ঢাকা ০৮:৪৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ছুটিতে কম্পিউটার পণ্যের দাম স্থিতিশীল কিম জং–উনের মৃত্যু নিয়ে কেন বারবার গুজব ছড়ায় ওমান যাওয়া হয়নি, নিয়তি রাকিবের জন্য লিখে রেখেছিল এক রোমাঞ্চকর গল্প পূজামণ্ডপে দায়িত্ব পালনকালে সাদুল্লাপুরে আরেক আনসার সদস্যের মৃত্যু, চার দিনে প্রাণ গেল দুজনের ৪৫তম বিসিএসে সুপারিশ পেয়েও বাদ, রাষ্ট্রীয় অনাচারের অভিযোগ, রি–ভেরিফিকেশনের আশ্বাস প্রতিমন্ত্রীর গ্যালেলিও, কোপার্নিকাস ও নিউটনের বই নিলামে, কিনতে খরচ হবে মাত্র ২০ লাখ ডলার আজ টিভিতে যা দেখবেন (২২ অক্টোবর ২০২৬) বছরের পর বছর একসঙ্গে থাকার পরও সঙ্গীকে কখন ও কেন আরও আকর্ষণীয় লাগে? তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে বিভ্রান্তি, মেটাকে ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার জরিমানা মিউনিখে বায়ার্নকে আটকে দিল আর্সেনাল

গ্যালেলিও, কোপার্নিকাস ও নিউটনের বই নিলামে, কিনতে খরচ হবে মাত্র ২০ লাখ ডলার

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:৪৪:০৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মানুষ একসময় মহাবিশ্ব সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানত না। আকাশের তারা, সূর্য, চাঁদ ও গ্রহগুলো কীভাবে চলছে, তা ছিল এক রহস্য। সেই রহস্যের অনেকটাই মানুষ বুঝতে পেরেছে মাত্র শত বছরের কিছু বেশি সময় আগে। এই বদলে যাওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে তিনটি বই।

১৫৪৩ থেকে ১৬৮৭ সালের মধ্যে নিকোলাস কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও গ্যালিলেই ও আইজ্যাক নিউটন এমন কিছু ধারণা সামনে আনেন, যা মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের পুরোনো বিশ্বাস বদলে দেয়। তাঁদের কাজের ফলে মানুষ বুঝতে শুরু করে, পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়। সূর্য, চাঁদ ও গ্রহগুলোর চলাচলের পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট নিয়ম। পরে সেই নিয়মের সাহায্যেই মহাবিশ্বকে বোঝার পথ খুলে যায়।

এই তিন বিজ্ঞানীর ঐতিহাসিক বইগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নিলামে ওঠানো হচ্ছে। বইগুলোর নিলাম আয়োজন করছে সোথবি (Sotheby)। সঙ্গে আছে বিজ্ঞানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ আরও শত শত দুর্লভ বই। ২০ অক্টোবর এসব বই নিলামে তোলা হবে। সোথবির তথ্য অনুযায়ী, বইগুলো দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল। কয়েক দশক পর আবার বইয়ের বাজারে ফিরছে এগুলো।

.আগস্ট মাসের সেরা কিছু বিজ্ঞানের বই.

১৫৪৩ থেকে ১৬৮৭ সালের মধ্যে নিকোলাস কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও গ্যালিলেই ও আইজ্যাক নিউটন এমন কিছু ধারণা সামনে আনেন, যা মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের পুরোনো বিশ্বাস বদলে দেয়।

.

সোথবির বই ও পাণ্ডুলিপি বিভাগের প্রধান রিচার্ড অস্টিনের কাছে ঘটনাটি একধরনের প্রত্যাবর্তনের মতো। তিনি বলেন, ‘বইগুলো দেখার জন্য বিশেষ দস্তানা পরার দরকার নেই। তবে ধরার আগে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে। ইন্টারনেটে বইগুলোর ছবি দেখা যায় ঠিকই। কিন্তু হাতে ধরে দেখার অভিজ্ঞতা একেবারেই আলাদা। হাতে ধরলে মনে হয়, সত্যিই এমন একটি বই হাতে নিয়েছি, যা মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দিয়েছিল।’

এই প্রদর্শনীর নাম ‘রিজন অ্যান্ড রেভল্যুশন’। বাংলায় বলা যায়, যুক্তি ও বিপ্লব। এতে বিজ্ঞানের ইতিহাস বদলে দেওয়া বইগুলো তুলে ধরা হয়েছে। কোপার্নিকাসের বইটির দাম সবচেয়ে বেশি উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর নিলামমূল্য ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। সব মিলিয়ে বইগুলো বিক্রি করে ৭০ লাখ ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারে সোথেবি।

.কেন বই পড়বেন.

চার্চের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, পৃথিবী ও মানুষ মহাবিশ্বের কেন্দ্রে রয়েছে। সূর্য, চাঁদ, গ্রহ ও তারারা পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরছে। আরও একটি বিশ্বাস ছিল, স্বর্গের সবকিছু নিখুঁত।

.

