‘পানিপথ’-এর দুই ঠিকানা, জাতীয় ভাবের দুই কল্পনা
- আপডেট সময় : ১২:২৪:৩২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

কোনো দেশে জাতীয় চৈতন্য বাস্তব জমিনে পা রাখার আগে আগুয়ান সমাজ ও সেই সমাজের বিদ্বৎজনের কল্পনায় তা আসে। সেই কল্পনা আকার পেতে থাকে জাতীয় ইতিহাসের কোনো ব্যক্তি, ঘটনা বা মুহূর্তকে কেন্দ্র করে। কল্পনা প্রতীকায়িত হয় এবং ক্রমে তা সামূহিক চৈতন্যের অংশ হয়ে যায়। এমনকি জাতীয় ভাব বাস্তব চেহারা নেওয়ার পরও কিন্তু কল্পনার এই অভিযাত্রা থেমে থাকে না। ইতিহাসে দেখা যায়, জাতীয় ভাব ও কল্পনার নেতৃত্ব থাকে আগুয়ান শ্রেণির হাতে। আর সেই শ্রেণির মধ্যে যে জাতীয় ভাব ও কল্পনা গড়ে ওঠে, তার সংকট ও সম্ভাবনার আয়না হয়ে ওঠে সেই শ্রেণির সাহিত্য। ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস ও কায়কোবাদের মহাশ্মশান-এর পর্যালোচনায় ইমরান কামাল ভারতবর্ষের অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই ধরনের কল্পনার রূপরেখা দেখতে পেয়েছেন। ঐতিহাসিক পানিপথের যুদ্ধ নিয়ে দুটি সাহিত্যকর্মের তুলনার চমৎকার প্রয়াস ‘“পানিপথ-এর দুই ঠিকানা, জাতীয় ভাবের দুই কল্পনা’প্রবন্ধটি।
ভূদেব মুখোপাধ্যায় (১৮১৭—১৮৯৪) ও কাজেম আল কোরায়শীর (বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছে যিনি কায়কোবাদ নামে সুপরিচিত, ১৮৫৭—১৯৫১) সাহিত্যজগতের মধ্যে তুলনা-বিচার চলে না। একজন ভারতের ঔপনিবেশিক আমলের প্রথম যুগের সমাজচিন্তক ও দার্শনিক, অন্যজন উনিশ শতকের শেষ পর্বের সমাদৃত কবি। দুজনই স্ব স্ব ক্ষেত্রে স্বনামধন্য। তারপরও দুই ভুবনের এই দুই বাসিন্দাকে এক শিরোনামে বন্দী করা কেন? কারণ, তাঁরা দেশভাগ-পূর্ব বাংলা সাহিত্যে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের ওপর রচিত দুটি অসামান্য সাহিত্যকর্মের স্রষ্টা। তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধকে উপজীব্য করে ভূদেব রচনা করেন স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস (১৩০২ বঙ্গাব্দ, ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দ)। একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কায়কোবাদের হাতে সৃজিত হয় মহাশ্মশান (১৯০৪)। দুই গ্রন্থেই তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ চিত্রিত হয় ভারতের জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হিসেবে। একই সঙ্গে উভয় রচনার বয়ান ও বর্ণনায় ভারতবর্ষের জাতীয়তার কল্পনা এবং জাতীয় ভাব প্রসঙ্গ হিসেবে জোরালোভাবে উপস্থিত। স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস-এ তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ অখণ্ড ভারতীয় জাতীয়তার (ভূদেবের দৃষ্টিতে ‘হিন্দু জাতীয়তা’) পরাজয় এবং ‘স্বাধীন ভারত’ নামের স্বপ্নের শেষ সম্ভাবনার মৃত্যু হিসেবে হাজির হয়। মহাশ্মশান-এ তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ হয় ভারতীয় হিন্দু-মুসলমানের বীরত্বের গৌরবময় কীর্তিগাথা (কায়কোবাদ ১৯৯৪, ৩৫১)।
এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, দুটি রচনাই তাঁদের স্বস্ব সময়খণ্ডের (কোনো ক্ষেত্রে পরের কালেও) বিদ্বৎসমাজে হয় উপেক্ষিত, না হয় তীব্র কটাক্ষের শিকার। ভূদেবের স্বপ্নকল্পনার অখণ্ড ভারত তাঁর সমসাময়িক বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ফিকশনাল ও অলীক রাষ্ট্রকল্পনার বিরাট নির্মিতির নিচে চাপা পড়ে। আর কায়কোবাদের জাতীয় গৌরবের আখ্যান তৎকালীন বাংলার (বিশেষ করে) মুসলমান সমাজে সৃষ্টি করে বিপ্রতীপ প্রতিক্রিয়া। এই কাব্যের বিরুদ্ধে আনা হয় ‘নীতিহীনতা’র ভীষণ অভিযোগ (শামসুদ্দীন ১৯৯৪)। তৎকালীন বাঙালি মুসলিম সমাজে একভাবে উপেক্ষিত মহাশ্মশান পরবর্তী সময়ে মুনীর চৌধুরীর (রক্তাক্ত প্রান্তর, ১৯৬২) হাতে নবজীবন পায় বটে। কিন্তু সাবভার্শনে (sub version) যুদ্ধবিরোধী চেতনা আর সেক্যুলার ভাবের ভিড়ে তার পুরোনো মহিমা ঢাকা পড়ে যায়। সমকালীন উপেক্ষা আর তির্যক আক্রমণের পরও ভূদেবের স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মের ‘ভারত’ কল্পনায় এবং উপনিবেশবাদবিরোধী ভাবাদর্শিক শিবিরে চিন্তার রসদ জুগিয়ে গেছে। আবার অন্যদিকে মহাশ্মশান-এর তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের চোরাস্রোতের মতো মুনীর চৌধুরী, মোহাম্মদ আলী মৃধাদের (পাতকী পানিপথ, ১৯৮৪) সাহিত্যিক নির্মিতির মধ্য দিয়ে বলা যায়, বদলে গিয়ে জীবিত থেকেছে।
তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধকে উপজীব্য করে এ দুই গ্রন্থনাকে পাশাপাশি রেখে পড়ার উদ্দেশ্য, বাঙালি উচ্চবর্গ ও বাংলার অগ্রণী শ্রেণির সংস্কৃতিতে ‘জাতীয় ভাব’ ও ‘জাতীয় পরিচয়’কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অলীক কল্পনার তত্ত্ব-তালাশ এবং জাতীয় ভাব ঘিরে ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলায় বেড়ে ওঠা উচ্চবর্গের চিন্তাসংকটের ওপর মোটাদাগের অনুসন্ধান চালানো।
ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস সাহিত্যের প্রচলিত ধরনের ছাঁচে ফেলে পাঠ করা মুশকিল। আবার এ লেখায় সাহিত্যকল্পনার এত প্রশ্রয় আছে যে একে সাহিত্য-আঙিনার বাইরে রাখাও কঠিন। অন্যদিকে ইতিহাস হিসেবে এই রচনার এক রকম পাঠ দাঁড়াতে পারে। কিন্তু আগাগোড়া বয়ানধর্ম ইতিহাসের উল্টোরথে ঘোরে, তাই একে ইতিহাস হিসেবে না পড়ে কল্পিত ইতিহাসরূপে পাঠ করাই শ্রেয় মনে হয়। ভূদেব নিজেও অবশ্য তা-ই চেয়েছেন; অর্থাৎ পাঠক তাঁর এই রচনা একটি অলীক (utopic) কল্পনা হিসেবে পাঠ করুন। এমন এক স্বপ্ন পাঠকের মনে ঈপ্সিত হোক, যা ভবিষ্যতের কোনো এক পর্বে ‘পুনরুত্থান’-এর আশা রূপে ভারতবর্ষে (না হলে অন্তত বাংলায়) প্রকট হবে।
১৩০২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত গ্রন্থের ভূমিকায় ভূদেব মুখোপাধ্যায় স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস রচনার পরিপ্রেক্ষিতের একটি চমৎকার বর্ণনা দেন। সেই ভূমিকায় তিনি বলেন:
“আমার কোন আত্মীয় একখানি ভারতবর্ষের ইতিহাস লিখিতেছেন। তাঁহার অনুরোধ পরতন্ত্র হইয়া আমি ঐ পুস্তক তাঁহার সহযোগে পাঠ করিয়া দেখিতেছি। যে দিন তাঁহার অনুবাদিত তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ পাঠ করি সেই দিন হঠাৎ আমার কণ্ঠতালু বিশুষ্ক হইতে লাগিল, শরীর পুনঃ পুনঃ রোমাঞ্চিত হইল, পুস্তক পাঠ যেন মহা ভার হইয়া পড়িল। পাঠ নিবৃত্ত করিয়া ঐ তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ অন্যরূপে পরিসমাপ্ত হইলে কি হইত, সে বিষয়ে ভাবিতে লাগিলাম।” (ভূদেব ২০১৪)
আত্মীয়রচিত (অথবা অনুবাদিত) ইতিহাসে তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের অংশটি পড়তে গিয়ে ভূদেবের অসুস্থ হয়ে পড়াটা ঘটনা হিসেবে বেশ চিন্তাজাগানিয়া হলেও পানিপথের ইতিহাস পাঠের সঙ্গে এর সংযোগকে সমাপাতনিক বা আকস্মিক বলে ধরে নেওয়াই ভালো। তবে তার বাইরেও ভূদেব লিখিত গ্রন্থের ভূমিকাতে এই অসুস্থতার আলাদা তাৎপর্য আছে। ভূদেব অসুস্থ বোধ করেছেন, তাই রচনাটি পাঠে নিবৃত্ত হয়েছেন। আর সেই ফাঁকে তাঁর মনে খেলে গেছে এক অদ্ভুত কল্পনা, তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ অন্যরূপে সমাপ্ত হলে কী হতো। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, ভূদেব তাঁর বিচিত্র কল্পনায় একই সঙ্গে দুটি জিজ্ঞাসার সূত্র তৈরি করেছেন। প্রথমত, তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের পরিণতি অন্য কী রকম হতে পারত? দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের পরিণতি অন্য রকম হলে ভারতবর্ষের হালসুরত কেমন হতো? তাঁর স্বপ্নলব্ধ সমগ্র রচনাটিই বলতে গেলে এই দুই জিজ্ঞাসাকে এক কল্পিত সুতায় বাঁধার নিবিড় চেষ্টা।
ভূদেব তাঁর গ্রন্থের ভূমিকার পরবর্তী অংশে যে দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন তাতে দেখা যাবে, এই সৃজনকল্পকে তিনি কিছুটা দৈবগুণে প্রাপ্ত বাণী বলেও মনে করেছেন। যেন কেবল ‘আমি’ নয়, আরেক ‘পশ্চাতের আমি’ও তাঁর লিখনে পাশাপাশি সক্রিয় থেকেছে। যেন স্বপ্নে পাওয়া, কিন্তু স্বপ্নের অনুঘটককে চেনার উপায় নেই, তাই রচয়িতাকে সৃজনকর্মটির নামের সঙ্গে ‘স্বপ্নলব্ধ’ কথাটা জুড়ে দিতে হয়েছে। তাঁর ভূমিকার শেষাংশে একখণ্ড শাস্ত্রকথা আছে, ‘স্বপ্নলব্ধ ঔষধ এবং উপদেশ কদাপি অগ্রাহ্য নহে’ (ভূদেব ২০১৪)। ভূদেবের কাছে ‘স্বপ্ন’ নিত্যযাপনের বিমূর্ত চলচ্চিত্র বা আয়নাবাজি নয়। তাঁর জগতে স্বপ্ন এমন সক্রিয় সম্ভাব্যতা, যাকে অগ্রাহ্য করা যায় না।
