ঢাকা ০৯:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

বাংলাদেশে ভাইরাল ভিডিও নিয়ে কী বললেন নেহা বোরা

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৪৪:০৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

কিছুদিন আগে ভারতের বামপন্থী ছাত্রনেত্রী নেহা বোরার একটি ভিডিও বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেখানে তিনি চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের তরুণদের সংগ্রাম থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার কথা বলেছিলেন। ভারতের চলমান আন্দোলনের পরিচিত এই তরুণ মুখের বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের অনেকের মনোযোগ আকর্ষণ করে।

কিন্তু ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর বক্তব্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে দুই দেশে দুই ধরনের প্রচার শুরু হয়।

বাংলাদেশের ‘ডানপন্থী’ সংবাদমাধ্যমগুলো নেহার বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ সামনে আনে। অন্যদিকে ভারতের ‘গোদি মিডিয়া’ হিসেবে পরিচিত সরকারঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমগুলো বোঝানোর চেষ্টা করে, নেহা ‘উগ্রপন্থীদের’ আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন এবং বাংলাদেশের মতো ভারতেও একইভাবে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তন করতে চান। দুই পক্ষের প্রচারের ধরন আলাদা হলেও ফল এক: নেহা কাদের সংগ্রামের প্রতি এবং কোন দাবিতে সংহতি জানিয়েছিলেন, সেই প্রেক্ষাপট আড়াল হয়ে যায়।

এবার আরেকটি ভিডিও বার্তায় এসব প্রচারের জবাব দিয়েছেন নেহা। তাঁর এই জবাব শুধু নিজের বক্তব্য পরিষ্কার করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; এর মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারা, সীমান্তের দুই পাশের তরুণদের সংহতি এবং দুই দেশের ধর্মীয় বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতি নিয়েও ভাবনার বিষয় রয়েছে।

.নেহা বোরা যেভাবে ভারতে গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের তরুণ মুখ.

নেহা বলেছেন, গত কয়েক দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ভিডিও এবং সেটির ‘১০ হাজারটি সংস্করণ’ ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। কিন্তু ভিডিওটি কী, কাদের সঙ্গে তিনি কথা বলছিলেন এবং কিসের প্রতি সংহতি জানাচ্ছিলেন—সেই তথ্য বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভিডিওর ওপরের কোণে থাকা প্রতীকটি কেটে ফেলা হয়েছে। অথচ সেটিই প্রমাণ করে, ভিডিওটি বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের জাতীয় সম্মেলনে সংগঠনটির কর্মীদের প্রতি সংহতি জানানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

নেহা বলেছেন, গণতন্ত্র, শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য সংগঠনটির সংগ্রাম থেকে তাঁরা ভারতে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করেন—এ কথাই তিনি স্পষ্ট করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সংগঠনের প্রতীক, নিচে থাকা তাঁর নাম এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের পরিচয় কেটে বাদ দিয়ে ভিডিওটিকে অপপ্রচারের অংশ হিসেবে চালানো হচ্ছে।

বাংলাদেশের ‘জেন–জি’ আন্দোলনের বিভিন্ন ধারা নিয়েও নেহা নিজের মূল্যায়ন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আন্দোলনে একদিকে ধর্মীয় মৌলবাদী ও রক্ষণশীল শক্তি ছিল, অন্যদিকে প্রগতিশীল শক্তিও ছিল। প্রগতিশীল শক্তি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের জন্য, শিক্ষার্থীদের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে এবং সংখ্যালঘু হিন্দু ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য লড়ছিল। তিনি বলেছেন, তাঁদের অনুপ্রেরণার উৎস এই প্রগতিশীল সংগ্রাম।

.

