ঢাকা ০২:৪৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

আত্মকথন: শিকড়ের গল্পে, সংস্কৃতির আলোয় মায়ের আগমন

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:২৪:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

চট্টগ্রামের দক্ষিণ নালাপাড়ায় দুর্গোৎসবের এবারের ভাবনা ‘আত্মকথন’। শিকড়, সংস্কৃতি ও উৎসবের মেলবন্ধনে এ যেন নিজের গল্পে ফিরে দেখা, ঐতিহ্যকে ধারণ করে নতুনের পথে এগিয়ে যাওয়ার এক সম্মিলিত প্রত্যয়।

নিজের কথা বলা—আত্মকথন। কিন্তু এই আত্মকথন শুধু আমার বা আপনার কথা নয়। এ আমাদের সবার কথা। আমাদের শিকড়ের কথা, সংস্কৃতির কথা, পাড়ার কথা, ভালোবাসার কথা।

দুর্গাপূজার প্রস্তুতি শুরু হয় অনেক আগেই। খড়ের গন্ধে, বাঁশের কাঠামোয়, মাটির স্পর্শে—নীরবে এগিয়ে চলে মায়ের ঘরে ফেরার আয়োজন। কারও হাতে খড়, কারও হাতে মাটি। কেউ গড়ে তোলেন কাঠামো, কেউ সাজিয়ে তোলেন মণ্ডপ। কেউ থাকেন সামনে, কেউবা আড়ালে থেকে সামলান ভোগের আয়োজন, চাঁদা সংগ্রহ কিংবা উৎসবের অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ।

নাম জানা-অজানা কত মানুষের শ্রম, ভালোবাসা আর অপেক্ষা মিলেই তো তৈরি হয় আমাদের উৎসব। প্রত্যেকের অংশগ্রহণে, প্রত্যেকের আন্তরিকতায় একটি পাড়া ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে আনন্দের সম্মিলিত ঠিকানা।

চট্টগ্রামের দক্ষিণ নালাপাড়া পূজা উদ্যাপন পরিষদের কাছে এই সম্মিলিত যাত্রাই এবারের ভাবনার অন্যতম অনুপ্রেরণা। পরিষদের পক্ষ থেকে রাজীব বিশ্বাস জানান, ‘আত্মকথন’-এর মধ্য দিয়ে তাঁরা তুলে ধরতে চান নিজেদের শিকড়, সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গে উৎসবের নিবিড় সম্পর্ক।

পূজার সভাপতি অলক গোপাল বলেন, দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক জীবন্ত ঐতিহ্য।

আর ঐতিহ্য মানে কি শুধু অতীতকে আঁকড়ে থাকা? তা নয়। ঐতিহ্য আমাদের শিকড়, আমাদের বেড়ে ওঠার ভিত্তি। সেই শিকড়ের ওপর দাঁড়িয়েই জন্ম নেয় নতুন ভাবনা, নতুন সৃজন, নতুন সম্ভাবনা।

দক্ষিণ নালাপাড়া পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গৌতম দে বলেন, তাঁদের এবারের বার্তা— ‘ঐতিহ্যের ভিত্তিতেই হোক সৃজনশীলতার নির্মাণ।’

এই বার্তার মধ্যেই রয়েছে আগামী দিনের স্বপ্ন। নতুন প্রজন্ম জানুক নিজেদের শিকড়ের কথা, চিনুক নিজেদের সংস্কৃতিকে, ধারণ করুক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। তারপর সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই সৃষ্টি করুক নতুন কিছু। পুরোনোকে ভুলে নয়, পুরোনোকে সঙ্গে নিয়েই হোক নতুনের পথচলা।