আত্মীয়রচিত তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের ইতিহাস পড়তে গিয়ে ভূদেব যুদ্ধের যে অন্য রকম পরিণতি কল্পনা করেন, তার রূপ ক্রমে স্বচ্ছ হয় স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস-এর প্রথম পরিচ্ছেদে। ভূদেবের স্বপ্নকল্পিত বিকল্প ‘পানিপথে’র যুদ্ধ সমাপ্ত হয় মহারাষ্ট্রীয় শক্তির বিজয়ের মধ্য দিয়ে। মারাঠা সেনাপতিদের সুচতুর যুদ্ধকৌশলের কাছে পরাস্ত হয় আহমদ শাহ আবদালী দুররানির নেতৃত্বে সংগঠিত মুসলিম বাহিনী। যুদ্ধের অন্তিমলগ্নে পরাজয় নিশ্চিত জেনেও যুদ্ধরত আহমদ শাহ আবদালীর কাছে মহারাষ্ট্রীয়দের বন্দী কাশীরাজ বিশেষ দূত রূপে আবির্ভূত হন। মহারাষ্ট্রীয়দের বিশেষ দূত কাশীরাজের মুসলিম শিবিরে আগমন যে বার্তা বয়ে আনে তার মূল কথা, ‘ক্ষমা প্রদর্শন করিয়া যদিও বরাবর অনিষ্ট ঘটিয়াছে, তথাপি হিন্দুদিগের জাতীয় প্রকৃতির অন্যথাচরণ হইতে পারে না। হিন্দুরা পূর্বের ন্যায় এক্ষণেও সদয় আচরণ করিতে প্রস্তুত। আপনি নিজ দলবল সহিত নির্বিঘ্নে স্বদেশে গমন করুন’ (ভূদেব ২০১৪, ৩১)। এই বার্তার মূলকথা, ‘ক্ষমাশীলতা’, যার ওপর ‘হিন্দু জাতীয়তা’ প্রতিষ্ঠিত। ভূদেবের কল্পনায় ক্ষমা হিন্দু জাতির মৌলিক প্রকৃতি, তাই সুনিশ্চিত বিজয় এবং মুসলিম বাহিনীকে পুরোপুরি ধ্বংস করার সুযোগ থাকার পরও মহারাষ্ট্রীয়দের পক্ষ থেকে সন্ধিপ্রস্তাব পাঠানো সম্ভব হয়। এভাবে হিন্দু জাতির জাতীয়তা এবং চৈতন্য যে পৃথক ধাতুতে গড়া, তার রূপ ভূদেবের স্বপ্নকল্পনায় শুরু থেকেই স্পষ্ট হতে থাকে।
এভাবে হিন্দুপ্রকৃতির ক্ষমাশীলতার স্মারক হিসেবে সন্ধিপ্রস্তাব এবং যুদ্ধে মহারাষ্ট্রীয়দের বিজয়ের মধ্য দিয়ে প্রথম পরিচ্ছেদের সমাপ্তির পর ভূদেব মনোনিবেশ করেন তাঁর কল্পনায় স্থিত দ্বিতীয় জিজ্ঞাসায়। যেখানে পরবর্তী ৯ পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত তাঁর কল্পনায়ুদ্ধের পরিণতি অন্য রকম হলে ভারতবর্ষের হালসুরত কেমন হতো, এর জবাব দিয়ে যায়।
ভূদেবকল্পিত ভারতবর্ষের বিকল্প ইতিহাসে অখণ্ড ভারতের সম্রাট হবেন রামচন্দ্র। সপ্তদশ মোগল সম্রাট ‘মহামতি শাহ আলম’ স্বেচ্ছায় তাঁকে মুকুট পরিয়ে দেবেন। ভূদেবের রামচন্দ্র কল্পিত চরিত্র। মারাঠা ইতিহাসে দ্বিতীয় শিবাজিপুত্র ‘রাম’ নামে পরিচিত। এই পরিচয় ভূদেবের স্বপ্নলব্ধ ইতিহাসের বাস্তব ভিত্তি। কিন্তু এর বাইরেও ভূদেবের কল্পনায় ‘রামচন্দ্র’-এর পৌরাণিক তাৎপর্যও আছে, নামে তার মহিমা বোঝা যায়। ইতিহাসের রাম আর মিথের রামচন্দ্র একাকার হয়ে যে চরিত্রটি দাঁড়ায়, তাকে অগ্রে রেখে অখণ্ড ভারতের সংবিধানের কল্পনা করেন ভূদেব। সেই সংবিধান সভা বসে মোগল দিল্লির প্রখ্যাত জুমা মসজিদে। সেই সভার সভাসদদের কথোপকথনে ‘রাম’ নামের আরেক রূপ প্রস্ফুটিত হয়, ‘যে রাম সেই রহীম, ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়’ (ভূদেব ২০১৪, ৩৭)। এই নাম ভূদেব বলিয়েছেন অধিবেশন সভায় উপস্থিত এক ব্রাহ্মণের কণ্ঠে এক মুসলমানের উদ্দেশ্যে। এমন কথা শুনে সেই শ্রোতা মুসলমানই-বা নীরব থাকবেন কেন। কণ্ঠে আরও একপ্রস্থ মধু মাখিয়ে তিনি উত্তর দিচ্ছেন, ‘ঠাকুর যথার্থ কহিয়াছেন, সমস্ত জগৎ সেই এক অদ্বিতীয় ঈশ্বরেরই বিভূতি মাত্র, মানুষভেদে যেমন আচরণভেদ, পরিচ্ছদভেদ, ভাষাভেদ তেমনি উপাসনার প্রণালিভেদও ভেদ হইয়া থাকে। সকলেই এক পিতার পুত্র। সেই পিতা ভিন্ন ভিন্ন পুত্রকে ভিন্ন ভিন্ন পোশাক পরাইয়া দেখিতেছেন। কিন্তু সকলেরই চামড়ার নীচে লহু লাল বই কাহারো কাল, কাহারো জরদ নহে’ (ভূদেব ২০১৪, ৩৭)। এ থেকে বোঝা যায়, ভূদেবের স্বপ্নলব্ধ অলীক রামরাজত্বের হিন্দু-মুসলমান ভারতের মসনদে রামচন্দ্রের অধিষ্ঠানকে কেমন সম্প্রীতির সঙ্গে বিবেচনা করে থাকবে। ভূদেবের রচনায় এই সম্প্রীতির অন্য গুরুত্বও