ঢাকা ০৯:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সৃজনশীল শিল্পকে অর্থনীতির চালিকা শক্তি করতে চায় সরকার: অর্থমন্ত্রী ‘মাইরা ফেলার মতো কাজ তো করি নাই’: গুলির ঘটনায় আসিফ আকবর সিডনিতে কাল চালু হচ্ছে নতুন দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ‘সবার আগে তোর লাশ পড়ে থাকবে’ হুমকির পর কুরিয়ার সার্ভিসের কাভার্ড ভ্যান ভাঙচুর চূড়ান্ত পর্বের টিকিট কাটল কৃষ্ণা-মাছুরার দল জাতীয় ত্বকী চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতার ফল প্রকাশ, পুরস্কার বিতরণ ২০ নভেম্বর সংসারে সচ্ছলতা আনতে কিস্তিতে অটোরিকশা কেনেন আবদুল, কুপিয়ে হত্যা করে নিয়ে গেল দুর্বৃত্তরা স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে ভালো লক্ষণ দেখছি না: জামায়াতের আমির খাওয়ার সময় অস্বাভাবিক ঘাম হয় কেন? হামলার হুমকি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল, আক্রমণাত্মক সামরিক নীতি নিচ্ছে ইরান, নতুন করে যুদ্ধ কি আসন্ন

হামলার হুমকি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল, আক্রমণাত্মক সামরিক নীতি নিচ্ছে ইরান, নতুন করে যুদ্ধ কি আসন্ন

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:২২:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে এবার শুধু পাল্টা–আঘাত হেনেই থেমে থাকবে না ইরান, প্রয়োজনে প্রতিবেশী দেশগুলোয় সামরিক অভিযান চালাবে। হামলা চালানো হবে মার্কিন সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত ঘাঁটিগুলোতেও। নিজেদের সামরিক নীতিতে পরিবর্তন আনার ঘোষণা দিয়ে এমনই হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।

গত বুধবার ইরানের এই ঘোষণা আসে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বেড়েছে। প্রায় আট মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের হামলার মধ্যে জরুরি দায়িত্বে নেই, এমন মার্কিন কূটনৈতিক কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সৌদি আরব থেকে সরিয়ে নিচ্ছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, চলমান সংঘাত নিয়ে তিনি শিগগিরই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

.

২০২৫ ও ২০২৬ সালের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিচ্ছে তেহরান। আগে হামলার জবাবে পাল্টাহামলার নীতি অনুসরণ করেও শত্রুপক্ষের একের পর এক আক্রমণ ঠেকাতে পারেনি ইরান।

নেগার মোর্তাজাভি, জ্যেষ্ঠ ফেলো, সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি

.

এর পাশাপাশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

যুদ্ধ বন্ধ করা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বর্তমানে আলোচনা স্থবির হয়ে আছে। এ পরিস্থিতিতে দুই পক্ষই হামলার পাল্টাপাল্টি হুমকি দিচ্ছে। তাই প্রশ্ন উঠেছে, মধ্যপ্রাচ্য কি তাহলে আবার বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে?

.

বুধবার আইআরজিসি তাদের প্রতিরক্ষানীতিতে পরিবর্তন আনার ঘোষণা দেয়। নতুন নীতিকে তারা বলছে আক্রমণাত্মক ও অসমতাভিত্তিক (অফেনসিভ অ্যান্ড অ্যাসিমেট্রিক্যাল); অর্থাৎ শত্রুপক্ষের কোনো হামলার পর শুধু প্রতিশোধমূলক আঘাত নয়, বরং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আরও বিস্তৃত সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি রাখবে ইরান।

আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বলেন, ‘আগে আমাদের প্রতিরক্ষানীতি ছিল আত্মরক্ষামূলক। আমরা বলতাম, কোনো দেশ আমাদের আক্রমণ করলে আমরা জবাব দেব। এখন আমরা বলছি, কোনো দেশ আমাদের আক্রমণ করলে আমরা জবাবও দেব, আবার আক্রমণও চালাব।’

.

গত বুধবার আইআরজিসি তাদের প্রতিরক্ষানীতিতে পরিবর্তন আনার ঘোষণা দেয়। নতুন নীতিকে তারা বলছে আক্রমণাত্মক ও অসমতাভিত্তিক (অফেনসিভ অ্যান্ড অ্যাসিমেট্রিক্যাল)।

.