দক্ষিণ নালাপাড়ার পূজামণ্ডপে ঘুরে দেখা যায়, দেয়ালচিত্রেও ফুটে উঠেছে এই ভাবনার নানা প্রকাশ। মণ্ডপের দেয়ালে দেয়ালে যেন লেখা রয়েছে নিজেদের পরিচয় ফিরে পাওয়ার গল্প। শিল্পের ভাষায় উঠে এসেছে শিকড়, সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ধনের কথা। সাজসজ্জা তাই নিছক সৌন্দর্য সৃষ্টির আয়োজন নয়; হয়ে উঠেছে নিজেদের গল্প বলার এক সৃজনশীল মাধ্যম।

এরই মধ্যে বেজে উঠেছে ঢাকের বাদ্যি। ধূপের গন্ধে ভরে উঠছে চারপাশ। আলোয় মুখর হয়েছে পাড়া। মায়ের আগমনে ফিরে এসেছে সেই চেনা আনন্দ, চেনা আবেগ, আপনজনের সান্নিধ্যে থাকার চিরচেনা অনুভূতি।

উৎসবের এই আলোয় মানুষ আবারও খুঁজে পাচ্ছে নিজের মানুষকে, নিজের স্মৃতিকে, নিজের বেড়ে ওঠার গল্পকে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা ঐতিহ্য নতুন করে প্রাণ পাচ্ছে মানুষের অংশগ্রহণে, শিল্পের প্রকাশে, ভালোবাসার বন্ধনে।মা এসেছেন—আমাদের পাড়ায়, আমাদের মাঝে, আমাদের ঘরে।

আর মায়ের এই ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও যেন ফিরে যাই আমাদের শিকড়ে, আমাদের সংস্কৃতিতে, আমাদের নিজেদের গল্পে।

এই ফিরে আসার গল্পই ‘আত্মকথন’। যেখানে ব্যক্তির কথা মিশে যায় সমষ্টির কণ্ঠে, ঐতিহ্যের হাত ধরে সৃজনশীলতা এগিয়ে যায় ভবিষ্যতের পথে, আর দুর্গোৎসব হয়ে ওঠে নিজেদের নতুন করে চেনার এক অনন্য উপলক্ষ।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

আত্মকথন: শিকড়ের গল্পে, সংস্কৃতির আলোয় মায়ের আগমন

আপডেট সময় : ১২:২৪:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

চট্টগ্রামের দক্ষিণ নালাপাড়ায় দুর্গোৎসবের এবারের ভাবনা ‘আত্মকথন’। শিকড়, সংস্কৃতি ও উৎসবের মেলবন্ধনে এ যেন নিজের গল্পে ফিরে দেখা, ঐতিহ্যকে ধারণ করে নতুনের পথে এগিয়ে যাওয়ার এক সম্মিলিত প্রত্যয়।

নিজের কথা বলা—আত্মকথন। কিন্তু এই আত্মকথন শুধু আমার বা আপনার কথা নয়। এ আমাদের সবার কথা। আমাদের শিকড়ের কথা, সংস্কৃতির কথা, পাড়ার কথা, ভালোবাসার কথা।

দুর্গাপূজার প্রস্তুতি শুরু হয় অনেক আগেই। খড়ের গন্ধে, বাঁশের কাঠামোয়, মাটির স্পর্শে—নীরবে এগিয়ে চলে মায়ের ঘরে ফেরার আয়োজন। কারও হাতে খড়, কারও হাতে মাটি। কেউ গড়ে তোলেন কাঠামো, কেউ সাজিয়ে তোলেন মণ্ডপ। কেউ থাকেন সামনে, কেউবা আড়ালে থেকে সামলান ভোগের আয়োজন, চাঁদা সংগ্রহ কিংবা উৎসবের অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ।

নাম জানা-অজানা কত মানুষের শ্রম, ভালোবাসা আর অপেক্ষা মিলেই তো তৈরি হয় আমাদের উৎসব। প্রত্যেকের অংশগ্রহণে, প্রত্যেকের আন্তরিকতায় একটি পাড়া ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে আনন্দের সম্মিলিত ঠিকানা।

