ঢাকা ১০:৫৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গরুর মাংস খেতে মহানবী (সা.) কেন নিরুৎসাহিত করেছেন

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩৬:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ইসলামে হালাল–হারাম নির্ধারণের একক অধিকার শুধু আল্লাহর। যেসব প্রাণী খাওয়া মুসলমানদের জন্য বৈধ করা হয়েছে, গরু তার মধ্যে অন্যতম। কিন্তু একটি হাদিস বেশ প্রচলিত যেখানে মহানবী (সা.) গরুর মাংস খেতে নিরুৎসাহিত করেছেন বা একে ‘রোগ’ আখ্যা দিয়েছেন।

এর ফলে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, গরুর মাংস যদি হালালই হয়, তবে নবীজি (সা.) কেন এমন কথা বললেন? বিষয়টির বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।

.

গরুর মাংস খাওয়া যে ধর্মীয়ভাবে সম্পূর্ণ হালাল, এ নিয়ে ফকিহদের মধ্যে বিন্দুমাত্র দ্বিমত নেই। কোরআনে সুরা বাকারার নামকরণের ইতিহাস এবং কোরবানির পশুর আলোচনায় গরুর কথা স্পষ্টভাবে এসেছে।

মহানবী (সা.) বিদায় হজের সময় তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ থেকে গরু কোরবানি দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৭০৯)

সুতরাং গরুর মাংসকে হারাম বা নিষিদ্ধ ভাবার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই।

.

মাংস হালাল হলেও স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনা করে গরুর মাংস সম্পর্কে নবীজির একটি হাদিস রয়েছে।

তিনি বলেছেন, ‘তোমরা গরুর দুধ পান করো এবং এর মাখন (ঘি) ব্যবহার করো; কারণ এর দুধে রয়েছে প্রতিষেধক এবং মাখনে রয়েছে আরোগ্য। তবে এর মাংস থেকে বেঁচে থাকো, কারণ এর মাংসে রয়েছে রোগ।’ (আল-মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন, হাদিস: ৮২২৫)

.খাদ্য সুরক্ষায় ইসলামের ৫ দর্শন.

উদ্ভিদের মধ্যে থাকা ক্ষতিকর উপাদানগুলো পশুর মাংসের মধ্যে বেশি জমা হয়, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সেই গাছপালার নির্যাস ও সার পরিশোধিত হয়ে যখন দুধে বা ঘিয়ে রূপ নেয়, তখন তা অনেক বেশি পুষ্টিকর, বিশুদ্ধ এবং মানবদেহের জন্য নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

ইমাম তিরমিজি (রহ.)

.

এই হাদিসের সত্যতা ও সনদ নিয়ে প্রাচীন মুহাদ্দিসদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। তবে নাসিরুদ্দিন আলবানিসহ অনেক মুহাদ্দিস এটিকে গ্রহণযোগ্য (হাসান বা সহিহ) বলে মত দিয়েছেন।

.

হাদিস বিশেষজ্ঞ ও ফকিহদের মতে, এই হাদিসের অর্থ এই নয় যে গরুর মাংস নিষিদ্ধ; বরং এটি একটি স্বাস্থ্যগত নির্দেশনা (তিব্বে নববি)।

আরবের উষ্ণ আবহাওয়া এবং তৎকালীন শারীরিক পরিশ্রমের ধরন অনুযায়ী অতিরিক্ত গরুর মাংস খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ছিল। (আব্দুর রউফ আল-মুনাভি, ফাইজুল কাদির শারহুল জামিউস সগির, ৩/২৫০, আল-মাকতবাতুত তিজারিয়্যাহ আল-কুবরা, মিসর)

ইমাম তিরমিজি লিখেছেন, “উদ্ভিদের মধ্যে থাকা ক্ষতিকর উপাদানগুলো পশুর মাংসের মধ্যে বেশি জমা হয় (যেহেতু মাংস সরাসরি শরীরের ভারী টিস্যু গঠন করে), যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সেই গাছপালার নির্যাস ও সার পরিশোধিত হয়ে যখন দুধে বা ঘিয়ে রূপ নেয়, তখন তা অনেক বেশি পুষ্টিকর, বিশুদ্ধ এবং মানবদেহের জন্য নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।” (আত–তিরমিজি, নাওয়াদিরুল উসুল ফি মারিফাতি আহাদিসির রাসুল, পৃষ্ঠা ২৬৪, দারুল জিল, বৈরুত)

ইবনুল কাইয়িম লিখেছেন, “গরুর মাংস ঠাণ্ডা ও শুষ্ক, হজম করতে কষ্টকর, ধীরে হজম হয় এবং তা কালো রক্ত উৎপন্ন করে; এটি শুধু কঠোর পরিশ্রমী মানুষের জন্যই উপযোগী। যারা নিয়মিত এটি খান বা এর ক্ষতিকর প্রভাব এড়াতে চান, তারা যদি এর সাথে গোলমরিচ, রসুন, দারুচিনি বা আদার মতো গরম মসলা ব্যবহার করেন, তবে এর ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।” (ইবনুল কাইয়িম, জাদুল মাআদ, ৪/৩২৪, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৯৮)

.মহানবীর প্রিয় খাবার ও পরিমিত খাদ্যাভ্যাস.

