ঢাকা ১২:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জেলেপাড়ায় সারা বছর টানাটানির সংসার, দুর্গাপূজায় আনন্দের কমতি নেই

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৫৮:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সারা বছর নদী, খাল-বিল ও অন্যের জলাশয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন তাঁরা। কেউ নিজের ধরা মাছ বাজারে বিক্রি করেন, কেউ পাইকারি বাজার থেকে মাছ কিনে খুচরা বাজারে বিক্রি করেন। কেউ আবার অন্যের জলাশয়ে মাছ ধরার কাজ করেন। তাঁদের অনেকের সংসার চলে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে। তবু শারদীয় দুর্গাপূজা এলেই বদলে যায় মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দিঘী ইউনিয়নের দিঘী জেলেপাড়ার চিত্র।

সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও ঘরে ঘরে শুরু হয় উৎসবের প্রস্তুতি। নতুন পোশাক কেনা, পূজার উপকরণ সংগ্রহ আর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আনন্দে সময় কাটানোর প্রত্যাশায় মুখর হয়ে ওঠেন এ পাড়ার বাসিন্দারা।

মাছ ধরার পেশায় যুক্ত মানুষের জীবন প্রকৃতির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। কখনো মাছের জোগান ভালো থাকলে আয় বাড়ে, আবার কখনো মাছ কম পাওয়া গেলে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে। মাছ ধরার খরচ, বাজারের দর এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে সারা বছরের সঞ্চয়ও খুব বেশি থাকে না। এর মধ্যেই আসে দুর্গাপূজা। পরিবারের সবার জন্য আনন্দের এই সময়ে বাড়তি খরচের চাপ সামলাতে হয় তাঁদের।

রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, দিঘী জেলেপাড়ার অধিকাংশ ঘর টিনের হলেও মাটির মেঝে। জরাজীর্ণ পুরোনো টিনের ঘরগুলোতে থাকা বাসিন্দাদের ঘরে ঘরে এখন আনন্দ-উৎসবের আয়োজন। শিশুরা নতুন জামাকাপড় পরে আনন্দে মেতেছে। কোনো বাড়িতে আত্মীয়স্বজন এসেছেন বেড়াতে। হরেক রকমের খাবারে চলছে তাঁদের আপ্যায়ন।

জেলার অন্যতম বৃহৎ মাছের পাইকারি বাজার তরা আড়ত থেকে প্রায় প্রতিদিন ভোরে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার মাছ কেনেন দিঘী মাঝিপাড়ার গৌড় রাজবংশী (৪৫)। তিনি বলেন, এসব মাছ ভ্যানে করে বিভিন্ন গ্রামে বিক্রি করেন তিনি। এ থেকে দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় হয়। এই দিয়েই চলে তাঁর তিন সদস্যের পরিবার। দুর্গপূজায় পরিবারের সবার জন্য নতুন জামাকাপড়, পূজার নানা উপকরণ কিনেছেন।

জেলেপাড়ার বাসিন্দারা জানান, দিঘী মাঝিপাড়ায় দুই শতাধিক পরিবারের বসবাস। এখানকার অধিকাংশ পরিবারই দরিদ্র। তাঁদের অনেকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ সীমিত। বংশপরম্পরায় মাছ ধরা তাঁদের জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তবে সময়ের পরিবর্তনে কেউ কেউ পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন। কেউ জীবিকার তাগিদে মাছের ব্যবসায় নেমেছেন। তবু মাছ ও জলাশয়ের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক এখনো অটুট।

এই মহল্লার মাছ ব্যবসা ছেড়ে এখন রিকশা চালিয়ে পরিবার নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন মন্টু রাজবংশী (৩৮)। ঋণের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে তাঁকে বসতভিটাটুকুও বিক্রি করতে হয়েছে। প্রায় তিন বছর ধরে অন্যের জায়গা ভাড়া নিয়ে ছোট একটি টিনের ঘর তুলে দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস তাঁর।

মন্টু রাজবাংশী বলেন, ‘এহন রিকশা চালাইয়া দিনে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা কামাই (আয়) করি। এইবার পূজায় দুই ম্যায়া ও বউয়ের জামাকাপড় কিনছি। আমার জন্য লুঙ্গি-ফতুয়া কিনছি। অভাব থাকলেও পূজায় সন্তানগো আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই চেষ্টা করি।’

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলেপাড়ার কেউ কেউ চড়া সুদে ঋণ নিয়ে মাছের ব্যবসা করেন। পাইকারি বাজার থেকে মাছ কিনে খুচরা বাজারে বিক্রি করে চলে তাঁদের সংসার। তবে মাছ বিক্রি করে যে আয় হয়, তা দিয়ে সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় লোকসান কিংবা মাছের দাম কম পাওয়ায় ঋণের বোঝা আরও বাড়ে। এভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে গিয়ে ঋণের জালে আটকে পড়ছেন কেউ কেউ।