আছে। স্বপ্নলব্ধ কল্পনার বয়ানে ভূদেব ভারতের যে সংবিধান ও রাষ্ট্রপরিকল্পনা হাজির করবেন, এমন চমৎকার সৌহার্দ্যপূর্ণ প্রেক্ষাপট থাকলে তা পাঠকের কাছে অধিক নির্ভরযোগ্যও হবে। এই প্রেক্ষাপটে কল্পনার বিকাশে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ পরিবেশে অনুষ্ঠিত সভায় ক্রমে স্বর্ণ, রৌপ্য ও তাম্রফলকে সংবিধান রচিত হতে থাকে। ভূদেবের কল্পিত ইতিহাসের সেই সংবিধানে অখণ্ড ভারতের যে রাজনৈতিক প্রকৃতি দাঁড় করানো হয়, তার প্রথম মর্মকথা, অখণ্ড ভারত হবে রাজতন্ত্র। দ্বিতীয় মর্মকথা, সমাজ (হিন্দুসমাজ) এবং গ্রাম (হিন্দুসমাজের প্রাণকেন্দ্র রূপে) হবে ভারতের রাষ্ট্রনৈতিক ব্যবস্থার প্রাণ। তৃতীয় মর্মকথা, ভারত-রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো ‘ভগবান’-এর বিরাট মূর্তির মতো চার ভাগে বিন্যস্ত হবে। যার নিম্নভাগে থাকবে কৃষিজীবী, শিল্প-ব্যবসায়ী (ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অর্থে) ও শ্রমিক প্রজারা। অর্থ-প্রতিপত্তিসম্পন্ন বনিয়া সম্প্রদায় হবে এর মধ্যভাগ। সামরিক বাহিনী ও আমলাতন্ত্র হবে এর দুই বাহু। আর পণ্ডিতমণ্ডলী হবে এর মস্তিষ্ক। এই মিলিয়ে ভারতের যে বিরাট রাজনৈতিক শরীরটি দাঁড়াবে, ব্যবস্থাপক সভা হবে তার মুখ। ‘আত্মশুদ্ধি’, ‘নিষ্কাম ব্রত’, ‘পরার্থ’ আর ‘সহনশীলতা’ হবে ভারতীয়ের জাতীয় ভাব ও ভাবপ্রসূত চৈতন্যের চার স্তম্ভ। ভূদেবের দৃষ্টিতে এই চার স্তম্ভ হিন্দু জাতীয় প্রকৃতির গুণ। ফলে এটা স্পষ্ট যে ভূদেব দেখাতে চেয়েছেন, হিন্দু জাতীয়তাই অখণ্ড স্বাধীন ভারতের জাতীয় ভাব। এ ক্ষেত্রে স্বভাবতই জিজ্ঞাসা দাঁড়ায়, অপরাপর ধর্ম-সমাজের মধ্যে কেনো অখণ্ড ভারতের জাতীয় ভাব গড়ে উঠবে না? এই জিজ্ঞাসার জবাব মিলবে হিন্দু জাতীয়তা প্রসঙ্গে ভূদেবের ভাবনা অনুসরণ এবং সেই ভাবনায় তাঁর দৃঢ় অবস্থানের উদ্দেশ্যের দিকে নজর দিলে। প্রথমত, ভূদেব মনে করেন, ‘ভারতভূমি যদিও হিন্দু জাতীয়দিগেরই যথার্থ মাতৃভূমি, যদিও হিন্দুরাই ইহার গর্ভে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, তথাপি মুসলমানেরাও আর ইহার পর নহেন, ইনি উহাদিগকেও আপন বক্ষে ধারণ করিয়া বহুকাল প্রতিপালন করিয়া আসিতেছেন। অতএব মুসলমানেরাও ইহার পালিত সন্তান।’
ভূদেবের কথা ঘুরিয়ে বললে দাঁড়াচ্ছে, অপরাপর ধর্ম-সম্প্রদায়-সমাজ, যারা দীর্ঘদিন ভারতে বসবাস করছে, তারাও ভারতমাতার পর নয়। কিন্তু যেহেতু হিন্দুসমাজ এই মাতৃকার আপন সন্তান, ফলে জাতীয় ভাব নির্মাণের দায়িত্ব ও অধিকার তার ওপরই বর্তায়। দ্বিতীয়ত, ভূদেব মনে করেন, হিন্দুত্বের সঙ্গে অপরাপর ধর্ম-সম্প্রদায়ের স্পষ্ট ভাব ও দর্শনগত দূরত্ব আছে। এই দূরত্বের মানচিত্র পাওয়া যায় তাঁর সামাজিক প্রবন্ধ গ্রন্থে:
১. প্রাক্তন, পুরস্কার ও পরকাল—এই ত্রিশক্তিবাদী হিন্দু শান্তিপরায়ণ, পরিশ্রমী, ধৈর্যশীল ও অনাসক্তচিত্ত।২. ওইরূপ ত্রিশক্তিবাদী কিন্তু দ্রব্যগুনবাদতৎপর বৌদ্ধজাতীয়েরা শান্ত, পরিশ্রমী, ধৈর্যশালী ও সাধনশীল।৩. ইচ্ছাশক্তি এবং পরকালবাদী খ্রিস্টধর্মী ইউরোপীয় অশান্ত, স্বৈরাচার, উদ্যমশীল ও ভোগসুখলিপ্সু।৪. ইচ্ছাশক্তি এবং পরকালবাদী মুসলমান অশান্ত, স্বৈরাচার এবং সাম্যধর্মী। (ভূদেব ২০১০, ১৫১)
ভূদেবের দৃষ্টিতে এই সব ধর্মের মধ্যে একমাত্র হিন্দুধর্মই ‘একাত্মবাদী’; অর্থাৎ তার ‘আত্মপর’ নেই (ভূদেব ২০১০, ১৬৯)। ফলে বহু জাত, ধর্ম, সম্প্রদায়ে বিভক্ত ভারত ভাব ও বস্তুগত দিক থেকে যদি আত্মনির্ভরশীল হতে চায়, তবে হিন্দুত্ব ছাড়া তার অন্যথা হওয়ার সুযোগ নেই; অর্থাৎ যেহেতু অন্য ধর্ম-সম্প্রদায় (বিশেষ করে খ্রিস্টধর্ম ও ইসলাম) একাত্মবাদ ও পরার্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয় এবং যেহেতু হিন্দুধর্ম একাত্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তার ‘আত্মপর’ নেই (এই বিচারের সঙ্গে সংযুক্তি রূপে এ-ও বলে রাখা যেতে পারে যে হিন্দুধর্মে শয়তান বা absolute evil-এর উপস্থিতি নেই), সেহেতু হিন্দুসমাজের সঙ্গেই অপরের মিলন সম্ভব বলে ভূদেব মনে করেন। তাঁর দৃষ্টিতে একাত্মবাদ ও মিলন সম্ভাব্যতা জাতীয় ভাব নির্মাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক প্রত্যয়। হিন্দুধর্মে এই প্রত্যয় ‘সাদৃশ্যে’র ধারণার সঙ্গে যুক্ত। ভূদেবের দৃষ্টিতে সাদৃশ্যের উপলব্ধি দুই ধরনের, ‘উহা বিধিমুখেও হয় আর নিষেধমুখেও হয়’ (ভূদেব ২০১০, ১৩১)। এই সাদৃশ্য ধারণাটিকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করে সুদীপ্ত কবিরাজ দেখান :