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও বলছে, অতিরিক্ত রেড মিট বা লাল মাংস হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও ক্যানসারের মতো রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। (আইএআরসি, রেড মিট অ্যান্ড প্রসেস্‌ড মিট, খ. ১১৪, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, লিয়ন, ফ্রান্স, ২০১৮)

.

কোনো হালাল খাবার যদি কারও জন্য নির্দিষ্টভাবে ক্ষতিকর প্রমাণিত হয় বা চিকিৎসকেরা নিষেধ করেন, তবে তার জন্য তা পরিহার করাই ইসলামের দাবি, যদিও তা সাধারণভাবে সবার জন্য হালাল।

.

মহানবী (সা.) সাধারণত দুম্বা বা ছাগলের মাংস বেশি পছন্দ করতেন। তবে তার মানে এই নয় যে তিনি গরুর মাংসকে খাদ্যতালিকা থেকে পুরোপুরি বাদ দিয়েছেন। বরং ইসলাম আমাদের পরিমিতিবোধ শেখায়।

আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা আহার করো ও পান করো; কিন্তু অপচয় বা সীমালঙ্ঘন কোরো না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)

হালাল বস্তু খাওয়া যাবে, তবে তা যেন শরীরের ক্ষতির কারণ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা সুন্নত।

কোনো হালাল খাবার যদি কারও জন্য নির্দিষ্টভাবে ক্ষতিকর প্রমাণিত হয় বা চিকিৎসকেরা নিষেধ করেন, তবে তার জন্য তা পরিহার করাই ইসলামের দাবি, যদিও তা সাধারণভাবে সবার জন্য হালাল। (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ৬/৩৪০, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)

.

গরুর মাংস ধর্মীয়ভাবে সম্পূর্ণ হালাল এবং উৎসব বা কোরবানিতে এটি খাওয়া আনন্দের অনুষঙ্গ।

তবে দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে অতিরিক্ত গরুর মাংস পরিহার করে পরিমিতিবোধ বজায় রাখা এবং গরুর দুধ ও ঘিয়ের প্রতি বেশি জোর দেওয়াই নবীজির বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য।

হালালকে হারাম না বানিয়ে স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতন হওয়াই মুমিনের কাজ।

.সুরা মায়িদায় আছে হারাম খাদ্য–পানীয় সর্ম্পকে

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

গরুর মাংস খেতে মহানবী (সা.) কেন নিরুৎসাহিত করেছেন

আপডেট সময় : ০৯:৩৬:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

ইসলামে হালাল–হারাম নির্ধারণের একক অধিকার শুধু আল্লাহর। যেসব প্রাণী খাওয়া মুসলমানদের জন্য বৈধ করা হয়েছে, গরু তার মধ্যে অন্যতম। কিন্তু একটি হাদিস বেশ প্রচলিত যেখানে মহানবী (সা.) গরুর মাংস খেতে নিরুৎসাহিত করেছেন বা একে ‘রোগ’ আখ্যা দিয়েছেন।

এর ফলে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, গরুর মাংস যদি হালালই হয়, তবে নবীজি (সা.) কেন এমন কথা বললেন? বিষয়টির বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।

.

গরুর মাংস খাওয়া যে ধর্মীয়ভাবে সম্পূর্ণ হালাল, এ নিয়ে ফকিহদের মধ্যে বিন্দুমাত্র দ্বিমত নেই। কোরআনে সুরা বাকারার নামকরণের ইতিহাস এবং কোরবানির পশুর আলোচনায় গরুর কথা স্পষ্টভাবে এসেছে।

মহানবী (সা.) বিদায় হজের সময় তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ থেকে গরু কোরবানি দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৭০৯)

সুতরাং গরুর মাংসকে হারাম বা নিষিদ্ধ ভাবার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই।

.

মাংস হালাল হলেও স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনা করে গরুর মাংস সম্পর্কে নবীজির একটি হাদিস রয়েছে।

তিনি বলেছেন, ‘তোমরা গরুর দুধ পান করো এবং এর মাখন (ঘি) ব্যবহার করো; কারণ এর দুধে রয়েছে প্রতিষেধক এবং মাখনে রয়েছে আরোগ্য। তবে এর মাংস থেকে বেঁচে থাকো, কারণ এর মাংসে রয়েছে রোগ।’ (আল-মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন, হাদিস: ৮২২৫)

.খাদ্য সুরক্ষায় ইসলামের ৫ দর্শন.

উদ্ভিদের মধ্যে থাকা ক্ষতিকর উপাদানগুলো পশুর মাংসের মধ্যে বেশি জমা হয়, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সেই গাছপালার নির্যাস ও সার পরিশোধিত হয়ে যখন দুধে বা ঘিয়ে রূপ নেয়, তখন তা অনেক বেশি পুষ্টিকর, বিশুদ্ধ এবং মানবদেহের জন্য নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

ইমাম তিরমিজি (রহ.)

