক্ষেত্রে নিরাপদ পদ্ধতি অনুসরণ করা বিশেষ জরুরি, কারণ অনিয়ন্ত্রিত গাঁজনে ক্ষতিকর অণুজীবও বেড়ে উঠতে পারে।
শিদল তৈরি হয়ে গেলে তা দিয়ে রান্না করা হয় নানা পদ। এর মধ্যে শিদল ভর্তা বেশ পরিচিত। সাধারণত পেঁয়াজ, রসুন ও কাঁচা মরিচের সঙ্গে শিদল রান্না করে ভর্তা তৈরি করা হয়। অঞ্চল ও পরিবারের রীতি অনুযায়ী রান্নার উপকরণ ও পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকে। কচুর লতি বা অন্যান্য সবজির সঙ্গেও শিদল রান্না করা হয়। অল্প পরিমাণ শিদলই রান্নায় বেশ তীব্র স্বাদ ও গন্ধ যোগ করতে পারে। গরম ভাতের সঙ্গে শিদল ভর্তা অনেকেরই প্রিয় খাবার। রান্নার সময় যে গন্ধ ছড়ায়, তা অবশ্য সবার সমান পছন্দের নয়। কেউ গন্ধ পেয়েই খেতে চান, কেউ আবার দূরে সরে যান।
শিদলের গন্ধ নিয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়াও মজার। যাঁরা ছোটবেলা থেকে এই খাবার খেয়ে অভ্যস্ত, তাঁদের কাছে এর গন্ধ পরিচিত ও লোভনীয়। অন্যদিকে, প্রথমবার শুঁকলেই কারও কারও অস্বস্তি হতে পারে। খাবারের গন্ধের প্রতি মানুষের পছন্দ অনেকটাই অভ্যাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এমন অনেক খাবার আছে, যেগুলোর গন্ধ কারও কাছে তীব্র মনে হলেও অন্যদের কাছে সেগুলো দারুণ সুস্বাদু। শিদলও তেমনই একটি খাবার, যার স্বাদ ও গন্ধ সিলেট অঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
.হাঙর, শাপলাপাতা আর পীতাম্বরী মাছ যেভাবে সমুদ্র রক্ষা করে

