মোহেবি জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দেড় গুণ হয়েছে। তবে মোট কত ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, সেই সংখ্যা তিনি জানাননি।

আইআরজিসির এই মুখপাত্র দাবি করেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মানও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এগুলোর পাল্লা, ধ্বংসক্ষমতা ও লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার নির্ভুলতা আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে।

মোহেবি আরও জানান, ইরানি বাহিনী ফাদার অব অল বম্বস বা সব বোমার জনক নামের নতুন একটি অস্ত্র প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাঁর ভাষায়, শত্রুর জন্য এটি নতুন কিছু।

.

ইরানের এই ঘোষণার মধ্যে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলসীমায় জাহাজে হামলা অব্যাহত রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার আইআরজিসির নৌবাহিনী জানায়, পারস্য উপসাগরের উত্তরাঞ্চলে চারটি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। তাদের অভিযোগ, জাহাজগুলো অবৈধভাবে তেল স্থানান্তরের কাজে যুক্ত ছিল। হামলার পর সেগুলোতে আগুন ধরে যায়।

আইআরজিসির দাবি, হরমুজ প্রণালির পশ্চিমে আরও তিনটি জাহাজ সামুদ্রিক মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

.

যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বে সরবরাহ হওয়া মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। যুদ্ধের কারণে তা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে এসেছিল।

গত মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল পরিবহন যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরে আসে। কারণ, রপ্তানিকারকেরা পাইপলাইনসহ বিকল্প পথ ব্যবহার করে তেল ও গ্যাস পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন।

সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে একের পর এক হামলা আবার উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের ইরান–সমর্থিত হুতি ও সৌদি আরব-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। এর জেরে সৌদি আরবেও হামলা চালাচ্ছে হুতিরা।

এসব ঘটনার কারণে জ্বালানি সরবরাহে নতুন বিঘ্নের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গতকাল আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।

.

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সামরিক নীতির মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বোঝাতে চাইছে, ভবিষ্যতে দেশটিতে হামলা চালালে তার জন্য চড়া মূল্য দিতে হবে।

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মোর্তাজাভি আল-জাজিরাকে বলেন, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিচ্ছে তেহরান। আগে হামলার জবাবে পাল্টাহামলার নীতি অনুসরণ করেও শত্রুপক্ষের একের পর এক আক্রমণ ঠেকাতে পারেনি ইরান।

.

আগে আমাদের প্রতিরক্ষানীতি ছিল আত্মরক্ষামূলক। আমরা বলতাম, কোনো দেশ আমাদের আক্রমণ করলে আমরা জবাব দেব। এখন আমরা বলছি, কোনো দেশ আমাদের আক্রমণ করলে আমরা জবাবও দেব, আবার আক্রমণও চালাব।

হোসেইন মোহেবি, মুখপাত্র, আইআরজিসি

.

মোর্তাজাভি বলেন, তেহরান এখন নতুন একটি সমীকরণ তৈরি করতে চায়। ভবিষ্যতে ইরানে যেকোনো হামলার জন্য হামলাকারীদের অনেক বেশি মূল্য দিতে হবে।

মোর্তাজাভির মতে, প্রচলিত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ নয় ইরান। তাই দেশটি ক্রমে অসমতাভিত্তিক যুদ্ধকৌশলের ওপর নির্ভর করছে।

এ ধরনের কৌশলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব কাজে লাগানো হতে পারে।

মোর্তাজাভি বলেন, তেহরানের লক্ষ্য ওয়াশিংটনের ওপর সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা। এই চাপের প্রভাব আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও পড়তে পারে।

.

এ বিশ্লেষকের ভাষায়, ওয়াশিংটনকে একটি শিক্ষা দিতে চায় তেহরান। তা হলো এই, ইরানে হামলার জন্য অনেক বেশি মূল্য চুকাতে হবে। এমনকি এর জন্য (ট্রাম্পের দলকে) নির্বাচনেও হারতে হতে পারে।

মোর্তাজাভি বলেন, ইরানি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁদের ধারণা, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এ বিশ্লেষকের মতে, ইরানের দীর্ঘ মেয়াদে লক্ষ্য হলো এমন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতের মার্কিন প্রশাসনগুলো ইরানে হামলার সাহস করার আগে দুবার ভাবে।

.

