ঢাকা ১০:৪৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
শ্রীপুর ইউপিতে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী জাহিদুল ইসলাম জাহিদ ছোটবেলা থেকেই ইংরেজি শেখা: ভীতি বনাম ভিত্তি সিভিতে কেন ব্যর্থতার কথাও লিখতে বলা হচ্ছে জনবল নিয়োগ হয়নি, প্রতিদিন সাড়ে ৩ হাজার দর্শনার্থী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে জুলাই জাদুঘর গর্ভকালে নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য মুমিন নারীর প্রার্থনা ইসরায়েলের নির্বাচনে ‘কিংমেকার’ কে এই আব্বাস আবারও মেসি জাদু, প্রতিপক্ষের রক্ষণ তছনছ করে করলেন জোড়া গোল সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন যুব উন্নয়নের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন পাওয়ার চুক্তি হয় ১০ লাখ টাকায় সরকারি ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার নিয়োগ: ফিন্যান্সিয়াল অ্যান্ড ব্যাংকিং নলেজ প্রস্তুতিতে করণীয়

ইসরায়েলের নির্বাচনে ‘কিংমেকার’ কে এই আব্বাস, নেতানিয়াহুকেও সরিয়েছিলেন তিনি

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:৫৬:০১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দন্ত চিকিৎসক থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ইসরায়েলের পার্লামেন্টে যান মনসুর আব্বাস। একবার বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সহায়তা করেছিলেন। এবারও নেতানিয়াহুকে হটানোর লক্ষ্য নিয়ে তিনি সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও ইহুদি রাজনীতিকের সঙ্গে জোট বেঁধেছেন।

ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনের প্রচারণাগুলোর ওপর নজর রাখলেই যেকোনো সাধারণ মানুষের মনে হতে পারে দেশটির ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি মনসুর আব্বাস। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁকে সেভাবেই তুলে ধরা হচ্ছে।

মনসুর আব্বাস ইসরায়েলের ‘ইউনাইটেড আরব লিস্ট’ বা ‘রাম’ নামে ইসলামপন্থী একটি রাজনৈতিক দলের নেতা। নেতানিয়াহু নির্বাচনী প্রচারণায় ইহুদি ভোটারদের সতর্ক করে বলছেন, তিনি ক্ষমতাচ্যুত হলে পরবর্তী সরকারের আসল ক্ষমতার চাবিকাঠি থাকবে মনসুর আব্বাসের হাতে, যা ইসরায়েলের জন্য ‘ঘরের ভেতরের’ বিপদ। ডানপন্থী ইসরায়েলিরা যাঁকে সবচেয়ে বেশি ভয় পান, সেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পেছনে প্রধান চালিকা শক্তি এই মনসুর আব্বাস।

বাস্তবতা হলো, নির্বাচনে মনসুর আব্বাসের ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলোর সঙ্গে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর এবং গাজার সম্পর্ক সামান্যই। বরং তাঁর পুরো মনোযোগ ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের ওপর। ইসরায়েলের জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশই ইসরায়েলি আরব। ইসরায়েলের কট্টরপন্থী ইহুদিদের সহিংস অপরাধ ও বৈষম্যমূলক আবাসন নীতির ভুক্তভোগী এই নাগরিকেরা।

মনসুর আব্বাসের বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুর আক্রমণাত্মক প্রচারণার একটি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ববহ করে তোলে। সেটা হলো, আসন্ন নির্বাচনে মনসুর আব্বাসই শেষ পর্যন্ত ‘কিংমেকার’ বা সরকার গঠনের নিয়ামক হয়ে উঠতে পারেন। এর আগেও তিনি এই ভূমিকা পালন করেছেন। ইসরায়েলের বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নেতানিয়াহুর বিরোধী জোট যদি মনসুর আব্বাসের সমর্থন না নেন, তবে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার মতো যথেষ্ট বড় জোট গঠন করতে পারবে না।

বিষয়টি মনসুর আব্বাসকে সম্ভবত ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী আরব রাজনীতিবিদ করে তুলেছে। বিষয়টি আরও অভাবনীয় এই কারণে যে ১৯৯৬ সালে ইসরায়েলের ইসলামিক মুভমেন্টের একটি শাখার হাত ধরে গঠিত ‘রাম’ একটি সামাজিকভাবে রক্ষণশীল দল, যা ইসরায়েলি ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধার ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত মেলবন্ধন তৈরি করে। রাম ইসরায়েলে মুসলিম পরিচয়কে শক্তিশালী করতে এবং আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতায়িত করতে কাজ করে।