বাংলাদেশের এবং পরে ভারতের ডানপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো নেহার বক্তব্য লুফে নেয়। এ নিয়ে তাঁর মন্তব্য, সামনাসামনি তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে যতই লড়াই করুক, নিজেদের মধ্যে তাদের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।

নেহার এই মন্তব্যের বিশেষ তাৎপর্য আছে। দুই দেশের ডানপন্থীরা পরস্পরের বিরোধিতা করলেও একটি জায়গায় তাদের স্বার্থ মিলে যায়: রাজনীতির প্রগতিশীল ধারাটিকে আড়াল করা। এক পক্ষ বাংলাদেশের অভ্যুত্থানকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে চায়, যেন সেখানে বামপন্থী ও প্রগতিশীল শক্তির কোনো ভূমিকা ছিল না। অন্য পক্ষ আবার সেটিকে কেবল ইসলামপন্থীদের আন্দোলন হিসেবে দেখাতে আগ্রহী। কারণ, সেই বয়ান ব্যবহার করে ভারতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকারীদেরও সন্দেহের মুখে ফেলা সহজ হয়।

বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানানোর প্রশ্নে নেহা বলেছেন, ভারতের বর্তমান সরকার এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যাতে ‘বাংলাদেশ’ নাম শুনলেই ভারতীয়দের একাংশ বিচলিত বা বিদ্বেষপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানানো মানে তাদের প্রগতিশীল সংগ্রামগুলোর প্রতি সমর্থন জানানো।

.

বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। কিন্তু দুই দেশেই ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক বিভাজনের অস্ত্র বানানোর প্রবণতা রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগ ব্যবহার করে সংখ্যালঘুকে সন্দেহের মধ্যে রাখা, ভিন্নমতকে দেশের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা এবং প্রতিবেশী দেশের ঘটনা দিয়ে নিজের দেশের বিদ্বেষকে উসকে দেওয়া—এই কৌশলগুলোর মধ্যে মিল স্পষ্ট।

.

একইভাবে তিনি বলেছেন, ভারতে ‘জেন–জি’ আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি বলতে যন্তর মন্তরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে হওয়া আন্দোলনকে সমর্থন করা বোঝায়। কয়েক সপ্তাহ পর একই স্থানে তৈরি হওয়া যে ‘সংরক্ষণ তোলো’ আন্দোলনকে তিনি সাজানো বলে অভিহিত করেছেন, সেটিকে সমর্থন করা বোঝায় না। তাঁর কথায়, যেকোনো আন্দোলনের প্রতি তাঁদের সংহতির ভিত্তি হলো প্রগতিশীল চিন্তা, গণতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি।

এই ব্যাখ্যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জরুরি। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে সমর্থন করা মানে এতে অংশ নেওয়া সব রাজনৈতিক শক্তিকে সমর্থন করা নয়। একইভাবে অভ্যুত্থানকে সমর্থন করার অর্থ তার পরে সংঘটিত সংখ্যালঘু নির্যাতন, মব সহিংসতা, সাংস্কৃতিক আক্রমণ কিংবা মতপ্রকাশে বাধার প্রতি সমর্থন নয়। বরং যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা মানুষকে রাজপথে এনেছিল, এসবের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সেই আকাঙ্ক্ষারই ধারাবাহিকতা।

.ধ্রুব রাঠির ‘নমস্কার দোস্ত!’ মোদির জন্য কতটা চিন্তার?.

নেহা তাঁর বিরুদ্ধে নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগেরও জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি সর্বজনীন ভোটাধিকার। এসআইআর বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ; তাঁর লড়াই সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। যাঁদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে গণতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে রাখা হচ্ছে, তাঁদের কাছে গণতন্ত্র পৌঁছে দেওয়াই তাঁর উদ্দেশ্য।

নেহার বক্তব্য, গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখা ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনতে চান আন্দোলনকারীরা। অর্থাৎ সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করলেই সেটি নৈরাজ্যের আহ্বান হয়ে যায় না। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়ে নাগরিকের প্রশ্ন তোলার অধিকারও গণতন্ত্রের অংশ।