.

এই হাদিসের সত্যতা ও সনদ নিয়ে প্রাচীন মুহাদ্দিসদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। তবে নাসিরুদ্দিন আলবানিসহ অনেক মুহাদ্দিস এটিকে গ্রহণযোগ্য (হাসান বা সহিহ) বলে মত দিয়েছেন।

.

হাদিস বিশেষজ্ঞ ও ফকিহদের মতে, এই হাদিসের অর্থ এই নয় যে গরুর মাংস নিষিদ্ধ; বরং এটি একটি স্বাস্থ্যগত নির্দেশনা (তিব্বে নববি)।

আরবের উষ্ণ আবহাওয়া এবং তৎকালীন শারীরিক পরিশ্রমের ধরন অনুযায়ী অতিরিক্ত গরুর মাংস খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ছিল। (আব্দুর রউফ আল-মুনাভি, ফাইজুল কাদির শারহুল জামিউস সগির, ৩/২৫০, আল-মাকতবাতুত তিজারিয়্যাহ আল-কুবরা, মিসর)

ইমাম তিরমিজি লিখেছেন, “উদ্ভিদের মধ্যে থাকা ক্ষতিকর উপাদানগুলো পশুর মাংসের মধ্যে বেশি জমা হয় (যেহেতু মাংস সরাসরি শরীরের ভারী টিস্যু গঠন করে), যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সেই গাছপালার নির্যাস ও সার পরিশোধিত হয়ে যখন দুধে বা ঘিয়ে রূপ নেয়, তখন তা অনেক বেশি পুষ্টিকর, বিশুদ্ধ এবং মানবদেহের জন্য নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।” (আত–তিরমিজি, নাওয়াদিরুল উসুল ফি মারিফাতি আহাদিসির রাসুল, পৃষ্ঠা ২৬৪, দারুল জিল, বৈরুত)

ইবনুল কাইয়িম লিখেছেন, “গরুর মাংস ঠাণ্ডা ও শুষ্ক, হজম করতে কষ্টকর, ধীরে হজম হয় এবং তা কালো রক্ত উৎপন্ন করে; এটি শুধু কঠোর পরিশ্রমী মানুষের জন্যই উপযোগী। যারা নিয়মিত এটি খান বা এর ক্ষতিকর প্রভাব এড়াতে চান, তারা যদি এর সাথে গোলমরিচ, রসুন, দারুচিনি বা আদার মতো গরম মসলা ব্যবহার করেন, তবে এর ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।” (ইবনুল কাইয়িম, জাদুল মাআদ, ৪/৩২৪, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৯৮)

.মহানবীর প্রিয় খাবার ও পরিমিত খাদ্যাভ্যাস.

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও বলছে, অতিরিক্ত রেড মিট বা লাল মাংস হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও ক্যানসারের মতো রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। (আইএআরসি, রেড মিট অ্যান্ড প্রসেস্‌ড মিট, খ. ১১৪, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, লিয়ন, ফ্রান্স, ২০১৮)

.

কোনো হালাল খাবার যদি কারও জন্য নির্দিষ্টভাবে ক্ষতিকর প্রমাণিত হয় বা চিকিৎসকেরা নিষেধ করেন, তবে তার জন্য তা পরিহার করাই ইসলামের দাবি, যদিও তা সাধারণভাবে সবার জন্য হালাল।

.

মহানবী (সা.) সাধারণত দুম্বা বা ছাগলের মাংস বেশি পছন্দ করতেন। তবে তার মানে এই নয় যে তিনি গরুর মাংসকে খাদ্যতালিকা থেকে পুরোপুরি বাদ দিয়েছেন। বরং ইসলাম আমাদের পরিমিতিবোধ শেখায়।

আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা আহার করো ও পান করো; কিন্তু অপচয় বা সীমালঙ্ঘন কোরো না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)

হালাল বস্তু খাওয়া যাবে, তবে তা যেন শরীরের ক্ষতির কারণ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা সুন্নত।

কোনো হালাল খাবার যদি কারও জন্য নির্দিষ্টভাবে ক্ষতিকর প্রমাণিত হয় বা চিকিৎসকেরা নিষেধ করেন, তবে তার জন্য তা পরিহার করাই ইসলামের দাবি, যদিও তা সাধারণভাবে সবার জন্য হালাল। (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ৬/৩৪০, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)

.

গরুর মাংস ধর্মীয়ভাবে সম্পূর্ণ হালাল এবং উৎসব বা কোরবানিতে এটি খাওয়া আনন্দের অনুষঙ্গ।

তবে দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে অতিরিক্ত গরুর মাংস পরিহার করে পরিমিতিবোধ বজায় রাখা এবং গরুর দুধ ও ঘিয়ের প্রতি বেশি জোর দেওয়াই নবীজির বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য।

হালালকে হারাম না বানিয়ে স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতন হওয়াই মুমিনের কাজ।

.সুরা মায়িদায় আছে হারাম খাদ্য–পানীয় সর্ম্পকে