ঢাকা ০১:৫৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সম্প্রীতির এই ধারাবাহিকতা অটুট থাকুক

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৪০:০৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশে উদ্‌যাপিত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা অপ্রীতিকর ঘটনার কারণে দুর্গাপূজার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে যে নিরাপত্তাহীনতা ও শঙ্কার পরিবেশ তৈরি হতে আমরা দেখেছি, সেই বিবেচনায় এ বছরকে ব্যতিক্রম বলতেই হবে। এর মধ্য দিয়ে এটাই প্রমাণিত হলো যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং সরকার ও প্রশাসন আন্তরিক হলে সব ধর্মের মানুষ নির্বিঘ্নে ও উৎসবমুখর পরিবেশে নিজেদের উৎসব উদ্‌যাপন করতে পারেন।

ঢাকাসহ দেশের সব জায়গায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে গত বুধবার শেষ হয় ছয় দিনের শারদীয় দুর্গাপূজা। প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, পূজা-অর্চনা, শঙ্খধ্বনি, ঢাকের বাদ্য আর ভক্তদের সমাগমে মুখর ছিল পূজামণ্ডপগুলো। বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় দেড় হাজার বেশি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

.

এবার দুর্গাপূজার আগে গাইবান্ধা, নেত্রকোনা, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরাসহ আরও কিছু এলাকায় প্রতিমা ভাঙচুরের খবর পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। তবে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় দুই লাখের বেশি আনসার সদস্যের নিয়োগ, তিন ধাপের পুলিশি নিরাপত্তা, সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি এবং সীমান্ত এলাকার মণ্ডপে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপতথ্য ঠেকাতে সাইবার নজরদারি বাড়ানো হয়।

আমরা মনে করি, সরকারের উদ্যোগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এসব উদ্যোগ দুর্গাপূজায় নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে সরকারপ্রধান, সরকারি দল ও বিরোধী দলের ভূমিকা ও অবস্থান শঙ্কামুক্ত পরিবেশে উৎসব উদ্‌যাপনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিগত সময়ে সরকারপ্রধানদের মূলত ঢাকার পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে আমরা দেখেছি। এ বছর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার সঙ্গে রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি পূজারিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করেন। বিএনপির মন্ত্রী ও এমপিরাও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তাঁদের সংসদীয় এলাকার পূজামণ্ডপগুলোতে গেছেন এবং খোঁজখবর রেখেছেন।

.

সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে দুর্গাপূজা উপলক্ষে মতবিনিময় করেন। এনসিপির নেতারা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

সরকার, রাজনৈতিক দল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ও উদ্যোগের কারণে যে শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হলো, এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখাটা জরুরি। শুধু হিন্দু সম্প্রদায় নয়; খ্রিষ্টান, বৌদ্ধসহ যেকোনো ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘুরা যাতে ভয় ও শঙ্কাহীন পরিবেশে তাঁদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন ও উদ্‌যাপন করতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

.

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে বাউল, মাজারপন্থীসহ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হয়েছেন, নারীর পরিসর সংকুচিত হয়েছে। মব–সহিংসতার একের পর এক ঘটনা ঘটলেও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় সক্রিয় ও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। অথচ একটি গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণের প্রধান শর্তই হলো জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গনির্বিশেষে সব নাগরিকের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সুরক্ষা। এই দায়িত্ব যেমন সরকার ও প্রশাসনের, একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর।

বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে বহুজাতি ও ধর্মের দেশ। গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও অর্থনীতিকে সুষ্ঠুধারায় এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থে যেকোনো মূল্যে সামাজিক সম্প্রীতি ও সংহতি বজায় রাখতে হবে। আমরা আশা করব উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণভাবে এবারের দুর্গাপূজা অনুষ্ঠানে যে আশাবাদ ও স্বস্তি তৈরি হয়েছে, শান্তি ও সম্প্রীতির সেই ধারাবাহিকতা সামনের দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