তবে এত দুর্লভ বই ব্যক্তিগত সংগ্রহে চলে যাওয়া নিয়ে আপত্তি আছে অনেক গবেষকের। তাঁদের মতে, বিজ্ঞানের ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বই সবার নাগালে থাকা উচিত। জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ নিক ওয়াইল্ডিং অবশ্য মনে করেন, শেষ পর্যন্ত এসব বইয়ের অনেকগুলোই আবার সরকারি বা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত প্রতিষ্ঠানে ফিরে যায়। কারণ, ব্যক্তিগত সংগ্রাহকের তুলনায় এসব প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি।

এই বইগুলোর গুরুত্ব বুঝতে হলে সে সময়ের কথা ভাবতে হবে। তখন ইউরোপে ক্যাথলিক চার্চের প্রভাব ছিল প্রবল। চার্চের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, পৃথিবী ও মানুষ মহাবিশ্বের কেন্দ্রে রয়েছে। সূর্য, চাঁদ, গ্রহ ও তারারা পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরছে। আরও একটি বিশ্বাস ছিল, স্বর্গের সবকিছু নিখুঁত। সেখানে কোনো খুঁত নেই। অন্যদিকে পৃথিবীতে রয়েছে নানা অসম্পূর্ণতা।

কিন্তু কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও ও নিউটনের কাজ এই ধারণাগুলোকে একে একে বদলে দেয়। শুরু হয় বিজ্ঞানের ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়।

.বই পড়ে লাভ কী.

জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ নিক ওয়াইল্ডিং অবশ্য মনে করেন, শেষ পর্যন্ত এসব বইয়ের অনেকগুলোই আবার সরকারি বা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত প্রতিষ্ঠানে ফিরে যায়।

.

নিকোলাস কোপার্নিকাসের অন দ্য রেভল্যুশনস অব দ্য হেভেনলি স্ফিয়ারস

‘পৃথিবী নয়, সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহগুলো ঘোরে’—আজকের দিনে কথাটা আমাদের কাছে খুব সাধারণ। কিন্তু একসময় এমন কথা বলাই ছিল বড় সাহসের কাজ। পোল্যান্ডের জ্যোতির্বিদ নিকোলাস কোপার্নিকাস তাঁর ১৫৪৩ সালে প্রকাশিত বইয়ে এই ধারণাই তুলে ধরেন। তাঁর বইয়ের নাম অন দ্য রেভল্যুশনস অব দ্য হেভেনলি স্ফিয়ারস।

কোপার্নিকাসের এই ধারণা ক্যাথলিক চার্চের প্রচলিত বিশ্বাসের সঙ্গে মেলেনি। এর কয়েক দশক পর চার্চের বিরোধিতার শিকার হন আরেক চিন্তাবিদ জিওর্দানো ব্রুনো।

.

সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদের সমর্থক ব্রুনোকে ১৬০০ সালে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছিল।

আজও ইতালির রোমে ব্রুনোর একটি মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে ক্যাম্পো দে ফিওরি নামের চত্বরে। এই জায়গাতেই তাঁকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। মূর্তিটির মুখ ভ্যাটিকানের দিকে ফেরানো। যেন মৃত্যুর এত বছর পরও তিনি নিজের বিশ্বাস থেকে সরে আসেননি।

.বই নিয়ে এই ১২ তথ্য জানতেন কি.

আজও ইতালির রোমে ব্রুনোর একটি মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে ক্যাম্পো দে ফিওরি নামের চত্বরে। এই জায়গাতেই তাঁকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। মূর্তিটির মুখ ভ্যাটিকানের দিকে ফেরানো।

.

কোপার্নিকাসের বইটির শুরুর দিকেই রয়েছে সৌরজগতের একটি চিত্র। সেখানে সূর্যকে মাঝখানে রাখা হয়েছে। তার চারপাশে গ্রহগুলোর কক্ষপথ দেখানো হয়েছে। গ্রহ যত দূরের, তার কক্ষপথ তত বড়। ছবিটির পাশে লাতিন ভাষায় লেখা একটি বাক্যের অর্থ, ‘সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে সূর্য।’

তবে কোপার্নিকাসের কাজ শুধু পৃথিবীকে সৌরজগতের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি গ্রহ, সূর্য ও চাঁদের অবস্থান হিসাব করার নতুন পদ্ধতিও দিয়েছিলেন। তাঁর তৈরি সারণি ব্যবহার করে জ্যোতির্বিদ, নাবিক ও পঞ্জিকা প্রস্তুতকারকেরা আগের চেয়ে নির্ভুলভাবে বিভিন্ন তারিখে এসব মহাজাগতিক বস্তুর অবস্থান হিসাব করতে পারতেন। এমনকি আজ আমরা বিশ্বজুড়ে যে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করি, তার সংস্কারের পেছনেও কোপার্নিকাসের এই কাজের ভূমিকা ছিল।

.বই পড়ার অভ্যাস আবার ফিরিয়ে আনবেন যেভাবে.

কোপার্নিকাসের কাজ শুধু পৃথিবীকে সৌরজগতের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি গ্রহ, সূর্য ও চাঁদের অবস্থান হিসাব করার নতুন পদ্ধতিও দিয়েছিলেন।

.

গ্যালিলিও গ্যালিলির স্টারি মেসেঞ্জার

কোপার্নিকাসের ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেন ইতালির বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি। টেলিস্কোপের সাহায্যে আকাশ পর্যবেক্ষণ করে তিনি এমন কিছু জিনিস দেখতে পান, যা আগে কেউ এভাবে দেখেনি। তাঁর পর্যবেক্ষণ মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দিতে শুরু করে।

গ্যালিলিওর বিখ্যাত বই স্টারি মেসেঞ্জার বা সিডেরিয়াস নুনসিয়াস প্রকাশিত হয় ১৬১০ সালে। এই বইটি ছিল তাঁর পরবর্তী বড় কাজের প্রস্তুতি। ১৬৩২ সালে প্রকাশিত হয় ডায়ালগ কনসার্নিং দ্য টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস। এই বইয়ে তিনি কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক ধারণার পক্ষে জোরালো যুক্তি দেন।

.

