ঢাকা ১০:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

টাঙ্গাইলে যে মণ্ডপে ১১ বছর ধরে নারীদের উদ্যোগে দুর্গাপূজা

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৪২:৩৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
আমাদের সর্বশেষ নিউজ পেতে ক্লিক করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

হিন্দু নারীদের নানা কুসংস্কারের কারণে বৈষম্যের শিকার হতে হতো। এই বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে নারীরা সংগঠিত হয়ে ‘উজ্জয়িনী’ নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। আর এই সংগঠনের উদ্যোগে ১১ বছর ধরে ‘দুর্গতিনাশিনী দেবী’ দুর্গার পূজা করা হচ্ছে।

ব্যতিক্রমী এই দুর্গাপূজামণ্ডপটি টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার দশকিয়া ইউনিয়নের মগড়া গ্রামে অবস্থিত। এই পূজামণ্ডপের চাঁদা সংগ্রহ, বাজারঘাট, ঢাক বাজানো থেকে শুরু করে সব কাজ করেন নারীরা।

বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ কালিহাতী উপজেলা শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কাশীনাথ মজুমদার বলেন, টাঙ্গাইল জেলায় এবার ১ হাজার ৩৫৭টি দুর্গাপূজার মণ্ডপ হয়েছে। এর মধ্যে কালিহাতীর মগড়া গ্রামে নারীদের উদ্যোগে দুর্গাপূজার আয়োজনটি ব্যতিক্রম। নারীদের এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের জন্য এর আগে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই পূজা কমিটিকে পুরস্কারও দেওয়া হয়।  এটিই জেলার একমাত্র মণ্ডপ, যেখানে পূজার আয়োজন করেন নারীরা।

নারীদের উদ্যোগে দুর্গাপূজা কীভাবে শুরু হলো, জানতে চাইলে এই পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সীমা কর্মকার (৪২) বলেন, ‘এ গ্রামের হিন্দু মেয়েদের সমাজে, এমনকি পরিবারেও বৈষম্যের শিকার হতে হতো। ঘোমটা ছাড়া ঘরের বাইরে বের হলে কথা শুনতে হতো। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলেও ছেলে–মেয়ে একসঙ্গে পড়ে, এমন প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হতে বাধা দিত, স্বামীর চেয়ে বেশি লেখাপড়া করা যাবে না, এমন নানা বিধিনিষেধ ছিল।

তিনি আরও বলেন, ২০০২ সালে সম্মান শ্রেণিতে ভর্তির সময় আমাকেও নানা সমস্যায় পড়তে হয়। তখন মনে মনে চিন্তা করি, এর প্রতিবাদ করতে হবে। নারীদের সংগঠিত করতে হবে। আমাদের গ্রামেই বিয়ে হয়ে আসে এক বধূ। ওনার নামও সীমা কর্মকার (এই সীমা আমার চেয়ে ছয় বছরের বড়)। আমরা নারীদের মুক্তির জন্য ওনার সঙ্গে আলাপ আলোচনা করতাম। একসময় আমরা দুজন (দুই সীমা কর্মকার) এবং শিপ্রা পাল ও বুলবুলি কর্মকার চারজন মিলে ওই বছরই গঠন করি ‘উজ্জয়িনী’ সংগঠন। পরে একে একে আরও নারী, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা যুক্ত হতে থাকে আমাদের সঙ্গে। পরে আমরা সিদ্ধান্ত নেই ‘দুর্গতিনাশিনী দেবী’ দুর্গার পূজা করব আমরা নিজেরাই। সব জায়গায় পুরুষেরা আয়োজনে মুখ্য ভূমিকায় থাকে। পুরুষেরা পারলে আমরা পারব না কেন। ২০১৬ সালে আমরা প্রথম দুর্গাপূজা শুরু করি। সফলভাবে পূজা সম্পন্ন করার পর আমাদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবছর আমরা দুর্গাপূজার আয়োজন করছি। এবার ১১তম দুর্গাপূজা হচ্ছে।’