According to Indian logic, similarity is a term with a dual meaning. It can mean that objects A and B are directly similar, placed in a relation of identity or indiscernible resemblance. But even if A and B are not directly similar, they may exhibit a negative similarity. B may not be identical to A, but its difference from A may be negligible compared to its differences with C, D, E, etc. (কবিরাজ ২০১০, ২৫৯)
অর্থাৎ ভারতীয় যুক্তিবিদ্যায় সাদৃশ্য যেমন ‘তুমি’ ‘আমার’ মতো, এভাবে নির্ণয় করা যায়। তেমনি আবার ‘তুমি’ ‘আমার’ মতো না হলেও ‘তার’ চেয়ে ‘তোমার’ সঙ্গে ‘আমার’ মিল বেশি অথবা ‘তার’ চেয়ে ‘তুমি’ ‘আমার’ কাছের, এভাবেও নির্ণয় করা যায়। ফলে সাদৃশ্য এমন ধারণা, যার সাহায্যে ‘হ্যাঁ’ বা ‘বিধি’ এবং ‘না’ বা ‘নিধি’ দুই পথেই মিলন সম্ভব। আর এই সাদৃশ্যের ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে হিন্দুধর্মে অপরত্ব বলে কিছু থাকে না।
এই ধারণা থেকেই ভূদেবের জাতীয়ভাবে মুসলমান এবং অপরাপর ধর্ম-সম্প্রদায়ের মানুষের যে সুনির্দিষ্ট স্থান থাকবে, তার চিত্র পাওয়া যায়। কিন্তু ভূদেবের অখণ্ড স্বাধীন জাতীয় ভাব নির্মাণের জন্য এত উদ্যোগের প্রয়োজন বোধ হচ্ছে কেন? কারণ নিহিত আছে তাঁর উপনিবেশ ও ঔপনিবেশিকের সংস্কৃতিবিরোধী প্রবল অবস্থানে। উনিশ শতকের সমাজচিন্তকদের মধ্যে ভূদেবই প্রথম স্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে ব্রিটিশ উপনিবেশের ছায়ায় সংগঠিত ভারত একপ্রকার অখণ্ড রূপ পেয়েছে বটে, কিন্তু অনবরত ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির অনুকৃতিজাত হীনতা এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতি বা ইউরোপীয় সংস্কৃতির ভ্রান্তবিলাস তার জাতীয় চরিত্রকে নষ্ট করে ফেলছে। স্বাধীন জাতীয় ভাব ছাড়া এই দশা থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় নেই। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও জিজ্ঞাসা থাকে, ঔপনিবেশিক ভাবের বিপরীতে ভূদেবের জাতীয় ভাবকেন্দ্রিক স্বপ্নকল্পনায় ‘সাম্রাজ্য’-এর প্রয়োজন পড়ল কেন। অন্যভাবে বললে, তাঁর বিকল্প তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের ওপর প্রতিষ্ঠিত রামরাজ্যকে কেন সাম্রাজ্যই হতে হবে? ভূদেব কিন্তু শুধু সাম্রাজ্যের কল্পনাতেও থেমে থাকেননি। তিনি তাঁর স্বপ্নলব্ধ ভারতকে রীতিমতো সমুদ্রবাণিজ্য ও সমরসম্ভারে সজ্জিত একটি মহাশক্তি হিসেবে কল্পনা করেছেন এবং এই কল্পনার কারণকে নির্দিষ্ট করেছেন যুগধর্মে (ভূদেব ২০১৪, ৪৪-৫০)। ফলে দেখা যাচ্ছে, তাঁর স্বপ্নকল্পনার ‘হতে পারত’র মধ্যে এক ‘হয়ে আছে’ বিদ্যমান। অনুমিত হয়, তাঁর কল্পনায় এই ‘হয়ে আছে’র আবির্ভাব ঘটেছে ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার সূত্রেই। এ ক্ষেত্রে জিজ্ঞাসা দাঁড়ায়, ভূদেবের স্বকীয়তার অলীক কল্পনার সঙ্গে পরকীয় বাস্তবতার মিলনের মধ্য দিয়ে সৃজিত এই যে খোয়াব, তা কি স্রেফ কল্পনার খাতিরে কল্পনা? এক ‘হতে পারত’র সঙ্গে এক ‘হয়ে আছে’র যুগলবন্দীতে কী ‘হতে পারে’ নামের এক সম্ভাব্যতাও উঁকি দিয়ে যায় না? স্বপ্নলব্ধ ইতিহাস নামে ভূদেব যে স্বপ্ন হাজির করেন, তা আর যা-ই হোক, অতীতমুখী নয়। প্রফেটিক ও ভিশনারি উপাদান তাতে এত প্রবল মাত্রায় আছে যে তাকে ভারতবর্ষের কল্পিত সম্ভাব্য ভবিষ্যতের ‘আশা’রূপে দেখলেও বাড়িয়ে দেখা হয় না।