সম্প্রীতির এই ধারাবাহিকতা অটুট থাকুক

আপডেট সময় : ০৯:৪০:০৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশে উদ্‌যাপিত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা অপ্রীতিকর ঘটনার কারণে দুর্গাপূজার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে যে নিরাপত্তাহীনতা ও শঙ্কার পরিবেশ তৈরি হতে আমরা দেখেছি, সেই বিবেচনায় এ বছরকে ব্যতিক্রম বলতেই হবে। এর মধ্য দিয়ে এটাই প্রমাণিত হলো যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং সরকার ও প্রশাসন আন্তরিক হলে সব ধর্মের মানুষ নির্বিঘ্নে ও উৎসবমুখর পরিবেশে নিজেদের উৎসব উদ্‌যাপন করতে পারেন।

ঢাকাসহ দেশের সব জায়গায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে গত বুধবার শেষ হয় ছয় দিনের শারদীয় দুর্গাপূজা। প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, পূজা-অর্চনা, শঙ্খধ্বনি, ঢাকের বাদ্য আর ভক্তদের সমাগমে মুখর ছিল পূজামণ্ডপগুলো। বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় দেড় হাজার বেশি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

.

এবার দুর্গাপূজার আগে গাইবান্ধা, নেত্রকোনা, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরাসহ আরও কিছু এলাকায় প্রতিমা ভাঙচুরের খবর পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। তবে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় দুই লাখের বেশি আনসার সদস্যের নিয়োগ, তিন ধাপের পুলিশি নিরাপত্তা, সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি এবং সীমান্ত এলাকার মণ্ডপে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপতথ্য ঠেকাতে সাইবার নজরদারি বাড়ানো হয়।

আমরা মনে করি, সরকারের উদ্যোগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এসব উদ্যোগ দুর্গাপূজায় নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে সরকারপ্রধান, সরকারি দল ও বিরোধী দলের ভূমিকা ও অবস্থান শঙ্কামুক্ত পরিবেশে উৎসব উদ্‌যাপনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিগত সময়ে সরকারপ্রধানদের মূলত ঢাকার পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে আমরা দেখেছি। এ বছর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার সঙ্গে রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি পূজারিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করেন। বিএনপির মন্ত্রী ও এমপিরাও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তাঁদের সংসদীয় এলাকার পূজামণ্ডপগুলোতে গেছেন এবং খোঁজখবর রেখেছেন।

.

সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে দুর্গাপূজা উপলক্ষে মতবিনিময় করেন। এনসিপির নেতারা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

সরকার, রাজনৈতিক দল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ও উদ্যোগের কারণে যে শান্তি ও সম্প্রীতির পরিবেশে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হলো, এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখাটা জরুরি। শুধু হিন্দু সম্প্রদায় নয়; খ্রিষ্টান, বৌদ্ধসহ যেকোনো ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘুরা যাতে ভয় ও শঙ্কাহীন পরিবেশে তাঁদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন ও উদ্‌যাপন করতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

.

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে বাউল, মাজারপন্থীসহ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হয়েছেন, নারীর পরিসর সংকুচিত হয়েছে। মব–সহিংসতার একের পর এক ঘটনা ঘটলেও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় সক্রিয় ও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। অথচ একটি গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণের প্রধান শর্তই হলো জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গনির্বিশেষে সব নাগরিকের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সুরক্ষা। এই দায়িত্ব যেমন সরকার ও প্রশাসনের, একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর।

বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে বহুজাতি ও ধর্মের দেশ। গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও অর্থনীতিকে সুষ্ঠুধারায় এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থে যেকোনো মূল্যে সামাজিক সম্প্রীতি ও সংহতি বজায় রাখতে হবে। আমরা আশা করব উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণভাবে এবারের দুর্গাপূজা অনুষ্ঠানে যে আশাবাদ ও স্বস্তি তৈরি হয়েছে, শান্তি ও সম্প্রীতির সেই ধারাবাহিকতা সামনের দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।