তত দিনে কোপার্নিকাসের বই ক্যাথলিক চার্চের নিষিদ্ধ বইয়ের তালিকায় জায়গা পেয়েছে। গ্যালিলিওকেও এর মূল্য দিতে হয়। ১৬৩৩ সালে রোমান ইনকুইজিশন তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করে। তখন তাঁর বয়স অনেক। নির্যাতনের হুমকির মুখে তাঁকে নিজের মত থেকে সরে আসতে বাধ্য করা হয়। এই ঘটনা আজও মুক্তচিন্তায় চার্চের অন্ধবিশ্বাসের বাধার প্রতীক হয়ে আছে।

.আগামী দিনের বই.

গ্যালিলিওর বিখ্যাত বই স্টারি মেসেঞ্জার বা সিডেরিয়াস নুনসিয়াস প্রকাশিত হয় ১৬১০ সালে। এই বইটি ছিল তাঁর পরবর্তী বড় কাজের প্রস্তুতি।

.

গ্যালিলিওর স্টারি মেসেঞ্জার বইয়ের শুরুর দিকে টেলিস্কোপের একটি চিত্র রয়েছে। কেন ছবিটি এঁকেছেন, তা বোঝাতে তিনি লিখেছিলেন, এতে যন্ত্রটি বুঝতে সুবিধা হবে। ছবিতে টেলিস্কোপের নল, দুই প্রান্তের লেন্স এবং আলোর চলার পথ দেখানো হয়েছে। আলো কীভাবে যন্ত্রের ভেতর দিয়ে গিয়ে চোখে পৌঁছায়, সেটিও বোঝানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।

এই টেলিস্কোপ দিয়েই গ্যালিলিও চাঁদের দিকে তাকিয়েছিলেন। তখন তিনি দেখেন, চাঁদের পৃষ্ঠ মসৃণ নয়। সেখানে রয়েছে উঁচু পাহাড়, গর্ত আর অসমান জায়গা। অর্থাৎ চাঁদও পৃথিবীর মতো নানা পরিবর্তন ও ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে। অথচ চার্চের প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, আকাশের বস্তুগুলো নিখুঁত। গ্যালিলিওর পর্যবেক্ষণ সেই ধারণার সঙ্গে মিলল না।

.

তবে তাঁর সবচেয়ে বড় আবিষ্কারগুলোর একটি ছিল বৃহস্পতির চারটি চাঁদ খুঁজে পাওয়া। এখন আমরা জানি, বৃহস্পতির চাঁদের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। নাসার বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতির পরিচিত চাঁদ ১১৫টি। কিন্তু ১৬১০ সালের ১১ জানুয়ারি গ্যালিলিও যখন নিজের টেলিস্কোপ দিয়ে বৃহস্পতিকে দেখছিলেন, তখন তিনি চারটি চাঁদ দেখতে পান। বইয়ে তিনি সেই মুহূর্তের কথাও লিখে রেখেছেন।

.২০২৬ সালে আসছে আন্তর্জাতিক যেসব বিজ্ঞানের বই.

ছবিতে টেলিস্কোপের নল, দুই প্রান্তের লেন্স এবং আলোর চলার পথ দেখানো হয়েছে। আলো কীভাবে যন্ত্রের ভেতর দিয়ে গিয়ে চোখে পৌঁছায়, সেটিও বোঝানোর চেষ্টা করেছেন গ্যালিলিও।

.

এ আবিষ্কার ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর মাধ্যমে বোঝা গেল, মহাকাশের সব বস্তু পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরে না। এর থেকে প্রমাণ হয়, পৃথিবী কোনোভাবে মহাবিশ্বের কেন্দ্রে নেই।

গ্যালিলিওর আরেকটি পর্যবেক্ষণ মহাবিশ্বকে আরও বিশাল করে তুলেছিল। খালি চোখে রাতের আকাশে যত তারা দেখা যায়, টেলিস্কোপ দিয়ে তার চেয়ে অন্তত দশ গুণ বেশি তারা দেখতে পেয়েছিলেন তিনি। এর একটি উদাহরণ প্লেইয়াডিস নক্ষত্রপুঞ্জ। গ্যালিলিওর আঁকা ছবিতে দেখা যায়, সেখানে তিনি ৩৫টি নক্ষত্র চিহ্নিত করেছেন। অথচ খালি চোখে দেখা যায় এমন তারার সংখ্যা ছবিতে মাত্র ছয়টি। বাকি তারাগুলো এত ক্ষীণ যে সাধারণভাবে সেগুলো চোখে পড়ে না।

গ্যালিলিও আরও লক্ষ করেছিলেন, রাতের আকাশে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির যে উজ্জ্বল রেখা দেখা যায়, সেখানে অসংখ্য তারা রয়েছে। আকাশের অন্য কিছু ঝাপসা আলোর অঞ্চলেও অনেক তারা একসঙ্গে থাকতে পারে। তিনি ধারণা করেছিলেন, এসব জায়গায় রয়েছে অসংখ্য তারা, যারা দল বেঁধে অবস্থান করছে।

এই পর্যবেক্ষণ পরে ছায়াপথ সম্পর্কে আমাদের আধুনিক ধারণা গড়ে উঠতে সাহায্য করে। একটি টেলিস্কোপের সাহায্যে আকাশের দিকে তাকিয়ে গ্যালিলিও বুঝতে পেরেছিলেন, খালি চোখে যা দেখা যায়, মহাবিশ্ব তার চেয়ে অনেক বড়।

.মানুষ আর আগের মতো বই পড়ে না কেন.