গতকাল সোমবার দুপুরে মগড়া গ্রামের কর্মকার পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, উজ্জয়িনী উদ্যোগে কর্মকার পাড়ায় অস্থায়ী মণ্ডপ তৈরি করা হয়েছে। অষ্টমী পূজার পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে নারীরা মন্দির প্রাঙ্গণেই অবস্থান করছেন। দর্শনার্থীরা আসছেন দেবী দুর্গাকে দেখতে। এক মেয়ে ঢাক বাজাচ্ছেন।

সেখানে কথা হয় টাঙ্গাইল থেকে পূজা দেখতে আসা সুব্রত কুমার তালুকদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অনেক পূজামণ্ডপ দেখেছি। শুধু নারীদের উদ্যোগে দুর্গাপূজা এই প্রথম দেখলাম। ভালো লাগল, নারীদের পূজার আয়োজন দেখে।’

মগড়া গ্রামের তুষার কর্মকার বলেন, এই গ্রামের নারীদের দুর্গাপূজার আয়োজন ভালো উদ্যোগ। এর মধ্য দিয়ে শুধু পূজা হচ্ছে না, নারীদের ক্ষমতায়ন ও সক্ষমতার বিষয়টিও জানান দিচ্ছে।

এ বিষয়ে পূজা কমিটির সভাপতি সীমা কর্মকার (৪৮) বলেন, ‘পূজার সব কাজ আমরা নারীরাই করি, শুধু পুরুষ পুরোহিত পূজা করেন। আমাদের সদস্যরা সবাই পূজার জন্য চাঁদা দিই। শুরুতে অনেকেই আমাদের এই আয়োজনকে ভালো চোখে দেখত না। এখন সবাই সহযোগিতা করেন।’

বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভানেত্রী সারওয়াত সিরাজ শুক্লা এবার পূজায় উজ্জয়িনীর সব সদস্যকে শাড়ি উপহার দিয়েছেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
   

টাঙ্গাইলে যে মণ্ডপে ১১ বছর ধরে নারীদের উদ্যোগে দুর্গাপূজা

আপডেট সময় : ০৯:৪২:৩৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

হিন্দু নারীদের নানা কুসংস্কারের কারণে বৈষম্যের শিকার হতে হতো। এই বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে নারীরা সংগঠিত হয়ে ‘উজ্জয়িনী’ নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। আর এই সংগঠনের উদ্যোগে ১১ বছর ধরে ‘দুর্গতিনাশিনী দেবী’ দুর্গার পূজা করা হচ্ছে।

ব্যতিক্রমী এই দুর্গাপূজামণ্ডপটি টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার দশকিয়া ইউনিয়নের মগড়া গ্রামে অবস্থিত। এই পূজামণ্ডপের চাঁদা সংগ্রহ, বাজারঘাট, ঢাক বাজানো থেকে শুরু করে সব কাজ করেন নারীরা।

বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ কালিহাতী উপজেলা শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কাশীনাথ মজুমদার বলেন, টাঙ্গাইল জেলায় এবার ১ হাজার ৩৫৭টি দুর্গাপূজার মণ্ডপ হয়েছে। এর মধ্যে কালিহাতীর মগড়া গ্রামে নারীদের উদ্যোগে দুর্গাপূজার আয়োজনটি ব্যতিক্রম। নারীদের এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের জন্য এর আগে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই পূজা কমিটিকে পুরস্কারও দেওয়া হয়।  এটিই জেলার একমাত্র মণ্ডপ, যেখানে পূজার আয়োজন করেন নারীরা।

