‘আমার কলিজার পাখিটা যখন চলে গেছে, এখন আর কিছু বলব না’
- আপডেট সময় : ০৭:০০:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানখেত থেকে মরদেহ উদ্ধার হওয়া স্কুলছাত্রীর (১৫) গ্রামের বাড়ি যশোর সদর উপজেলার একটি গ্রামে। গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাতে তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে পরিবারে মাতম নেমে আসে। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ বাবা–মা। পরে আজ শুক্রবার সকাল ১০টায় জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
আজ দুপুরে স্থানীয় সাংবাদিকেরা ছবি তুলতে গেলে নিহত ছাত্রীর মা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলতে শুরু করেন, ‘কী হবে ছবি তুলে? আমার কলিজার পাখিটা যখন চলে গেছে; এখন আর কিছু বলব না।’ পরে তিনি মেয়ে যে বান্ধবীর বাসায় গিয়েছিল, তাকে ধরলে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন হবে বলে দাবি করেন।
পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হয় ওই ছাত্রী। সে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায়। এরপর কুমিল্লায় ফিরে কক্সবাজারে যায়। সেখান থেকে ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’ বাসে করে গত বুধবার রাত ১২টার দিকে নগরের হোটেল নুরজাহানে নামে এবং সোয়া ১২টার দিকে বেরিয়ে যায়। সেখান থেকে তাঁর গন্তব্য ছিল বাসা। কিন্তু পরদিন (গতকাল) সকালে লালমাইয়ের পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া জঙ্গল-সংলগ্ন ধানখেতে তার মরদেহ পাওয়া যায়।
পুলিশ বলছে, পদুয়ার বাজারে নামার পর শহরের দিকে না গিয়ে মেয়েটি কীভাবে লালমাইয়ের নির্জন ফসলি জমিতে পৌঁছাল, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। গতকাল তার মরদেহ উদ্ধারের সময় পাশে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পাওয়া যায়। অটোরিকশার ভেতরে পাওয়া যায় মেয়েটির একটি পোশাক। পাশে পড়ে ছিল একটি ভ্যানিটি ব্যাগ।
এই অটোরিকশাই স্কুলছাত্রী হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠেছে। পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, ইতিমধ্যে সন্দেহভাজন অটোরিকশাচালক সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে আটক করা হয়েছে। তার আগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁর দুই নিকটাত্মীয়কেও হেফাজতে নেওয়া হয়।
কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান আজ দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, লালমাইয়ে কিশোরী হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশ কাজ করছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে একজনকে আটক করে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। দ্রুত এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানানো হবে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মরদেহের পাশে পাওয়া অটোরিকশাটি ভাড়ায় নিয়ে চালাতেন সুমন। তাঁর বাড়ি লালমাই-সংলগ্ন জয়নগর এলাকায়। বেশির ভাগ সময় রাতে পদুয়ার বাজার ও আশপাশের এলাকায় যাত্রী পরিবহন করতেন তিনি। নিজের বাড়ি না থাকায় থাকতেন শ্বশুরবাড়িতে। ঘটনার পর থেকে সুমন আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও মুঠোফোন না থাকায় সুমনের অবস্থান শনাক্ত করতে গিয়ে সমস্যা হলেও পরে তাঁকে আটক করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, সিএনজিচালককে কেন্দ্র করেই তদন্ত এগোচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে আর কেউ জড়িত কি না এবং কিশোরীর সঙ্গে থাকা মুঠোফোনসহ অন্যান্য মালামাল কোথায়, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গতকাল সকালে সড়কের পাশে ধানখেতে অটোরিকশাটি পড়ে থাকতে দেখে সন্দেহ হয় এলাকাবাসীর। এরপর অটোরিকশা থেকে প্রায় ৩০ গজ দূরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ এবং কিছুটা দূরে স্কুলছাত্রীর মরদেহ দেখতে পান তাঁরা। আশপাশের খেতে ধানগাছ এলোমেলো ও ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। এসব চিহ্ন দেখে সেখানে দৌড়াদৌড়ি কিংবা ধস্তাধস্তি হয়ে থাকতে পারে বলে তাঁরা ধারণা করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রুহুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ধানখেতডির ধানগাছ ভাঙাচোরা। ধস্তাধস্তির মতো চিহ্ন দেখলাম। মাইয়াডার মুখ-মাথা কাদায় ছিল আর গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। পরে এলাকার ২০-২৫ জন মিল্লা সিএনজিডা ধানখেত থিকা রাস্তায় তুলছে। সিএনজির ভিতরে মাইয়াডার একটা জামাও পাইছে। তার বাপে দেইখ্যা কইছে, এই জামা তাঁর মাইয়ার।’
পুলিশ জানিয়েছে, নিহত স্কুলছাত্রী বুধবার বিকেলে এক শিক্ষকের মাধ্যমে পরিবারকে জানায় যে রাতে সে বাসায় ফিরবে। পরে রাত পৌনে দুইটার দিকে বাবার মুঠোফোনে লালমাইয়ের ‘লাইভ লোকেশন’ পাঠিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছিল ওই ছাত্রী। কিন্তু বাবা ঘুমিয়ে থাকায় বার্তাটি তখন দেখতে পারেননি।
নিহত স্কুলছাত্রীর বাবা প্রথম আলোকে বলেন, ‘সকালে মেসেজ দেখি। তারপর লাইভ লোকেশনে গিয়ে মেয়ের মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে দেখতে পাই।’ তিনি বলেন, ‘এখন কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে চাই না। আমার মেয়ের সঙ্গে কী হয়েছে, কারা তাকে হত্যা করেছে, পুরো ঘটনা জানতে চাই। জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করার দাবি জানাই।’
কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনাস্থল ধানখেতজুড়ে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, জীবন বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করেছিল ওই ছাত্রী। এ ঘটনায় তার বাবা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লালমাই থানায় একটি মামলা করেছেন। ইতিমধ্যে আজ সকালে চট্টগ্রাম থেকে সিএনজিচালক সুমনকে আটক করেছে পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বিস্তারিত সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তুলে ধরা হবে।


















