ঢাকা ০৫:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ধস্তাধস্তির মধ্যে গুলি বেরিয়ে যায় বলছে বিজিবি, মামলায় নিহত যুবকও আসামি

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:৫৬:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) চোরাচালানবিরোধী অভিযানে হামলা ও গুলিতে এক যুবকের নিহত হওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে। গতকাল সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে বিজিবির ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের (৩৯ বিজিবি) কড়াইতলী বিওপির কোম্পানি কমান্ডার নায়েক রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

মামলায় গুলিতে নিহত মো. রুমান মিয়াসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্য দুই আসামি হলেন হালুয়াঘাটের সংগ্র গ্রামের আতিকুল ইসলাম (৪০) ও শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার পানিহাটা গ্রামের আবদুল্লাহ (৩৫)।

বিষয়টি নিশ্চিত করে হালুয়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জালাল উদ্দিন বলেন, বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে মামলাটি হয়েছে।

গতকাল সোমবার ভোরে হালুয়াঘাট উপজেলার জলজলিয়া এলাকায় বিজিবির চোরাচালানবিরোধী অভিযানের সময় টহল দলের ওপর হামলা হলে গুলিতে রুমান মিয়া নিহত হন। দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মর্গে রুমানের ময়নাতদন্ত হয়। পরে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করলে রাত ১০টার দিকে জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় রাতে মামলা করে বিজিবি।

মামলার সংক্ষিপ্ত এজাহারে উল্লেখ করা হয়, সোমবার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে হালুয়াঘাট সীমান্তে টহল দিচ্ছিল বিজিবি। এ সময় ১১১৯ নম্বর সীমান্ত পিলার থেকে বাংলাদেশের ভেতরে প্রায় এক হাজার গজ দূরে জলজলিয়া এলাকায় ভারত থেকে অবৈধ পথে চারটি গরু আনার খবর পান বিজিবি সদস্যরা। তাঁরা সেখানে গিয়ে চারটি গরু জব্দ করেন। ফেরার পথে জলজলিয়া এলাকায় বিজিবি সদস্যদের পথ আটকান চোরাকারবারিরা। তাঁরা দেশি অস্ত্র, ধারালো রামদা ও বাঁশের লাঠি নিয়ে বিজিবি সদস্যদের ওপর হামলা করেন। এ সময় দুটি গরু ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

এজাহারে আরও বলা হয়, হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কড়াইতলী বিওপির কোম্পানি কমান্ডার নায়েক রফিকুল ইসলাম সতর্কতামূলক চারটি ফাঁকা গুলি ছোড়েন। এরপরও চোরাকারবারিরা নিবৃত্ত না হয়ে বিজিবি সদস্যদের ওপর আবার আক্রমণ করেন। এ সময় রামদা দিয়ে রফিকুলের হাতের আঙুলে কোপ দেওয়া হয়। অন্য একজন রফিকুলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে ধস্তাধস্তিতে অস্ত্র থেকে গুলি বেরিয়ে যায় এবং মো. রুমান গুলিবিদ্ধ হন। একই সময় অন্য বিজিবি সদস্যদের মারধর করে জখম করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে বিজিবির গুলিতে যুবকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন স্বজনেরা। তাঁরা হালুয়াঘাট পুরাতন বাসস্ট্যান্ড থানা রোড এলাকায় গতকাল সোমবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ।

নিহত রুমানের ছোট ভাই আবু রায়হান বলেন, বিজিবি সদস্যরা রাতে এলাকায় গরু খুঁজছিলেন। ফোন পেয়ে তাঁর ভাই জলজলিয়া গ্রামে যান। ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে বিজিবি তাঁর বড় ভাইকে গুলি করে। তিনি দাবি করেন, তাঁর ভাই স্থানীয় বাজারের ইজারাদার ছিলেন। কোনো চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত নন। বাজার থেকে কেনা গরুর কাগজপত্র দেখাতে সেখানে গিয়েছিলেন।

রুমানের বিষয়ে স্থানীয় ভুবনকুড়া ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল জব্বার বলেন, ভারতীয় গরু বাজারে বিক্রি করতে আনলে রুমান কাগজপত্র করে দিতেন। তবে তিনি গরু চোরাচালানে জড়িত নন। তিনি অভিযোগ করেন, সীমান্ত দিয়ে নিয়মিত গরু আসে। এসব কারবার ঘিরে বিজিবির সঙ্গে সাপ্তাহিক অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা আছে; কিন্তু ব্যবসায়ীরা যে সপ্তাহে টাকা দেন না, তখন অভিযান চালানো হয়।

বিজিবির ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নুরুল আজিম বায়েজীদ প্রথম আলোকে বলেন, ওই দিন চোরাকারবারিরা অতিরিক্ত বেপরোয়া আচরণ করেন এবং ধারালো অস্ত্র ও লাঠি দিয়ে বিজিবির ওপর হামলা করেন। ফাঁকা গুলির পরও হামলাকারীরা থামেনি; বরং পেছন থেকে বিজিবির এক সদস্যের ওপর আক্রমণ করেন। তখন ধস্তাধস্তির মধ্যে গুলি বেরিয়ে যায় এবং একজনের গায়ে লাগে।

লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে বিজিবির অধিনায়ক বলেন, এ ধরনের অভিযোগ তাঁরা গুরুত্বের সঙ্গে নেন। কেউ প্রমাণসহ অভিযোগ দিলে সংশ্লিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কোনো চোরাকারবারিকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