এক সাক্ষাৎকারে মনসুর আব্বাস জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুর বর্ণবাদী, ফ্যাসিবাদী সরকারকে পতন ঘটাতে চান তিনি। পাশাপাশি এমন এক সরকার প্রতিষ্ঠায় সহযোগী হতে চান, যে সরকারের অংশীদার হবেন আরব নাগরিকেরা। তিনি বলেন, ‘এমন সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে আমাদের কথা বলার সুযোগ থাকবে, আমাদের প্রভাব থাকবে।’

মনসুর আব্বাস ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের বেদুইন শহর তুবা-জাঙ্গারিয়ার এক জনসভায় শত শত ভোটারের উদ্দেশে বক্তৃতায় আশ্বাস দেন, ‘ক্ষমতাবানদের টেবিলে আমরা আর অনাথ হয়ে থাকব না।’ সেই বক্তৃতায় তিনি আরব ও ইহুদিদের মধ্যে অংশীদারত্বের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন।

কেউ কেউ অবশ্য মনসুর আব্বাসকে দেশের সবচেয়ে কৌশলী রাজনীতিবিদ বলে থাকেন। ২০২১ সালে মনসুর আব্বাস প্রথমবার সবার নজর কাড়েন সেই সময় নেতানিয়াহুর নতুন সরকারে যোগ দেওয়ার জন্য তাঁর সঙ্গে আলোচনা চালানোয়। এটা ছিল একটি ইসলামপন্থী দলের জন্য ঐতিহাসিক মাইলফলক। তবে শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুকে সরানোর জন্য বিরোধীদের সঙ্গে জোট বাঁধেন আব্বাস। এতে পতন ঘটে নেতানিয়াহু সরকারের। টানা ১২ বছর পর প্রধানমন্ত্রিত্ব হারান নেতানিয়াহু।

যদিও পরের বছরই নির্বাচনে জিতে নেতানিয়াহু আবার প্রধানমন্ত্রীর পদ পুনরুদ্ধার করেন। এবার নেতানিয়াহু ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টর ইহুদিবাদী সরকার গঠন করেন। এরপর যখন ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস ইসরায়েলে ঢুকে প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে হত্যা করে এবং প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যায়, তখন থেকে অনেক ইসরায়েলিই ইসরায়েলের আরব নাগরিকসহ সব ফিলিস্তিনিকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখা শুরু করেন।

৫২ বছর বয়সী মনসুর আব্বাস হামাসের এই হামলার পর ইসরায়েলি ইহুদিদের কাছে পৌঁছানো এবং তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের প্রচেষ্টা আরও বাড়িয়ে দেন। তিনি ৭ অক্টোবরের হামলার দিনই সেই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান। পাশাপাশি গাজা সীমান্ত এলাকা থেকে পালিয়ে আসা ইসরায়েলিদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে সাহায্য করেন। তিনি বারবার হামাসের এই হামলার নিন্দা করেছেন এবং বলেছেন, সহিংসতা কেবল ফিলিস্তিনিদেরই ক্ষতি করেছে।

তবু ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, মনসুর আব্বাস ততই আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। নেতানিয়াহু ও তাঁর সহযোগীরা মনসুর আব্বাসকে সন্ত্রাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল বা তার চেয়েও খারাপ কিছু হিসেবে চিত্রায়িত করছেন।

জায়নবাদী বিরোধী নেতারা একসময় মনসুর আব্বাসকে এক সাহসী পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন। তাঁরাও এখন কট্টর ইহুদীবাদী ভোটারদের মন জয় করার প্রতিযোগিতায় নেমে প্রকাশ্যে তাঁর কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন। অন্যান্য আরব দলগুলোর নেতারা, তাঁরা মনসুর আব্বাসকে যেন ‘বেইমান’ বলতে বাকি রেখেছেন। কারণ, প্রকাশ্যে হামাসের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন।

কিন্তু মনসুর আব্বাস অবিচল। সম্প্রতি তুবা-জাঙ্গারিয়া এলাকায় গোধূলিলগ্নে শত শত মুসলিম পুরুষ সাদা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে তাঁর কথা শুনছিলেন। মনসুর আব্বাস বলেন, তিনি যে পথে আছেন, সে পথের জন্য আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে।

এর কয়েক দিন পর নাজারেথে এক সংবাদ সম্মেলনে মনসুর আব্বাস তাঁর এ যাবৎকালের সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপটি নেন। তিনি ঘোষণা করেন, মধ্য-বামপন্থী আইনপ্রণেতা এবং সাবেক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা ইহুদি ইয়াভ সেগালোভিচ ‘রাম’-এর প্রার্থী তালিকার ২ নম্বর পজিশনের প্রার্থী হবেন।