গ্যালিলিওর আরেকটি পর্যবেক্ষণ মহাবিশ্বকে আরও বিশাল করে তুলেছিল। খালি চোখে রাতের আকাশে যত তারা দেখা যায়, টেলিস্কোপ দিয়ে তার চেয়ে অন্তত দশ গুণ বেশি তারা দেখতে পেয়েছিলেন তিনি।

.

আইজ্যাক নিউটনের দ্য ম্যাথমেটিক্যাল প্রিন্সিপলস অব ন্যাচারাল ফিলোসফি

রাতের আকাশে ধূমকেতু দেখা গেলে একসময় মানুষ ভয় পেত। অনেকে ভাবত, ধূমকেতু বুঝি কোনো বিপদের সংকেত। রাজা-বাদশাহরাও এমন দৃশ্য দেখে চিন্তিত হতেন। কিন্তু আইজ্যাক নিউটনের কাজ প্রমাণ করল, ধূমকেতুর চলাচলের পেছনেও রয়েছে প্রকৃতির নিয়ম। কোনো অশুভ শক্তি নয়, মহাকর্ষ বলই তাদের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে।

.

১৬৮৭ সালে নিউটন প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত বই দ্য ম্যাথমেটিক্যাল প্রিন্সিপলস অব ন্যাচারাল ফিলোসফি। বইটি বিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রিন্সিপিয়া নামেও পরিচিত। বইটির পাতায় পাতায় রয়েছে জটিল গাণিতিক হিসাব ও নানা চিত্র।

চাঁদ, সূর্য, গ্রহ ও পৃথিবীর ওপর কীভাবে বিভিন্ন বল কাজ করে। পৃথিবীর সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি। কেন নিয়মিতভাবে সমুদ্রের পানি ফুলে ওঠে, আবার নেমে যায়, তা বোঝার পথ খুলে দেন।

এ ছাড়া বইটিতে রয়েছে দোলকের গতি, গ্রহের কক্ষপথের নানা ব্যতিক্রম, বিষুবের অগ্রগতি, তরলের বাধা এবং শব্দের গতি নিয়ে আলোচনা। তরল পদার্থে ঘূর্ণির মতো যে গতির সৃষ্টি হয়, তা নিয়েও লিখেছেন নিউটন।

.আইনস্টাইনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল যে ৫ বই.

১৬৮৭ সালে নিউটন প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত বই দ্য ম্যাথমেটিক্যাল প্রিন্সিপলস অব ন্যাচারাল ফিলোসফি। বইটি বিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রিন্সিপিয়া নামেও পরিচিত।

.

বইটি পড়া সহজ নয়। এতে রয়েছে শত শত সমীকরণ, চিত্র এবং এমন কিছু প্রসঙ্গ, যা বুঝতে বিশেষ জ্ঞান দরকার। তারপরও প্রকাশের সময় বইটি বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। নিউটন মহাকর্ষ সম্পর্কে এমন একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, যা দিয়ে পৃথিবী থেকে শুরু করে মহাকাশের নানা ঘটনার হিসাব করা সম্ভব হলো। তাঁর বই প্রকৃতিকে বোঝার জন্য একটি নতুন পদ্ধতিও দেখাল। পরে এই পদ্ধতিই আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

নিউটন অবশ্য তাঁর বইয়ে কোপার্নিকাস বা গ্যালিলিওর প্রশংসা করে আলাদা করে কিছু লেখেননি। সেটা তাঁর স্বভাবও ছিল না। কিন্তু তাঁদের কাজকে নিজের গবেষণার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন তিনি।

.

বিশেষ করে গ্যালিলিওর কাজ থেকে উপকৃত হয়েছেন নিউটন। গ্যালিলিও শুধু মহাকাশের বস্তু নিয়ে গবেষণা করেননি, পৃথিবীতে কোনো বস্তু কীভাবে চলে, সেটিও বোঝার চেষ্টা করেছিলেন।

নিউটন জানতেন, বিজ্ঞানের অগ্রগতি কখনো একজন মানুষের একার কাজ নয়। একজনের আবিষ্কারের ওপর দাঁড়িয়ে পরেরজন আরও দূর পর্যন্ত দেখতে পারেন। একবার সহগবেষক রবার্ট হুককে লেখা চিঠিতে নিউটন কৃতজ্ঞাতা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আমি যদি অন্যদের চেয়ে একটু বেশি দূর পর্যন্ত দেখতে পারি, তবে তা সম্ভব হয়েছে বিশাল সব দৈত্যদের কাঁধে দাঁড়িয়ে থাকার কারণেই।’

.যে ৫ কারণে প্রতিদিন বই পড়া উচিত .

নিউটন অবশ্য তাঁর বইয়ে কোপার্নিকাস বা গ্যালিলিওর প্রশংসা করে আলাদা করে কিছু লেখেননি। সেটা তাঁর স্বভাবও ছিল না। কিন্তু তাঁদের কাজকে নিজের গবেষণার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন তিনি।

.