ধস্তাধস্তির মধ্যে গুলি বেরিয়ে যায় বলছে বিজিবি, মামলায় নিহত যুবকও আসামি

আপডেট সময় : ০৬:৫৬:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) চোরাচালানবিরোধী অভিযানে হামলা ও গুলিতে এক যুবকের নিহত হওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে। গতকাল সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে বিজিবির ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের (৩৯ বিজিবি) কড়াইতলী বিওপির কোম্পানি কমান্ডার নায়েক রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

মামলায় গুলিতে নিহত মো. রুমান মিয়াসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্য দুই আসামি হলেন হালুয়াঘাটের সংগ্র গ্রামের আতিকুল ইসলাম (৪০) ও শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার পানিহাটা গ্রামের আবদুল্লাহ (৩৫)।

বিষয়টি নিশ্চিত করে হালুয়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জালাল উদ্দিন বলেন, বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে মামলাটি হয়েছে।

গতকাল সোমবার ভোরে হালুয়াঘাট উপজেলার জলজলিয়া এলাকায় বিজিবির চোরাচালানবিরোধী অভিযানের সময় টহল দলের ওপর হামলা হলে গুলিতে রুমান মিয়া নিহত হন। দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মর্গে রুমানের ময়নাতদন্ত হয়। পরে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করলে রাত ১০টার দিকে জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় রাতে মামলা করে বিজিবি।

মামলার সংক্ষিপ্ত এজাহারে উল্লেখ করা হয়, সোমবার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে হালুয়াঘাট সীমান্তে টহল দিচ্ছিল বিজিবি। এ সময় ১১১৯ নম্বর সীমান্ত পিলার থেকে বাংলাদেশের ভেতরে প্রায় এক হাজার গজ দূরে জলজলিয়া এলাকায় ভারত থেকে অবৈধ পথে চারটি গরু আনার খবর পান বিজিবি সদস্যরা। তাঁরা সেখানে গিয়ে চারটি গরু জব্দ করেন। ফেরার পথে জলজলিয়া এলাকায় বিজিবি সদস্যদের পথ আটকান চোরাকারবারিরা। তাঁরা দেশি অস্ত্র, ধারালো রামদা ও বাঁশের লাঠি নিয়ে বিজিবি সদস্যদের ওপর হামলা করেন। এ সময় দুটি গরু ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

এজাহারে আরও বলা হয়, হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কড়াইতলী বিওপির কোম্পানি কমান্ডার নায়েক রফিকুল ইসলাম সতর্কতামূলক চারটি ফাঁকা গুলি ছোড়েন। এরপরও চোরাকারবারিরা নিবৃত্ত না হয়ে বিজিবি সদস্যদের ওপর আবার আক্রমণ করেন। এ সময় রামদা দিয়ে রফিকুলের হাতের আঙুলে কোপ দেওয়া হয়। অন্য একজন রফিকুলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে ধস্তাধস্তিতে অস্ত্র থেকে গুলি বেরিয়ে যায় এবং মো. রুমান গুলিবিদ্ধ হন। একই সময় অন্য বিজিবি সদস্যদের মারধর করে জখম করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে বিজিবির গুলিতে যুবকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন স্বজনেরা। তাঁরা হালুয়াঘাট পুরাতন বাসস্ট্যান্ড থানা রোড এলাকায় গতকাল সোমবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ।

নিহত রুমানের ছোট ভাই আবু রায়হান বলেন, বিজিবি সদস্যরা রাতে এলাকায় গরু খুঁজছিলেন। ফোন পেয়ে তাঁর ভাই জলজলিয়া গ্রামে যান। ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে বিজিবি তাঁর বড় ভাইকে গুলি করে। তিনি দাবি করেন, তাঁর ভাই স্থানীয় বাজারের ইজারাদার ছিলেন। কোনো চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত নন। বাজার থেকে কেনা গরুর কাগজপত্র দেখাতে সেখানে গিয়েছিলেন।

রুমানের বিষয়ে স্থানীয় ভুবনকুড়া ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল জব্বার বলেন, ভারতীয় গরু বাজারে বিক্রি করতে আনলে রুমান কাগজপত্র করে দিতেন। তবে তিনি গরু চোরাচালানে জড়িত নন। তিনি অভিযোগ করেন, সীমান্ত দিয়ে নিয়মিত গরু আসে। এসব কারবার ঘিরে বিজিবির সঙ্গে সাপ্তাহিক অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা আছে; কিন্তু ব্যবসায়ীরা যে সপ্তাহে টাকা দেন না, তখন অভিযান চালানো হয়।

বিজিবির ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নুরুল আজিম বায়েজীদ প্রথম আলোকে বলেন, ওই দিন চোরাকারবারিরা অতিরিক্ত বেপরোয়া আচরণ করেন এবং ধারালো অস্ত্র ও লাঠি দিয়ে বিজিবির ওপর হামলা করেন। ফাঁকা গুলির পরও হামলাকারীরা থামেনি; বরং পেছন থেকে বিজিবির এক সদস্যের ওপর আক্রমণ করেন। তখন ধস্তাধস্তির মধ্যে গুলি বেরিয়ে যায় এবং একজনের গায়ে লাগে।

লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে বিজিবির অধিনায়ক বলেন, এ ধরনের অভিযোগ তাঁরা গুরুত্বের সঙ্গে নেন। কেউ প্রমাণসহ অভিযোগ দিলে সংশ্লিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কোনো চোরাকারবারিকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।