যে গান শুনে গিটার হাতে নিতে ইচ্ছা হয়
- আপডেট সময় : ০৭:৩৬:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে

গিটারের প্রেমে পড়ার শুরুটা কখনো একটি গান শুনেই হয়। চাক বেরির ‘জনি বি. গুড’ তেমনই এক গান। শুরুর বাজনা শুনে গিটারপ্রেমীর মনে হতেই পারে, ইস্ এমন করে যদি বাজাতে পারতাম! তারপর গান যত এগোয়, সেই ইচ্ছার সঙ্গে মিশে যায় এক তরুণের গল্প। লেখাপড়ায় মন ছিল কম, কিন্তু গিটার বাজালে পথচলতি মানুষও থমকে দাঁড়ায়। তাঁর মা স্বপ্ন দেখেন, একদিন ছেলের নাম আলোয় লেখা হবে। গিটার হাতে নিজের চেনা জগৎ ছাড়িয়ে যাওয়ার সেই স্বপ্নই শুনিয়েছিলেন চাক বেরি। তাঁর জন্মের এক শ বছর পরও গানটি পৃথিবীর কোনো প্রান্তে নতুন কারও হাতে গিটার তুলে নেওয়ার প্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।
গানটির যাত্রা পৃথিবীতেও থামেনি। ১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপিত ভয়েজার ১ ও ভয়েজার ২ মহাকাশযানের গোল্ডেন রেকর্ডে জায়গা পেয়েছে ‘জনি বি. গুড’। পৃথিবীর সংগীতের নমুনা হিসেবে মহাকাশে পাড়ি দিয়েছে চাক বেরির গানও। আজ ১৮ অক্টোবর চাক বেরির জন্মশতবর্ষ। ১৯২৬ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি অঙ্গরাজ্যের সেন্ট লুইসে জন্ম তাঁর। পুরো নাম চার্লস এডওয়ার্ড অ্যান্ডারসন বেরি। গায়ক, গীতিকার ও গিটারবাদক—তিন পরিচয়েই তিনি স্মরণীয়। আর এই তিনের সমন্বয়েই হয়ে উঠেছিলেন রক অ্যান্ড রোলের অন্যতম পথিকৃৎ।
নিজের সুরের খোঁজে রক অ্যান্ড রোল অনেক শিল্পী ও সংগীতধারার মিলিত ফসল। চাক বেরি সেই ধারাকে দিয়েছিলেন স্বতন্ত্র ভাষা। ব্লুজ, রিদম অ্যান্ড ব্লুজ ও কান্ট্রির উপাদান মিলিয়ে গড়ে তুলেছিলেন নিজের বাজনা। গিটারের ঝলক, ছন্দের দোলা আর ছোট ছোট গল্পে ভরা গানের কথা—সব মিলিয়ে তাঁর গান চেনা যেত সহজেই। পরের প্রজন্মের বহু রকশিল্পীর কাছে সেই ধরন হয়ে ওঠে অনুসরণযোগ্য।
সেন্ট লুইসের ক্লাবগুলো ছিল তাঁর সংগীতচর্চার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ১৯৫৩ সালে যোগ দেন পিয়ানোবাদক জনি জনসনের দল স্যার জনস ট্রিওতে। শ্রোতাদের সামনে বাজাতে বাজাতে বুঝেছেন, কোন সুরে তাঁদের পা নড়ে, কোন পরিবেশনা মনোযোগ ধরে রাখে। ব্লুজের পাশাপাশি কান্ট্রির উপাদান মেশাতেন। কৃষ্ণাঙ্গ শ্রোতাদের সঙ্গে শ্বেতাঙ্গরাও আসছিলেন সেই গান শুনতে।
বড় সুযোগটি আসে ১৯৫৫ সালে। শিকাগোয় মাডি ওয়াটার্সের সঙ্গে দেখা করে জানতে চান, রেকর্ড করতে হলে কার কাছে যাবেন। ওয়াটার্স তাঁকে চেস রেকর্ডসের লিওনার্ড চেসের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে আসে ‘মেবেলিন’। গানটি যুক্তরাষ্ট্রের রিদম অ্যান্ড ব্লুজ তালিকার শীর্ষে ওঠে। পপ তালিকায় পৌঁছায় পঞ্চম স্থানে। ক্লাবের গণ্ডি পেরিয়ে চাক বেরি পৌঁছে যান বৃহত্তর শ্রোতাদের কাছে।
তরুণেরা খুঁজে পেল নিজেদেরএরপর একের পর এক গান। ১৯৫৬ সালে ‘রোল ওভার বিটোফেন’। পরের বছর ‘স্কুল ডেজ’ ও ‘রক অ্যান্ড রোল মিউজিক’। ১৯৫৮ সালে ‘সুইট লিটল সিক্সটিন’ ও ‘জনি বি. গুড’। এসব গানে স্কুল আছে, প্রেম আছে, নাচের আনন্দ আছে।