কায়কোবাদের মহাশ্মশান কাব্যের গ্রন্থরূপে আবির্ভাবের সময়টা বেশ চিন্তাকর্ষক। বঙ্গভঙ্গের এক বছর আগে, তখন এই কাব্য প্রকাশ পেয়েছিল। সেকালে বাংলার রাজনৈতিক আবহ কেমন ছিল, তা বোধ করি সহজে অনুমেয়। সেকালে এই কাব্য যে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল, তার কথা নিবন্ধের শুরুতেই উল্লিখিত আছে। বিশেষ করে বাংলার মুসলমান সমাজে এই কাব্যের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল বেশি। সে সময় এই কাব্যের আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন ফজলর রহমান খাঁ, সৈয়দ এমদাদ আলী, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীরা। আবার এই কাব্যের প্রশংসা করে দীর্ঘ রচনা লিখেছিলেন আবুল কালাম মোহাম্মদ শামসুদ্দীন। এর মধ্যে মহাশ্মশান প্রসঙ্গে সেকালের বাঙালি মুসলমান সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ভালো বোঝা যায় মোহাম্মদ শামসুদ্দীনের ‘মহাশ্মশান কাব্য’ নামে রচিত প্রবন্ধের শেষাংশের বর্ণনায় :
…কতিপয় দোষ এবং কাব্যগত আরও কিছু কিছু ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও মহাশ্মশান যে আমাদের জাতীয় সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠতম এবং ভাষা জননীর অন্যতম সুন্দর অলংকার তৎসম্বন্ধে আশা করি কোনরূপ মতদ্বৈধ হইবে না। বাঙ্গালী মুসলমানদের দুর্ভাগ্য যে, তাঁহারা এমন সুন্দর কাব্যের সমাদর করিতে পারিতেছেন না। (শামসুদ্দীন ১৯৯৪, ৪১৫)
মোহাম্মদ শামসুদ্দীনের বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে মুসলিম সমাজে এই কাব্য যতটা আদর পাওয়ার কথা, ততটা পায়নি। বিশেষ করে মুসলিম নারী চরিত্র নির্মাণে কায়কোবাদ যে মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন, বাঙালি মুসলিম সমাজ তাকে যথেষ্ট রুচিশীল সৃজন বলে মনে করেনি। এর বাইরেও মহাশ্মশান-এর একটি বিশেষ তাৎপর্যের কথা মোহাম্মদ শামসুদ্দীনের বক্তব্যে স্পষ্ট। শামসুদ্দীন এই কাব্যকে জাতীয় সাহিত্য বলে অভিহিত করেন। কারণ, এই কাব্যের প্রেক্ষাপট, বিষয় ও ব্যাপ্তি। কায়কোবাদও যে তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধকে ভারতবর্ষের ইতিহাসের একটি জাতীয় ঘটনা হিসেবে মনে করেছেন, তা গ্রন্থটির প্রথম সংস্করণের উৎসর্গপত্রেই উল্লেখ আছে (শামসুদ্দীন ১৯৯৪, ৩৫১)। কবির দৃষ্টিতে কাব্যটিতে তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ ঘিরে জাতীয় ভাবের আধার খোঁজার চেষ্টা আছে। সেই আধারের সন্ধান যে কায়কোবাদ মহাশ্মশানজুড়ে করে গেছেন, তার উদাহরণ কাব্যের বহু স্থানে ছড়িয়ে আছে। কায়কোবাদ বোধ করেন, তাঁর কাব্য এবং কাব্যের বিষয় ‘জাতীয় গৌরবের মহাশ্মশান’ (কায়কোবাদ ১৯৯৪, ৩৫১) এবং সেই গৌরবের সঙ্গে জুড়ে দেন ‘আমাদের’ শব্দটি। এই ‘আমাদের’ বলতে তিনি হিন্দু-মুসলমান উভয় জাতিকেই বোঝাতে চান। মহাশ্মশান-এ তার প্রমাণও পাওয়া যায়।
মহাশ্মশান-এ তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধকে উপজীব্য করে জাতীয়তার বোধ বিরাজমান থাকে ঘটনার সমাবেশে, চরিত্রদের দৈনন্দিন বীরত্ব, প্রেম, প্রতারণা, বিরহ, হিংসা, আক্রোশ, লিপ্সা, খেউর, কামনা, নৈতিকতা, ধর্মবোধ, ছোট ছোট বিজয়ের উল্লাস এবং ছোট ছোট পরাজয়ের গ্লানির মতো মানবিক প্রকাশ, অনুভব ও অনুভূতির মধ্যে। ভূদেবের মতো কায়কোবাদ বিকল্প ইতিহাসের বৈপ্লবিক কল্পনা করেননি। স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস-এর মতো জাতীয়ভাবের বিপুল প্রজ্ঞাদীপ্ত দার্শনিক অভিজ্ঞান মহাশ্মশান-এ নেই। কথাটি ঘুরিয়ে বললে, এই কাব্যে আছে দার্শনিক অভিজ্ঞানের প্রতিস্থাপনা রূপে মানবিক অনুভব। তিন খণ্ডে রচিত এই বিশাল আখ্যানের প্রথম খণ্ড পরিক্রমণিত হয় জোহরা বেগম-ইব্রাহিম কার্দি এবং হিরণবালা-আতা খাঁ প্রণয়-সম্বন্ধের নানান ঘাত-প্রতিঘাতকে কেন্দ্র করে। একদিকে প্রেম, ব্যক্তি-সম্পর্ক; অন্যদিকে ধর্ম, সম্প্রদায় ও কর্মনীতি তাদের জীবন দ্বিখণ্ডিত করে রাখে একাধারে মানবিক ও সত্তার সংকট রূপে বিরাজমান থেকে। ফলে দেখা যায়, আখ্যানে প্রধান প্রধান চরিত্রের মনে একাধারে সামষ্টিক পরাজয়ের ভীতি এবং প্রিয়জনকে হারানোর আশঙ্কা দুই-ই সমানভাবে সক্রিয়। বলাবাহুল্য, অস্তিত্বের এই প্রবল টানাপোড়েনের মৌলিক কারণ ‘পানিপথের তৃতীয় সমর’। কাব্যের তৃতীয় খণ্ডে সেই সমর এক প্রকাণ্ড সংঘটন রূপে আবির্ভূত হয়, যা শেষ হয় মুসলিম শিবিরের বিজয় ও মারাঠা শিবিরের বিনাশের মধ্য দিয়ে। আখ্যানের শেষ ভাগে বিজয়ী ও বিজিত—উভয় পক্ষের মানসে বেদনার গাঢ় অনুভূতিই স্থায়ী দাগ হয়ে থেকে যায়। দেখা যায়, চরিত্রের প্রত্যেকেই মহাযুদ্ধের ভেতর চলমান নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধে পরাজিত। কেউ নিহত, কেউ পরাভূত। সমগ্র রণক্ষেত্রে যেন একই সুর গুঞ্জরিত, ‘যে রত্ন হারায়ে গেনু এ জন্মের মত/ পানিপথ যুদ্ধক্ষেত্রে সরস্বতী তীরে!