ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এক সম্ভাবনাময় অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ
- আপডেট সময় : ০৩:১৬:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

প্রতিবছর ডেঙ্গু এক ভীতি নিয়ে ফিরে আসে বাংলাদেশে। সংবাদমাধ্যমে প্রতিদিন মৃত্যুর খবর ছাপা হয়। হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়ে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ডেঙ্গুর এই মৃত্যু আমাদের মেনে নিতে হচ্ছে। বাংলাদেশে ওষুধ আবিষ্কারের সংস্কৃতি না থাকায় ডেঙ্গুর মতো জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকটেও আমাদের কিছুই করার থাকে না। উন্নত বিশ্বে ওষুধ বা টিকা আবিষ্কার হলে সরকার হয়তো সেটা কিনতে চায়। কিংবা ওষুধ কোম্পানিগুলো জেনেরিক ওষুধ তৈরি করতে পারে।
সমস্যা হলো, যে রোগ বাংলাদেশের জন্য সমস্যা, সেটা উন্নত বিশ্বের জন্য সমস্যা না-ও হতে পারে। ডেঙ্গুর বেলাতেও অনেকটা এমনই হয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি নতুন ওষুধ আবিষ্কৃত হয় যুক্তরাষ্ট্রে। ডেঙ্গু যেহেতু আমেরিকার সমস্যা নয়, সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ আবিষ্কারক প্রতিষ্ঠানগুলো বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে এই রোগের ওষুধ বা টিকা তৈরি করতে চাইবে না। তবুও যে টিকা বা ওষুধ আবিষ্কারের চেষ্টা হচ্ছে না, তা কিন্তু নয়।
ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ আছে—ডিইএনভি-১ (DENV-1), ডিইএনভি-২, ডিইএনভি-৩ এবং ডিইএনভি-৪। একেক অঞ্চলে, একেক সময়ে একেক সেরোটাইপের প্রকোপ ও তীব্রতা বেশি থাকতে পারে। এ জন্যই ডেঙ্গুর খুব কার্যকর টিকা তৈরি করা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। ডেঙ্গুর জন্য কয়েকটা টিকা নিয়েই কাজ হয়েছে। বর্তমানে জাপানি প্রতিষ্ঠান তাকেদার (Takeda) একটি টিকা, যা কিউডেঙ্গা (Qdenga) নামে পরিচিত। সেটি বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে ভারত সম্প্রতি এই টিকা তাদের নিজেদের দেশের রোগীদের ওপর পুনরায় ফেস-৩ ট্রায়াল করে রোগীদের জন্য ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে।
তবে কিউডেঙ্গা ডেঙ্গুর সব সেরোটাইপের জন্য সমানভাবে কার্যকর নয়। সম্প্রতি বাংলাদেশের আইসিডিডিআরবি থেকে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালে ডিইএনভি-২ সেরোটাইপে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি ছিল। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে আইইডিসিআর কর্তৃক একটি গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৬ সালে ডিইএনভি-৩ সেরোটাইপে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি।
ডেঙ্গু বাংলাদেশে যেভাবে বছর বছর ফিরে আসছে এবং মহামারিরূপে দেখা দিচ্ছে, একে মোকাবিলা করতে হলে বেশ কিছু পদক্ষেপ একসঙ্গে নিতে হবে। শুধু সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মশা নিধন দিয়ে এর মোকাবিলা করা যাবে না। প্রয়োজন টিকা। প্রয়োজন অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ।
ডেঙ্গুর জন্য আমেরিকার এফডিএ কিংবা ইউরোপের ইএমএ থেকে অনুমোদিত কোনো ওষুধ এখনো নেই। ফলে বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো জেনেরিক ওষুধ তৈরি করতে পারছে না। তবে এখানে একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। একটি সম্ভাব্য ওষুধ আছে, যেটার নাম মোসনোডেনভির। এটি একটি ছোট অণুর ওষুধ, যা আবিষ্কৃত হয় বেলজিয়ামের কেইউ লুভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত এক ভাইরোলজিস্টের ল্যাবে। পরবর্তী সময়ে এই ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের দায়িত্ব নেয় স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান জনসন অ্যান্ড জনসন। তারা ফেস-১ এবং ফেস-২এ সম্পন্ন করে। কিন্তু এরপর মাঝপথে এসে ট্রায়ালের পরবর্তী ধাপগুলো বন্ধ করে দেয়। সাধারণত কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশি থাকলে বা কার্যকারিতা না থাকলে এ ধরনের ট্রায়াল বন্ধ হয়। তবে বড় বড় প্রতিষ্ঠান এসব কারণ ছাড়াও ওষুধের বাণিজ্যে সম্ভাবনা কম দেখলে অর্থ বিনিয়োগ করে ব্যয়বহুল ট্রায়াল চালিয়ে যেতে চায় না। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মোসনোডেনভিরের বেলাতেও শেষোক্ত কারণটিই ঘটেছে।