বেরি তখন কিশোর বয়স পেরিয়ে এসেছেন। তবু কিশোর মনের উত্তেজনা ধরতে পারতেন। তরুণদের নিজস্ব রুচি, ছোট ছোট চাওয়া আর বড় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জায়গা পেয়েছিল তাঁর গানে। দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ ঘটনা হয়ে উঠত প্রাণবন্ত গল্প। গিটারের পাশাপাশি এই গল্প বলার ক্ষমতাও তাঁকে আলাদা করেছিল। রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমের মূল্যায়নেও তাঁর গানে মার্কিন কিশোরজীবনের এই উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে।
বেরির গান যেমন শোনার, তাঁর পরিবেশনা তেমনি দেখারও। গিটার বাজাতে বাজাতে হাঁটু ভাঁজ করে নিচু হয়ে মঞ্চে এগিয়ে যেতেন। বিখ্যাত সেই ‘ডাক ওয়াক’ হয়ে ওঠে তাঁর পরিচয়ের অংশ। মুখভঙ্গি, চলাফেরা আর বাজনা মিলিয়ে দর্শককে মাতিয়ে রাখতেন। গিটার হাতে মঞ্চের সামনে দাঁড়ানো শিল্পীর যে ছবি রকসংগীতের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, তা গড়ে তোলায় বেরির বড় ভূমিকা ছিল।
বর্ণবিভক্ত মার্কিন সমাজে তাঁর সংগীতের আরেকটি তাৎপর্যও ছিল। কৃষ্ণাঙ্গ সংগীতের ঐতিহ্য থেকে উঠে আসা একজন শিল্পীর গান আপন করে নিচ্ছিল শ্বেতাঙ্গ তরুণেরাও। সংগীতের নানা ধারার সঙ্গে শ্রোতাদের মধ্যকার দূরত্বও কিছুটা ঘুচছিল। রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেম তাঁর অবদান মূল্যায়ন করতে গিয়ে সংগীতধারা ও বর্ণের সীমানা অতিক্রমের এই ক্ষমতার কথা বলেছে।
বিটলস থেকে বাংলায়বেরির প্রভাব আটলান্টিক পেরিয়ে পৌঁছায় ব্রিটেনে। বিটলস ও রোলিং স্টোনস তাঁর গান গেয়েছে। তাঁর বাজনা অনুপ্রাণিত করেছে জিমি হেনড্রিক্সসহ পরের প্রজন্মের বহু শিল্পীকে। জন লেননের কথায়, ‘রক অ্যান্ড রোলকে অন্য কোনো নাম দিতে চাইলে, তাকে চাক বেরি বলতে পারেন।’
উপমহাদেশেও তাঁর গান পৌঁছেছে নানা পথে। কেউ শুনেছেন বেরির নিজের রেকর্ড। কেউ তাঁর পরিচয় পেয়েছেন বিটলস বা রোলিং স্টোনসের গান শুনতে গিয়ে। অঞ্জন দত্তের অনুপ্রেরণার তালিকাতেও চাক বেরির নাম রয়েছে। ২০১০ সালে ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য পাওয়া যায়।
ভারতীয় গিটারবাদক আয়ুষী কার্নিকের অভিজ্ঞতায় প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার পথটি আরও স্পষ্ট। ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’কে তিনি জানিয়েছিলেন, বিটলসের গাওয়া চাক বেরির গান শুনতেন। পরে বেরিকে খুঁজতে গিয়ে পরিচয় হয় মাডি ওয়াটার্সের সংগীতের সঙ্গে। প্রিয় ব্যান্ডের গান এভাবেই তাঁকে নিয়ে গেছে রক অ্যান্ড রোল ও ব্লুজের পুরোনো জগতে।
