সোশ্যাল মিডিয়ায় দাদিমা ইনফ্লুয়েন্সারদের কাণ্ডেই মজেছে তরুণেরা, কারও কারও ফলোয়ার কোটি ছাড়িয়েছে
- আপডেট সময় : ০৮:২২:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

ফ্যাশন, রান্না কিংবা ঘর সামলানোর টিপস শেয়ার করে সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় তারা। একজনের বসয় ৯৬, অন্যদেরও ৮০ পেড়িয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয়তা পেতে বয়স যে বাধা নয়, তারই প্রমাণ দিচ্ছেন কয়েকজন প্রবীণ নারী। তাঁদের কেউ ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করে নিজের পরিচর্যার খরচ চালাচ্ছেন, কেউ আবার রান্নার ভিডিও দিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের মন জয় করে নিচ্ছেন। তরুণদের ভিড়ে এই ‘গ্র্যান্ডমা ইনফ্লুয়েন্সার’রা বদলে দিচ্ছেন বয়স ও জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রচলিত ধারণা।
লিলিয়ান দ্রোনিয়াককে তাঁর অনুসারীরা চেনেন ‘গ্র্যান্ডমা দ্রোনিয়াক’ নামে। বয়স ৯৬ বছর। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। মজার ভিডিও, প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব আর পার্টি করার গল্প দিয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন তরুণ প্রজন্মের মনেও।
২০২০ সালে নাতির সহায়তায় ভিডিও পোস্ট করা শুরু করেন দ্রোনিয়াক। শুরুটা হয়েছিল মূলত অবসর সময়ের একঘেয়েমি কাটাতে। এখন সেই শখই পরিণত হয়েছে আয়ের উৎসে। বিভিন্ন খাবার ও সৌন্দর্যপণ্যের ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করে মাসে প্রায় ১২ হাজার ডলার আয় করেন তিনি। এই অর্থ দিয়ে নিজের পরিচর্যাকেন্দ্রের খরচ মেটানোর পাশাপাশি প্রপৌত্র-প্রপৌত্রীদের পড়াশোনার জন্যও সঞ্চয় করছেন।
তাঁর মতে, বয়স বাড়লেই জীবন থেমে যায় না। বয়স্ক মানুষও আনন্দ করতে পারেন, বাইরে যেতে পারেন, নিজের মতো করে জীবন উপভোগ করতে পারেন। তরুণদের কাছে সেই বার্তাই পৌঁছে দিতে চান তিনি।
যুক্তরাজ্যের কার্ডিফের বাসিন্দা ভিভ ট্রুরানের বয়স ৮২ বছর। স্বামীকে হারানোর পর প্রতিবেশীর পরামর্শে নিজের রঙিন পোশাকের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করতে শুরু করেন তিনি। এখন ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা আট লাখের বেশি।
নিজের শোবার ঘরকেই বানিয়ে ফেলেছেন ভিডিও তৈরির স্টুডিও। প্রতিদিন দুটি ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি। কখনো রঙিন পোশাক, কখনো চশমা, আবার কখনো স্কার্ফের সংগ্রহ তুলে ধরেন অনুসারীদের সামনে। তাঁর রয়েছে ২২ জোড়া চশমা ও স্কার্ফে ভরা দুটি ড্রয়ার।
কাজের ব্যাপারে তিনি বেশ নিয়মানুবর্তী। সকালে ঘুম থেকে উঠে দিনের প্রথম ভিডিও তৈরি না করা পর্যন্ত বাড়ির বাইরে যান না। অনুসারী ও ভিউয়ের হিসাব রাখেন খাতায়। এরই মধ্যে সেই হিসাবের জন্য পাঁচটি খাতা পূর্ণ হয়েছে। তাকে নিয়মিত ফলো করেন এমন একজন তরুণী জানিয়েছে, আমি বয়স বাড়াকে ভয় পেতাম। ট্রুরান আমার এই ধরণা বদলে দিয়েছে। তিনি বোঝাতে পেরেছেন বয়স বাড়া মানেই জীবন থেকে রং হারিয়ে যাওয়া নয়।
বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করলেও তিনি বেছে নেন নিজের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে। স্থানীয় ব্র্যান্ড ও দাতব্য সংস্থাকে অগ্রাধিকার দেন। বড় অঙ্কের প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছেন, যদি ব্র্যান্ডটি তাঁর মূল্যবোধের সঙ্গে না মেলে।
৮৩ বছর বয়সী গ্রেস গেরামিটা সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচিত ‘নোনা গ্রেসি’ নামে। তাঁকে বলা হয় ইন্টারনেটের ইতালীয় দাদি। বহু বছর ধরে তৈরি করে আসা পারিবারিক রান্নার রেসিপি ভিডিওর মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেন তিনি। তাঁর অনুসারীর সংখ্যাও কয়েক মিলিয়ন।