সহিংসতা ছড়ানোর অভিযোগের জবাবে নেহা বলেছেন, তাঁরা যন্তর মন্তরে ২৩ দিন অনশন করেছেন। তাঁর অভিযোগ, রাষ্ট্র, বিজেপি সরকার ও পুলিশ তাঁদের ‘ভাইরাস’, ‘আরশোলা’ ও ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলেছে; পেলেটগান ও লাঠিপেটার মুখোমুখি করেছে। কিন্তু তাঁরা পাল্টা হাত তোলেননি।

সবশেষে নেহা তাঁর দেশের চিন্তাশীল ও পড়াশোনা করা তরুণদেরই বিবেচনা করতে বলেছেন, গণতন্ত্রের জন্য রাজপথে লড়াই করা মানুষদের বিরুদ্ধে এই অপপ্রচারের ভিত্তি আছে কি না। তাঁর বক্তব্য, রাজপথের লড়াই মোকাবিলা করতে না পেরে তাঁদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো হচ্ছে। তবে তাঁরা এমন এক প্রজন্ম, যাঁরা ‘গোদি মিডিয়া’ দেখে বড় হননি; প্রতিটি বিষয় ভেবে, বুঝে ও বিচার–বিশ্লেষণ করতে শিখেছেন।

.

নেহার এই বক্তব্য বাংলাদেশের তরুণদেরও ভাবনার বিষয়। কোনো ভিডিওর কোনো অংশ নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে গেলেই সেটা প্রচার করা এবং বিপক্ষে গেলে সেটিকে বিকৃতভাবে তুলে ধরা—দুটি একই রকম অসততা। নেহার বাংলাদেশের আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার কথা প্রচার করব, কিন্তু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সংখ্যালঘুর অধিকারের কথা বাদ দেব—এটি তাঁর বক্তব্যকে সম্মান করা নয়; নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করা।

বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। কিন্তু দুই দেশেই ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক বিভাজনের অস্ত্র বানানোর প্রবণতা রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগ ব্যবহার করে সংখ্যালঘুকে সন্দেহের মধ্যে রাখা, ভিন্নমতকে দেশের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা এবং প্রতিবেশী দেশের ঘটনা দিয়ে নিজের দেশের বিদ্বেষকে উসকে দেওয়া—এই কৌশলগুলোর মধ্যে মিল স্পষ্ট।

ভারতে মুসলমানের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হব, কিন্তু বাংলাদেশে হিন্দু বা অন্য সংখ্যালঘুর নিরাপত্তার প্রশ্নে চুপ থাকব—এটা একটি স্ববিরোধী অবস্থান। একইভাবে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিয়ে উদ্বেগ দেখিয়ে ভারতে মুসলমানের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোও কোনো মানবিক অবস্থান নয়। দুই ক্ষেত্রেই মানুষের অধিকারকে রাজনৈতিক সুবিধার উপকরণ বানানো হয়।

.ককরোচরা মোদির ‘তিলে তিলে’ গড়া ভাবমূর্তি চুরমার করে দিয়েছে.

নেহার বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংহতির এই নীতিগত ভিত্তি। দেশের পরিচয় দেখে সবকিছুকে সমর্থন বা প্রত্যাখ্যান করার বদলে দেখতে হবে, কোন সংগ্রাম মানুষের সমান অধিকার, স্বাধীনতা ও মর্যাদার পক্ষে। বাংলাদেশের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক তরুণদের সঙ্গে ভারতের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক তরুণদের সংহতির জায়গা এখানেই।

এই সংহতি গড়ে তুলতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহনশীলতাকে রাজনৈতিক চর্চার অংশ করতে হবে। ভিন্ন ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা, ভিন্নমতের মানুষের কথা বলার অধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের শান্তিপূর্ণ তৎপরতার সুযোগ—সবই এর অন্তর্ভুক্ত। ধর্মীয় বিদ্বেষ ও বিভাজনের বিরুদ্ধে দুই দেশের লড়াই অনেকখানি একই জায়গায় এসে মেলে। সেই লড়াইয়ে সীমান্তের দুই পাশের মানুষ পরস্পরের কাছ থেকে সাহস ও অনুপ্রেরণা নিতেই পারেন।

