সন্তানকে কঠিন কাজের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পাঠাচ্ছেন চীনা অভিভাবকেরা, কেন
- আপডেট সময় : ০৭:১২:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

হাজার হাজার ইউয়ান খরচ করে চীনের অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানদের দিয়ে কঠিন সব কাজ করাচ্ছেন। ইট বহন করা, খেতে কাজ করা কিংবা গোয়ালঘর পরিষ্কার করা। তবে মনোবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছেন, সন্তানদের ওপর এমন অতিরিক্ত চাপ দিলে সুবিধার চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি।
.
‘আমাকে দিয়ে এসব কাজ করানোর জন্যই কি বিমানের টিকিটের টাকা খরচ করেছেন?’ ক্যামেরার সামনে কান্না করে কথাটি বলছিল এক কিশোর। তবে কান্না করলেও সে কাজ থামায়নি। সাংহাই থেকে পাহাড়ি এলাকায় আসা ওই কিশোর কান্না করতে করতে কাঠ কাটা, ইট বহন করা আর খেত পরিষ্কারের কাজ করে যাচ্ছিল।
সম্প্রতি চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অনেক ভিডিও দেখা যাচ্ছে। সেখানে দেখা যায়, শিশুরা খামারে কঠিন সব কাজ করছে। কান্না করতে করতে নিজেদের কষ্টের কথা বলছে। অন্য একটি ভিডিওতে আরেক শিশুকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি খুব ক্লান্ত, আর পারছি না। মা, আমার ভুল হয়েছে। আমি বাড়ি ফিরে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে চাই।’
এগুলো মূলত চীনের ‘চি কু’ বা কষ্ট সহ্য করার প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য সিচুয়ান, ইউনান ও গুইঝোর মতো এলাকায় এসব ক্যাম্প আয়োজন করা হয়। অনেক অভিভাবক মনে করেন, আজকের শিশুরা খুব আলসে ও নাজুক হয়ে পড়ছে। তাই তাদের শক্ত ও কষ্টসহিষ্ণু করে তুলতেই এসব ক্যাম্পে পাঠানো হয়।
.
২০০০ সাল থেকেই চীনে এ ধরনের ক্যাম্প রয়েছে। তবে সম্প্রতি এগুলোর জনপ্রিয়তা অনেক বেড়েছে। এমনকি ভিডিওতে শিশুদের কান্নার দৃশ্য দেখেও অনেক মা–বাবা তাঁদের সন্তানদের এসব ক্যাম্পে ভর্তি করাচ্ছেন।
.এআই কি হারিয়ে যাওয়া পাখির গান ফিরিয়ে আনতে পারবে.
এগুলো মূলত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত বাণিজ্যিক কর্মসূচি। ১০ দিনের প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় পাঁচ হাজার ইউয়ান (প্রায় ৭০০ ডলার) এবং এক মাসের জন্য ১০ হাজার ইউয়ানের বেশি খরচ করতে হয়। অতিরিক্ত চাহিদার কারণে ভর্তি হতে অভিভাবকদের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলে।
ভিডিওগুলোয় দেখা যায়, শিশুরা রোদে জমি চাষ করছে, চা–পাতা তুলছে, রান্না করছে, ইট বইছে, গোয়ালঘর পরিষ্কার করছে এবং পিঠে চালের বস্তা নিয়ে পাহাড়ি পথে হাঁটছে। তবে মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ধরনের কঠিন পরিবেশ শিশুদের ওপর কেমন মানসিক প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করে তাদের বয়স, কাজের চাপ এবং তারা কতটুকু মানসিক সমর্থন পাচ্ছে তার ওপর।
.
কষ্টের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার সুযোগ
আট বছর বয়সী এক শিশুর মা টং লু নিজে এ ধরনের ক্যাম্প আয়োজন করে থাকেন। সম্প্রতি তাঁর কোম্পানি ‘হাওশি স্টাডি ট্যুর’ ঝেজিয়াংয়ের লিশুই পাহাড়ি এলাকায় শিশুদের জন্য ছয় দিনের একটি বিশেষ ক্যাম্প পরিচালনা করে।
গ্রীষ্মের সবচেয়ে গরম সময়ে এই ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। জুলাইয়ে সেখানকার তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকে। ‘সোয়াপড লাইভস’ নামের এই কর্মসূচিতে ৯ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের গ্রামীণ কৃষক পরিবারের সঙ্গে রেখে কাজ শেখানো হয়।
টং লু জানান, বর্তমান যুগে শিশুদের জীবন অনেক সহজ হয়ে গেছে। অনেকে কষ্ট সহ্য করতে পারে না এবং কোনো কাজে লেগে থাকার গুরুত্ব বোঝে না। তারা ভালো খাবার ও পোশাক পায়, মা–বাবা নানা সুবিধা দেন এবং প্রায় সবার ঘরেই গাড়ি থাকে। ফলে তারা কিছুটা কোমল ও আলসে হয়ে পড়ছে।
.এআইয়ের যুগে মানুষের বুদ্ধিমত্তাই আসল—ফরিদ জাকারিয়া.