/ আর না পাইব তাহা; যুদ্ধে জয়ী হনু/ তাহাতে কী লাভ মোর? ভিখারীর মত/ ভগ্ন প্রাণ নিয়ে আমি চলিনু স্বদেশে!/ সব শূন্য মোর কাছে শূন্য মোর হৃদি,/ শূন্য গৃহ, শূন্য মোর রাজ-সিংহাসন!/ এ শূন্য কি দিয়া আমি করিব পূরণ?’ (কায়কোবাদ ১৯৯৪, ৩১৩)। মহাভারতের ‘স্ত্রী পর্ব’-এর মতো মহাবিজয়ের উল্লাস নয়, মহাশ্মশানও সৌন্দর্য ছড়ায় অসংখ্য ছোট ছোট হারিয়ে ফেলার বেদনা, মানুষের নিজের কাছে নিজের পরাজয়ের শোকগাথায়। হিন্দু-মুসলমাননির্বিশেষে সব চরিত্রের মধ্যে এমন মানবিক অনুভূতিগুলোর সমান্তরাল উপস্থিতি কাব্যটিকে জাতীয় চরিত্র দেয়। এই চরিত্র থেকে উত্থিত ভাব ভারতবর্ষের দুই প্রধান ধর্ম-সম্প্রদায়ের মধ্যে অনুভবের অলীক সাম্যাবস্থা তৈরি করে বটে, কিন্তু তা বাস্তবিক রাজনৈতিক মীমাংসার দিকে অগ্রসর হয় না। কায়কোবাদের তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের জাতীয় বয়ান তাই ইতিহাসের প্রচলিত পথে অগ্রসর হতে হতে হিন্দু-মুসলমান দুই বীর জাতির হয়ে এই গৌরবেই আশ্রয় খুঁজে ফেরে। এক যুদ্ধের আখ্যান-কল্পনায় একাকার না হয়ে তারা রাজনৈতিকভাবে দুই শিবিরেই বিভক্ত থেকে যায়। এই আখ্যান কোনো রাজনৈতিক মোহনায় মেলে না। অমীমাংসা তার মীমাংসা হয়ে থেকে যায়। আর এই কাব্যকল্পনার ফাঁক গলে এমন অশনিসংকেতও কবির শিহরণের কারণ হয় যে মারাঠাদের কবল থেকে ভারতের মুসলমানদের রক্ষায় কাবুলের অধিপতি আহমদ শাহ আবদালী যদি এগিয়ে না আসতেন এবং মুসলমানদের পক্ষে যুদ্ধ না করতেন, তাহলে ইতিহাসের পাতা ও ভারতের মানচিত্র অন্য বর্ণে রঞ্জিত হতো (কায়কোবাদ ১৯৯৪, ৩৫৯-৩৬০)। মহাশ্মশান-এর তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকায় কায়কোবাদ আরও বলেন :
যদিও এই পানিপথের মহাযুদ্ধে ভারতীয় মুসলমানদেরই জয় হইয়াছিল বটে, কিন্তু ইহার ফল ভোগ করিবার শক্তি তখন তাঁহাদের আদৌ ছিল না। কারণ এই মহাযুদ্ধে উভয় শক্তিই একেবারে বিধ্বস্ত হইয়া গিয়াছিল।…যুদ্ধ জয়ের কিছুকাল পরেই মহাবীর আহমদ সাহ্ আব্দালী নিজ দেশে চলিয়া যান, ঠিক সেই সময় সেই সঙ্কটময় দুর্দিনে ভারতীয় মুসলমানদের সৌভাগ্যবশতই ইংরেজগণ ভারতে আগমন করিয়া তাঁহাদের সাম্রাজ্যের ভিত্তি পত্তনের চেষ্টা করিয়াছিলেন, এবং এই মহাযুদ্ধই তাহাদের সেই ভিত্তি পত্তনের পথ সুগম করিয়া দিয়াছিল।…ভারতীয় মুসলমানদের উপরে জগদীশ্বরের অপার করুণা বলিয়াই ভারতে ইংরেজগণের আগমন হইয়াছিল। নচেৎ আহমদ সাহ্ আব্দালী চলিয়া যাওয়ার অব্যবহিত পরেই ভারতীয় কোনও না কোন হিন্দু সম্প্রদায়ের তীক্ষ্ণধার অসির আঘাতে ভারতের নগরে নগরে পল্লীতে পল্লীতে আবার সেই মুসলমান নর-নারীর প্রাণের পবিত্র শোণিতে রক্ত-প্রবাহিনী বহিয়া ভারতীয় মুসলমানদিগকে গিরি গুহায় ও বনেজঙ্গলে আশ্রয় লইতে হইত। তাই বলিতেছি, ভারতে ইংরেজগণের আগমনে ও তাঁহাদের রাজত্বের ভিত্তি পত্তনে মুসলমানদের উপকার বই অপকার হয় নাই। (কায়কোবাদ ১৯৯৪, ৩৬০)
ফলে দেখা যাচ্ছে, ভূদেব সৃজিত ভারতের স্বপ্নলব্ধ বিকল্প ইতিহাস কায়কোবাদের কল্পনাতীত। তাঁর দৃষ্টিতে আহমেদ শাহ আবদালীর ভারতে আগমন, তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় এবং ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্রিটিশদের হাতে না গেলে বা এর অন্যথা হলে ভারতীয় মুসলমানের আত্মবিনাশ ও বিলয় ছাড়া অন্য কোনো পরিণতির কথা তিনি ভাবতেই পারেননি। কবিচৈতন্যের এই অভাব একদিকে যেমন ঔপনিবেশিকদের উপস্থিতির নৈতিক বৈধতার ক্ষেত্র তৈরি করে, আবার অন্যদিকে ভূদেবের অখণ্ড স্বপ্নিল ভারতের ভাবকল্পের বিপরীতে এক বিরাট ‘নাহং’ হয়ে দাঁড়ায়। সাতচল্লিশ পেরিয়ে উপমহাদেশের ওপর দিয়ে এখনো যে ভাব আর পরিচয়-সংকটের লু হাওয়া বয়ে যাচ্ছে, তার একপ্রকার আদিরূপ তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধকে ঘিরে ভূদেব আর কায়কোবাদের ভাবকল্পের বৈপরীত্যের মধ্যেই স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়।