এটাই মূলধারার আরব এবং জায়নবাদী ইহুদি রাজনীতিবিদদের মধ্যে প্রথম কোনো জোট করার ঘটনা। পাশে সেগালোভিচকে নিয়ে মনসুর আব্বাস হিব্রু ভাষায় বলেন, ‘পরিবর্তন আনতে হলে অন্য মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে, শত্রু হিসেবে নয়।’

গ্যালিলির দ্রুজ, খ্রিষ্টান ও মুসলিম অধ্যুষিত শহর মাঘারে জন্মগ্রহণকারী মনসুর আব্বাসের রাজনীতিতে আসার কোনো ইচ্ছা ছিল না। মুদিদোকানির ঘরে জন্ম নেওয়া মনসুর আব্বাস প্রতিবেশীদের কাছে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আস্থা অর্জন করেছিলেন। বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য অনেকেই তাঁর দ্বারস্থ হতো। হাইস্কুলে পড়ার সময় প্রায়ই তাঁকে শিক্ষার্থীদের মধ্যস্থতা করতে বলা হতো।

মনসুর আব্বাস পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন দন্ত চিকিৎসক হিসেবে। তিনি নিজ শহরে দ্রুজ এবং খ্রিষ্টানদের মধ্যে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া দেখেছেন। দেখেছেন, হাজার হাজার মানুষকে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে। স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং ঘরবাড়ি নতুন করে গড়ে তোলার মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত তিন নিজের পেশা বন্ধ রেখেছিলেন। মানুষের জন্য আরও বেশি করে কাজ করার ইচ্ছা ছিল তাঁর। তিনি বলেন, সেই ইচ্ছা থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নেন রাজনীতি করার। তাঁর মতে, মানুষকে আরও সেবা দেওয়ার একমাত্র উপায় হলো রাষ্ট্রযন্ত্র বা রাষ্ট্রের মাধ্যমগুলো ব্যবহার করা।

তিন সন্তানের বাবা মনসুর আব্বাস ২০১৯ সালে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে প্রবেশ করেন। এর পর থেকে ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের জন্য জরুরি বিষয় হিসেবে আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে লাগামহীন সহিংস অপরাধ ও চাঁদাবাজি বন্ধের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন।

তুবা-জাঙ্গারিয়া থেকে গাড়ি চালিয়ে ফেরার পথে মনসুর আব্বাস জানান, তাঁর এসব প্রচেষ্টার কারণেও তিনি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। তিনি সংগঠিত অপরাধী চক্রের পাশাপাশি আরব, ইহুদি এবং পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকেও হুমকি পেয়েছেন।

মনসুর আব্বাস ইহুদিদের প্রতি হাত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টার জন্য জাতীয়ভাবে অনেক বেশি নজর কেড়েছেন। ২০২১ সালের মে মাসে ইসরায়েলে আরব ও ইহুদিদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। তখন তিনি শহরের কট্টরপন্থী ইহুদি মেয়রকে সঙ্গে নিয়ে লোড শহরে পুড়ে যাওয়া সিনাগগ পরিদর্শনে যান। এই সিনাগগ পুনর্নির্মাণে সাহায্য করার প্রস্তাব দেন তিনি, সহিংসতারও তীব্র নিন্দা জানান। ওই সময় কিছু ইসরায়েলি আরব নাগরিক তাঁর পদত্যাগের দাবি তোলেন। কারণ, ইসরায়েলি পুলিশ তখন আরব নাগরিকদের নির্বিচার গ্রেপ্তার করছিল।

এ বিষয়ে প্রভাবশালী আরব সাংবাদিক মোহাম্মদ মাগাদলি বলেন, ‘সে সময়ে এটি একদমই অগ্রহণযোগ্য ছিল। ইসলামিক মুভমেন্টের অন্যতম বড় এক নেতা আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, “আপনি বলে দিতে পারেন মনসুর আব্বাসের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এখানেই শেষ।” কিন্তু মনসুর আব্বাস সবাইকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে এটিই সঠিক কাজ ছিল।’

২০২১ সালে নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারে মনসুর আব্বাসের দল ‘রাম’-এর যোগ দেওয়া ছিল যুগান্তকারী এক ঘটনা। এর আগে সাধারণত রাম–এর মতো ইসলামপন্থী আরব দলগুলো সরকারের বাইরে থেকে ইসরায়েলি নীতির সমালোচনা করত ও প্রতিবাদ জানাত।

তবে মনসুর আব্বাসের যুক্তি হলো, বড় ধরনের সাফল্য অর্জনের একমাত্র উপায় হলো ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতার ব্যবহার করা। এটি করতে গিয়ে যদি আরব নাগরিকদের অপছন্দনীয় নীতিগুলোর দায়ভার কাঁধে নিতে হয়, তাতেও তিনি প্রস্তুত।