  • মনজুরুল ইসলাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

*মতামত লেখকের নিজস্ব

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

বাংলাদেশে ভাইরাল ভিডিও নিয়ে কী বললেন নেহা বোরা

আপডেট সময় : ০৮:৪৪:০৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

কিছুদিন আগে ভারতের বামপন্থী ছাত্রনেত্রী নেহা বোরার একটি ভিডিও বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেখানে তিনি চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের তরুণদের সংগ্রাম থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার কথা বলেছিলেন। ভারতের চলমান আন্দোলনের পরিচিত এই তরুণ মুখের বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের অনেকের মনোযোগ আকর্ষণ করে।

কিন্তু ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর বক্তব্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে দুই দেশে দুই ধরনের প্রচার শুরু হয়।

বাংলাদেশের ‘ডানপন্থী’ সংবাদমাধ্যমগুলো নেহার বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ সামনে আনে। অন্যদিকে ভারতের ‘গোদি মিডিয়া’ হিসেবে পরিচিত সরকারঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমগুলো বোঝানোর চেষ্টা করে, নেহা ‘উগ্রপন্থীদের’ আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন এবং বাংলাদেশের মতো ভারতেও একইভাবে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তন করতে চান। দুই পক্ষের প্রচারের ধরন আলাদা হলেও ফল এক: নেহা কাদের সংগ্রামের প্রতি এবং কোন দাবিতে সংহতি জানিয়েছিলেন, সেই প্রেক্ষাপট আড়াল হয়ে যায়।

এবার আরেকটি ভিডিও বার্তায় এসব প্রচারের জবাব দিয়েছেন নেহা। তাঁর এই জবাব শুধু নিজের বক্তব্য পরিষ্কার করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; এর মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারা, সীমান্তের দুই পাশের তরুণদের সংহতি এবং দুই দেশের ধর্মীয় বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতি নিয়েও ভাবনার বিষয় রয়েছে।

.নেহা বোরা যেভাবে ভারতে গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের তরুণ মুখ.

নেহা বলেছেন, গত কয়েক দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ভিডিও এবং সেটির ‘১০ হাজারটি সংস্করণ’ ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। কিন্তু ভিডিওটি কী, কাদের সঙ্গে তিনি কথা বলছিলেন এবং কিসের প্রতি সংহতি জানাচ্ছিলেন—সেই তথ্য বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভিডিওর ওপরের কোণে থাকা প্রতীকটি কেটে ফেলা হয়েছে। অথচ সেটিই প্রমাণ করে, ভিডিওটি বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের জাতীয় সম্মেলনে সংগঠনটির কর্মীদের প্রতি সংহতি জানানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

নেহা বলেছেন, গণতন্ত্র, শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য সংগঠনটির সংগ্রাম থেকে তাঁরা ভারতে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করেন—এ কথাই তিনি স্পষ্ট করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সংগঠনের প্রতীক, নিচে থাকা তাঁর নাম এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের পরিচয় কেটে বাদ দিয়ে ভিডিওটিকে অপপ্রচারের অংশ হিসেবে চালানো হচ্ছে।

বাংলাদেশের ‘জেন–জি’ আন্দোলনের বিভিন্ন ধারা নিয়েও নেহা নিজের মূল্যায়ন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আন্দোলনে একদিকে ধর্মীয় মৌলবাদী ও রক্ষণশীল শক্তি ছিল, অন্যদিকে প্রগতিশীল শক্তিও ছিল। প্রগতিশীল শক্তি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের জন্য, শিক্ষার্থীদের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে এবং সংখ্যালঘু হিন্দু ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য লড়ছিল। তিনি বলেছেন, তাঁদের অনুপ্রেরণার উৎস এই প্রগতিশীল সংগ্রাম।

.

