কৃষিতে বিকল্প জ্বালানি: সৌরশক্তির দিকে ঝুঁকছে গাইবান্ধা
- আপডেট সময় : ১১:২৬:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬ ৩৯ বার পড়া হয়েছে

আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি বাজারের অস্বাভাবিক ওঠানামার প্রভাব যখন ক্রমেই বাড়ছে, তখন সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে বাংলাদেশের কৃষি খাতে। বিশেষ করে গাইবান্ধা-এর মতো কৃষিনির্ভর জেলাগুলোতে সেচনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় জ্বালানি সংকট এখন বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি নিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো অনেকটা স্বাভাবিক চিত্র। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ডিজেলনির্ভর কৃষিতে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কৃষকদের অভিযোগ, সময়মতো ডিজেল না পাওয়ায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, ফলে বোরো ধানসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশের কৃষিতে এখনও সেচের বড় অংশ নির্ভর করে ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর। দেশে প্রায় ১৬ লাখ ডিজেলচালিত সেচ পাম্প ব্যবহৃত হয়, যার বাজারমূল্য এক হাজার কোটি টাকারও বেশি। শুধু ধান চাষেই বছরে প্রায় ১০ লাখ টন ডিজেলের প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প চালাতে ২ হাজার থেকে ২২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লাগে। মোট প্রায় ৫৫ লাখ হেক্টর জমিতে এই সেচ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ফলে জ্বালানি বা বিদ্যুৎ সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে সেচ খরচ বিঘাপ্রতি ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানান স্থানীয় কৃষকরা। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো তেল না পাওয়ায় জমিতে সেচ দিতে দেরি হচ্ছে, যা সরাসরি ফলনে প্রভাব ফেলছে। সদর উপজেলার কৃষক রিয়াজউদ্দিন বলেন, ‘মাঝেমধ্যে পাম্প চালানোর জন্য তেল পাওয়া যায় না। আবার দাম বেশি থাকলে সেচ কম দিতে হয়, এতে ফলন কমে যায়।’
এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌরশক্তিনির্ভর সেচ প্রযুক্তি হতে পারে একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধান। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সৌরচালিত সেচ পাম্প ব্যবহারে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতি বছর ১৭ হাজার টনের বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন কমানো সম্ভব। পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমতে পারে প্রায় ১ দশমিক ৮৮ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত।
বর্তমানে দেশে ২ হাজারের বেশি সৌরচালিত সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে, যার একটি অংশ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায়। গাইবান্ধাতেও সীমিত পরিসরে কিছু সৌরচালিত পাম্প চালু হয়েছে, যা কৃষকদের মধ্যে আশাব্যঞ্জক সাড়া ফেলেছে।
সৌরচালিত সেচব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, একবার স্থাপন করলে দীর্ঘমেয়াদে প্রায় বিনা খরচে পানি উত্তোলন করা যায়। সূর্যের আলো থাকলেই পাম্প চালানো সম্ভব হওয়ায় ডিজেল বা বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমে যায়। পরিবেশবান্ধব এই প্রযুক্তি কার্বন নিঃসরণ কমায়, যা জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে গাইবান্ধার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি উদ্যোগেও এ খাত এগোচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (আইডকোল) যৌথভাবে দেশে সৌর সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। আইডকোলের তথ্য অনুযায়ী, একটি সৌরচালিত পাম্প বছরে গড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার লিটার ডিজেল সাশ্রয় করতে পারে। এতে কৃষকের খরচ কমার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি আমদানির চাপও হ্রাস পায়।
তবে এই প্রযুক্তির বিস্তারে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। একটি সৌরচালিত সেচ পাম্প স্থাপনে ১৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে, যা এককভাবে কৃষকের পক্ষে বহন করা কঠিন। ফলে সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা বা সরকারি ভর্তুকি ছাড়া এই প্রযুক্তির বিস্তার ধীরগতির। পাশাপাশি জমির মালিকানা, সেচের সময়সূচি নির্ধারণ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম মনে করেন, জেলার চরাঞ্চলগুলো সৌর সেচের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। সেখানে বিদ্যুতের লাইন পৌঁছানো কঠিন এবং ডিজেল সরবরাহও অনিশ্চিত। ক্লাস্টারভিত্তিক সৌর সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে কৃষিতে টেকসই পরিবর্তন আনা সম্ভব।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জিইউকের প্রধান নির্বাহী ও চর গবেষক এম আবদুস সালাম বলেন, সৌরশক্তিনির্ভর সেচ ব্যবস্থা কৃষকদের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। এ খাতে সরকারি সহায়তা ও বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এই সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গাইবান্ধার মতো সম্ভাবনাময় জেলায় সৌরশক্তির ব্যবহার শুধু সেচেই সীমাবদ্ধ না রেখে ধান শুকানো, শস্য সংরক্ষণ এবং ক্ষুদ্র কৃষিযন্ত্র পরিচালনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জ্বালানি সংকট যখন কৃষির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন গাইবান্ধায় সৌরশক্তি হতে পারে একটি বাস্তবসম্মত ও টেকসই সমাধান। প্রয়োজন পরিকল্পিত বিনিয়োগ, নীতিগত সহায়তা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি। সঠিক উদ্যোগ নেওয়া গেলে উত্তরবঙ্গের এই জেলাই হতে পারে দেশের কৃষিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সফল মডেল।


