কিছু আরব নাগরিকের কাছে মনসুর আব্বাস ইতিমধ্যেই খুব চড়া মূল্য দিচ্ছেন। পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে আব্বাস খুব কমই কথা বলেন, কারণ ইসরায়েলের ভোটারদের কাছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিষয়টি কতটা অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, সে ব্যাপারে তিনি সতর্ক।

আগস্ট মাসে দলীয় সম্মেলনে মনসুর আব্বাস যখন সংক্ষেপে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রতি নিজের সমর্থনের কথা উল্লেখ করেন, তখন তাঁর সম্ভাব্য জোটসঙ্গী কয়েকজন বিরোধী নেতা এই বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন।

ইসরায়েল যে গাজা যুদ্ধে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, তার বিরুদ্ধে আব্বাস কেন আরও সোচ্চার হয়ে কথা বলেননি, তা নিয়ে আরব নাগরিকেরাও প্রশ্ন তুলেছেন।

ইসরায়েলে আরব-ইহুদি সম্পর্কের উন্নয়নে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাব্রাহাম ইনিশিয়েটিভস’-এর সহসভাপতি বাশার ফাহুম-জায়ৌসি বলেন, ‘আরব সম্প্রদায়ের ভেতরে আব্বাসের এই নীতিগত সমঝোতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে।’

ইসলামিক মুভমেন্টের চেয়ারম্যান সাফওয়াত ফ্রেজ বলেন, ইসরায়েলের আরব নাগরিকেরা আব্বাসের সব কথা পছন্দ না-ও করতে পারেন, তবে অনেকেই মেনে নেন যে আপস বা সমঝোতা তাঁর কর্মকৌশলেরই একটি অংশ।

সেগালোভিচের সঙ্গে মনসুর আব্বাসের হাত মেলানো বা জোট গঠন অপ্রত্যাশিত বলে মনে হয় নানা কারণে। নেসেটের ফ্লোরে দুজনে একবার একসঙ্গে নির্বাচন লড়ার বিষয়ে কৌতুক করেছিলেন। সে বিষয়টি স্মরণ করে সেগালোভিচ বলেন, তিনি যে জোট সরকারে জাতীয় নিরাপত্তা উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, সেই সরকারে আব্বাসও যোগ দিয়েছিলেন।

উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সেগালোভিচ আরব সম্প্রদায়গুলোতে অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করাকে তাঁর মিশন হিসেবে নিয়েছিলেন। অপরাধ দমনে একটি টাস্কফোর্সও গঠন করেছিলেন। তাঁর নজরদারিতে হত্যাকাণ্ডের হার ১৬ শতাংশ কমেছিল বলে উল্লেখ সেগালোভিচ।

এটি ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের কাছে সেগালোভিচের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দেয়। ২০২২ সালে নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় এলে সেগালোভিচের নেওয়া উদ্যোগগুলো বাতিল হয়। হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও বেড়ে যায়। অ্যাব্রাহাম ইনিশিয়েটিভসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর রেকর্ড ২৫২ জন আরব নাগরিক নিহত হয়েছেন।

তবে সেগালোভিচের কিছু বিষয় মনসুর আব্বাসের জন্য অস্বস্তির। তিনি আরবি বলতে পারেন না, যা নির্বাচনী প্রচারণার দৃশ্যগুলোতে অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করে। মনসুর আব্বাস সমকামী অধিকারের বিরোধিতা করেন; অন্যদিকে সেগালোভিচ নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে পরিচয় দেন এবং তাঁর এক সমকামী কন্যা রয়েছে। সেগালোভিচ নিজেও এসব অধিকার সমর্থন করেন।

সেগালোভিচের সঙ্গে জোট করে মনসুর আব্বাস হয়তো কট্টর ইহুদিবাদীদের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে চেয়েছেন। এটা রাম-এর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনে নেতানিয়াহুবিরোধী জোটের নেতাদের উদ্বেগ কাটাতে সাহায্য করতে পারে।

এক সাক্ষাৎকারে সেগালোভিচ বলেন, ‘আমি মনসুরকে বিশ্বাস করি। তিনি একজন সাহসী মানুষ। তিনি তাঁর এই সাহসের মূল্যও দিচ্ছেন। আমার কাছে তিনি ইসরায়েলের ভবিষ্যতের জন্য একধরনের আশা।’

এই আশার পরীক্ষা হবে ২৭ অক্টোবর।

ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের আরেক শহর সাখনিনে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে মনসুর আব্বাস হাসিমুখে সবার সঙ্গে সেলফি তুলছিলেন, কুশল বিনিময় করছিলেন। সেখানে ভোটার ইহসান বশির (৫৩) তাঁকে পরবর্তী সরকারে যোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। এমনকি সেই সরকারের নেতৃত্বে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু থাকলেও আপত্তি নেই তাঁর। উদ্দেশ্য ওই এলাকায় সহিংসতার হার কমানো।