বাংলাদেশের এবং পরে ভারতের ডানপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো নেহার বক্তব্য লুফে নেয়। এ নিয়ে তাঁর মন্তব্য, সামনাসামনি তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে যতই লড়াই করুক, নিজেদের মধ্যে তাদের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।

নেহার এই মন্তব্যের বিশেষ তাৎপর্য আছে। দুই দেশের ডানপন্থীরা পরস্পরের বিরোধিতা করলেও একটি জায়গায় তাদের স্বার্থ মিলে যায়: রাজনীতির প্রগতিশীল ধারাটিকে আড়াল করা। এক পক্ষ বাংলাদেশের অভ্যুত্থানকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে চায়, যেন সেখানে বামপন্থী ও প্রগতিশীল শক্তির কোনো ভূমিকা ছিল না। অন্য পক্ষ আবার সেটিকে কেবল ইসলামপন্থীদের আন্দোলন হিসেবে দেখাতে আগ্রহী। কারণ, সেই বয়ান ব্যবহার করে ভারতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকারীদেরও সন্দেহের মুখে ফেলা সহজ হয়।

বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানানোর প্রশ্নে নেহা বলেছেন, ভারতের বর্তমান সরকার এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যাতে ‘বাংলাদেশ’ নাম শুনলেই ভারতীয়দের একাংশ বিচলিত বা বিদ্বেষপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানানো মানে তাদের প্রগতিশীল সংগ্রামগুলোর প্রতি সমর্থন জানানো।

.

বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। কিন্তু দুই দেশেই ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক বিভাজনের অস্ত্র বানানোর প্রবণতা রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগ ব্যবহার করে সংখ্যালঘুকে সন্দেহের মধ্যে রাখা, ভিন্নমতকে দেশের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা এবং প্রতিবেশী দেশের ঘটনা দিয়ে নিজের দেশের বিদ্বেষকে উসকে দেওয়া—এই কৌশলগুলোর মধ্যে মিল স্পষ্ট।

.

একইভাবে তিনি বলেছেন, ভারতে ‘জেন–জি’ আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি বলতে যন্তর মন্তরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে হওয়া আন্দোলনকে সমর্থন করা বোঝায়। কয়েক সপ্তাহ পর একই স্থানে তৈরি হওয়া যে ‘সংরক্ষণ তোলো’ আন্দোলনকে তিনি সাজানো বলে অভিহিত করেছেন, সেটিকে সমর্থন করা বোঝায় না। তাঁর কথায়, যেকোনো আন্দোলনের প্রতি তাঁদের সংহতির ভিত্তি হলো প্রগতিশীল চিন্তা, গণতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি।

এই ব্যাখ্যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জরুরি। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে সমর্থন করা মানে এতে অংশ নেওয়া সব রাজনৈতিক শক্তিকে সমর্থন করা নয়। একইভাবে অভ্যুত্থানকে সমর্থন করার অর্থ তার পরে সংঘটিত সংখ্যালঘু নির্যাতন, মব সহিংসতা, সাংস্কৃতিক আক্রমণ কিংবা মতপ্রকাশে বাধার প্রতি সমর্থন নয়। বরং যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা মানুষকে রাজপথে এনেছিল, এসবের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সেই আকাঙ্ক্ষারই ধারাবাহিকতা।

.ধ্রুব রাঠির ‘নমস্কার দোস্ত!’ মোদির জন্য কতটা চিন্তার?.

নেহা তাঁর বিরুদ্ধে নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগেরও জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি সর্বজনীন ভোটাধিকার। এসআইআর বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ; তাঁর লড়াই সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। যাঁদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে গণতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে রাখা হচ্ছে, তাঁদের কাছে গণতন্ত্র পৌঁছে দেওয়াই তাঁর উদ্দেশ্য।

নেহার বক্তব্য, গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখা ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনতে চান আন্দোলনকারীরা। অর্থাৎ সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করলেই সেটি নৈরাজ্যের আহ্বান হয়ে যায় না। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়ে নাগরিকের প্রশ্ন তোলার অধিকারও গণতন্ত্রের অংশ।

