যুদ্ধের আঘাতে ভাঙছে রক্তের সম্পর্ক
- আপডেট সময় : ১১:১৯:০৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬ ৩৪ বার পড়া হয়েছে

ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ কেবল সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব গভীরভাবে ঢুকে পড়েছে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক ও আবেগের ভেতরে। একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও মতাদর্শগত বিভাজন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, রক্তের সম্পর্ক পর্যন্ত ভেঙে যাচ্ছে।
কেউ যুদ্ধকে পরিবর্তনের সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে নিরীহ মানুষের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় মনে করছেন। বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দের মাঝেই ইরানের ঘরে ঘরে তৈরি হচ্ছে এক নীরব কিন্তু গভীর দ্বন্দ্ব, যা ভবিষ্যতে সমাজে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
তেহরান-এর কাছের একটি শহরে এক ভাই তার বোনকে সরাসরি বলে বসেন, ‘তুমি আর আমার বোন নও।’ এমন ঘটনা এখন বিচ্ছিন্ন নয়; বরং যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এটি অনেক পরিবারের বাস্তব চিত্র হয়ে উঠছে।
একটি পরিবারের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, নওরোজ উৎসব উপলক্ষে সবাই একত্রিত হলেও আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। পরিবারের এক সদস্য, যিনি সরকারসমর্থক একটি স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত, নিজের বোনের সঙ্গে কথা বলা তো দূরের কথা, তাকে অভিবাদন জানাতেও অস্বীকৃতি জানান। একই ঘরে থেকেও তারা যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই জগতে বসবাস করছেন।
পরিবারের তরুণ সদস্যদের মধ্যে বিভক্তি আরও স্পষ্ট। কেউ মনে করেন, বাইরের চাপ বা হামলা পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে। আবার অন্যরা এটিকে দেশের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেন। এই মতভেদ কখনো কখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, পারিবারিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়।
আরেক তরুণের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, তার বোন সরকারের সমর্থক হওয়ায় পারিবারিক সম্পর্ক আগে থেকেই টানাপড়েনে ছিল। যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পারিবারিক অনুষ্ঠানে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে তিনি একাই ফিরে আসেন।
ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতা এই সংকটকে আরও জটিল করেছে। কেউ কেউ বিকল্প উপায়ে যোগাযোগ চালিয়ে গেলেও সেই যোগাযোগই অনেক সময় নতুন দ্বন্দ্বের জন্ম দিচ্ছে। পরিবারে মতপার্থক্য এখন শুধু কথার লড়াই নয়, বরং আচরণ ও সিদ্ধান্তেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
উত্তরাঞ্চলের এক শিক্ষার্থীর ভাষ্য, তার বাবা যুদ্ধকে সমর্থন করলেও তিনি তা মেনে নিতে পারছেন না। তার মতে, এই সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এমন মতবিরোধ প্রায়ই পারিবারিক তর্ককে তীব্র করে তুলছে।
নওরোজের মতো ঐতিহ্যবাহী উৎসব, যা সাধারণত মিলন ও আনন্দের প্রতীক, সেটিও এবার অনেক পরিবারের জন্য অস্বস্তির উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। একই টেবিলে বসেও অনেকে কথা বলছেন না, চোখাচোখি এড়িয়ে যাচ্ছেন। কোথাও আবার পুরোনো ক্ষোভ নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে।
একই সঙ্গে বেড়েছে ভয় ও অনিশ্চয়তা। অনেক তরুণ-তরুণী এখন নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করছেন। ভুল জায়গায় কিছু বলে ফেললে বিপদ হতে পারে—এই আশঙ্কা তাদের চুপ করে থাকতে বাধ্য করছে। ফলে বন্ধুত্ব ও সামাজিক সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবও পারিবারিক সম্পর্কে চাপ সৃষ্টি করছে। কাজের সুযোগ কমে যাওয়া, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা মানুষের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা সরাসরি সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে।
সব মিলিয়ে, ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত শুধু সামরিক নয়, সামাজিক ও মানবিক সংকটেও রূপ নিচ্ছে। এই নীরব ভাঙন দীর্ঘমেয়াদে সমাজের ভেতরে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।