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রামি খুরির মতে, ইরানের নতুন নীতির আরেকটি উদ্দেশ্য হলো সংঘাতের ক্ষয়ক্ষতি শুধু নিজেদের ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখা।

আরব সেন্টারের এই অনাবাসিক জ্যেষ্ঠ ফেলো আল-জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের সামরিক অভিযানে সহায়তাকারী আঞ্চলিক দেশগুলোকেও সংঘাতের পরিণতি ভোগ করতে হবে, এমন বার্তা দিতে চাইছে তেহরান।

খুরি বলেন, এটি কৌশলের একটি অংশ। দুর্ভোগ ও ক্ষয়ক্ষতি সমান এবং পাল্টাপাল্টি হতে হবে।

.

ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্যে ভিন্ন ভিন্ন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। গত বুধবার তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর তেহরানের সঙ্গে আলোচনা করছে না। শিগগিরই কিছু একটা ঘটতে পারে।

.

ইরান এই অঞ্চলে দীর্ঘদিনের পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চাইছে উল্লেখ করে খুরি বলেন, ইরানিরা আসলে ঔপনিবেশিক যুগের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করছে।

নতুন করে সংঘাত ছড়ালে তার অর্থনৈতিক প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেন খুরি। তাঁর মতে, জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন, বিমার খরচ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চালান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

খুরি বলেন, এর দুর্ভোগ শুধু মধ্যপ্রাচ্য, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

.

ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্যে ভিন্ন ভিন্ন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। গত বুধবার তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর তেহরানের সঙ্গে আলোচনা করছে না। শিগগিরই কিছু একটা ঘটতে পারে।

সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, কোনো না কোনোভাবে খুব শিগগির কিছু একটা ঘটবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যে একটি নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প এ কথা বলেন।

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘এটি খুব শিগগির শেষ হবে। আমরা এখনই সরে আসতে পারি। কিন্তু আমরা নিশ্চিত হতে চাই, সমাধানটি যেন দীর্ঘমেয়াদি হয়।’ এর আগে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালাবেন না।

.

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চলতি সপ্তাহে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন। তাঁর দাবি, আলোচনার জন্য হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা বন্ধ করতে হবে তেহরানকে।

গত কয়েক সপ্তাহে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়টি নতুন করে বিরোধের কেন্দ্রে এসেছে। রুবিও গত বুধবার বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ দেয়, এমন কোনো চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে না। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন হয়।

রুবিও আরও বলেন, ইরান যাতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোতে না পারে, সেই সুযোগ তৈরি করে—এমন কোনো চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করবে না।

তেহরানের দাবি, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটির আওতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের রয়েছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে সাত দিনের একটি নতুন পরিকল্পনাও দিয়েছে ইরান। বিনিময়ে দেশটি ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ ছাড়ার দাবি জানিয়েছে।

.

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবে অবস্থানরত জরুরি দায়িত্বে নেই, এমন কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেশটি ছাড়ার নির্দেশ দেয়। হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার মধ্যে এই নির্দেশ দেওয়া হলো।

পাশাপাশি রিয়াদে মার্কিন দূতাবাস আরও হামলার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলো থেকেও কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া হতে পারে।

.

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের সামরিক অভিযানে সহায়তাকারী আঞ্চলিক দেশগুলোকেও সংঘাতের পরিণতি ভোগ করতে হবে, এমন বার্তা দিতে চাইছে তেহরান।

রামি খুরি, জ্যেষ্ঠ ফেলো, আরব সেন্টার

.

তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট জানিয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের সব মিশনের জন্য এ ধরনের নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষায়, বর্তমান নির্দেশ শুধু ‘সৌদি আরবে কর্মরত কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের’ জন্য প্রযোজ্য।

এর মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ইরান নিয়ে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। গত রোববার ইরানের সরকারকে আবার উৎখাত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি। নেতানিয়াহুর দাবি, ইরান যাতে পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ নামে পরিচিত আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন করতে না পারে, সে জন্য এটি জরুরি।

আগামী মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ইসরায়েলের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন। এতে দেশটির দীর্ঘতম সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

.