কোনো দেশে জাতীয় চৈতন্য বাস্তব জমিনে পা রাখার আগে জাতি-গোষ্ঠী-সম্প্রদায়ের অগ্রবর্তী সমাজ ও সমাজের বিদ্বৎজনের কল্পনায় আসে। সেই কল্পনা আকার পেতে থাকে জাতীয় ইতিহাসের কোনো ব্যক্তি, ঘটনা বা মুহূর্তকে কেন্দ্র করে। কল্পনা প্রতীকায়িত হয় এবং ক্রমে সামূহিক চৈতন্যের অংশ হয়ে যায়। এমনকি জাতীয় ভাব বাস্তব চেহারা নেওয়ার পরও কিন্তু কল্পনার এই অভিযাত্রা থেমে থাকে না (রণজিৎ ২০১৯, ১২৭)। ইতিহাসে প্রায় সর্বত্রই দেখা যায়, জাতীয় ভাব ও কল্পনার নেতৃত্ব থাকে অগ্রবর্তী শ্রেণির হাতে। আর সেই শ্রেণির মধ্যে যে জাতীয় ভাব ও কল্পনা গড়ে ওঠে, তার সংকট ও সম্ভাবনার আয়না হয়ে ওঠে সেই শ্রেণির সাহিত্য (রণজিৎ ২০১৯, ১২৯)। ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস ও কায়কোবাদের মহাশ্মশান-এর মধ্য দিয়ে এ কথা আরও স্পষ্ট রূপে দৃশ্যমান হয়। এটা দেখা যায় যে একই ঘটনায় একজন যেখানে পরাজয়ের গ্লানি বোধ করেন, অন্যজন সেখানে জাতীয় গৌরব খুঁজতে প্রবৃত্ত হন। একই ইতিহাসের বিকল্প কল্পনা একজনের কাছে ‘আশা’রূপে হাজির হলে অন্যজনের কাছে তা হাজির থাকে ‘অকল্পনীয় আতঙ্ক’রূপে। আবার দুজনের দুই ভাব অনুভবে ঔপনিবেশিকতা হাজির থাকে বিচিত্ররূপে। ভূদেবের কল্পনায় রামসাম্রাজ্যের কাঠামো তৈরি হয় ঔপনিবেশিক যুগধর্মের তরিকায়। কায়কোবাদের মানসপটে ভারতে ঔপনিবেশিকের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ভারতীয় মুসলমানের পরিত্রাতা রূপে আবির্ভূত হয়। আর এসবের মধ্য দিয়ে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধকে উপজীব্য করে রচিত বাংলার দুটি অসামান্য রচনা, সাহিত্যকর্ম হয়ে ওঠার পাশাপাশি ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষ ও বাংলার প্রতিনিধিত্বশীল শ্রেণির অভিন্ন জাতীয় ভাব নির্মাণে ব্যর্থতার সাক্ষ্যও বহন করে চলে।
ওয়াজেদ ১৯৯৪।। মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, ‘মহাশ্মশান সম্বন্ধে দুই একটি কথা’, কায়কোবাদ রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড), আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত, ঢাকা: বাংলা একাডেমি।
কবিরাজ ২০১০।। Sudipta Kaviraj, ‘The Reversal of Orientalism : Bhudev Mukhopadhyay and the Project of Indigenist Social Theory’, The Imaginary Institution of India : Politics and Ideas, New York: Columbia University Press।
কায়কোবাদ ১৯৯৪।। কায়কোবাদ, মহাশ্মশান, কায়কোবাদ রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড), আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত, ঢাকা: বাংলা একাডেমি।
ভূদেব ২০১০।। ভূদেব মুখোপাধ্যায়, ‘সামাজিক প্রবন্ধ’, প্রবন্ধসমগ্র, মনস্বিতা সান্যাল ও রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, কলকাতা: চর্যাপদ।
ভূদেব ২০১৪।। ভূদেব মুখোপাধ্যায়, স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস, গায়ত্রী ভট্টাচার্য সম্পাদিত, কলকাতা: চর্যাপদ।
রণজিৎ ২০১৯।। রণজিৎ গুহ, ‘নিম্নবর্গের ইতিহাস’, রচনাসংগ্রহ ১, কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স।
শামসুদ্দীন ১৯৯৪।। আবুল কালাম মোহাম্মদ শামসুদ্দীন, ‘মহাশ্মশান কাব্য’, কায়কোবাদ রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড), আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত, ঢাকা: বাংলা একাডেমি
ইমরান কামাল, সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: [email protected]
নোট: আর্কাইভ থেকে প্রকাশিত। দেখুন, প্রতিচিন্তা, দ্বাদশ বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা, অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২২।



