বশির বলেন, ‘আমার এক ছেলে ও চার মেয়ে আছে। ওদের বাইরে যেতে দিতে আমি ভয় পাই।’ বশিরের কথায় আব্বাস হাসলেন, মাথা নাড়লেন। তিনি বললেন, ‘আশা করি, রাম অনেক আসন পাবে এবং নতুন সরকার গঠন করবে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

ইসরায়েলের নির্বাচনে ‘কিংমেকার’ কে এই আব্বাস, নেতানিয়াহুকেও সরিয়েছিলেন তিনি

আপডেট সময় : ০৭:৫৬:০১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

দন্ত চিকিৎসক থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ইসরায়েলের পার্লামেন্টে যান মনসুর আব্বাস। একবার বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সহায়তা করেছিলেন। এবারও নেতানিয়াহুকে হটানোর লক্ষ্য নিয়ে তিনি সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও ইহুদি রাজনীতিকের সঙ্গে জোট বেঁধেছেন।

ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনের প্রচারণাগুলোর ওপর নজর রাখলেই যেকোনো সাধারণ মানুষের মনে হতে পারে দেশটির ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি মনসুর আব্বাস। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁকে সেভাবেই তুলে ধরা হচ্ছে।

মনসুর আব্বাস ইসরায়েলের ‘ইউনাইটেড আরব লিস্ট’ বা ‘রাম’ নামে ইসলামপন্থী একটি রাজনৈতিক দলের নেতা। নেতানিয়াহু নির্বাচনী প্রচারণায় ইহুদি ভোটারদের সতর্ক করে বলছেন, তিনি ক্ষমতাচ্যুত হলে পরবর্তী সরকারের আসল ক্ষমতার চাবিকাঠি থাকবে মনসুর আব্বাসের হাতে, যা ইসরায়েলের জন্য ‘ঘরের ভেতরের’ বিপদ। ডানপন্থী ইসরায়েলিরা যাঁকে সবচেয়ে বেশি ভয় পান, সেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পেছনে প্রধান চালিকা শক্তি এই মনসুর আব্বাস।

বাস্তবতা হলো, নির্বাচনে মনসুর আব্বাসের ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলোর সঙ্গে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর এবং গাজার সম্পর্ক সামান্যই। বরং তাঁর পুরো মনোযোগ ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের ওপর। ইসরায়েলের জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশই ইসরায়েলি আরব। ইসরায়েলের কট্টরপন্থী ইহুদিদের সহিংস অপরাধ ও বৈষম্যমূলক আবাসন নীতির ভুক্তভোগী এই নাগরিকেরা।

মনসুর আব্বাসের বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুর আক্রমণাত্মক প্রচারণার একটি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ববহ করে তোলে। সেটা হলো, আসন্ন নির্বাচনে মনসুর আব্বাসই শেষ পর্যন্ত ‘কিংমেকার’ বা সরকার গঠনের নিয়ামক হয়ে উঠতে পারেন। এর আগেও তিনি এই ভূমিকা পালন করেছেন। ইসরায়েলের বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নেতানিয়াহুর বিরোধী জোট যদি মনসুর আব্বাসের সমর্থন না নেন, তবে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার মতো যথেষ্ট বড় জোট গঠন করতে পারবে না।

বিষয়টি মনসুর আব্বাসকে সম্ভবত ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী আরব রাজনীতিবিদ করে তুলেছে। বিষয়টি আরও অভাবনীয় এই কারণে যে ১৯৯৬ সালে ইসরায়েলের ইসলামিক মুভমেন্টের একটি শাখার হাত ধরে গঠিত ‘রাম’ একটি সামাজিকভাবে রক্ষণশীল দল, যা ইসরায়েলি ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধার ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত মেলবন্ধন তৈরি করে। রাম ইসরায়েলে মুসলিম পরিচয়কে শক্তিশালী করতে এবং আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতায়িত করতে কাজ করে।

এক সাক্ষাৎকারে মনসুর আব্বাস জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুর বর্ণবাদী, ফ্যাসিবাদী সরকারকে পতন ঘটাতে চান তিনি। পাশাপাশি এমন এক সরকার প্রতিষ্ঠায় সহযোগী হতে চান, যে সরকারের অংশীদার হবেন আরব নাগরিকেরা। তিনি বলেন, ‘এমন সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে আমাদের কথা বলার সুযোগ থাকবে, আমাদের প্রভাব থাকবে।’