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ পুরোপুরি শেষ না হলেও ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন হামলার আশঙ্কা বাড়ছে।

নেগার মোর্তাজাভি বলেন, ‘আরেক দফা যুদ্ধ এগিয়ে আসছে বলেই মনে হচ্ছে।’ তাঁর মতে, উভয় পক্ষই নতুন সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা আরও বেড়ে গেলে বড় পরিসরে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামরিক অভিযানের সময় নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন মোর্তাজাভি। তবে তাঁর আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি আলোচনার চেয়ে সংঘাত বাড়ার দিকেই বেশি এগোচ্ছে।

.

ইরানি ফাদার অব অল বম্বস বা সব বোমার জনক নামের নতুন একটি অস্ত্র প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

.

বুধবার ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি মোহসেন রেজায়িও একটি কঠোর বার্তা দিয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএর বরাতে আল-জাজিরা জানিয়েছে, রেজায়ি বলেছেন, সবাইকে জানতে হবে, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো পদক্ষেপের মূল্য দিতে হবে।

রেজায়ি আরও বলেন, ‘আমরা কূটনীতিকেই অগ্রাধিকার দেব। কিন্তু যুদ্ধ চলতে থাকলে জবাব অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ইরানের রয়েছে।’

বিশ্লেষক রামি খুরিও নতুন সংঘাতের আশঙ্কা করছেন। তবে তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি আলোচনায় চাপ সৃষ্টির কৌশলও হতে পারে। আল-জাজিরাকে খুরি বলেন, ‘আমার মনে হয়, আসন্ন সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। তবে একে যুদ্ধ বলা ঠিক হবে কি না, তা আমি জানি না।’

এই বিশ্লেষকের ধারণা, নতুন করে হামলা হলে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এর মধ্যে বিদ্যুৎব্যবস্থা, পরিবহন নেটওয়ার্ক, সেতু ও জরুরি সেবাগুলোও থাকতে পারে।

খুরি বলেন, সম্ভবত কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে ভয়াবহ হামলা হবে, যার উদ্দেশ্য হবে ইরানের মানুষের জীবন অত্যন্ত কঠিন করে তোলা।

তবে বড় ধরনের নতুন সামরিক আক্রমণ সামলে নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে সমপরিমাণ ক্ষতি করার সক্ষমতা ইরানের আছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয় বলে মনে করেন খুরি। তিনি বলেন, ইরান বড় ধরনের নতুন হামলা কতটা সামাল দিতে পারবে, তা স্পষ্ট নয়। তবে তাঁর ধারণা, সামরিক চাপের মুখে তেহরানের আত্মসমর্পণের সম্ভাবনা কম।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

হামলার হুমকি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল, আক্রমণাত্মক সামরিক নীতি নিচ্ছে ইরান, নতুন করে যুদ্ধ কি আসন্ন

আপডেট সময় : ০৭:২২:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে এবার শুধু পাল্টা–আঘাত হেনেই থেমে থাকবে না ইরান, প্রয়োজনে প্রতিবেশী দেশগুলোয় সামরিক অভিযান চালাবে। হামলা চালানো হবে মার্কিন সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত ঘাঁটিগুলোতেও। নিজেদের সামরিক নীতিতে পরিবর্তন আনার ঘোষণা দিয়ে এমনই হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।

গত বুধবার ইরানের এই ঘোষণা আসে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বেড়েছে। প্রায় আট মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের হামলার মধ্যে জরুরি দায়িত্বে নেই, এমন মার্কিন কূটনৈতিক কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সৌদি আরব থেকে সরিয়ে নিচ্ছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, চলমান সংঘাত নিয়ে তিনি শিগগিরই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

.

২০২৫ ও ২০২৬ সালের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিচ্ছে তেহরান। আগে হামলার জবাবে পাল্টাহামলার নীতি অনুসরণ করেও শত্রুপক্ষের একের পর এক আক্রমণ ঠেকাতে পারেনি ইরান।

নেগার মোর্তাজাভি, জ্যেষ্ঠ ফেলো, সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি

.