ভারতের ব্যান্ড দ্য রিটর্নেলোসের সদস্য নিকোলাস রিক্সনের স্মৃতিও তেমন। ‘১০১ ইন্ডিয়া’য় তিনি লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে এক আত্মীয়ের নিয়ে আসা ক্যাসেটে দশ বছর বয়সে প্রথম চাক বেরির গান শোনেন। ‘জনি বি. গুড’-এর গিটার বেজে উঠতেই সবাই নাচতে শুরু করেছিলেন। নিজের ব্যান্ডে বাজানোর পেছনেও বেরি ও রক অ্যান্ড রোলের ভূমিকার কথা জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশের সঙ্গে যোগসূত্রটি খুঁজতে হয় ব্যান্ডসংগীতের শুরুর দিকে। ২০২৩ সালের ২ জুলাই সোলসের ৫০ বছর নিয়ে ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর আসরার চৌধুরীর লেখা এক নিবন্ধে সেই ইতিহাসের আলোচনা রয়েছে। চাক বেরিসহ মার্কিন শিল্পীদের গড়ে তোলা রক অ্যান্ড রোলকে পরে ব্রিটিশ শিল্পীরা এগিয়ে নেন। তাঁদের গান দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের কাছে পৌঁছানোর একটি মাধ্যম ছিল রেডিও সিলোনের ‘প্যারাডাইস আইল্যান্ড’ অনুষ্ঠান। নিবন্ধটিতে পাশ্চাত্য গান শোনার এই অভ্যাসকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ব্যান্ডসংগীত গড়ে ওঠার পটভূমির অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।চাক বেরির সঙ্গে আজম খানের তুলনাও করেছেন কেউ কেউ। ২০১১ সালে ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এ আসরার চৌধুরী লিখেছিলেন, বেরির মতো আজম খানও তরুণদের আপন গান উপহার দিয়েছেন। গানে স্মরণীয় করেছেন দেশের মানুষ ও জায়গার নাম। এই তুলনা অবশ্য আজম খানের ওপর বেরির সরাসরি প্রভাবের প্রমাণ নয়। মিলটি তাঁদের ভূমিকায়। দুই ভিন্ন সমাজে তাঁরা তরুণদের অনুভূতি প্রকাশের নতুন ভাষা তৈরি করেছিলেন।
স্বীকৃতি ও শেষ অধ্যায়বেরির জীবন সাফল্যের সরল গল্প নয়। কারাবাস ও আইনি জটিলতা তাঁর সংগীত জীবনে ছেদ ফেলেছে। জনপ্রিয়তায়ও ওঠানামা ছিল। তবে তাঁর গান পরের প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে বেঁচে থেকেছে।
এখানে একটি মজার তথ্য আছে। যুক্তরাষ্ট্রের পপ সিঙ্গেলস তালিকায় তাঁর একমাত্র শীর্ষস্থান পাওয়া গান ‘মাই ডিং-আ-লিং’, ১৯৭২ সালে। ‘জনি বি. গুড’ বা ‘রোল ওভার বিটোফেন’ সেই জায়গায় পৌঁছায়নি। অথচ রকসংগীতে তাঁর অবদানের কথা বলতে গেলে এই গানগুলোর নামই সামনে আসে। তালিকার অবস্থান দিয়ে একটি গানের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সব সময় বোঝা যায় না।
১৯৮৪ সালে রেকর্ডিং একাডেমি তাঁকে আজীবন সম্মাননার গ্র্যামি দেয়। ১৯৮৬ সালে রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমের প্রথম অন্তর্ভুক্ত শিল্পীদের একজন হন তিনি। তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন রোলিং স্টোনসের গিটারবাদক কিথ রিচার্ডস। যাঁর সংগীতে অনুপ্রাণিত হয়ে পরের প্রজন্ম এগিয়েছে, তাঁকে স্বীকৃতি জানানোর মঞ্চেও ছিল সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি।
২০১৭ সালের ১৮ মার্চ মিজৌরির সেন্ট চার্লস কাউন্টিতে নিজ বাড়িতে মারা যান চাক বেরি। বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। সে বছরের ৯ জুন প্রকাশিত হয় তাঁর শেষ স্টুডিও অ্যালবাম ‘চাক’। আগের স্টুডিও অ্যালবামের ৩৮ বছর পর নতুন অ্যালবাম নিয়ে শ্রোতাদের কাছে ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। সেই অ্যালবামের প্রকাশ দেখে যেতে পারেননি।
সূত্র: চাক বেরির ওয়েবসাইট, রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেম, দ্য টেলিগ্রাফ, গ্র্যামি.কম।



















