ঢাকা ১২:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অনিয়ম, তেল চুরি ও প্রাণহানি বন্ধ করুন

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:২৮:৩৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

রাজধানীর বুকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ময়লার গাড়িগুলো অনিয়ন্ত্রিত ঘাতক যান ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির এক ভয়াবহ প্রতীকে পরিণত হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা এই বর্জ্যবাহী যানগুলো কেড়ে নিচ্ছে নিরীহ মানুষের প্রাণ। ২০১৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কয়েকজন শিক্ষার্থীসহ অন্তত ১৮ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এই ময়লার গাড়ির নিচে চাপা পড়ে। শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর পর তীব্র আন্দোলন, তদন্ত কমিটি গঠন ও দু-একজন চালককে সাময়িক বরখাস্তের নাটক হলেও বাস্তবে প্রাতিষ্ঠানিক অরাজকতার অবসান ঘটানো যায়নি।

এই মৃত্যুর নেপথ্যে রয়েছে চরম অপরাধমূলক অবহেলা ও অনৈতিক চর্চা। নথিপত্রে বরাদ্দপ্রাপ্ত স্থায়ী চালকেরা নিয়মিত সরকারি বেতন পকেটে পুরে অলস সময় কাটালেও রাজপথে ভারী গাড়ি চালানোর চাবি সঁপে দেওয়া হচ্ছে লাইসেন্সহীন বহিরাগত কিংবা অনভিজ্ঞ সহকারীদের হাতে। সম্প্রতি সায়েদাবাদে ফিলিং স্টেশনে রাতে সরেজমিনে দেখা যায়, ভারী ময়লার গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসে আছেন মাত্র ১০ হাজার টাকা বেতনে কাজ করা এক চুক্তিভিত্তিক সহকারী, যাঁর কোনো বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। আর নির্ধারিত মূল চালক তখন মেতে আছেন মোড়ের আড্ডায়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটির অন্তত ৫৬টি গাড়ি নিয়মিতভাবে বহিরাগত প্রক্সি চালকদের দিয়ে চালানো হচ্ছে।

মৃত্যুর এই মিছিলের সমান্তরালে নীরবে ডালপালা মেলেছে বর্জ্য পরিবহনের জ্বালানি চুরির এক সুসংগঠিত সিন্ডিকেট। ট্রিপপ্রতি প্রয়োজনের চেয়ে তিন থেকে চার লিটার অতিরিক্ত ডিজেল বরাদ্দ করিয়ে গাড়ি পাম্পে রেখেই সেই তেল কম দামে কালোবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তথ্য অনুযায়ী এই অবৈধ পন্থায় মাসে প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার লিটার তেল চুরি হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ২৪ লাখ টাকা। হিসাব করলে বছরে প্রায় পৌনে তিন কোটি টাকার সরকারি অর্থ ভাগ হয়ে পকেটে ঢুকছে অসাধু চালক, পরিবহনশ্রমিক ইউনিয়নের প্রভাবশালী নেতা ও সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্মকর্তাদের।

যেকোনো দুর্ঘটনার পর কেবল চুক্তিভিত্তিক প্রক্সি চালককে বলির পাঁঠা বানিয়ে সিটি করপোরেশনের পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জনবলসংকট কিংবা দীর্ঘ ডিউটির দোহাই দিয়ে এই অপরাধকে কোনোভাবেই ঢাকা যাবে না। বরাদ্দপ্রাপ্ত স্থায়ী চালকদের উপস্থিতি নিশ্চিতে অনতিবিলম্বে স্মার্ট ট্র্যাকিং ও ডিজিটাল বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা চালু করতে হবে। একই সঙ্গে অনুমোদনহীন চালকদের হাতে গাড়ি তুলে দেওয়া মূল চালক, তেল চুরির সিন্ডিকেট এবং এতে মদদদাতা শ্রমিকনেতা ও অসাধু কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজপথকে রক্তে রঞ্জিত করার এই প্রাতিষ্ঠানিক নৈরাজ্য আর এক মুহূর্তও মেনে নেওয়া যায় না।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

