‘শুধু শোক নয়, আমরা বিচার চাই, জবাবদিহি চাই’
- আপডেট সময় : ০৭:২০:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সৈকতে টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে পুড়ে নিহত ১০ জনের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। মরদেহ বুঝে নিতে আজ রোববার সকাল থেকে হাসপাতালের মর্গ এলাকায় অপেক্ষা করছেন স্বজনেরা। কিন্তু মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় তাঁদের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে।
প্রিয়জনের মরদেহের অপেক্ষায় স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতালের পরিবেশ। শোকের পাশাপাশি তাঁদের মধ্যে রয়েছে ক্ষোভ। তাঁদের দাবি শুধু শোক প্রকাশ নয়, এই প্রাণহানির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দ্রুত ডিএনএ পরীক্ষা করে মরদেহ হস্তান্তর করে দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
আজ রোববার বেলা ১১টার দিকে হাসপাতালে গিয়ে কথা হয় স্বজনদের সঙ্গে। বেলা দুইটা পর্যন্ত তাঁদের কেউ মরদেহ বুঝে পাননি। মরদেহগুলো গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় হিমঘরে রাখা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডে স্ত্রী নাসরিন আক্তার মুক্তাকে হারিয়েছেন দেওয়ান ফয়সাল। তাঁর ধারণা উদ্ধার হওয়া ১০ লাশের মধ্যে তাঁর স্ত্রীর লাশও রয়েছে। এ কারণে স্ত্রীর মরদেহ বুঝে নিতে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে এসে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি।
আজ সকালে হাসপাতালের করিডরে কথা হয় দেওয়ান ফয়সালের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি জানি, আমার স্ত্রী নাসরিন আক্তার মুক্তাকে আর ফিরে পাব না। কিন্তু আমি চাই না, আর কোনো স্বামীকে এভাবে তাঁর স্ত্রী হারাতে হোক, আর কোনো পরিবারকে প্রিয়জনের মরদেহ খুঁজতে হাসপাতালে ছুটতে হোক।’
দেওয়ান ফয়সাল ঢাকা জেলা (উত্তর) ছাত্রদলের সহসভাপতি। স্ত্রী নিয়ে তিনি থাকতেন ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায়। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়া কোনো রিসোর্ট পরিচালিত হলে এবং কর্তৃপক্ষের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হলে তার দায় কার? যাঁদের দায়িত্ব ছিল তদারকি করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও আইন প্রয়োগ করা, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চেয়ে ফয়সাল বলেন, ‘আমাদের স্বজনদের ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই, কিন্তু বিচার নিশ্চিত করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের আছে। আমার স্ত্রীকে ফিরে পাব না, কিন্তু তাঁর মৃত্যু যেন আরেকটি পরিবারের মৃত্যুফাঁদ হয়ে না থাকে। আমরা শুধু শোক প্রকাশ নয়, জবাবদিহি চাই, বিচার চাই।’
অগ্নিকাণ্ডে বড় ভাই, ভাবি ও তাঁদের দুই শিশুসন্তানকে হারিয়েছেন নঈমুদ্দিন। তাঁর অভিযোগ, রিসোর্টে পর্যাপ্ত বহির্গমন পথ ও যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলে হয়তো এত প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হতো।
নঈমুদ্দিন বলেন, ‘আমার বড় ভাই, তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের দুই সন্তান—সবাইকে হারিয়েছি। এই শোক ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমরা পুরো পরিবার ভীষণ মর্মাহত।’
তিনি বলেন, আগুন লাগার পর ভবন থেকে বের হওয়ার পর্যাপ্ত পথ থাকলে মানুষ নিরাপদে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেত। ভবন নির্মাণে কী ধরনের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে, কোথায় এটি নির্মাণ করা হয়েছে এবং আগুন কীভাবে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে, সেসব বিষয়ও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
অগ্নিকাণ্ডে বন্ধু নাহিদুর রহমানকে হারিয়ে শোকাহত জুয়েল রানা। বন্ধুর খোঁজে তিনিও ছুটে আসেন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে। আজ সকালে জুয়েল রানা বলেন, ‘আমি নাহিদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু। নাহিদ আমার খুব কাছের বন্ধু ছিল, আমার কলিজার টুকরা ছিল সে। ওকে হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।’
জুয়েল রানা বলেন, এ ঘটনায় কেউ দায়ী থাকলে তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। দায়িত্ব পালনে যাঁদের অবহেলা ছিল, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তেরও দাবি জানান তিনি।
অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। তবে মরদেহ দেখে নিশ্চিতভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, মরদেহগুলো থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ডিএনএ পরীক্ষাগারে পাঠানো হবে। পাশাপাশি নিহত ব্যক্তিদের বাবা-মা, ভাই-বোন কিংবা সন্তানের মতো নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকেও নমুনা সংগ্রহ করা হবে। দুই পক্ষের নমুনা পরীক্ষার ফল মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার পর মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল আরও বলেন, ডিএনও পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ এবং ফল মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ কাজে তিন থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে পরীক্ষার কাজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ডিএনএ পরীক্ষার নিজস্ব পরীক্ষাগার নেই। হাসপাতালের দায়িত্ব হলো মরদেহ থেকে প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা। এরপর ডিএনএ পরীক্ষা ও পরিচয় শনাক্তের পরবর্তী কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করবে।



