নারীদের উদ্যোগে দুর্গাপূজা কীভাবে শুরু হলো, জানতে চাইলে এই পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সীমা কর্মকার (৪২) বলেন, ‘এ গ্রামের হিন্দু মেয়েদের সমাজে, এমনকি পরিবারেও বৈষম্যের শিকার হতে হতো। ঘোমটা ছাড়া ঘরের বাইরে বের হলে কথা শুনতে হতো। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলেও ছেলে–মেয়ে একসঙ্গে পড়ে, এমন প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হতে বাধা দিত, স্বামীর চেয়ে বেশি লেখাপড়া করা যাবে না, এমন নানা বিধিনিষেধ ছিল।

তিনি আরও বলেন, ২০০২ সালে সম্মান শ্রেণিতে ভর্তির সময় আমাকেও নানা সমস্যায় পড়তে হয়। তখন মনে মনে চিন্তা করি, এর প্রতিবাদ করতে হবে। নারীদের সংগঠিত করতে হবে। আমাদের গ্রামেই বিয়ে হয়ে আসে এক বধূ। ওনার নামও সীমা কর্মকার (এই সীমা আমার চেয়ে ছয় বছরের বড়)। আমরা নারীদের মুক্তির জন্য ওনার সঙ্গে আলাপ আলোচনা করতাম। একসময় আমরা দুজন (দুই সীমা কর্মকার) এবং শিপ্রা পাল ও বুলবুলি কর্মকার চারজন মিলে ওই বছরই গঠন করি ‘উজ্জয়িনী’ সংগঠন। পরে একে একে আরও নারী, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা যুক্ত হতে থাকে আমাদের সঙ্গে। পরে আমরা সিদ্ধান্ত নেই ‘দুর্গতিনাশিনী দেবী’ দুর্গার পূজা করব আমরা নিজেরাই। সব জায়গায় পুরুষেরা আয়োজনে মুখ্য ভূমিকায় থাকে। পুরুষেরা পারলে আমরা পারব না কেন। ২০১৬ সালে আমরা প্রথম দুর্গাপূজা শুরু করি। সফলভাবে পূজা সম্পন্ন করার পর আমাদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবছর আমরা দুর্গাপূজার আয়োজন করছি। এবার ১১তম দুর্গাপূজা হচ্ছে।’

গতকাল সোমবার দুপুরে মগড়া গ্রামের কর্মকার পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, উজ্জয়িনী উদ্যোগে কর্মকার পাড়ায় অস্থায়ী মণ্ডপ তৈরি করা হয়েছে। অষ্টমী পূজার পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে নারীরা মন্দির প্রাঙ্গণেই অবস্থান করছেন। দর্শনার্থীরা আসছেন দেবী দুর্গাকে দেখতে। এক মেয়ে ঢাক বাজাচ্ছেন।

সেখানে কথা হয় টাঙ্গাইল থেকে পূজা দেখতে আসা সুব্রত কুমার তালুকদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অনেক পূজামণ্ডপ দেখেছি। শুধু নারীদের উদ্যোগে দুর্গাপূজা এই প্রথম দেখলাম। ভালো লাগল, নারীদের পূজার আয়োজন দেখে।’

মগড়া গ্রামের তুষার কর্মকার বলেন, এই গ্রামের নারীদের দুর্গাপূজার আয়োজন ভালো উদ্যোগ। এর মধ্য দিয়ে শুধু পূজা হচ্ছে না, নারীদের ক্ষমতায়ন ও সক্ষমতার বিষয়টিও জানান দিচ্ছে।

এ বিষয়ে পূজা কমিটির সভাপতি সীমা কর্মকার (৪৮) বলেন, ‘পূজার সব কাজ আমরা নারীরাই করি, শুধু পুরুষ পুরোহিত পূজা করেন। আমাদের সদস্যরা সবাই পূজার জন্য চাঁদা দিই। শুরুতে অনেকেই আমাদের এই আয়োজনকে ভালো চোখে দেখত না। এখন সবাই সহযোগিতা করেন।’

বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভানেত্রী সারওয়াত সিরাজ শুক্লা এবার পূজায় উজ্জয়িনীর সব সদস্যকে শাড়ি উপহার দিয়েছেন।