সহিংসতা ছড়ানোর অভিযোগের জবাবে নেহা বলেছেন, তাঁরা যন্তর মন্তরে ২৩ দিন অনশন করেছেন। তাঁর অভিযোগ, রাষ্ট্র, বিজেপি সরকার ও পুলিশ তাঁদের ‘ভাইরাস’, ‘আরশোলা’ ও ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলেছে; পেলেটগান ও লাঠিপেটার মুখোমুখি করেছে। কিন্তু তাঁরা পাল্টা হাত তোলেননি।

সবশেষে নেহা তাঁর দেশের চিন্তাশীল ও পড়াশোনা করা তরুণদেরই বিবেচনা করতে বলেছেন, গণতন্ত্রের জন্য রাজপথে লড়াই করা মানুষদের বিরুদ্ধে এই অপপ্রচারের ভিত্তি আছে কি না। তাঁর বক্তব্য, রাজপথের লড়াই মোকাবিলা করতে না পেরে তাঁদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো হচ্ছে। তবে তাঁরা এমন এক প্রজন্ম, যাঁরা ‘গোদি মিডিয়া’ দেখে বড় হননি; প্রতিটি বিষয় ভেবে, বুঝে ও বিচার–বিশ্লেষণ করতে শিখেছেন।

.

নেহার এই বক্তব্য বাংলাদেশের তরুণদেরও ভাবনার বিষয়। কোনো ভিডিওর কোনো অংশ নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে গেলেই সেটা প্রচার করা এবং বিপক্ষে গেলে সেটিকে বিকৃতভাবে তুলে ধরা—দুটি একই রকম অসততা। নেহার বাংলাদেশের আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার কথা প্রচার করব, কিন্তু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সংখ্যালঘুর অধিকারের কথা বাদ দেব—এটি তাঁর বক্তব্যকে সম্মান করা নয়; নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করা।

বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। কিন্তু দুই দেশেই ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক বিভাজনের অস্ত্র বানানোর প্রবণতা রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগ ব্যবহার করে সংখ্যালঘুকে সন্দেহের মধ্যে রাখা, ভিন্নমতকে দেশের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা এবং প্রতিবেশী দেশের ঘটনা দিয়ে নিজের দেশের বিদ্বেষকে উসকে দেওয়া—এই কৌশলগুলোর মধ্যে মিল স্পষ্ট।

ভারতে মুসলমানের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হব, কিন্তু বাংলাদেশে হিন্দু বা অন্য সংখ্যালঘুর নিরাপত্তার প্রশ্নে চুপ থাকব—এটা একটি স্ববিরোধী অবস্থান। একইভাবে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিয়ে উদ্বেগ দেখিয়ে ভারতে মুসলমানের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোও কোনো মানবিক অবস্থান নয়। দুই ক্ষেত্রেই মানুষের অধিকারকে রাজনৈতিক সুবিধার উপকরণ বানানো হয়।

.ককরোচরা মোদির ‘তিলে তিলে’ গড়া ভাবমূর্তি চুরমার করে দিয়েছে.

নেহার বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংহতির এই নীতিগত ভিত্তি। দেশের পরিচয় দেখে সবকিছুকে সমর্থন বা প্রত্যাখ্যান করার বদলে দেখতে হবে, কোন সংগ্রাম মানুষের সমান অধিকার, স্বাধীনতা ও মর্যাদার পক্ষে। বাংলাদেশের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক তরুণদের সঙ্গে ভারতের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক তরুণদের সংহতির জায়গা এখানেই।

এই সংহতি গড়ে তুলতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহনশীলতাকে রাজনৈতিক চর্চার অংশ করতে হবে। ভিন্ন ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা, ভিন্নমতের মানুষের কথা বলার অধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের শান্তিপূর্ণ তৎপরতার সুযোগ—সবই এর অন্তর্ভুক্ত। ধর্মীয় বিদ্বেষ ও বিভাজনের বিরুদ্ধে দুই দেশের লড়াই অনেকখানি একই জায়গায় এসে মেলে। সেই লড়াইয়ে সীমান্তের দুই পাশের মানুষ পরস্পরের কাছ থেকে সাহস ও অনুপ্রেরণা নিতেই পারেন।

  • মনজুরুল ইসলাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

*মতামত লেখকের নিজস্ব