এর পাশাপাশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

যুদ্ধ বন্ধ করা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বর্তমানে আলোচনা স্থবির হয়ে আছে। এ পরিস্থিতিতে দুই পক্ষই হামলার পাল্টাপাল্টি হুমকি দিচ্ছে। তাই প্রশ্ন উঠেছে, মধ্যপ্রাচ্য কি তাহলে আবার বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে?

.

বুধবার আইআরজিসি তাদের প্রতিরক্ষানীতিতে পরিবর্তন আনার ঘোষণা দেয়। নতুন নীতিকে তারা বলছে আক্রমণাত্মক ও অসমতাভিত্তিক (অফেনসিভ অ্যান্ড অ্যাসিমেট্রিক্যাল); অর্থাৎ শত্রুপক্ষের কোনো হামলার পর শুধু প্রতিশোধমূলক আঘাত নয়, বরং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আরও বিস্তৃত সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি রাখবে ইরান।

আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বলেন, ‘আগে আমাদের প্রতিরক্ষানীতি ছিল আত্মরক্ষামূলক। আমরা বলতাম, কোনো দেশ আমাদের আক্রমণ করলে আমরা জবাব দেব। এখন আমরা বলছি, কোনো দেশ আমাদের আক্রমণ করলে আমরা জবাবও দেব, আবার আক্রমণও চালাব।’

.

গত বুধবার আইআরজিসি তাদের প্রতিরক্ষানীতিতে পরিবর্তন আনার ঘোষণা দেয়। নতুন নীতিকে তারা বলছে আক্রমণাত্মক ও অসমতাভিত্তিক (অফেনসিভ অ্যান্ড অ্যাসিমেট্রিক্যাল)।

.

মোহেবি জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দেড় গুণ হয়েছে। তবে মোট কত ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, সেই সংখ্যা তিনি জানাননি।

আইআরজিসির এই মুখপাত্র দাবি করেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মানও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এগুলোর পাল্লা, ধ্বংসক্ষমতা ও লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার নির্ভুলতা আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে।

মোহেবি আরও জানান, ইরানি বাহিনী ফাদার অব অল বম্বস বা সব বোমার জনক নামের নতুন একটি অস্ত্র প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাঁর ভাষায়, শত্রুর জন্য এটি নতুন কিছু।

.

ইরানের এই ঘোষণার মধ্যে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলসীমায় জাহাজে হামলা অব্যাহত রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার আইআরজিসির নৌবাহিনী জানায়, পারস্য উপসাগরের উত্তরাঞ্চলে চারটি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। তাদের অভিযোগ, জাহাজগুলো অবৈধভাবে তেল স্থানান্তরের কাজে যুক্ত ছিল। হামলার পর সেগুলোতে আগুন ধরে যায়।

আইআরজিসির দাবি, হরমুজ প্রণালির পশ্চিমে আরও তিনটি জাহাজ সামুদ্রিক মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

.

যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বে সরবরাহ হওয়া মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। যুদ্ধের কারণে তা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে এসেছিল।

গত মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল পরিবহন যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরে আসে। কারণ, রপ্তানিকারকেরা পাইপলাইনসহ বিকল্প পথ ব্যবহার করে তেল ও গ্যাস পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন।

সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে একের পর এক হামলা আবার উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের ইরান–সমর্থিত হুতি ও সৌদি আরব-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। এর জেরে সৌদি আরবেও হামলা চালাচ্ছে হুতিরা।

এসব ঘটনার কারণে জ্বালানি সরবরাহে নতুন বিঘ্নের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গতকাল আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।

.

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সামরিক নীতির মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বোঝাতে চাইছে, ভবিষ্যতে দেশটিতে হামলা চালালে তার জন্য চড়া মূল্য দিতে হবে।

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মোর্তাজাভি আল-জাজিরাকে বলেন, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিচ্ছে তেহরান। আগে হামলার জবাবে পাল্টাহামলার নীতি অনুসরণ করেও শত্রুপক্ষের একের পর এক আক্রমণ ঠেকাতে পারেনি ইরান।

.

আগে আমাদের প্রতিরক্ষানীতি ছিল আত্মরক্ষামূলক। আমরা বলতাম, কোনো দেশ আমাদের আক্রমণ করলে আমরা জবাব দেব। এখন আমরা বলছি, কোনো দেশ আমাদের আক্রমণ করলে আমরা জবাবও দেব, আবার আক্রমণও চালাব।

হোসেইন মোহেবি, মুখপাত্র, আইআরজিসি

.