অনিয়ম, তেল চুরি ও প্রাণহানি বন্ধ করুন

আপডেট সময় : ০৯:২৮:৩৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

রাজধানীর বুকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ময়লার গাড়িগুলো অনিয়ন্ত্রিত ঘাতক যান ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির এক ভয়াবহ প্রতীকে পরিণত হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা এই বর্জ্যবাহী যানগুলো কেড়ে নিচ্ছে নিরীহ মানুষের প্রাণ। ২০১৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কয়েকজন শিক্ষার্থীসহ অন্তত ১৮ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এই ময়লার গাড়ির নিচে চাপা পড়ে। শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর পর তীব্র আন্দোলন, তদন্ত কমিটি গঠন ও দু-একজন চালককে সাময়িক বরখাস্তের নাটক হলেও বাস্তবে প্রাতিষ্ঠানিক অরাজকতার অবসান ঘটানো যায়নি।

এই মৃত্যুর নেপথ্যে রয়েছে চরম অপরাধমূলক অবহেলা ও অনৈতিক চর্চা। নথিপত্রে বরাদ্দপ্রাপ্ত স্থায়ী চালকেরা নিয়মিত সরকারি বেতন পকেটে পুরে অলস সময় কাটালেও রাজপথে ভারী গাড়ি চালানোর চাবি সঁপে দেওয়া হচ্ছে লাইসেন্সহীন বহিরাগত কিংবা অনভিজ্ঞ সহকারীদের হাতে। সম্প্রতি সায়েদাবাদে ফিলিং স্টেশনে রাতে সরেজমিনে দেখা যায়, ভারী ময়লার গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসে আছেন মাত্র ১০ হাজার টাকা বেতনে কাজ করা এক চুক্তিভিত্তিক সহকারী, যাঁর কোনো বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। আর নির্ধারিত মূল চালক তখন মেতে আছেন মোড়ের আড্ডায়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটির অন্তত ৫৬টি গাড়ি নিয়মিতভাবে বহিরাগত প্রক্সি চালকদের দিয়ে চালানো হচ্ছে।

মৃত্যুর এই মিছিলের সমান্তরালে নীরবে ডালপালা মেলেছে বর্জ্য পরিবহনের জ্বালানি চুরির এক সুসংগঠিত সিন্ডিকেট। ট্রিপপ্রতি প্রয়োজনের চেয়ে তিন থেকে চার লিটার অতিরিক্ত ডিজেল বরাদ্দ করিয়ে গাড়ি পাম্পে রেখেই সেই তেল কম দামে কালোবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তথ্য অনুযায়ী এই অবৈধ পন্থায় মাসে প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার লিটার তেল চুরি হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ২৪ লাখ টাকা। হিসাব করলে বছরে প্রায় পৌনে তিন কোটি টাকার সরকারি অর্থ ভাগ হয়ে পকেটে ঢুকছে অসাধু চালক, পরিবহনশ্রমিক ইউনিয়নের প্রভাবশালী নেতা ও সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্মকর্তাদের।

যেকোনো দুর্ঘটনার পর কেবল চুক্তিভিত্তিক প্রক্সি চালককে বলির পাঁঠা বানিয়ে সিটি করপোরেশনের পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জনবলসংকট কিংবা দীর্ঘ ডিউটির দোহাই দিয়ে এই অপরাধকে কোনোভাবেই ঢাকা যাবে না। বরাদ্দপ্রাপ্ত স্থায়ী চালকদের উপস্থিতি নিশ্চিতে অনতিবিলম্বে স্মার্ট ট্র্যাকিং ও ডিজিটাল বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা চালু করতে হবে। একই সঙ্গে অনুমোদনহীন চালকদের হাতে গাড়ি তুলে দেওয়া মূল চালক, তেল চুরির সিন্ডিকেট এবং এতে মদদদাতা শ্রমিকনেতা ও অসাধু কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজপথকে রক্তে রঞ্জিত করার এই প্রাতিষ্ঠানিক নৈরাজ্য আর এক মুহূর্তও মেনে নেওয়া যায় না।