জেলেপাড়ার প্রবীণ জেলে কৃষ্ণ রাজবংশী (৯০) বলেন, ‘মাছ ধরা পেশায় এখন আর আগের মতো আয় নেই। পরিবার-পরিজন নিয়ে কোনোরকমে টিকে আছি। পূজায় বিভিন্ন কেনাকাটায় এবং ধর্ম পালনে টাকাপয়সা খরচ হয়। কষ্ট হলেও এই পূজায় পরিবারের সবার মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করি।’

তরা আড়ত থেকে মাছ কিনে পাশের গড়পাড়া ঘোষের বাজারে মাছ বিক্রি করেন মনা রাজবংশী (৫৫)। তিনি বলেন, দুর্গাপূজা সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। অর্থাভাব থাকলেও পরিবারের সবাইকে নিয়ে এই উৎসবে আনন্দের ঘাটতি হয় না।

মাঝিপাড়ায় দিঘী কালীবাড়ি সর্বজনীন দুর্গামন্দির রয়েছে। এ পাড়ার হালদার ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের লোকজন নিজেদের অর্থে মন্দিরে পূজা করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। মন্দির কমিটির সভাপতি ভোলানাথ হালদার বলেন, ‘পূজা উপলক্ষে আমাদের মহল্লার ২০০ পরিবার থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা অনুদান নির্ধারণ করা হয়েছে। কেউ দিয়েছেন, আবার কেউ এখনো দেননি। এই অনুদানের অর্থ মণ্ডপে প্রতিমা তৈরি ও সাজসজ্জা, পূজা ও আচার অনুষ্ঠান, বিদ্যুৎ ও আলোকসজ্জা এবং আপ্যায়নে ব্যয় হয়।’

ভোলানাথ হালদারের ভাষ্যমতে, দিঘী মাঝিপাড়ার বাসিন্দাদের কাছে দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার পালনের উপলক্ষ নয়, এটি পারিবারিক মিলন ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করারও সময়। সারা বছর জীবিকার প্রয়োজনে ব্যস্ত থাকা মানুষগুলো পূজার দিনগুলোতে পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পান। পাড়ার মানুষের মধ্যেও তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। সীমিত সামর্থ্যের কারণে আয়োজনের পরিধি ছোট হলেও আনন্দের কমতি রাখতে চান না তাঁরা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

জেলেপাড়ায় সারা বছর টানাটানির সংসার, দুর্গাপূজায় আনন্দের কমতি নেই

আপডেট সময় : ০৮:৫৮:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সারা বছর নদী, খাল-বিল ও অন্যের জলাশয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন তাঁরা। কেউ নিজের ধরা মাছ বাজারে বিক্রি করেন, কেউ পাইকারি বাজার থেকে মাছ কিনে খুচরা বাজারে বিক্রি করেন। কেউ আবার অন্যের জলাশয়ে মাছ ধরার কাজ করেন। তাঁদের অনেকের সংসার চলে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে। তবু শারদীয় দুর্গাপূজা এলেই বদলে যায় মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দিঘী ইউনিয়নের দিঘী জেলেপাড়ার চিত্র।

সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও ঘরে ঘরে শুরু হয় উৎসবের প্রস্তুতি। নতুন পোশাক কেনা, পূজার উপকরণ সংগ্রহ আর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আনন্দে সময় কাটানোর প্রত্যাশায় মুখর হয়ে ওঠেন এ পাড়ার বাসিন্দারা।

মাছ ধরার পেশায় যুক্ত মানুষের জীবন প্রকৃতির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। কখনো মাছের জোগান ভালো থাকলে আয় বাড়ে, আবার কখনো মাছ কম পাওয়া গেলে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে। মাছ ধরার খরচ, বাজারের দর এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে সারা বছরের সঞ্চয়ও খুব বেশি থাকে না। এর মধ্যেই আসে দুর্গাপূজা। পরিবারের সবার জন্য আনন্দের এই সময়ে বাড়তি খরচের চাপ সামলাতে হয় তাঁদের।

রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, দিঘী জেলেপাড়ার অধিকাংশ ঘর টিনের হলেও মাটির মেঝে। জরাজীর্ণ পুরোনো টিনের ঘরগুলোতে থাকা বাসিন্দাদের ঘরে ঘরে এখন আনন্দ-উৎসবের আয়োজন। শিশুরা নতুন জামাকাপড় পরে আনন্দে মেতেছে। কোনো বাড়িতে আত্মীয়স্বজন এসেছেন বেড়াতে। হরেক রকমের খাবারে চলছে তাঁদের আপ্যায়ন।