১৮ বছর বয়সে ইতালি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান গ্রেসি। দুই মেয়েকে বড় করতে একসময় একাধিক কাজ করতেন। ছয় বছর আগে তাঁর নাতি ম্যাথিউ রান্নার ভিডিও করার প্রস্তাব দিলে প্রথমে রাজি হননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সম্পর্কে ধারণা কম ছিল, ইংরেজিতেও স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। কিন্তু পরবর্তীতে পরিক্ষামূলক কয়েকটি ভিডিও তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেন। ভিডিওগুলো দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
এখন আগের যেকোনো চাকরির তুলনায় বেশি আয় করছেন তিনি। তবে তাঁর কাছে এই কাজের মূল্য কেবল অর্থ উপার্জনে সীমাবদ্ধ নয়। খাবারের টেবিলে পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে বসানোর যে ঐতিহ্য, সেটি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাঁর মূল উদ্দেশ্য। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষের ভালোবাসার বার্তা পেলে এখনো আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
বারবারা কস্টেলোর বয়স ৭৭ বছর। একসময়ের শিক্ষক এই নারী এখন ‘ব্রাঞ্চ উইথ ব্যাবস’ নামে পরিচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ঘর গোছানোর টিপস শেয়ার করেন তিনি। তাঁর ভিডিও দেখে অনেকেই নিজেদের মা কিংবা দাদির কথা মনে করেন। কেউ কেউ তাঁকে বলেন, তিনি তাঁদের সেই মায়ের মতো, যাঁকে তাঁরা কখনো কাছে পাননি।
একবার এক বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণী তাঁকে রেস্তোরাঁয় দেখে জানান, একা থাকতে শুরু করার পর কস্টেলোর রান্নার বই তাঁকে অনেক সাহায্য করেছে। এমন অভিজ্ঞতাই কস্টেলোর কাছে এই কাজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। বই প্রকাশের অনুষ্ঠানে সাবেক শিক্ষার্থীদের নিজেদের সন্তানদের নিয়ে আসতেও দেখেছেন তিনি।
বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করলেও নিজের নাম যুক্ত করার আগে বিষয়টি ভালোভাবে ভেবে দেখেন। তাঁর কাছে জনপ্রিয়তার চেয়ে আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ।
ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান উই আর সোশ্যালের নাওমি বার্কারের মতে, প্রবীণ কনটেন্ট নির্মাতাদের অনুসারীদের সঙ্গে সম্পর্ক সাধারণত গভীর ও বিশ্বস্ত। তাঁদের অনেক অনুসারীর ক্রয়ক্ষমতাও রয়েছে। তাই ব্র্যান্ডগুলোর কাছে তাঁরা বিশেষ গুরুত্বপূর্ন।
এ ছাড়া তাঁদের কনটেন্টে থাকে জীবনের অভিজ্ঞতা, আন্তরিকতা ও নির্ভরতার অনুভূতি। অনিশ্চয়তায় ভরা জীবনে এমন ভিডিও অনেকের কাছে স্বস্তির জায়গা হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যাঁরা পরিবার থেকে দূরে থাকেন কিংবা নিজের দাদি-নানিকে কাছে পান না, তাঁদের জন্য এই প্রবীণ নারীরা হয়ে উঠতে পারেন একধরনের ‘ভার্চুয়াল দাদি’।
গ্র্যান্ডমা দ্রোনিয়াক, ভিভ ট্রুরান, নোনা গ্রেসি কিংবা বারবারা কস্টেলো প্রত্যেকের কনটেন্ট আলাদা। কেউ ফ্যাশনে, কেউ রান্নায়, কেউ আবার দৈনন্দিন জীবনের সহজ কিছু পরামর্শ দিয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। তাঁদের সাফল্য থেকে বোঝা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি গড়তে তরুণ হওয়া জরুরি নয়।
বরং দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা, নিজস্ব রুচি, স্বতঃস্ফূর্ততা ও মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরির ক্ষমতাই তাঁদের আলাদা করেছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে নতুন কিছু শেখা, নিজের প্রতিভা প্রকাশ করা কিংবা আয়ের নতুন পথ তৈরি করার সুযোগও যে শেষ হয়ে যায় না, এই নারীরা তারই উদাহরণ।
