মোর্তাজাভি বলেন, তেহরান এখন নতুন একটি সমীকরণ তৈরি করতে চায়। ভবিষ্যতে ইরানে যেকোনো হামলার জন্য হামলাকারীদের অনেক বেশি মূল্য দিতে হবে।

মোর্তাজাভির মতে, প্রচলিত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ নয় ইরান। তাই দেশটি ক্রমে অসমতাভিত্তিক যুদ্ধকৌশলের ওপর নির্ভর করছে।

এ ধরনের কৌশলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব কাজে লাগানো হতে পারে।

মোর্তাজাভি বলেন, তেহরানের লক্ষ্য ওয়াশিংটনের ওপর সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা। এই চাপের প্রভাব আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও পড়তে পারে।

.

এ বিশ্লেষকের ভাষায়, ওয়াশিংটনকে একটি শিক্ষা দিতে চায় তেহরান। তা হলো এই, ইরানে হামলার জন্য অনেক বেশি মূল্য চুকাতে হবে। এমনকি এর জন্য (ট্রাম্পের দলকে) নির্বাচনেও হারতে হতে পারে।

মোর্তাজাভি বলেন, ইরানি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁদের ধারণা, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এ বিশ্লেষকের মতে, ইরানের দীর্ঘ মেয়াদে লক্ষ্য হলো এমন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতের মার্কিন প্রশাসনগুলো ইরানে হামলার সাহস করার আগে দুবার ভাবে।

.

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রামি খুরির মতে, ইরানের নতুন নীতির আরেকটি উদ্দেশ্য হলো সংঘাতের ক্ষয়ক্ষতি শুধু নিজেদের ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখা।

আরব সেন্টারের এই অনাবাসিক জ্যেষ্ঠ ফেলো আল-জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের সামরিক অভিযানে সহায়তাকারী আঞ্চলিক দেশগুলোকেও সংঘাতের পরিণতি ভোগ করতে হবে, এমন বার্তা দিতে চাইছে তেহরান।

খুরি বলেন, এটি কৌশলের একটি অংশ। দুর্ভোগ ও ক্ষয়ক্ষতি সমান এবং পাল্টাপাল্টি হতে হবে।

.

ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্যে ভিন্ন ভিন্ন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। গত বুধবার তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর তেহরানের সঙ্গে আলোচনা করছে না। শিগগিরই কিছু একটা ঘটতে পারে।

.

ইরান এই অঞ্চলে দীর্ঘদিনের পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চাইছে উল্লেখ করে খুরি বলেন, ইরানিরা আসলে ঔপনিবেশিক যুগের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করছে।

নতুন করে সংঘাত ছড়ালে তার অর্থনৈতিক প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেন খুরি। তাঁর মতে, জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন, বিমার খরচ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চালান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

খুরি বলেন, এর দুর্ভোগ শুধু মধ্যপ্রাচ্য, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

.

ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্যে ভিন্ন ভিন্ন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। গত বুধবার তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর তেহরানের সঙ্গে আলোচনা করছে না। শিগগিরই কিছু একটা ঘটতে পারে।

সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, কোনো না কোনোভাবে খুব শিগগির কিছু একটা ঘটবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যে একটি নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প এ কথা বলেন।

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘এটি খুব শিগগির শেষ হবে। আমরা এখনই সরে আসতে পারি। কিন্তু আমরা নিশ্চিত হতে চাই, সমাধানটি যেন দীর্ঘমেয়াদি হয়।’ এর আগে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালাবেন না।

.

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চলতি সপ্তাহে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন। তাঁর দাবি, আলোচনার জন্য হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা বন্ধ করতে হবে তেহরানকে।

গত কয়েক সপ্তাহে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়টি নতুন করে বিরোধের কেন্দ্রে এসেছে। রুবিও গত বুধবার বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ দেয়, এমন কোনো চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে না। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন হয়।

রুবিও আরও বলেন, ইরান যাতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোতে না পারে, সেই সুযোগ তৈরি করে—এমন কোনো চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করবে না।

তেহরানের দাবি, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটির আওতায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের রয়েছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে সাত দিনের একটি নতুন পরিকল্পনাও দিয়েছে ইরান। বিনিময়ে দেশটি ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ ছাড়ার দাবি জানিয়েছে।

.