চট্টগ্রামের দক্ষিণ নালাপাড়া পূজা উদ্যাপন পরিষদের কাছে এই সম্মিলিত যাত্রাই এবারের ভাবনার অন্যতম অনুপ্রেরণা। পরিষদের পক্ষ থেকে রাজীব বিশ্বাস জানান, ‘আত্মকথন’-এর মধ্য দিয়ে তাঁরা তুলে ধরতে চান নিজেদের শিকড়, সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গে উৎসবের নিবিড় সম্পর্ক।

পূজার সভাপতি অলক গোপাল বলেন, দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক জীবন্ত ঐতিহ্য।

আর ঐতিহ্য মানে কি শুধু অতীতকে আঁকড়ে থাকা? তা নয়। ঐতিহ্য আমাদের শিকড়, আমাদের বেড়ে ওঠার ভিত্তি। সেই শিকড়ের ওপর দাঁড়িয়েই জন্ম নেয় নতুন ভাবনা, নতুন সৃজন, নতুন সম্ভাবনা।

দক্ষিণ নালাপাড়া পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গৌতম দে বলেন, তাঁদের এবারের বার্তা— ‘ঐতিহ্যের ভিত্তিতেই হোক সৃজনশীলতার নির্মাণ।’

এই বার্তার মধ্যেই রয়েছে আগামী দিনের স্বপ্ন। নতুন প্রজন্ম জানুক নিজেদের শিকড়ের কথা, চিনুক নিজেদের সংস্কৃতিকে, ধারণ করুক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। তারপর সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই সৃষ্টি করুক নতুন কিছু। পুরোনোকে ভুলে নয়, পুরোনোকে সঙ্গে নিয়েই হোক নতুনের পথচলা।

দক্ষিণ নালাপাড়ার পূজামণ্ডপে ঘুরে দেখা যায়, দেয়ালচিত্রেও ফুটে উঠেছে এই ভাবনার নানা প্রকাশ। মণ্ডপের দেয়ালে দেয়ালে যেন লেখা রয়েছে নিজেদের পরিচয় ফিরে পাওয়ার গল্প। শিল্পের ভাষায় উঠে এসেছে শিকড়, সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ধনের কথা। সাজসজ্জা তাই নিছক সৌন্দর্য সৃষ্টির আয়োজন নয়; হয়ে উঠেছে নিজেদের গল্প বলার এক সৃজনশীল মাধ্যম।

এরই মধ্যে বেজে উঠেছে ঢাকের বাদ্যি। ধূপের গন্ধে ভরে উঠছে চারপাশ। আলোয় মুখর হয়েছে পাড়া। মায়ের আগমনে ফিরে এসেছে সেই চেনা আনন্দ, চেনা আবেগ, আপনজনের সান্নিধ্যে থাকার চিরচেনা অনুভূতি।

উৎসবের এই আলোয় মানুষ আবারও খুঁজে পাচ্ছে নিজের মানুষকে, নিজের স্মৃতিকে, নিজের বেড়ে ওঠার গল্পকে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা ঐতিহ্য নতুন করে প্রাণ পাচ্ছে মানুষের অংশগ্রহণে, শিল্পের প্রকাশে, ভালোবাসার বন্ধনে।মা এসেছেন—আমাদের পাড়ায়, আমাদের মাঝে, আমাদের ঘরে।

আর মায়ের এই ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও যেন ফিরে যাই আমাদের শিকড়ে, আমাদের সংস্কৃতিতে, আমাদের নিজেদের গল্পে।

এই ফিরে আসার গল্পই ‘আত্মকথন’। যেখানে ব্যক্তির কথা মিশে যায় সমষ্টির কণ্ঠে, ঐতিহ্যের হাত ধরে সৃজনশীলতা এগিয়ে যায় ভবিষ্যতের পথে, আর দুর্গোৎসব হয়ে ওঠে নিজেদের নতুন করে চেনার এক অনন্য উপলক্ষ।