খোঁজ দ্য দরিদ্র
- আপডেট সময় : ০৭:৩৬:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে

মোবাইলে ইন্টারনেট থাকে, হাঁড়িতে ভাত থাকে না। দুটো সংযোগ একসঙ্গে চালু রাখার সামর্থ্য নেই।
.
দেশে দরিদ্র মানুষ আছে, এটা সবাই জানে। কিন্তু তাদের খুঁজে বের করতেও যে এত আয়োজন লাগে, তা কি তারা জানে? ‘দরিদ্র খুঁজতেই ২০১০ কোটি’—এমন শিরোনাম দেখে এক দরিদ্র মানুষ পকেট হাতড়ে বললেন, ‘পকেটে ১০ টাকা নেই, অথচ আমাকে খুঁজতেই এত টাকা! আমি কি দরিদ্র, নাকি হারিয়ে যাওয়া কোনো ভিআইপি?’
পাশের আরেকজন বললেন, ‘চুপ! জীবনে প্রথমবার তোর দাম উঠেছে। এত টাকা খরচ করে তোকে খোঁজা হচ্ছে!’
‘কত দাম?’
‘সেটা জানতে আবার জরিপ হবে।’
পরদিন লোকটির বাড়িতে হাজির জরিপকারী। হাতে ফরম, কাঁধে ব্যাগ, মুখে গুরুগম্ভীর ভাব। দেখে মনে হলো, দরিদ্র খুঁজতে নয়, আন্তর্জাতিক কোনো রহস্যের জট খুলতে এসেছেন।
—আপনার মাসিক আয় কত?
—কোন মাসের?
—মানে?
—কোনো মাসে কাজ পাই, কোনো মাসে পাই না। যে মাসে পাই, সে মাসেও পুরো টাকা পাই না। আপনি মাস ঠিক করুন, আমি আয় বলি।
জরিপকারী ফরমের দিকে তাকালেন। সেখানে আয়ের ঘর আছে, কিন্তু ‘আয় কখনো আসে, কখনো আসে না’—এমন জটিল পরিস্থিতির জন্য আলাদা ঘর নেই।
জরিপকারী ফরমে লিখলেন, ‘আয় অনিয়মিত।’
—মাসিক ব্যয়?
—আয়ের চেয়ে বেশি।
—সঞ্চয়?
—মাসের শেষে ধার।
জরিপকারী একটু থেমে লিখলেন, ‘দারিদ্র্যের বহুমাত্রিকতা।’
.
লোকটি বললেন, ‘দারিদ্র্য তো একটাই—পেটে ভাত নেই। এত মাত্রা যোগ করলে হাঁড়িতে ভাত বাড়বে?’
জরিপকারী উত্তর দিলেন না। প্রশ্নটি তাঁর ফরমে ছিল না।
—আপনার মোবাইল আছে?
—আছে।
—স্মার্টফোন?
—জি।
জরিপকারীর চোখ উজ্জ্বল। লোকটি প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত!
—ইন্টারনেট ব্যবহার করেন?
—করি, ফ্রি ওয়াই-ফাই পেলে।
—নিজে ডেটা কেনেন না?
—কিনি। তবে ডেটা কেনার পর বাজারে কী কিনব, সেটা নিয়ে একটু সমস্যা হয়।
—কী সমস্যা?
—মোবাইলে ইন্টারনেট থাকে, হাঁড়িতে ভাত থাকে না। দুটো সংযোগ একসঙ্গে চালু রাখার সামর্থ্য নেই।
জরিপকারী বুঝলেন, ডিজিটাল সংযোগ আর আর্থিক সচ্ছলতা এক জিনিস নয়।
—টেলিভিশন আছে?
—ছিল। নষ্ট হয়েছে।
—সারাননি কেন?
—সারালে খবর দেখতে পারব। কিন্তু খবর দেখে তো বাজারের বাকি শোধ হবে না।
.
‘ফ্রিজ?’
‘নেই।’
‘বাড়ি?’
‘ভাড়া।’
‘বাড়ির মালিক?’
‘বাড়িওয়ালা।’
সব তথ্য লিখে জরিপকারী জানালেন, এবার তথ্য যাচাই হবে।
লোকটি অবাক, ‘ঘরে চাল নেই, সেটা আবার যাচাই করবেন কীভাবে?’
‘প্রক্রিয়া আছে। আগে তথ্য সংগ্রহ, তারপর যাচাই, বিশ্লেষণ।’
‘চাল থাকলে ভাত হতো। এখন চাল নেই, তাই প্রক্রিয়া হজম করছি!’
লোকটি বললেন, ‘ভাই, আমার রান্নাঘরে এসে হাঁড়ির ঢাকনা খুললেই তো হবে। এত শ্রেণিবিন্যাস করলে আমার দারিদ্র্য কি পদোন্নতি পাবে?’