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবে অবস্থানরত জরুরি দায়িত্বে নেই, এমন কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেশটি ছাড়ার নির্দেশ দেয়। হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার মধ্যে এই নির্দেশ দেওয়া হলো।

পাশাপাশি রিয়াদে মার্কিন দূতাবাস আরও হামলার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলো থেকেও কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া হতে পারে।

.

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের সামরিক অভিযানে সহায়তাকারী আঞ্চলিক দেশগুলোকেও সংঘাতের পরিণতি ভোগ করতে হবে, এমন বার্তা দিতে চাইছে তেহরান।

রামি খুরি, জ্যেষ্ঠ ফেলো, আরব সেন্টার

.

তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট জানিয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের সব মিশনের জন্য এ ধরনের নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষায়, বর্তমান নির্দেশ শুধু ‘সৌদি আরবে কর্মরত কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের’ জন্য প্রযোজ্য।

এর মধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ইরান নিয়ে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। গত রোববার ইরানের সরকারকে আবার উৎখাত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি। নেতানিয়াহুর দাবি, ইরান যাতে পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ নামে পরিচিত আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন করতে না পারে, সে জন্য এটি জরুরি।

আগামী মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ইসরায়েলের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন। এতে দেশটির দীর্ঘতম সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

.

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ পুরোপুরি শেষ না হলেও ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন হামলার আশঙ্কা বাড়ছে।

নেগার মোর্তাজাভি বলেন, ‘আরেক দফা যুদ্ধ এগিয়ে আসছে বলেই মনে হচ্ছে।’ তাঁর মতে, উভয় পক্ষই নতুন সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা আরও বেড়ে গেলে বড় পরিসরে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামরিক অভিযানের সময় নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন মোর্তাজাভি। তবে তাঁর আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি আলোচনার চেয়ে সংঘাত বাড়ার দিকেই বেশি এগোচ্ছে।

.

ইরানি ফাদার অব অল বম্বস বা সব বোমার জনক নামের নতুন একটি অস্ত্র প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

.

বুধবার ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি মোহসেন রেজায়িও একটি কঠোর বার্তা দিয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএর বরাতে আল-জাজিরা জানিয়েছে, রেজায়ি বলেছেন, সবাইকে জানতে হবে, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো পদক্ষেপের মূল্য দিতে হবে।

রেজায়ি আরও বলেন, ‘আমরা কূটনীতিকেই অগ্রাধিকার দেব। কিন্তু যুদ্ধ চলতে থাকলে জবাব অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ইরানের রয়েছে।’

বিশ্লেষক রামি খুরিও নতুন সংঘাতের আশঙ্কা করছেন। তবে তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি আলোচনায় চাপ সৃষ্টির কৌশলও হতে পারে। আল-জাজিরাকে খুরি বলেন, ‘আমার মনে হয়, আসন্ন সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। তবে একে যুদ্ধ বলা ঠিক হবে কি না, তা আমি জানি না।’

এই বিশ্লেষকের ধারণা, নতুন করে হামলা হলে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এর মধ্যে বিদ্যুৎব্যবস্থা, পরিবহন নেটওয়ার্ক, সেতু ও জরুরি সেবাগুলোও থাকতে পারে।

খুরি বলেন, সম্ভবত কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে ভয়াবহ হামলা হবে, যার উদ্দেশ্য হবে ইরানের মানুষের জীবন অত্যন্ত কঠিন করে তোলা।

তবে বড় ধরনের নতুন সামরিক আক্রমণ সামলে নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে সমপরিমাণ ক্ষতি করার সক্ষমতা ইরানের আছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয় বলে মনে করেন খুরি। তিনি বলেন, ইরান বড় ধরনের নতুন হামলা কতটা সামাল দিতে পারবে, তা স্পষ্ট নয়। তবে তাঁর ধারণা, সামরিক চাপের মুখে তেহরানের আত্মসমর্পণের সম্ভাবনা কম।