ক্যাম্পে এমন সব কাজ রাখা হয়, যাতে শিশুরা বুঝতে পারে কোনো সহজ জিনিস পাওয়ার পেছনে কতটা পরিশ্রম থাকে। উদাহরণ হিসেবে, শিশুরা ঝুড়ি নিয়ে কাঠ কুড়াতে যায়। তিন–চার ঘণ্টা ধরে কাঠ কুড়িয়ে ও বহন করে এনে মাটির চুলায় রান্না করতে হয়, আর সেই খাবার মাত্র ১০ মিনিটে খাওয়া শেষ হয়ে যায়।
শিশুরা প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিনিট চা–পাতা তোলে। এসব বিক্রি করে পাওয়া দুধ বা ডাল–শস্যের মতো খাবার গরিব পরিবারগুলোকে দান করা হয়। এ ছাড়া তারা ১০ থেকে ২০ মিনিট ধরে গোয়ালঘরের গোবর পরিষ্কার করে তা বয়ে নিয়ে যায়। এই গোবর সার তৈরি বা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, খাবার কোথা থেকে আসে এবং প্লেটে পৌঁছানোর আগে কতটা শ্রম দিতে হয়, তা শিশুদের শেখানো।
.
তবে ক্যাম্পে এসে প্রথম ধাক্কা শিশুরা খায় নিজেদের ঘর দেখে। গ্রামের সাধারণ ঘরে কাঠের দোতলা বিছানায় ছয় থেকে আট শিশুকে থাকতে হয়। ঘরগুলো পরিষ্কার হলেও শহরের আরামদায়ক হোটেলের মতো নয়। তাই প্রথম দেখাতেই অনেক শিশু বাড়ি ফেরার জন্য কান্না শুরু করে।
ক্যাম্পের এক দিন শিশুদের গ্রামের স্কুলের অভিজ্ঞতা দিতে বিশেষ আয়োজন করা হয়। সেদিন পাঁচ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ হেঁটে পরিত্যক্ত একটি স্কুলে যেতে হয়। সঙ্গে এক কেজি চালের বস্তা বহন করতে হয়। পথে ক্লান্ত হলে তারা বিশ্রাম নিতে পারে। তবে কাজ শেষ করতেই হয়। শেষে সেই পরিত্যক্ত স্কুলেই সবাই মিলে টিনের পাত্রে ভাত খায়।
ক্যাম্প শেষের আগের রাতে একটি বিশেষ পর্ব থাকে। ক্যাম্প শুরু হওয়ার আগেই অভিভাবকদের দিয়ে গোপনে চিঠি লিখিয়ে নেওয়া হয়। কঠিন শারীরিক পরিশ্রমের দিনগুলো শেষে চিঠিগুলো শিশুদের হাতে দেওয়া হয়। মা–বাবার চিঠি পড়ে অনেক শিশু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে। এতে পরিবার ও মা–বাবার প্রতি তাদের ভালোবাসার অনুভূতি তৈরি হয়।
.শিশুদের রাগ বা জেদ সামলানোর উপায় কী.
কঠিন পরিবেশ কি সত্যি সহনশীল করে তোলে
কঠিন পরিস্থিতিতে ফেললেই কি শিশুরা সহনশীল হয়ে ওঠে? বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক মানসিক সমর্থন ছাড়া অতিরিক্ত কষ্ট দিলে শিশুরা শক্তিশালী হওয়ার বদলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে।
সিঙ্গাপুরের নানয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানী সেতো পেইপেই জানান, বেশি কষ্ট সহ্য করার নামই সহনশীলতা নয়। সাইকেল চালাতে গিয়ে পড়ে আবার চেষ্টা করা একটি ভালো অভিজ্ঞতা। কিন্তু কেবল শাস্তি দেওয়া বা কষ্ট দেওয়ার জন্য কঠিন কাজ করানো মোটেও ইতিবাচক নয়। শিশু যদি বুঝতে পারে সাহায্য চেয়ে লাভ নেই, তবে সে কেবল নীরবে কষ্ট সহ্য করতে শেখে। কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা শেখে না।
অনেক সময় মিথ্যা বলে বা ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে শিশুদের এসব ক্যাম্পে পাঠানো হয়। এতে শিশুরা মা–বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার বদলে তাঁদের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। এ ক্ষেত্রে বয়সও একটি বড় বিষয়। ১৫ বছরের একটি কিশোর হয়তো বুঝে ফেলে কেন তাকে এই কষ্ট দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ছোট শিশুদের জন্য পরিচিত ও ভালোবাসার মানুষের নিরাপত্তা বেশি প্রয়োজন। তবে সব শিশু যে এটা অপছন্দ করে, তা নয়। অনেকেই পরে খামারের কাজ উপভোগ করতে শুরু করে।
অধ্যাপক ডেজিরে কিন বাওলিয়ান বলেন, কোনো চ্যালেঞ্জিং কাজে পাঠালেও চারপাশের পরিবেশ অবশ্যই ভালোবাসাপূর্ণ হতে হবে। ভয়ের কারণে পাওয়া সাময়িক বাধ্যতা বেশি দিন থাকে না; বরং এতে বড়দের প্রতি অবিশ্বাসের জন্ম হয়। কিন্তু সঠিক যত্ন ও ভালোবাসায় বেড়ে উঠলে শিশুরা জীবনের যেকোনো কঠিন মুহূর্ত সহজে পার করতে পারে।
সূত্র: সিং নিউজ, ইয়াহু নিউজ, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, চ্যানেল নিউজ এশিয়া
.কেউ মিথ্যা বলছে কি না কীভাবে বুঝব