জেলার অন্যতম বৃহৎ মাছের পাইকারি বাজার তরা আড়ত থেকে প্রায় প্রতিদিন ভোরে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার মাছ কেনেন দিঘী মাঝিপাড়ার গৌড় রাজবংশী (৪৫)। তিনি বলেন, এসব মাছ ভ্যানে করে বিভিন্ন গ্রামে বিক্রি করেন তিনি। এ থেকে দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় হয়। এই দিয়েই চলে তাঁর তিন সদস্যের পরিবার। দুর্গপূজায় পরিবারের সবার জন্য নতুন জামাকাপড়, পূজার নানা উপকরণ কিনেছেন।

জেলেপাড়ার বাসিন্দারা জানান, দিঘী মাঝিপাড়ায় দুই শতাধিক পরিবারের বসবাস। এখানকার অধিকাংশ পরিবারই দরিদ্র। তাঁদের অনেকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ সীমিত। বংশপরম্পরায় মাছ ধরা তাঁদের জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তবে সময়ের পরিবর্তনে কেউ কেউ পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন। কেউ জীবিকার তাগিদে মাছের ব্যবসায় নেমেছেন। তবু মাছ ও জলাশয়ের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক এখনো অটুট।

এই মহল্লার মাছ ব্যবসা ছেড়ে এখন রিকশা চালিয়ে পরিবার নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন মন্টু রাজবংশী (৩৮)। ঋণের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে তাঁকে বসতভিটাটুকুও বিক্রি করতে হয়েছে। প্রায় তিন বছর ধরে অন্যের জায়গা ভাড়া নিয়ে ছোট একটি টিনের ঘর তুলে দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস তাঁর।

মন্টু রাজবাংশী বলেন, ‘এহন রিকশা চালাইয়া দিনে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা কামাই (আয়) করি। এইবার পূজায় দুই ম্যায়া ও বউয়ের জামাকাপড় কিনছি। আমার জন্য লুঙ্গি-ফতুয়া কিনছি। অভাব থাকলেও পূজায় সন্তানগো আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই চেষ্টা করি।’

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলেপাড়ার কেউ কেউ চড়া সুদে ঋণ নিয়ে মাছের ব্যবসা করেন। পাইকারি বাজার থেকে মাছ কিনে খুচরা বাজারে বিক্রি করে চলে তাঁদের সংসার। তবে মাছ বিক্রি করে যে আয় হয়, তা দিয়ে সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় লোকসান কিংবা মাছের দাম কম পাওয়ায় ঋণের বোঝা আরও বাড়ে। এভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে গিয়ে ঋণের জালে আটকে পড়ছেন কেউ কেউ।

জেলেপাড়ার প্রবীণ জেলে কৃষ্ণ রাজবংশী (৯০) বলেন, ‘মাছ ধরা পেশায় এখন আর আগের মতো আয় নেই। পরিবার-পরিজন নিয়ে কোনোরকমে টিকে আছি। পূজায় বিভিন্ন কেনাকাটায় এবং ধর্ম পালনে টাকাপয়সা খরচ হয়। কষ্ট হলেও এই পূজায় পরিবারের সবার মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করি।’

তরা আড়ত থেকে মাছ কিনে পাশের গড়পাড়া ঘোষের বাজারে মাছ বিক্রি করেন মনা রাজবংশী (৫৫)। তিনি বলেন, দুর্গাপূজা সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। অর্থাভাব থাকলেও পরিবারের সবাইকে নিয়ে এই উৎসবে আনন্দের ঘাটতি হয় না।

মাঝিপাড়ায় দিঘী কালীবাড়ি সর্বজনীন দুর্গামন্দির রয়েছে। এ পাড়ার হালদার ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের লোকজন নিজেদের অর্থে মন্দিরে পূজা করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। মন্দির কমিটির সভাপতি ভোলানাথ হালদার বলেন, ‘পূজা উপলক্ষে আমাদের মহল্লার ২০০ পরিবার থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা অনুদান নির্ধারণ করা হয়েছে। কেউ দিয়েছেন, আবার কেউ এখনো দেননি। এই অনুদানের অর্থ মণ্ডপে প্রতিমা তৈরি ও সাজসজ্জা, পূজা ও আচার অনুষ্ঠান, বিদ্যুৎ ও আলোকসজ্জা এবং আপ্যায়নে ব্যয় হয়।’

ভোলানাথ হালদারের ভাষ্যমতে, দিঘী মাঝিপাড়ার বাসিন্দাদের কাছে দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার পালনের উপলক্ষ নয়, এটি পারিবারিক মিলন ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করারও সময়। সারা বছর জীবিকার প্রয়োজনে ব্যস্ত থাকা মানুষগুলো পূজার দিনগুলোতে পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পান। পাড়ার মানুষের মধ্যেও তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। সীমিত সামর্থ্যের কারণে আয়োজনের পরিধি ছোট হলেও আনন্দের কমতি রাখতে চান না তাঁরা।