৬ মাস থেকে ৯ বছরের শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২ সপ্তাহের মধ্যে হামের টিকা দিতে হবে
- আপডেট সময় : ০৮:০২:৩৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় টিকা না পাওয়া ছয় মাস থেকে নয় বছর বয়সী শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়ার সুপারিশ করেছে যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল। সংক্রমণ ও টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা বেশি, এমন জেলাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে বলেছে দলটি। এই কার্যক্রম দুই সপ্তাহের মধ্যে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
সুপারিশের মধ্যে আরও রয়েছে হামের প্রাদুর্ভাব কমাতে বাদ পড়া শিশু ও সংক্রমণ বেশি থাকা জেলাগুলোতে এখনই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দিতে হবে। নিয়মিত টিকার ক্ষেত্রে শিশুদের বয়সসীমা বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা দরকার। হাম–রুবেলার টিকার পরবর্তী জাতীয় ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা ঠিক সময়ে করতে হবে।
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় এ রকম একগুচ্ছ সুপারিশ করেছে যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগ নজরদারি পর্যালোচনার অংশ হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত ৭০ সদস্যের যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল এসব সুপারিশ করেছে। গত বুধবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক কর্মশালায় এই মূল্যায়ন উপস্থাপন করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক মঞ্চের প্রতিনিধি এবং দেশি জনস্বাস্থ্যবিদ, সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল বলেছে, টিকাদানের ব্যর্থতার কারণে বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাবের বিস্ফোরণ ঘটেছে। ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে টিকা থেকে বিপুলসংখ্যক শিশুর বাদ পড়া, ২০২৫ সালে হাম–রুবেলার টিকার মজুত ফুরিয়ে যাওয়া, দুই বছরের বেশি বয়সী শিশুদের নিয়মিত টিকা থেকে বাদ দেওয়ায় এ বিস্ফোরণ ঘটে। এ ছাড়া দেশের জনঘনত্ব ও প্রাদুর্ভাবে অপর্যাপ্ত সাড়ার কারণে প্রাদুর্ভাব এ পর্যায়ে এসেছে।
এ বছর মার্চে শুরু হয়েছে হামের প্রাদুর্ভাব, শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সরকার ধারণা করেছিল, টিকার মাধ্যমে তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। ৫ এপ্রিল শুরু হওয়া হাম–রুবেলা টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন শেষ হয় ২০ মে। এরপর নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি ক্যাম্পেইনে বাদ পড়া শিশুদেরও টিকা দেওয়া অব্যাহত রেখেছে স্বাস্থ্য বিভাগ; কিন্তু হাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এ পরিস্থিতিতে যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দলের সুপারিশ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা।
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল আটটা থেকে রোববার সকাল আটটা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ১ হাজার ৩১৯ জন। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ২ লাখ ৩৬ হাজার ৩৬৬ জন রোগী হাসপাতালে এসেছে। এ সময়ে হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত হামে ১ হাজার ১৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল মনে করছে টিকাদান, নজরদারি ও রোগী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জরুরি কিছু কাজ এখনই করার আছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে টিকা দেওয়ার মাধ্যমে সুরক্ষা নিশ্চিত করা। ছয় মাস থেকে নয় বছর বয়সী টিকা না পাওয়া শিশুদের বাছাই করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দিতে হবে। সংক্রমণ বেশি এমন এবং টিকা না পাওয়া শিশু বেশি এমন জেলা বাছাই করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দিতে হবে। এ দুটি কাজ দুই সপ্তাহের মধ্যে করতে হবে।
স্বাস্থ্যকর্মীদের টিকা দেওয়ারও সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের দুটি সুপারিশ আছে। হামের প্রাদুর্ভাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত ছয় মাস বয়সে হাম–রুবেলার টিকা দিতে হবে। ছয় মাসের কাছাকাছি বয়সী শিশুকে টিকা দেওয়ার পাশাপাশি পৃথক করে রাখতে হবে।
হাম নজরদারি ও প্রাদুর্ভাবে সর্বোচ্চ মান বজায় রখার কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেছেন, সন্দেহভাজন সব রোগীর (জ্বর ও র্যাশ আছে) নাম, ঠিকানা, বয়স, লিঙ্গ এসব সাধারণ তথ্য ঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে। এ ছাড়া প্রতিটি হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। হালনাগাদ রোগী ব্যবস্থাপনা নির্দেশনা হাসপাতালে রাখতে হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ীভাবে বাদ পড়া শিশুদের টিকা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল টিকাদানের স্থানীয় পরিকল্পনা হালনাগদ করার পরামর্শ দিয়েছে। তারা বলেছে, যোগ্য সব শিশুকে ঠিক সময় নিয়মিত টিকা দিতে হবে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে শিশুদের সর্বোচ্চ বয়স দুই বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করতে বলা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সব বয়সের উপযুক্ত মানুষের টিকার ব্যবস্থা করার কথা বলেছে।
বিশেষজ্ঞ দল বলেছে, বিদ্যালয়ে ভর্তির সময় শিশুদের টিকাদানের কার্ড যাচাই–বাছাই করতে হবে, যাতে বাদ পড়া শিশুদের টিকা নিশ্চিত করা যায়।
পরবর্তী হাম–রুবেলার ক্যাম্পেইনের জন্য সময়মতো পরিকল্পনা করতে হবে। সম্ভবত সেই ক্যাম্পেইন হবে ২০২৯ বা ২০৩০ সালে।
যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল উচ্চ মানসম্পন্ন নজরদারি ও প্রাদুর্ভাবে যথাসময়ে সাড়া দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তারা বলেছে, নতুন রোগীর ওপর সক্রিয় নজরদারি করতে হবে; আর এটা নিশ্চিত করতে হবে যে জ্বর ও র্যাশ থাকা রোগীর ক্ষেত্রে জাতীয় নির্দেশনা অনুসরণ করা হচ্ছে।
সবশেষে বিশেষজ্ঞ দল বলেছে, টিকার কার্যকারিতার ওপর প্রভাব ফেলে এমন প্রাতিষ্ঠানিক ও মাঠপর্যায়ের ত্রুটিগুলো খতিয়ে দেখতে গবেষণা করতে হবে। এ ছাড়া নয় মাসের কম বয়সী শিশুদের তথ্য পর্যালোচনা করা দরকার।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দলের সুপারিশ প্রায় সবগুলোই গুরুত্বপূর্ণ। আমরাও শিশুদের টিকাদানের বয়স বাড়ানোর কথা বলে আসছি। তবে হাম মোকাবিলায় কমিউনিটির সম্পৃক্ততার কথা সুপারিশে নেই, মনে হয় কিছুটা গুরুত্ব কম পেয়েছে।’ তাঁর মতে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সহায়তা না দিলে, ওষুধের সহায়তা না দিলে তারা হাসপাতালে আসবে কেন? তারা হাসপাতালে এসে চিকিৎসা না নিলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
























