ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সুন্দরগঞ্জে বর্ণাঢ্য সাইকেল র্যালি
- আপডেট সময় : ০৬:১১:৪৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৬২ বার পড়া হয়েছে

শুক্রবারের সকালটা গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ছিল অন্যরকম। ভোরের হালকা কুয়াশা এখনও পুরোপুরি সরে যায়নি, বাতাসে শীতের মৃদু তাপ। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো যেন ধীরে ধীরে চোখ মেলছে, আর ঘরে ঘরে সূর্যের আলো দুলছে শান্তির মতো। ঠিক সেই সময় একের পর এক সাইকেল জমে উঠল সুন্দরগঞ্জ আব্দুল মজিদ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। সবার গায়ে মানচিত্রের জার্সি, কারও কাঁধে ব্যাগ, কারও হাতে জাতীয় পতাকা, কেউ হাতে নিয়েছে দলীয় পতাকা, আর কারও মুখে খোলা হাসি। কিন্তু সব চোখে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা—আজ শুধু চলা নয়, আজ বলা আছে।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সুন্দরগঞ্জে আয়োজন করা হয় বর্ণাঢ্য সাইকেল র্যালি। প্রায় এক হাজার সাইকেল, প্রায় ১৮ কিলোমিটার পথ। প্রতিটি প্যাডেলে বার্তা, প্রতিটি চাকা ঘোরায় সচেতনতার ছোঁয়া। এটি কোনো প্রতিযোগিতা নয়, কোনো তাড়াহুড়া নয়। ছিল শুধু এক অঙ্গীকার—শৃঙ্খলা, আদর্শ, দায়িত্ব এবং সংগ্রামের প্রতীক।
সকালে মাঠ ভরে ওঠে তরুণদের কোলাহলে। সাইকেলের চাকায় চাকায় শব্দ, বাতাসে উড়ছে রঙিন ব্যানার। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে হাসতে খেলে কথা বলছে, কেউ চুপচাপ সামনে তাকিয়ে যেন নিজের ভেতরের বার্তা গুছিয়ে নিচ্ছে। দূরদূরান্তের গ্রাম থেকে আসা অনেকেই প্রথমবার এত বড় র্যালিতে অংশ নিচ্ছে। উত্তেজনা আর গর্ব মিলেমিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি সৃষ্টি করছে।
সকাল সাড়ে ৮টায় র্যালি শুরু হয়। প্রথম প্যাডেলের ঘূর্ণনেই যেন পুরো উপজেলা নড়ে ওঠে। সুশৃঙ্খল সারিতে এগিয়ে চলে সাইকেল বহর। কখনো পাকা রাস্তা, কখনো বাজারের কোলাহল, কখনো গ্রামের নীরবতা—সবকিছুর মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে দীর্ঘ সারি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ থমকে দাঁড়ায়। কেউ মোবাইল তুলে ছবি তোলে, কেউ শিশুদের ডাক দিয়ে সাইকেল সারির পাশ দিয়ে এগোতে সাহায্য করে। বৃদ্ধ এক চা-দোকানি চোখ বোলায়, ‘এমন শৃঙ্খলা এখন আর দেখা যায় না।’
র্যালিতে উপস্থিত ছিলেন রংপুর মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ডা. মোহাম্মদ শাওন, গাইবান্ধা জেলা ছাত্রশিবিরের বায়তুলমাল সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক শাকিল আহমেদ, সুন্দরগঞ্জ উপজেলা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মো. সোহান ইসলাম, পৌর সাংগঠনিক থানা শাখা সভাপতি শাহিন সরকার, সুন্দরগঞ্জ পূর্ব সাংগঠনিক থানা শাখা সভাপতি আবু রায়হানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
র্যালির পথে ধীরে ধীরে শ্লোগান ভেসে যাচ্ছে বাতাসে—‘নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার’, ‘শুভ শুভ দিন, শিবিরের জন্মদিন’, ‘এসো নবীন দলে দলে, শিবিরের পতাকা তলে’। প্রতিটি স্লোগান যেন নতুন প্রাণ দেয় রাস্তায়, শোনায় আদর্শের বার্তা। কোথাও উগ্রতা নেই, কোথাও বিশৃঙ্খলা নেই, শুধু শক্তি, বিশ্বাস এবং আন্দোলনের ছন্দ।
ছাত্ররা এককভাবে নয়, একত্রে উচ্চারণ করছে, ‘আমার নেতা তোমার নেতা, বিশ্ব নবী মোস্তফা’, ‘আমরা সবাই রাসূল সেনা, ভয় করিনা বুলেট-বোমা’। এই মিলন, এই উত্সব, শুধু সকালের সৌন্দর্য নয়, এটি এক আদর্শ ও দৃঢ়তার প্রতীক।
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে র্যালিটি থামে মাওলানা ভাসানী সেতু এলাকায়। তখন রোদ কিছুটা চড়া, ঘামে ভিজে গেছে অনেকের জামা। তবু কারও মুখে ক্লান্তি নেই। বরং আছে এক ধরনের তৃপ্তি—আজকের সকালটা নষ্ট হয়নি।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মো. সোহান ইসলাম বলেন, ‘ছাত্রশিবির কেবল একটি সংগঠনের নাম নয়, এটি একটি চরিত্র গঠনের আন্দোলন। আজকের এই সাইকেল র্যালি শুধু উল্লাস নয়, এটি আমাদের আদর্শ ও দায়িত্বের বার্তা বহন করছে। প্রতিটি প্যাডেলে আমরা জাগরণ ঘটাচ্ছি। এটি শুধু সাইকেল চালানো নয়, এটি আমাদের আদর্শের অভিযাত্রা। আমরা চাই তরুণ সমাজ সৎ, স্বচ্ছ ও সজাগ হোক। আজকের র্যালিতে অংশ নেওয়া হাজার তরুণ শুধু পথই অতিক্রম করছে না, তারা আমাদের মূল্যবোধের বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য, প্রতিটি গ্রাম ও শহরে তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং নতুন প্রজন্ম শিবিরের মূলমন্ত্র—আদর্শ, শৃঙ্খলা ও সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করা।’

