মনসুর আব্বাস ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের বেদুইন শহর তুবা-জাঙ্গারিয়ার এক জনসভায় শত শত ভোটারের উদ্দেশে বক্তৃতায় আশ্বাস দেন, ‘ক্ষমতাবানদের টেবিলে আমরা আর অনাথ হয়ে থাকব না।’ সেই বক্তৃতায় তিনি আরব ও ইহুদিদের মধ্যে অংশীদারত্বের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন।

কেউ কেউ অবশ্য মনসুর আব্বাসকে দেশের সবচেয়ে কৌশলী রাজনীতিবিদ বলে থাকেন। ২০২১ সালে মনসুর আব্বাস প্রথমবার সবার নজর কাড়েন সেই সময় নেতানিয়াহুর নতুন সরকারে যোগ দেওয়ার জন্য তাঁর সঙ্গে আলোচনা চালানোয়। এটা ছিল একটি ইসলামপন্থী দলের জন্য ঐতিহাসিক মাইলফলক। তবে শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুকে সরানোর জন্য বিরোধীদের সঙ্গে জোট বাঁধেন আব্বাস। এতে পতন ঘটে নেতানিয়াহু সরকারের। টানা ১২ বছর পর প্রধানমন্ত্রিত্ব হারান নেতানিয়াহু।

যদিও পরের বছরই নির্বাচনে জিতে নেতানিয়াহু আবার প্রধানমন্ত্রীর পদ পুনরুদ্ধার করেন। এবার নেতানিয়াহু ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টর ইহুদিবাদী সরকার গঠন করেন। এরপর যখন ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস ইসরায়েলে ঢুকে প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে হত্যা করে এবং প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যায়, তখন থেকে অনেক ইসরায়েলিই ইসরায়েলের আরব নাগরিকসহ সব ফিলিস্তিনিকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখা শুরু করেন।

৫২ বছর বয়সী মনসুর আব্বাস হামাসের এই হামলার পর ইসরায়েলি ইহুদিদের কাছে পৌঁছানো এবং তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের প্রচেষ্টা আরও বাড়িয়ে দেন। তিনি ৭ অক্টোবরের হামলার দিনই সেই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান। পাশাপাশি গাজা সীমান্ত এলাকা থেকে পালিয়ে আসা ইসরায়েলিদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে সাহায্য করেন। তিনি বারবার হামাসের এই হামলার নিন্দা করেছেন এবং বলেছেন, সহিংসতা কেবল ফিলিস্তিনিদেরই ক্ষতি করেছে।

তবু ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, মনসুর আব্বাস ততই আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। নেতানিয়াহু ও তাঁর সহযোগীরা মনসুর আব্বাসকে সন্ত্রাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল বা তার চেয়েও খারাপ কিছু হিসেবে চিত্রায়িত করছেন।

জায়নবাদী বিরোধী নেতারা একসময় মনসুর আব্বাসকে এক সাহসী পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন। তাঁরাও এখন কট্টর ইহুদীবাদী ভোটারদের মন জয় করার প্রতিযোগিতায় নেমে প্রকাশ্যে তাঁর কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন। অন্যান্য আরব দলগুলোর নেতারা, তাঁরা মনসুর আব্বাসকে যেন ‘বেইমান’ বলতে বাকি রেখেছেন। কারণ, প্রকাশ্যে হামাসের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন।

কিন্তু মনসুর আব্বাস অবিচল। সম্প্রতি তুবা-জাঙ্গারিয়া এলাকায় গোধূলিলগ্নে শত শত মুসলিম পুরুষ সাদা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে তাঁর কথা শুনছিলেন। মনসুর আব্বাস বলেন, তিনি যে পথে আছেন, সে পথের জন্য আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে।

এর কয়েক দিন পর নাজারেথে এক সংবাদ সম্মেলনে মনসুর আব্বাস তাঁর এ যাবৎকালের সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপটি নেন। তিনি ঘোষণা করেন, মধ্য-বামপন্থী আইনপ্রণেতা এবং সাবেক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা ইহুদি ইয়াভ সেগালোভিচ ‘রাম’-এর প্রার্থী তালিকার ২ নম্বর পজিশনের প্রার্থী হবেন।

এটাই মূলধারার আরব এবং জায়নবাদী ইহুদি রাজনীতিবিদদের মধ্যে প্রথম কোনো জোট করার ঘটনা। পাশে সেগালোভিচকে নিয়ে মনসুর আব্বাস হিব্রু ভাষায় বলেন, ‘পরিবর্তন আনতে হলে অন্য মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে, শত্রু হিসেবে নয়।’

