কাইলি জেনার, নাকি ৬১৮ কোটি টাকার ব্রা, আলোচনায় কোনটি
- আপডেট সময় : ০৩:৪৬:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে

ব্রা–টির দামের পাশাপাশি কাইলি জেনারকে মডেল হিসেবে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও আলোচনা, সমালোচনা হচ্ছে।
বছরের পর বছর ধরে ফ্যাশন ও সৌন্দর্যপণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের ফ্যাশন শোর অন্যতম আকর্ষণ ‘ফ্যান্টাসি ব্রা’। এটি পরার সুযোগ পাওয়াটাকে ধরা হয় মডেলদের জন্য বিশেষ সম্মান ও ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
প্রথমবারের মতো আইকনিক সেই অন্তর্বাস পরে ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের র্যাম্পে হাঁটলেন মার্কিন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও প্রসাধনসামগ্রী ব্যবসায়ী কাইলি জেনার। ১৯৯৬ সালে প্রথম এই ব্রা পরে র্যাম্পে হেঁটেছিলেন মডেল ক্লদিয়া শিফার।
একই বছর পরে বিভিন্ন সময়ে আলেসান্দ্রা অ্যামব্রোসিও ও আদ্রিয়ানা লিমার মতো মডেলও এটি পরেছিলেন। সর্বশেষ ২০১৮ সালে মডেল এলসা হস্ককে এই বিশেষ ব্রা পরতে দেখা গিয়েছিল। আট বছর পর আবারও ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের মঞ্চে ফিরে এল এই ব্রা, মডেল হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে কাইলি জেনারকে।
ফ্যান্টাসি ব্রার সঙ্গে কাইলি পরেছিলেন রুপালি থং, সাদা মিনিস্কার্ট। পায়ে ছিল স্বচ্ছ হিল। আর পিঠে জুড়ে ছিল বড়, সাদা পালকের ডানা—তাঁর সাজে ফুটে উঠেছিল ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের র্যাম্পের চিরচেনা আবেদন।
এবারের ‘ফ্যান্টাসি ব্রা’র আনুমানিক মূল্য ৫ কোটি মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি টাকায় ৬১৮ কোটি ৬০ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের সঙ্গে এটি যৌথভাবে বানিয়েছেন জ্যাকব অ্যান্ড কোংয়ের নকশাকার জ্যাকব আরাবো।
বিলাসবহুল ঘড়ি আর গয়নার ব্র্যান্ডটির বিরল গয়নার সংগ্রহ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তৈরি হয়েছে এর নকশা। মূল্যবান ধাতু ও রত্ন দিয়ে তৈরি ব্রাটিতে রয়েছে ক্রিস্টালের কাজ। নিচের দিকে ঝুলে থাকা ঝালর এর সৌন্দর্যে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা।
এবারের ফ্যান্টাসি ব্রাতে কোনো কাপড় ব্যবহার করা হয়নি। হিরা ও ১৮ ক্যারেটের সাদা সোনা দিয়ে এটি তৈরি করা হয়েছে। ব্রাটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে র্যাম্পে হাঁটার সময় কাইলি জেনারের শরীরের নড়াচড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এটিও স্বাভাবিকভাবে নড়তে পারে।
ব্রাটি তৈরি করেছেন ১৫ জন দক্ষ কারিগর। পুরো কাজ শেষ করতে তাঁদের সময় লেগেছে এক হাজার ঘণ্টার বেশি। জ্যাকব অ্যান্ড কোংয়ের দাবি, এটিই এ পর্যন্ত তৈরি সবচেয়ে মূল্যবান ফ্যান্টাসি ব্রা।
নকশাকারীর তথ্য অনুযায়ী, ১৮ ক্যারেট সোনা ও ৪ হাজার ৪১০টি হিরা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশেষ এই ব্রা। হিরা এবং সোনা মিলিয়ে ওজন হয়েছে ১ হাজার ৩৭৩ দশমিক ৩৯ ক্যারেট।
তবে সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল ৭৫ দশমিক ৫৪ ক্যারেটের উজ্জ্বল কাটের বিরল, গাঢ় হলুদ রঙের হিরাটি। যেটা ‘ফ্যান্সি ভিভিড ইয়েলো’ শ্রেণির। গয়না নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, শুধু এই হীরাটির দামই ২ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি টাকায় ২৭২ কোটি ১৮ লাখ ৬৪ হাজার ২০০ টাকা।
দামের পাশাপাশি কাইলি জেনারকে মডেল হিসেবে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও আলোচনা, সমালোচনা হচ্ছে। কার্ডাশিয়ান পরিবারের তারকা কাইলি জেনারকে বেছে নেওয়ার কারণেই এ মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
