পুঁটি মাছের গায়ে বর্ষাকালে লাল রং আসে কেন
- আপডেট সময় : ০৭:২০:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

বর্ষার শেষ। বিকেলের আলো পড়ে এসেছে। ধানখেতের ধারে ছোট একটা খাল, পানি প্রায় নড়ছে না। তুমি পাড়ে উবু হয়ে বসেছ। হঠাৎ পানির নিচে কী যেন ঝিলিক দিয়ে গেল। একটা না, অনেকগুলো। গায়ের রং রুপালি, তার ওপর হালকা লালচে ছোপ। কেউ যেন আঙুলে সিঁদুর নিয়ে ছুঁয়ে গেছে।
গ্রামের লোকে এদের বলে সিঁদুরপুঁটি
তবে এটা আলাদা কোনো মাছ নয়। আসলে এ হলো আমাদের চেনা জাত পুঁটি। বিজ্ঞানীরা একে বলেন Puntius sophore। সারা বছর এর গা থাকে রুপালি। বর্ষার সময় প্রজননের মৌসুমে গায়ে লাল দাগ ফোটে। তখনই মানুষ নাম দিয়ে ফেলে সিঁদুরপুঁটি। একই মাছ, শুধু সাজ বদলেছে। ছোটবেলায় গামছা দিয়ে খালে মাছ ধরেছ কখনো? তাহলে এই মাছ হয়তো তোমার হাতেও উঠেছে, নামটা শুধু জানা হয়নি।
মাছটা খুব ছোট। বড়জোর ৮-১০ সেন্টিমিটার লম্বা। শরীর একটু চ্যাপটা, আঁশে আলো পড়লে চকচক করে। পিঠের পাখনায় একটা কালচে ছোপ থাকে। অন্য ছোট মাছের সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে ওই ছোপটা খুঁজো।
মৌসুম বদলালে মাছের চেহারাও বদলায়। প্রজননের সময় গায়ে লালচে আভা ফোটে, ছেলে মাছের বেলায় সেটা বেশি চোখে পড়ে। বাকি সময় সে সাধারণ রুপালি পুঁটি। সঙ্গীর চোখে পড়তেই এই সাজ। পাখিদের মধ্যেও এমন দেখা যায়, ময়ূরের কথা ভাবলে বুঝতে পারবে।
.সাকার, পিরানহাসহ ৫ রাক্ষুসে মাছ কেন রাক্ষুসে.
এরা দক্ষিণ এশিয়ার মিঠা পানির মাছ। বাংলাদেশে নদী, খাল, বিল, পুকুর, এমনকি ধানখেতের নালাতেও এদের দেখা মেলে। স্রোত কম আর পানি পরিষ্কার হলে এরা সবচেয়ে খুশি। তবে বেশি বাছবিচার নেই। বদলে যাওয়া পরিবেশে মানিয়ে নিতে জানে।
একা থাকা এদের ধাতে নেই। ১০-২০টা মাছ একসঙ্গে ঘোরে, একসঙ্গে থামে, একসঙ্গে বাঁক নেয়। ওপর থেকে দেখলে পুরো দলটা ছোট্ট একখণ্ড মেঘের মতো লাগে। দলে থাকার সুবিধা আছে। শিকারি এসে পড়লে একটা মাছ টের পায়, আর বাকিরা সঙ্গে সঙ্গে সরে যায়। একজনের চোখে সবার প্রাণ বাঁচে।
.
খাবার নিয়ে এদের বায়নাক্কা নেই। পানিতে পড়া পোকা, মশার লার্ভা, শ্যাওলা, গাছের কুচি, সামনে যা পায় তা-ই খায়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে সর্বভুক। মশার লার্ভা খায় বলে মানুষেরও কিছুটা লাভ। যে ডোবায় এই মাছ থাকে, সেখানে মশা কম জন্মায়, এমনটাই ধারণা করা হয়।
ডিম পাড়ার সময় বর্ষাকাল। ডিম ছাড়ার পর এদের দায়িত্ব শেষ। মা-বাবা ডিমের যত্ন নেয় না। অনেক সময় নিজেরাই ডিম খেয়ে ফেলে। একসঙ্গে অনেক ডিম পাড়ে।
আমাদের দেশে ছোট মাছের কদর বহু দিনের। মাথা-কাঁটাসহ গোটা মাছ খাওয়া যায়, তাই ক্যালসিয়াম, আয়রন, জিংক আর ভিটামিন এ মেলে। পুষ্টিবিদেরা বলেন, বাড়ন্ত বয়সে ছোট মাছ দরকার। জাত পুঁটিও সেই দলের। রূপের কারণে কেউ কেউ একে অ্যাকুরিয়ামেও রাখে। কাচের বাক্সে দল বেঁধে ঘুরতে থাকলে চোখ সরানো মুশকিল।
.কোন মাছ ডাঙায় বেঁচে থাকে.
কিন্তু এত মানিয়ে নিতে পারা মাছও এখন বিপদে। জলাশয় কমছে। ডোবা ভরাট হচ্ছে, খাল শুকিয়ে যাচ্ছে, বিল দখল হয়ে যাচ্ছে। তার ওপর কীটনাশক। খেতে দেওয়া বিষ বৃষ্টিতে ধুয়ে খালে-বিলে গিয়ে জমে। অনেক চাষি হয়তো ভাবেনই না, তাঁর দেওয়া বিষ শেষে কোথায় যায়। ছোট মাছেরা সবার আগে ভোগে। শরীর এতটুকু, বিষ সইবে কী করে?
সারা দুনিয়ার হিসাবে এই মাছ এখনো ঝুঁকিতে নেই। কিন্তু কোনো এলাকার জলাশয় নষ্ট হয়ে গেলে সেখান থেকে মাছটা পুরো মুছে যেতে পারে। তখন সেই এলাকার প্রকৃতিও একটু দরিদ্র হয়ে যায়।
এখানেই আসে খাদ্যশৃঙ্খলের কথা। পুঁটি মশার লার্ভা খায়। আবার তাকে খায় বড় মাছ, বক, মাছরাঙা। ছোট মাছ হারালে শিকলের একটা কড়া খুলে যায়। বইয়ে নিশ্চয়ই পড়েছ। খালের পাড়ে বসলে এটা নিজের চোখেই দেখা যায়।
তুমি কী করতে পারো? বড় কিছু না। পথে ডোবা বা পুকুর পড়লে সেখানে ময়লা ফেলো না। পাশের খাল ভরাট হতে দেখলে বড়দের জিজ্ঞাসা করো, কেন হচ্ছে। স্কুলের বিজ্ঞান ক্লাবে এলাকার মাছের একটা তালিকা বানাতে পারো। বর্ষার পর একদিন খালের পাড়ে গিয়ে বসো। ফোনে ছবি তোলো। কোন মাছ, কোথায়, কোন মাসে দেখলে, খাতায় লিখে রাখো। চিনতে না পারলে শিক্ষককে দেখাও।
তারপর একদিন পানির নিচে ঝিলিক দেখলে আর ভাবতে হবে না, ওটা কী। তুমি নিজেই বলে উঠবে, ওই তো, সিঁদুরপুঁটি।
তথ্যসূত্র: ফিশ বেজ
.চিংড়ি মাছ, কাঁকড়া নয় কেন


