গত বছরের শেষের দিকে জনসন অ্যান্ড জনসন বিখ্যাত দুটি জার্নালে এ-সংক্রান্ত দুটি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ প্রকাশ করে। তখন এই আর্টিকেলগুলো নজরে আসে। প্রি-ক্লিনিক্যাল ড্রাগ ডিসকভারিতে দীর্ঘদিনের গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে এতটুকু বুঝতে পারি, তাদের সাইন্টিফিক ডেটা খুবই প্রতিশ্রুতিমূলক। খুবই আশাব্যঞ্জক। আর এই আর্টিকেল দুটির ওপর নির্ভর করে বিখ্যাত জার্নাল সায়েন্স একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। মোসনোডেনভির হলো প্যান-সেরোটাইপ অ্যান্টিভাইরাল। অর্থাৎ, এটি ডেঙ্গুর যেকোনো সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই কার্যকর হবে। প্রি-ক্লিনিক্যাল গবেষণায় তারা সেটাই পরীক্ষা করে দেখিয়েছে। আরেকটি ভালো দিক হলো, ফেস-১ এবং ২এ-তে মোসনোডেনভিরের কোনো উল্লেখযোগ্য বিষাক্ততা দেখা দেয়নি। প্রোফাইল্যাক্টিক স্টাডিতে এর বেশ ভালো কার্যকারিতা পাওয়া গেছে।
সায়েন্টিফিক আর্টিকেলগুলো পড়ার পর এই ফিল্ডের আরও কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আমাদের আলোচনা-পর্যালোচনা হয়। বাংলাদেশের জন্য এই ওষুধ (মোসনোডেনভির) একটি আশীর্বাদ হতে পারে কি না, তা নিয়ে আমরা ভাবতে শুরু করি। বেলজিয়ামের কেইউ লুভেনের অধ্যাপক ইয়োহান নেইটসের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাঁর ল্যাবরেটরিতেই এই ওষুধটি আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রফেসর নেইটস এবং তাঁর দল মোসনোডেনভিরের ওপর একটি প্রেজেন্টেশনও দেন। আমরা সেই প্রেজেন্টেশনে উত্থাপিত ডেটা থেকেও বুঝতে পারি, এই ওষুধটি ডেঙ্গুর চিকিৎসায় দারুণ এক সম্ভাবনা হতে পারে।
বাংলাদেশ যদি এই ওষুধটি নিয়ে কাজ করতে চায়, তাহলে বাংলাদেশকে এর ফেস-২বি ট্রায়াল করতে হবে। একে বলা হয় থেরাপিউটিক ট্রায়াল। বাংলাদেশের আইসিডিডিআরবি এ ধরনের ট্রায়ালে বেশ অভিজ্ঞ। কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে তারা অনায়াসে এটি করতে পারবে। আর ট্রায়াল সফল হলে বাংলাদেশের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর চাইলে হয়তো এই ওষুধকে ইমার্জেন্সি ইউজ অথরাইজেশন বা জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিতে পারে, ঠিক যেভাবে এফডিএ কিংবা ইএমএ দিয়ে থাকে। ওষুধ লাইসেন্সিং এবং বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে প্রাইভেট ফার্মাগুলো উদ্যোগ নিতে পারে। পুরো কাজটা একটা জাতীয় জোটের মাধ্যমেও হতে পারে, যেহেতু এখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা আবশ্যক।
বাংলাদেশ তার ইতিহাসে কখনো কোনো ওষুধ আবিষ্কার করেনি। এমনকি কোনো নতুন ওষুধের অনুমোদনও দেয়নি। বাংলাদেশ মূলত ডাউনস্ট্রিমের একেবারে শেষভাগে কাজ করে; অর্থাৎ জেনেরিক ওষুধ তৈরি করে বাজারজাত করে। এই ট্রায়াল ও অনুমোদনের কাজটা হতে পারে জাতীয় সংকটে দেশের সায়েন্টিফিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা প্রমাণের একটি চেষ্টা। পৃথিবীর যেকোনো দেশ তার জাতীয় সংকটে এ ধরনের কাজ করে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকা একদিকে যেমন ম্যানহাটন প্রজেক্টের মাধ্যমে পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছে, অন্যদিকে একই সঙ্গে পেনিসিলিন উন্নয়নেও কাজ করেছে। বিজ্ঞানের যেকোনো প্রজেক্টেই চ্যালেঞ্জ ও অনিশ্চয়তা থাকে। সেটি মাথায় রেখেই জাতীয় সংকটের মুহূর্তে একটি জাতিকে নিজের সক্ষমতা প্রমাণের চেষ্টা করতে হয়।
মোসনোডেনভিরের এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সব সায়েন্টিফিক ডেটা খুবই আশাব্যঞ্জক। পরবর্তী ধাপের চ্যালেঞ্জটা বাংলাদেশ হয়তো নিতে পারে। আর এ জন্য প্রবাসী বিজ্ঞানীরাও যেকোনো সাহায্য করতে এগিয়ে আসবেন বলেই আমার বিশ্বাস।




