এই তিনটি বইয়ের দিকে তাকালে কথাটির অর্থ আরও স্পষ্ট হয়। কোপার্নিকাস দেখিয়েছিলেন, পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়। গ্যালিলিও টেলিস্কোপ দিয়ে সেই ধারণার পক্ষে নতুন প্রমাণ হাজির করেছিলেন। আর নিউটন দেখিয়েছিলেন, মহাবিশ্বের নানা বস্তুর চলাচলকে একই গাণিতিক নিয়ম দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

তাঁদের বইগুলো শুধু পুরোনো কিছু বৈজ্ঞানিক ধারণার সংগ্রহ নয়। এগুলো মানুষের চিন্তার ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যে মহাবিশ্বকে একসময় রহস্যময় ও অজানা মনে হতো, সেটিকে প্রশ্ন করে, পর্যবেক্ষণ করে এবং হিসাব কষে বোঝার পথ তৈরি করেছিলেন তাঁরা।

আর সেই কারণেই কয়েক শ বছর আগের এই বইগুলো আজও এত মূল্যবান। এগুলোর পাতায় পাতায় লেখা আছে, কীভাবে মানুষ অজানাকে জানার চেষ্টা করেছে, পুরোনো বিশ্বাসকে প্রশ্ন করেছে এবং একটু একটু করে মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচন করেছে।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

.ছাপা বই কি হারিয়ে যাবে

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

গ্যালেলিও, কোপার্নিকাস ও নিউটনের বই নিলামে, কিনতে খরচ হবে মাত্র ২০ লাখ ডলার

আপডেট সময় : ০৭:৪৪:০৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

মানুষ একসময় মহাবিশ্ব সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানত না। আকাশের তারা, সূর্য, চাঁদ ও গ্রহগুলো কীভাবে চলছে, তা ছিল এক রহস্য। সেই রহস্যের অনেকটাই মানুষ বুঝতে পেরেছে মাত্র শত বছরের কিছু বেশি সময় আগে। এই বদলে যাওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে তিনটি বই।

১৫৪৩ থেকে ১৬৮৭ সালের মধ্যে নিকোলাস কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও গ্যালিলেই ও আইজ্যাক নিউটন এমন কিছু ধারণা সামনে আনেন, যা মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের পুরোনো বিশ্বাস বদলে দেয়। তাঁদের কাজের ফলে মানুষ বুঝতে শুরু করে, পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়। সূর্য, চাঁদ ও গ্রহগুলোর চলাচলের পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট নিয়ম। পরে সেই নিয়মের সাহায্যেই মহাবিশ্বকে বোঝার পথ খুলে যায়।

এই তিন বিজ্ঞানীর ঐতিহাসিক বইগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নিলামে ওঠানো হচ্ছে। বইগুলোর নিলাম আয়োজন করছে সোথবি (Sotheby)। সঙ্গে আছে বিজ্ঞানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ আরও শত শত দুর্লভ বই। ২০ অক্টোবর এসব বই নিলামে তোলা হবে। সোথবির তথ্য অনুযায়ী, বইগুলো দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল। কয়েক দশক পর আবার বইয়ের বাজারে ফিরছে এগুলো।

.আগস্ট মাসের সেরা কিছু বিজ্ঞানের বই.

১৫৪৩ থেকে ১৬৮৭ সালের মধ্যে নিকোলাস কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও গ্যালিলেই ও আইজ্যাক নিউটন এমন কিছু ধারণা সামনে আনেন, যা মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের পুরোনো বিশ্বাস বদলে দেয়।

.

সোথবির বই ও পাণ্ডুলিপি বিভাগের প্রধান রিচার্ড অস্টিনের কাছে ঘটনাটি একধরনের প্রত্যাবর্তনের মতো। তিনি বলেন, ‘বইগুলো দেখার জন্য বিশেষ দস্তানা পরার দরকার নেই। তবে ধরার আগে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে। ইন্টারনেটে বইগুলোর ছবি দেখা যায় ঠিকই। কিন্তু হাতে ধরে দেখার অভিজ্ঞতা একেবারেই আলাদা। হাতে ধরলে মনে হয়, সত্যিই এমন একটি বই হাতে নিয়েছি, যা মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দিয়েছিল।’

এই প্রদর্শনীর নাম ‘রিজন অ্যান্ড রেভল্যুশন’। বাংলায় বলা যায়, যুক্তি ও বিপ্লব। এতে বিজ্ঞানের ইতিহাস বদলে দেওয়া বইগুলো তুলে ধরা হয়েছে। কোপার্নিকাসের বইটির দাম সবচেয়ে বেশি উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর নিলামমূল্য ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। সব মিলিয়ে বইগুলো বিক্রি করে ৭০ লাখ ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারে সোথেবি।

.কেন বই পড়বেন.

চার্চের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, পৃথিবী ও মানুষ মহাবিশ্বের কেন্দ্রে রয়েছে। সূর্য, চাঁদ, গ্রহ ও তারারা পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরছে। আরও একটি বিশ্বাস ছিল, স্বর্গের সবকিছু নিখুঁত।

.

তবে এত দুর্লভ বই ব্যক্তিগত সংগ্রহে চলে যাওয়া নিয়ে আপত্তি আছে অনেক গবেষকের। তাঁদের মতে, বিজ্ঞানের ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বই সবার নাগালে থাকা উচিত। জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ নিক ওয়াইল্ডিং অবশ্য মনে করেন, শেষ পর্যন্ত এসব বইয়ের অনেকগুলোই আবার সরকারি বা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত প্রতিষ্ঠানে ফিরে যায়। কারণ, ব্যক্তিগত সংগ্রাহকের তুলনায় এসব প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি।

এই বইগুলোর গুরুত্ব বুঝতে হলে সে সময়ের কথা ভাবতে হবে। তখন ইউরোপে ক্যাথলিক চার্চের প্রভাব ছিল প্রবল। চার্চের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, পৃথিবী ও মানুষ মহাবিশ্বের কেন্দ্রে রয়েছে। সূর্য, চাঁদ, গ্রহ ও তারারা পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরছে। আরও একটি বিশ্বাস ছিল, স্বর্গের সবকিছু নিখুঁত। সেখানে কোনো খুঁত নেই। অন্যদিকে পৃথিবীতে রয়েছে নানা অসম্পূর্ণতা।

কিন্তু কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও ও নিউটনের কাজ এই ধারণাগুলোকে একে একে বদলে দেয়। শুরু হয় বিজ্ঞানের ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়।

.বই পড়ে লাভ কী.

জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ নিক ওয়াইল্ডিং অবশ্য মনে করেন, শেষ পর্যন্ত এসব বইয়ের অনেকগুলোই আবার সরকারি বা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত প্রতিষ্ঠানে ফিরে যায়।

.

নিকোলাস কোপার্নিকাসের অন দ্য রেভল্যুশনস অব দ্য হেভেনলি স্ফিয়ারস

‘পৃথিবী নয়, সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহগুলো ঘোরে’—আজকের দিনে কথাটা আমাদের কাছে খুব সাধারণ। কিন্তু একসময় এমন কথা বলাই ছিল বড় সাহসের কাজ। পোল্যান্ডের জ্যোতির্বিদ নিকোলাস কোপার্নিকাস তাঁর ১৫৪৩ সালে প্রকাশিত বইয়ে এই ধারণাই তুলে ধরেন। তাঁর বইয়ের নাম অন দ্য রেভল্যুশনস অব দ্য হেভেনলি স্ফিয়ারস।

কোপার্নিকাসের এই ধারণা ক্যাথলিক চার্চের প্রচলিত বিশ্বাসের সঙ্গে মেলেনি। এর কয়েক দশক পর চার্চের বিরোধিতার শিকার হন আরেক চিন্তাবিদ জিওর্দানো ব্রুনো।

.

সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদের সমর্থক ব্রুনোকে ১৬০০ সালে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছিল।

আজও ইতালির রোমে ব্রুনোর একটি মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে ক্যাম্পো দে ফিওরি নামের চত্বরে। এই জায়গাতেই তাঁকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। মূর্তিটির মুখ ভ্যাটিকানের দিকে ফেরানো। যেন মৃত্যুর এত বছর পরও তিনি নিজের বিশ্বাস থেকে সরে আসেননি।

.বই নিয়ে এই ১২ তথ্য জানতেন কি.

আজও ইতালির রোমে ব্রুনোর একটি মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে ক্যাম্পো দে ফিওরি নামের চত্বরে। এই জায়গাতেই তাঁকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। মূর্তিটির মুখ ভ্যাটিকানের দিকে ফেরানো।

.

কোপার্নিকাসের বইটির শুরুর দিকেই রয়েছে সৌরজগতের একটি চিত্র। সেখানে সূর্যকে মাঝখানে রাখা হয়েছে। তার চারপাশে গ্রহগুলোর কক্ষপথ দেখানো হয়েছে। গ্রহ যত দূরের, তার কক্ষপথ তত বড়। ছবিটির পাশে লাতিন ভাষায় লেখা একটি বাক্যের অর্থ, ‘সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে সূর্য।’

তবে কোপার্নিকাসের কাজ শুধু পৃথিবীকে সৌরজগতের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি গ্রহ, সূর্য ও চাঁদের অবস্থান হিসাব করার নতুন পদ্ধতিও দিয়েছিলেন। তাঁর তৈরি সারণি ব্যবহার করে জ্যোতির্বিদ, নাবিক ও পঞ্জিকা প্রস্তুতকারকেরা আগের চেয়ে নির্ভুলভাবে বিভিন্ন তারিখে এসব মহাজাগতিক বস্তুর অবস্থান হিসাব করতে পারতেন। এমনকি আজ আমরা বিশ্বজুড়ে যে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করি, তার সংস্কারের পেছনেও কোপার্নিকাসের এই কাজের ভূমিকা ছিল।

.বই পড়ার অভ্যাস আবার ফিরিয়ে আনবেন যেভাবে.

কোপার্নিকাসের কাজ শুধু পৃথিবীকে সৌরজগতের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি গ্রহ, সূর্য ও চাঁদের অবস্থান হিসাব করার নতুন পদ্ধতিও দিয়েছিলেন।

.

গ্যালিলিও গ্যালিলির স্টারি মেসেঞ্জার

কোপার্নিকাসের ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেন ইতালির বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি। টেলিস্কোপের সাহায্যে আকাশ পর্যবেক্ষণ করে তিনি এমন কিছু জিনিস দেখতে পান, যা আগে কেউ এভাবে দেখেনি। তাঁর পর্যবেক্ষণ মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দিতে শুরু করে।

গ্যালিলিওর বিখ্যাত বই স্টারি মেসেঞ্জার বা সিডেরিয়াস নুনসিয়াস প্রকাশিত হয় ১৬১০ সালে। এই বইটি ছিল তাঁর পরবর্তী বড় কাজের প্রস্তুতি। ১৬৩২ সালে প্রকাশিত হয় ডায়ালগ কনসার্নিং দ্য টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস। এই বইয়ে তিনি কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক ধারণার পক্ষে জোরালো যুক্তি দেন।

.

তত দিনে কোপার্নিকাসের বই ক্যাথলিক চার্চের নিষিদ্ধ বইয়ের তালিকায় জায়গা পেয়েছে। গ্যালিলিওকেও এর মূল্য দিতে হয়। ১৬৩৩ সালে রোমান ইনকুইজিশন তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করে। তখন তাঁর বয়স অনেক। নির্যাতনের হুমকির মুখে তাঁকে নিজের মত থেকে সরে আসতে বাধ্য করা হয়। এই ঘটনা আজও মুক্তচিন্তায় চার্চের অন্ধবিশ্বাসের বাধার প্রতীক হয়ে আছে।

.আগামী দিনের বই.