গ্যালিলির দ্রুজ, খ্রিষ্টান ও মুসলিম অধ্যুষিত শহর মাঘারে জন্মগ্রহণকারী মনসুর আব্বাসের রাজনীতিতে আসার কোনো ইচ্ছা ছিল না। মুদিদোকানির ঘরে জন্ম নেওয়া মনসুর আব্বাস প্রতিবেশীদের কাছে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আস্থা অর্জন করেছিলেন। বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য অনেকেই তাঁর দ্বারস্থ হতো। হাইস্কুলে পড়ার সময় প্রায়ই তাঁকে শিক্ষার্থীদের মধ্যস্থতা করতে বলা হতো।

মনসুর আব্বাস পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন দন্ত চিকিৎসক হিসেবে। তিনি নিজ শহরে দ্রুজ এবং খ্রিষ্টানদের মধ্যে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া দেখেছেন। দেখেছেন, হাজার হাজার মানুষকে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে। স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং ঘরবাড়ি নতুন করে গড়ে তোলার মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত তিন নিজের পেশা বন্ধ রেখেছিলেন। মানুষের জন্য আরও বেশি করে কাজ করার ইচ্ছা ছিল তাঁর। তিনি বলেন, সেই ইচ্ছা থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নেন রাজনীতি করার। তাঁর মতে, মানুষকে আরও সেবা দেওয়ার একমাত্র উপায় হলো রাষ্ট্রযন্ত্র বা রাষ্ট্রের মাধ্যমগুলো ব্যবহার করা।

তিন সন্তানের বাবা মনসুর আব্বাস ২০১৯ সালে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে প্রবেশ করেন। এর পর থেকে ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের জন্য জরুরি বিষয় হিসেবে আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে লাগামহীন সহিংস অপরাধ ও চাঁদাবাজি বন্ধের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন।

তুবা-জাঙ্গারিয়া থেকে গাড়ি চালিয়ে ফেরার পথে মনসুর আব্বাস জানান, তাঁর এসব প্রচেষ্টার কারণেও তিনি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। তিনি সংগঠিত অপরাধী চক্রের পাশাপাশি আরব, ইহুদি এবং পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকেও হুমকি পেয়েছেন।

মনসুর আব্বাস ইহুদিদের প্রতি হাত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টার জন্য জাতীয়ভাবে অনেক বেশি নজর কেড়েছেন। ২০২১ সালের মে মাসে ইসরায়েলে আরব ও ইহুদিদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। তখন তিনি শহরের কট্টরপন্থী ইহুদি মেয়রকে সঙ্গে নিয়ে লোড শহরে পুড়ে যাওয়া সিনাগগ পরিদর্শনে যান। এই সিনাগগ পুনর্নির্মাণে সাহায্য করার প্রস্তাব দেন তিনি, সহিংসতারও তীব্র নিন্দা জানান। ওই সময় কিছু ইসরায়েলি আরব নাগরিক তাঁর পদত্যাগের দাবি তোলেন। কারণ, ইসরায়েলি পুলিশ তখন আরব নাগরিকদের নির্বিচার গ্রেপ্তার করছিল।

এ বিষয়ে প্রভাবশালী আরব সাংবাদিক মোহাম্মদ মাগাদলি বলেন, ‘সে সময়ে এটি একদমই অগ্রহণযোগ্য ছিল। ইসলামিক মুভমেন্টের অন্যতম বড় এক নেতা আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, “আপনি বলে দিতে পারেন মনসুর আব্বাসের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এখানেই শেষ।” কিন্তু মনসুর আব্বাস সবাইকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে এটিই সঠিক কাজ ছিল।’

২০২১ সালে নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারে মনসুর আব্বাসের দল ‘রাম’-এর যোগ দেওয়া ছিল যুগান্তকারী এক ঘটনা। এর আগে সাধারণত রাম–এর মতো ইসলামপন্থী আরব দলগুলো সরকারের বাইরে থেকে ইসরায়েলি নীতির সমালোচনা করত ও প্রতিবাদ জানাত।

তবে মনসুর আব্বাসের যুক্তি হলো, বড় ধরনের সাফল্য অর্জনের একমাত্র উপায় হলো ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতার ব্যবহার করা। এটি করতে গিয়ে যদি আরব নাগরিকদের অপছন্দনীয় নীতিগুলোর দায়ভার কাঁধে নিতে হয়, তাতেও তিনি প্রস্তুত।

কিছু আরব নাগরিকের কাছে মনসুর আব্বাস ইতিমধ্যেই খুব চড়া মূল্য দিচ্ছেন। পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে আব্বাস খুব কমই কথা বলেন, কারণ ইসরায়েলের ভোটারদের কাছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিষয়টি কতটা অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, সে ব্যাপারে তিনি সতর্ক।

আগস্ট মাসে দলীয় সম্মেলনে মনসুর আব্বাস যখন সংক্ষেপে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রতি নিজের সমর্থনের কথা উল্লেখ করেন, তখন তাঁর সম্ভাব্য জোটসঙ্গী কয়েকজন বিরোধী নেতা এই বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন।