.
দরিদ্র মানুষকে সঠিকভাবে শনাক্ত করা জরুরি। না হলে সহায়তা ভুল মানুষের কাছে যেতে পারে। কিন্তু শনাক্ত হওয়ার পর তাঁর জীবনে কী বদল আসবে, সেটিও তো জরুরি।
.
জরিপকারী বোঝালেন, সবাইকে একইভাবে দরিদ্র বলা যায় না। কেউ দরিদ্র, কেউ অতিদরিদ্র, কেউ ঝুঁকিপূর্ণ, কেউ আবার দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে।
লোকটি জানতে চাইলেন, ‘আমি কোন শ্রেণিতে?’
‘তথ্য বিশ্লেষণের পর জানা যাবে।’
‘আমার ঘরে তিন দিন ধরে চাল নেই। এটা কোন শ্রেণি?’
‘সেটাও যাচাই করতে হবে।’
লোকটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, ‘আমার দারিদ্র্যের ধরন প্রতিদিন একই। শুধু বাজারের দর বদলায়!’
লোকটির মনে আশা জাগল। এত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, এত তথ্য দিয়েছেন—এবার নিশ্চয়ই কিছু একটা হবে।
—আমাকে খুঁজে পেলে কী হবে?
—আপনার তথ্যের ভিত্তিতে দারিদ্র্য বিমোচনের পরিকল্পনা করা হবে।
—কবে?
—তথ্য বিশ্লেষণের পর।
—তারপর?
—প্রতিবেদন তৈরি হবে, সুপারিশ করা হবে, বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
লোকটি মাথা চুলকে বললেন, ‘আপনাদের ধাপ এত বেশি যে আমার দারিদ্র্য এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে যেতে যেতেই অবসরে চলে যাবে!’
জরিপকারী বললেন, ‘আপনি বিষয়টিকে হাস্যরসের সঙ্গে নিচ্ছেন।’
‘না ভাই, পেটের সঙ্গে নিচ্ছি। পেটকে পরিকল্পনা খাওয়াতে পারি না, প্রতিবেদন খাওয়াতে পারি না। পেট শুধু ভাত চেনে।’
জরিপকারী কলম বন্ধ করলেন। এই উত্তরটি ফরমে লেখার জায়গা নেই।
.
দরিদ্র মানুষকে সঠিকভাবে শনাক্ত করা জরুরি। না হলে সহায়তা ভুল মানুষের কাছে যেতে পারে। কিন্তু শনাক্ত হওয়ার পর তাঁর জীবনে কী বদল আসবে, সেটিও তো জরুরি।
লোকটি জানতে চাইলেন, ‘তালিকায় নাম উঠলে দোকানদার কি বাকি দেবে?’
‘তা বলতে পারছি না।’
‘বাড়িওয়ালা ভাড়া মওকুফ করবেন?’
‘সেটা আমার দায়িত্ব নয়।’
‘অসুখ হলে চিকিৎসা মিলবে?’
‘এটা অন্য বিষয়।’
লোকটি মাথা নাড়লেন, ‘বুঝেছি। আপনাদের দায়িত্ব আমাকে খুঁজে বের করা, আর আমার দায়িত্ব দারিদ্র্য নিয়ে বেঁচে থাকা!’
জরিপকারী চলে যাওয়ার পর লোকটি দরজায় একটি কাগজ ঝুলিয়ে দিলেন। তাতে লেখা—
‘দরিদ্র মানুষ পাওয়া গেছে। এবার দারিদ্র্যটাকে খুঁজে বের করে বিদায় করুন।’
নিচে আরও লিখলেন—
‘আমাকে খুঁজতে ২০১০ কোটি টাকার কথা শুনেছি। এবার জানতে চাই, আমাকে পাওয়ার পর দারিদ্র্য দূর করতে কত লাগবে?
নিচে একটি নোট লিখলেন
আমাকে খুঁজে পেতে এত আয়োজন দেখে খুশি হয়েছি। তবে অনুরোধ, আমাকে পাওয়ার পর যেন আবার নতুন জরিপ শুরু না হয়—আমার দারিদ্র্য দূর করতে কত টাকা লাগবে, সেটা জানার জন্য!
.আরও যা যা ফাঁস হতে পারে.Breaking Good.আমি ভুল করিনি.চাঁদ দখল.বন্ধু ফার্মেসি.ডাব সমাচার.Lieসেন্স.অজুহাতের কামব্যাক.চাঁদা নিয়ে বিখ্যাত কবি–সাহিত্যিকেরা যা লিখতেন.এলাকার ট্যালেন্টেড বড় ভাই রবীন্দ্রনাথ.কোথায় কোথায় কালি মাখানো যায়?
