গ্যালিলিওর বিখ্যাত বই স্টারি মেসেঞ্জার বা সিডেরিয়াস নুনসিয়াস প্রকাশিত হয় ১৬১০ সালে। এই বইটি ছিল তাঁর পরবর্তী বড় কাজের প্রস্তুতি।

.

গ্যালিলিওর স্টারি মেসেঞ্জার বইয়ের শুরুর দিকে টেলিস্কোপের একটি চিত্র রয়েছে। কেন ছবিটি এঁকেছেন, তা বোঝাতে তিনি লিখেছিলেন, এতে যন্ত্রটি বুঝতে সুবিধা হবে। ছবিতে টেলিস্কোপের নল, দুই প্রান্তের লেন্স এবং আলোর চলার পথ দেখানো হয়েছে। আলো কীভাবে যন্ত্রের ভেতর দিয়ে গিয়ে চোখে পৌঁছায়, সেটিও বোঝানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।

এই টেলিস্কোপ দিয়েই গ্যালিলিও চাঁদের দিকে তাকিয়েছিলেন। তখন তিনি দেখেন, চাঁদের পৃষ্ঠ মসৃণ নয়। সেখানে রয়েছে উঁচু পাহাড়, গর্ত আর অসমান জায়গা। অর্থাৎ চাঁদও পৃথিবীর মতো নানা পরিবর্তন ও ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে। অথচ চার্চের প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, আকাশের বস্তুগুলো নিখুঁত। গ্যালিলিওর পর্যবেক্ষণ সেই ধারণার সঙ্গে মিলল না।

.

তবে তাঁর সবচেয়ে বড় আবিষ্কারগুলোর একটি ছিল বৃহস্পতির চারটি চাঁদ খুঁজে পাওয়া। এখন আমরা জানি, বৃহস্পতির চাঁদের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। নাসার বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতির পরিচিত চাঁদ ১১৫টি। কিন্তু ১৬১০ সালের ১১ জানুয়ারি গ্যালিলিও যখন নিজের টেলিস্কোপ দিয়ে বৃহস্পতিকে দেখছিলেন, তখন তিনি চারটি চাঁদ দেখতে পান। বইয়ে তিনি সেই মুহূর্তের কথাও লিখে রেখেছেন।

.২০২৬ সালে আসছে আন্তর্জাতিক যেসব বিজ্ঞানের বই.

ছবিতে টেলিস্কোপের নল, দুই প্রান্তের লেন্স এবং আলোর চলার পথ দেখানো হয়েছে। আলো কীভাবে যন্ত্রের ভেতর দিয়ে গিয়ে চোখে পৌঁছায়, সেটিও বোঝানোর চেষ্টা করেছেন গ্যালিলিও।

.

এ আবিষ্কার ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর মাধ্যমে বোঝা গেল, মহাকাশের সব বস্তু পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরে না। এর থেকে প্রমাণ হয়, পৃথিবী কোনোভাবে মহাবিশ্বের কেন্দ্রে নেই।

গ্যালিলিওর আরেকটি পর্যবেক্ষণ মহাবিশ্বকে আরও বিশাল করে তুলেছিল। খালি চোখে রাতের আকাশে যত তারা দেখা যায়, টেলিস্কোপ দিয়ে তার চেয়ে অন্তত দশ গুণ বেশি তারা দেখতে পেয়েছিলেন তিনি। এর একটি উদাহরণ প্লেইয়াডিস নক্ষত্রপুঞ্জ। গ্যালিলিওর আঁকা ছবিতে দেখা যায়, সেখানে তিনি ৩৫টি নক্ষত্র চিহ্নিত করেছেন। অথচ খালি চোখে দেখা যায় এমন তারার সংখ্যা ছবিতে মাত্র ছয়টি। বাকি তারাগুলো এত ক্ষীণ যে সাধারণভাবে সেগুলো চোখে পড়ে না।

গ্যালিলিও আরও লক্ষ করেছিলেন, রাতের আকাশে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির যে উজ্জ্বল রেখা দেখা যায়, সেখানে অসংখ্য তারা রয়েছে। আকাশের অন্য কিছু ঝাপসা আলোর অঞ্চলেও অনেক তারা একসঙ্গে থাকতে পারে। তিনি ধারণা করেছিলেন, এসব জায়গায় রয়েছে অসংখ্য তারা, যারা দল বেঁধে অবস্থান করছে।

এই পর্যবেক্ষণ পরে ছায়াপথ সম্পর্কে আমাদের আধুনিক ধারণা গড়ে উঠতে সাহায্য করে। একটি টেলিস্কোপের সাহায্যে আকাশের দিকে তাকিয়ে গ্যালিলিও বুঝতে পেরেছিলেন, খালি চোখে যা দেখা যায়, মহাবিশ্ব তার চেয়ে অনেক বড়।

.মানুষ আর আগের মতো বই পড়ে না কেন.

গ্যালিলিওর আরেকটি পর্যবেক্ষণ মহাবিশ্বকে আরও বিশাল করে তুলেছিল। খালি চোখে রাতের আকাশে যত তারা দেখা যায়, টেলিস্কোপ দিয়ে তার চেয়ে অন্তত দশ গুণ বেশি তারা দেখতে পেয়েছিলেন তিনি।

.