ইসরায়েল যে গাজা যুদ্ধে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, তার বিরুদ্ধে আব্বাস কেন আরও সোচ্চার হয়ে কথা বলেননি, তা নিয়ে আরব নাগরিকেরাও প্রশ্ন তুলেছেন।

ইসরায়েলে আরব-ইহুদি সম্পর্কের উন্নয়নে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাব্রাহাম ইনিশিয়েটিভস’-এর সহসভাপতি বাশার ফাহুম-জায়ৌসি বলেন, ‘আরব সম্প্রদায়ের ভেতরে আব্বাসের এই নীতিগত সমঝোতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে।’

ইসলামিক মুভমেন্টের চেয়ারম্যান সাফওয়াত ফ্রেজ বলেন, ইসরায়েলের আরব নাগরিকেরা আব্বাসের সব কথা পছন্দ না-ও করতে পারেন, তবে অনেকেই মেনে নেন যে আপস বা সমঝোতা তাঁর কর্মকৌশলেরই একটি অংশ।

সেগালোভিচের সঙ্গে মনসুর আব্বাসের হাত মেলানো বা জোট গঠন অপ্রত্যাশিত বলে মনে হয় নানা কারণে। নেসেটের ফ্লোরে দুজনে একবার একসঙ্গে নির্বাচন লড়ার বিষয়ে কৌতুক করেছিলেন। সে বিষয়টি স্মরণ করে সেগালোভিচ বলেন, তিনি যে জোট সরকারে জাতীয় নিরাপত্তা উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, সেই সরকারে আব্বাসও যোগ দিয়েছিলেন।

উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সেগালোভিচ আরব সম্প্রদায়গুলোতে অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করাকে তাঁর মিশন হিসেবে নিয়েছিলেন। অপরাধ দমনে একটি টাস্কফোর্সও গঠন করেছিলেন। তাঁর নজরদারিতে হত্যাকাণ্ডের হার ১৬ শতাংশ কমেছিল বলে উল্লেখ সেগালোভিচ।

এটি ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের কাছে সেগালোভিচের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দেয়। ২০২২ সালে নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় এলে সেগালোভিচের নেওয়া উদ্যোগগুলো বাতিল হয়। হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও বেড়ে যায়। অ্যাব্রাহাম ইনিশিয়েটিভসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর রেকর্ড ২৫২ জন আরব নাগরিক নিহত হয়েছেন।

তবে সেগালোভিচের কিছু বিষয় মনসুর আব্বাসের জন্য অস্বস্তির। তিনি আরবি বলতে পারেন না, যা নির্বাচনী প্রচারণার দৃশ্যগুলোতে অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করে। মনসুর আব্বাস সমকামী অধিকারের বিরোধিতা করেন; অন্যদিকে সেগালোভিচ নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে পরিচয় দেন এবং তাঁর এক সমকামী কন্যা রয়েছে। সেগালোভিচ নিজেও এসব অধিকার সমর্থন করেন।

সেগালোভিচের সঙ্গে জোট করে মনসুর আব্বাস হয়তো কট্টর ইহুদিবাদীদের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে চেয়েছেন। এটা রাম-এর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনে নেতানিয়াহুবিরোধী জোটের নেতাদের উদ্বেগ কাটাতে সাহায্য করতে পারে।

এক সাক্ষাৎকারে সেগালোভিচ বলেন, ‘আমি মনসুরকে বিশ্বাস করি। তিনি একজন সাহসী মানুষ। তিনি তাঁর এই সাহসের মূল্যও দিচ্ছেন। আমার কাছে তিনি ইসরায়েলের ভবিষ্যতের জন্য একধরনের আশা।’

এই আশার পরীক্ষা হবে ২৭ অক্টোবর।

ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের আরেক শহর সাখনিনে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে মনসুর আব্বাস হাসিমুখে সবার সঙ্গে সেলফি তুলছিলেন, কুশল বিনিময় করছিলেন। সেখানে ভোটার ইহসান বশির (৫৩) তাঁকে পরবর্তী সরকারে যোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। এমনকি সেই সরকারের নেতৃত্বে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু থাকলেও আপত্তি নেই তাঁর। উদ্দেশ্য ওই এলাকায় সহিংসতার হার কমানো।

বশির বলেন, ‘আমার এক ছেলে ও চার মেয়ে আছে। ওদের বাইরে যেতে দিতে আমি ভয় পাই।’ বশিরের কথায় আব্বাস হাসলেন, মাথা নাড়লেন। তিনি বললেন, ‘আশা করি, রাম অনেক আসন পাবে এবং নতুন সরকার গঠন করবে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে।’