সামাজিক মাধ্যমে কেউ কেউ সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানালেও অনেকের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাশন জগতে কাজ করা অভিজ্ঞ সুপারমডেলদের কাউকে কেন এই সুযোগ দেওয়া হলো না।
ব্রিটিশ সামাজিক মাধ্যম কৌশলবিদ, বিপণন বিশেষজ্ঞ ও কনটেন্ট নির্মাতা জোয়েল মারলিনারসনের মতে, কাইলিকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল সুপরিকল্পিত। এর মধ্য দিয়ে মডেলিং ও সামাজিক মাধ্যমের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিবিসি নিউজবিটকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ‘কাইলি এমন এক নতুন যুগের প্রতিনিধিত্ব করেন, যেখানে ব্র্যান্ডগুলো গতানুগতিক মডেলের সংজ্ঞায় কে মানানসই সে বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে কাকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করা যাবে, সেটিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।’
মারলিনারসনের মতে, তরুণ দর্শকদের সঙ্গে কাইলির ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তাঁদের অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে অনুসরণ করে। কার্ডাশিয়ান বোনদের নিয়ে তৈরি রিয়েলিটি শো দেখতে দেখতেই বড় হয়েছে এই প্রজন্ম।
ফ্যাশন জগতের পুরোনো অনুরাগীদের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন। যাঁদের স্মৃতিতে নাওমি ক্যাম্পবেলের মতো কিংবদন্তি সুপারমডেলদের স্বর্ণযুগ এখনো উজ্জ্বল, তাঁদের কাছে কাইলিকে এই বিশেষ সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ফ্যাশনের পরিচিত ঐতিহ্যের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
কাইলিকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে অনেকেই লিখেছেন, প্রকৃত মডেলদের প্রতিভা ও দক্ষতাকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, একসময়ের আভিজাত্যপূর্ণ এই ফ্যাশন শো এখন মডেলিং দক্ষতার চেয়ে সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয়তাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের প্রধান সৃজনশীল কর্মকর্তা অ্যাডাম সেলম্যানের মতে, কাইলি কেবল ফ্যাশন তারকা নন, তিনি ‘সংস্কৃতির এক শক্তিশালী প্রভাবক’ (ইনফ্লুয়েন্সার)। তাঁর প্রভাব ফ্যাশন, সংস্কৃতি ও টেলিভিশনের গণ্ডিও ছাড়িয়ে গেছে।
এতে করেই বোঝা যায় ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের মতো দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডগুলো কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। এমন কাউকে সামনে আনতে চায়, যাঁকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ তৈরি হবে, সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হবে এবং দর্শকদের আকৃষ্ট করে রাখতে পারবে অনেকক্ষণ।
উল্লেখ্য, দর্শকসংখ্যা কমে যাওয়া, যৌন বৈষম্য, সেকেলে উপস্থাপনা ও বৈচিত্র্যের অভাব নিয়ে সমালোচনার মুখে ২০১৮ সালের পর ভিক্টোরিয়াস সিক্রেটের ফ্যাশন শো বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৪ সালে ‘সব ধরনের নারীকে উদ্যাপন’ করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে আবারও ফিরে আসে এই আয়োজন।
সে বছর প্লাস-সাইজ মডেল অ্যাশলি গ্রাহামসহ বিভিন্ন গড়ন ও বৈশিষ্ট্যের মডেলদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বৈচিত্র্যের ওপর গুরুত্ব দেয় ব্র্যান্ডটি। সমালোচনাকারীরা এটাও বলছে, ফ্যান্টাসি ব্রাকে ঘিরে এই বিপুল আলোচনা সমাজের বাস্তবতা থেকে আমাদের বিচ্ছিন্নতারই প্রমাণ।
যেখানে মানুষ ঠিকমতো খাবার কিনতে পারছে না, ঘরের বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার সামর্থ্যও অনেকের নেই, সেখানে আমরা কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছি এবং কোথায় অর্থ ব্যয় করছি, তা নিয়ে ভাবার সময় এসে গেছে।




