আইজ্যাক নিউটনের দ্য ম্যাথমেটিক্যাল প্রিন্সিপলস অব ন্যাচারাল ফিলোসফি

রাতের আকাশে ধূমকেতু দেখা গেলে একসময় মানুষ ভয় পেত। অনেকে ভাবত, ধূমকেতু বুঝি কোনো বিপদের সংকেত। রাজা-বাদশাহরাও এমন দৃশ্য দেখে চিন্তিত হতেন। কিন্তু আইজ্যাক নিউটনের কাজ প্রমাণ করল, ধূমকেতুর চলাচলের পেছনেও রয়েছে প্রকৃতির নিয়ম। কোনো অশুভ শক্তি নয়, মহাকর্ষ বলই তাদের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে।

.

১৬৮৭ সালে নিউটন প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত বই দ্য ম্যাথমেটিক্যাল প্রিন্সিপলস অব ন্যাচারাল ফিলোসফি। বইটি বিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রিন্সিপিয়া নামেও পরিচিত। বইটির পাতায় পাতায় রয়েছে জটিল গাণিতিক হিসাব ও নানা চিত্র।

চাঁদ, সূর্য, গ্রহ ও পৃথিবীর ওপর কীভাবে বিভিন্ন বল কাজ করে। পৃথিবীর সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি। কেন নিয়মিতভাবে সমুদ্রের পানি ফুলে ওঠে, আবার নেমে যায়, তা বোঝার পথ খুলে দেন।

এ ছাড়া বইটিতে রয়েছে দোলকের গতি, গ্রহের কক্ষপথের নানা ব্যতিক্রম, বিষুবের অগ্রগতি, তরলের বাধা এবং শব্দের গতি নিয়ে আলোচনা। তরল পদার্থে ঘূর্ণির মতো যে গতির সৃষ্টি হয়, তা নিয়েও লিখেছেন নিউটন।

.আইনস্টাইনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল যে ৫ বই.

১৬৮৭ সালে নিউটন প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত বই দ্য ম্যাথমেটিক্যাল প্রিন্সিপলস অব ন্যাচারাল ফিলোসফি। বইটি বিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রিন্সিপিয়া নামেও পরিচিত।

.

বইটি পড়া সহজ নয়। এতে রয়েছে শত শত সমীকরণ, চিত্র এবং এমন কিছু প্রসঙ্গ, যা বুঝতে বিশেষ জ্ঞান দরকার। তারপরও প্রকাশের সময় বইটি বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। নিউটন মহাকর্ষ সম্পর্কে এমন একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, যা দিয়ে পৃথিবী থেকে শুরু করে মহাকাশের নানা ঘটনার হিসাব করা সম্ভব হলো। তাঁর বই প্রকৃতিকে বোঝার জন্য একটি নতুন পদ্ধতিও দেখাল। পরে এই পদ্ধতিই আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

নিউটন অবশ্য তাঁর বইয়ে কোপার্নিকাস বা গ্যালিলিওর প্রশংসা করে আলাদা করে কিছু লেখেননি। সেটা তাঁর স্বভাবও ছিল না। কিন্তু তাঁদের কাজকে নিজের গবেষণার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন তিনি।

.

বিশেষ করে গ্যালিলিওর কাজ থেকে উপকৃত হয়েছেন নিউটন। গ্যালিলিও শুধু মহাকাশের বস্তু নিয়ে গবেষণা করেননি, পৃথিবীতে কোনো বস্তু কীভাবে চলে, সেটিও বোঝার চেষ্টা করেছিলেন।

নিউটন জানতেন, বিজ্ঞানের অগ্রগতি কখনো একজন মানুষের একার কাজ নয়। একজনের আবিষ্কারের ওপর দাঁড়িয়ে পরেরজন আরও দূর পর্যন্ত দেখতে পারেন। একবার সহগবেষক রবার্ট হুককে লেখা চিঠিতে নিউটন কৃতজ্ঞাতা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আমি যদি অন্যদের চেয়ে একটু বেশি দূর পর্যন্ত দেখতে পারি, তবে তা সম্ভব হয়েছে বিশাল সব দৈত্যদের কাঁধে দাঁড়িয়ে থাকার কারণেই।’

.যে ৫ কারণে প্রতিদিন বই পড়া উচিত .

নিউটন অবশ্য তাঁর বইয়ে কোপার্নিকাস বা গ্যালিলিওর প্রশংসা করে আলাদা করে কিছু লেখেননি। সেটা তাঁর স্বভাবও ছিল না। কিন্তু তাঁদের কাজকে নিজের গবেষণার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন তিনি।

.

এই তিনটি বইয়ের দিকে তাকালে কথাটির অর্থ আরও স্পষ্ট হয়। কোপার্নিকাস দেখিয়েছিলেন, পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়। গ্যালিলিও টেলিস্কোপ দিয়ে সেই ধারণার পক্ষে নতুন প্রমাণ হাজির করেছিলেন। আর নিউটন দেখিয়েছিলেন, মহাবিশ্বের নানা বস্তুর চলাচলকে একই গাণিতিক নিয়ম দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

তাঁদের বইগুলো শুধু পুরোনো কিছু বৈজ্ঞানিক ধারণার সংগ্রহ নয়। এগুলো মানুষের চিন্তার ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যে মহাবিশ্বকে একসময় রহস্যময় ও অজানা মনে হতো, সেটিকে প্রশ্ন করে, পর্যবেক্ষণ করে এবং হিসাব কষে বোঝার পথ তৈরি করেছিলেন তাঁরা।

আর সেই কারণেই কয়েক শ বছর আগের এই বইগুলো আজও এত মূল্যবান। এগুলোর পাতায় পাতায় লেখা আছে, কীভাবে মানুষ অজানাকে জানার চেষ্টা করেছে, পুরোনো বিশ্বাসকে প্রশ্ন করেছে এবং একটু একটু করে মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচন করেছে।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

.ছাপা বই কি হারিয়ে যাবে